পাপের প্রায়শ্চিত্ত : দুই বাংলার বন্যা

আপডেট: আগস্ট ২২, ২০১৭, ১:৩২ পূর্বাহ্ণ

কলকাতা থেকে দীপঙ্কর দাসগুপ্ত


একজনের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে গিয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও প্লাবন রাঢ় বাংলার এপার ওপারের এবারের জলোচ্ছ্বাসে যে বিপুল ক্ষতি হল, তার ফলে ইতোমধ্যে প্রায় শতাধিক লোক প্রাণ হারিয়েছেন। আর দিন কাটাতে হচ্ছে কলার ভেলায়। ১০ বছর আগে যদি তিস্তা চুক্তি হত, তাহলে হয়তো এবারের বন্যা থেকে লক্ষ লক্ষ একর চাষ জমি ও মানুষকে বাঁচানো যেত। তাঁর জেদ, তাঁর গোয়ার্তুমি এবং বাংলাদেশের জামাতদের সঙ্গে তার আঁতাত এই চুক্তি হতে দেয়নি। যার পরিণাম এই বিপুল ক্ষতি। ভারত ও বাংলাদেশের নদীগুলি বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। পলি পড়ে নদীগুলো যদিও জল ধরে রাখতে অক্ষম। উত্তরবঙ্গের নদীগুলো পলি পড়ে কার্যত জল ধরে রাখতে অক্ষম। উত্তরবঙ্গের নদীগুলো পলিসরানোর জন্য ভারত সরকার গত ১০ বছরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা দেয়। তাই উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক নেতারা প্রশ্ন তুলেছেন সে টাকা কোথায় গেল?
বিপজ্জনকভাবে গঙ্গা, মহানন্দা, ফুলাহার, আত্রেয়ী, পুনর্ভবার জল বেড়ে চলেছে। চরম বিপদের মধ্যে পড়েছে মালদহ, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর। বিভিন্ন জায়গায় নদীর বাঁধ ভেঙেছে, জলমগ্ন হয়ে পড়েছে একের পর এক গ্রাম, ধসে পড়েছে সেতু। জলে ডুবে রয়েছে হাসপাতাল। নৌকা করে রোগিদের আনা- নেয়া করা হচ্ছে। জাতীয় সড়ক জুড়ে জল। অসংখ্য মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন জাতীয় সড়কের ওপর। এদিকে খাদ্যের জন্য বুভুক্ষু মানুষের হাহাকার পড়েছে সবকটি বানভাসি এলাকায়। ত্রাণের জন্য বিক্ষোভ দেখাতে এসে বংশিহারিতে বিডিও অফিস থেকে ত্রাণ সামগ্রী লুট করেন বানভাসি মানুষ। ভয়ঙ্কর আকার নিয়েছে উত্তরবঙ্গের এই অংশের বাকি নদীগুলিও। গঙ্গার ভাঙনে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে মালদহ ও মুর্শিদাবাদে। বিপন্ন হয়ে পড়েছে বহু গ্রাম। এরই মধ্যে মালদহের ১০ জন এবং দক্ষিণ দিনাজপুরের ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
দক্ষিণ দিনাজপুরের বন্যা পরিস্থিতি এক ভয়াবহ আকার নিয়েছে। গত ২৫ বছরের রেকর্ড ভেঙে আত্রেয়ীর জল চরম বিপদসীমা ছাপিয়ে বইতে শুরু করেছে। বালুরহাট, গঙ্গারামপুর, বুনিয়াদপুর পুরোপুরি জলের তলায়। বালুরঘাট গুরসভার পুরো এলাকাই বন্যার জলে থৈ থৈ করছে। পুনর্ভবা নদীল জল কুল ছাপিয়ে গ্রামে ঢুকছে। এদিকে টাঙ্গনের জলে ভেসে গেছে বংশিহারী। বংশিহারির হাসপাতাল জলের তলায়। একতলাটা পুরোপুরি ডুবে গেছে। রোগিদের সরিয়ে নেয়া হয়েছে। রোগী আনা নেয়া করতে হচ্ছে নৌকা করে। গ্রামগুলি জলে ভেসে যাওয়ায় বিভিন্ন অংশে শুরু হয়েছে বিক্ষোভ। জল সরাতে বালুরঘাট হিলি রাস্তায় পাঙ্গার পাড়ায় একটি অংশ কেটে দিলেন গ্রামবাসীরা। এর ফলে গুরুত্বপুর্ণ এই সীমান্ত রাস্তাটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। গঙ্গরামপুর কালিয়াচক রাস্তা পুরোপুরি জলের তলায়। টাংগন, পুনর্ভবা, আত্রেয়ী নদীর বাঁধ ভেঙে ১৩ আগস্ট রাত থেকে প্লাবিত হয়েছে দক্ষিণ দিনাজপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা। কুমারগঞ্জ, গঙ্গারামপুর, কুশমণ্ডী, হিলি ব্লকের সমস্ত এলাকা জলের তলায় চলে গিয়েছে। বাড়িছাড়া কয়েক লক্ষ বাসিন্দা। বহু মানুষ আটকে রয়েছেন নানা জায়গায়। সোমবার ভোর থেকে টিমে তালে উদ্ধারকার্য শুরু হলেও ত্রাণ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার অভিযোগ তুলেছেন দক্ষিণ দিনাজপুরের বাসিন্দারা। লাগাতার চারদিনের বর্ষণে জলমগ্ন হয়ে পড়েছে বালুরঘাটের একাধিক ওয়ার্ড। আত্রেয়ী, পুনর্ভবা ও টাঙ্গন নদীর বাঁধ ভেঙে গত ১৩ আগস্ট থেকেই শহরে জল ঢুকতে শুরু করেছে। তা এথন ভয়াবহ আকার নেয়। এখন পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
উত্তর দিনাজপুরের অবস্থার খানিকটা উন্নত হলেও পরিস্থিতি খুবই গুরুতর। এলাকার পর এলাকা জলে ডুবে রয়েছে। এদিন সকালে করণদিঘি- দোমোহনা রাস্তায় সুধানি নদীর চুনাবাড়ি ব্রিজ ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। এটি হলো ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের বিকল্প পথটি। এর ফলে দোমোহনা হয়ে শিলিগুড়ি যাওয়ার এই বিকল্প পথটি বন্ধ হয়ে যায়। এই জেলা ১৬ আগস্ট থেকে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত সমস্ত স্কুল ও কলেজে ছুটি ঘোষণা করেছে প্রশাসন। ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের বিভিন্ন অংশ জলে ডুবে রয়েছে। এই রাস্তায় একটা বড় অংশে বানভাসী মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। ১৯৮৭ সালের পর রায়গঞ্জ পুরসভায় এমন পরিস্থিতি আর হয়নি। গোটা শহর গত তিনদিন ধরে জলের তলায় রয়েছে।
এদিকে মালদহ জেলার অবস্থা আবার বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। মহানন্দাসহ জেলার সবকটি নদীর জল বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে। ফুলাহার নদী অত্যন্ত বিধ্বসী চেহারা নিয়েছে। বহু গ্রাম ভাসিয়ে নিয়েছে। বহু গ্রাম ভাসিয়ে দিয়েছে ফুলাহারের জল। ইংলিশ বাজার পুরসভা পুরোপুরি ডুবে গেছে। জেলার বহু গ্রাম জলের তলায়। বিহারের বন্যা পরিস্থিতির জেরে জটিল হল মালদহের হরিশ্চন্দ্রপুরের পরিস্থিতি। পর পর দুটি ব্লক প্লাবিত হয়ে গিয়েছে মালদহের বন্যার জলে। হরিশ্চন্দ্রপুর লাগোয়া বিহারের পালসাতে ধুবল বাঁধ কেটে দেন স্থানীয়রা। যার ফলে এলাকায় জল ঢুকে প্লাবিত হয় হরিশ্চন্দ্রপুরের ২ নম্বর ব্লকের তিনটি গ্রাম। জলের তোড়ে একটি শিশুও তলিয়ে গিয়েছে বলে খবর।
গত ৪৮ ঘণ্টায় ফুলাহার নদীর জল বেড়েছে ১৫০ সেন্টিমিটার। সেই জলই ঢুকেছে হরিশ্চন্দ্রপুরের দুটি ব্লবের বিস্তীর্ণ এলাকায়। এদিকে জলমগ্ন হচ্ছে দেখে হরিশ্চন্দ্রপুরের কাটমানি বাঁধ ভেঙে দেয় এলাকাবাসী। ফলে প্লাবিত হয়ে যায় পিপলাসহ একাধিক এলাকা। এরই মধ্যে হরিশ্চন্দ্রপুরের শীষতলায় জলের তোড়ে ভেসে গিয়েছে ৮ বছরের একটি শিশু। এলাকার মানুষের অভিযোগ বিহারের বন্যায় জল হু হু করে ঢুকছে মালদহে। প্রশাসনের তরফেও ত্রাণের কোনো ব্যবস্থা নেই। এলাকার অধিকাংশ স্কুলই জলমগ্ন। অনেকেই নিকটবর্তী বাঁধ সংলগ্ন এলাকায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন।
এদিকে বিহার ও উত্তরপ্রদেশে ব্যাপক বৃষ্টি হওয়ায় গঙ্গার জল ফেঁপে ফুলে উঠেছে। বাঁধ বাঁচাতে ফরাক্কা ব্যারাজের বেশিরভাগ গেটই খুলে দেয়া হয়েছে। ফলে বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে ব্যারেজের নিচের মুর্শিদাবাদ। শুরু হয়েছে ব্যাপক ভাঙন। একইসঙ্গে মালদহের গঙ্গা ও ফুলাহারের পাড়ে ব্যাপক ধস নামছে। বেশ কিছু বাড়ি ও চাষের জমি নদীর জলে তলিয়ে গেছে।
উত্তরের তিন জেলা জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহারের অবস্থার অনেকটা উন্নত হয়েছে। বৃষ্টি কমে গেছে। তবে জেলাগুলির বহু গ্রাম এখন জলের তলায়। অসংখ্য মানুষ নিরাশ্রয় হয়ে রাস্তায় ও নদীর বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন। সর্বত্রই ত্রাণের জন্য হাহাকার। মাথা গোঁজার জন্য সামান্য ত্রিপল ও প্লাস্টিক চাদরও বহু মানুষ পাননি।
ত্রাণের জন্য হাহাকার রাজ্যের সবকটি বানভাসি এলাকায়। সর্বত্রই দুর্গত মানুষ ত্রাণ না পেয়ে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। এই বিক্ষোভ আজ বড় আকার নেয় দক্ষিণ দিনাজপুরের বংশিহারীতে। সকাল থেকে সেখানকার ব্লক আধিকারিকের অফিসে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন বানভাসি মানুষরা। বিক্ষোভ দেখাবার সময় তারা জানতে পারেন ঐ অফিসে একটি ঘরে ত্রাণ সামগ্রী বিশেষ করে খাবার রয়েছে। বুভুক্ষুমানুষের সেই ঘরের দরজা ভেঙে খাবার লুট করে নিয়ে যান গ্রামে। উত্তরবঙ্গের বানভাসি সবকটি জেলাতেই মানুষ খাবারের জন্য হাহাকার করছেন। সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিদের সামনে পেলেই সবাই একটু খাবারের জন্য আকুল আর্তি জানাচ্ছেন। এদিকে বেশিরভাগ জায়গাতেই গ্রামবাসীদের অভিযোগ, ত্রাণ নিয়ে চূড়ান্ত দলবাজি চলছে। ছিঁটেফোঁট যেটুকু আসছে তা শুধুমাত্র তৃণমূলের সমর্থকদের মধ্যেই বিলি করা হচ্ছে।