পাবনায় শহিদ পুলিশ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সংবর্ধনা প্রাসঙ্গিক

আপডেট: ডিসেম্বর ২০, ২০১৬, ১২:০১ পূর্বাহ্ণ

হাবিবুর রহমান স্বপন


যথাযোগ্য মর্যাদায় সারাদেশে মহান বিজয় দিবস পালিত হলো। ৪৫ বছর পর এবারই প্রথম পাবনা পুলিশ কর্তৃপক্ষ, বীর পুলিশ মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ পুলিশ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে সংবর্ধনা প্রদান করলো। আজ এটিই আমার লেখার বিষয়।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ২৫ মার্চ কালরাতে ভারী অস্ত্রের সাহায্যে হামলা চালায় রাজারবাগ পুলিশ সদর দপ্তর এবং পিলখানাস্থ ইপিআর সদর দপ্তরে। পুলিশের বীর সদস্যগণ হালকা অস্ত্র নিয়েই হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। এই যুদ্ধে শহিদ হন অনেক পুলিশ।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে ছাত্র, শিক্ষক, পুলিশ, বিডিআর, সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্যসহ সাধারণ মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেন। প্রথম কাতারে যারা অংশ নেন, পুলিশ তাদের মধ্যে অন্যতম।
আমাদের পাবনায় প্রথম যখন হানাদার বাহিনী দখল নেয়, তখন থেকেই পুলিশ বাহিনী ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। ২৫ মার্চের পর পাবনা শহরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে কোণঠাঁসা করে রাখে জনতা। ছাত্র-জনতাকে সাহস যোগায় পুলিশ বাহিনী। পাকিস্তানি সৈন্যদের মোকাবেলা করতে পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগার (ম্যাগজিন) থেকে আগ্নেয়াস্ত্র গোলাবারুদ তুলে দেয়া হয় মুক্তিকামী ছাত্র-জনতার হাতে। একই সাথে পুলিশ সদস্যগণ হানাদারদের প্রতিরোধ করে। হানাদার বাহিনী ২৮ মার্চ সকালে পাবনা পুলিশ লাইনে হামলা চালায়। পুলিশ সদস্যগণ, পুলিশ লাইন, অ্যাডভোকেট বার বিল্ডিং, জজ কোর্টের ছাদসহ বিভিন্ন বিল্ডিংয়ের ছাদে এবং বাঙ্কারে অবস্থান নিয়ে হানাদার বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করে। এর পর হাজার হাজার মানুষ দেশিয় অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে মুহুর্মূহু ‘জয় বাংলা’ ম্লোগান দিয়ে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলে পাকিস্তানি সৈন্যদের। পাক হানাদাররা পিছু হটে যায় বিসিক শিল্প নগরীর ক্যাম্পে। এর পর পুলিশ লাইনের আর আই (রিজার্ভ ইন্সপেক্টর) মো. আবুল খায়ের পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগার খুলে অস্ত্র এবং গোলাবারুদ তুলে দেন ছাত্র-জনতার হাতে। তাকে সাহস যোগান পুলিশ সুপার চৌধুরী এ গফ্ফার (কিউ, পি, এম, পি, পি, এম) এবং জেলা প্রশাসক নূরুল কাদের খান। চৌধুরী গফ্ফার পাবনায় পুলিশ সুপারের দায়িত্ব পান ২৭ জুলাই ১৯৭০। তিনি ৩ এপ্রিল ১৯৭১ পর্যন্ত পাবনায় দায়িত্ব পালন করে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন। উল্লেখ্য, ৪ এপ্রিল থেকে ১১ মে পর্যন্ত পাবনা জেলায় পুলিশ সুপারের পদটি খালি ছিল।
এরপর পুরাতন টেলিফোন এক্সচেঞ্জে অবস্থিত পাকিস্তানি সেনাদের ঘিরে ফেলে মুক্তিযোদ্ধাগণ। এই যুদ্ধেরও নেতৃত্ব দেন আর আই আবুল খায়ের। হানাদার বাহিনীর সকল সদস্য নিহত হয়। ২৯ মার্চ মুক্ত হয় পাবনা শহর। এভাবে মুক্ত থাকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত। ১৩ দিন মুক্ত পাবনার মানুষের জান-মাল এবং সম্পদের নিরাপত্তা দেয় পুলিশ বাহিনী।
১১ এপ্রিল সন্ধ্যায় পাবনায় প্রবেশ করে হানাদার সৈন্যরা। তারা প্রথমেই হত্যা করে পুলিশ বাহিনীতে কর্তব্যরতদের। শহিদ হন ২৯ জন পুলিশ। যাঁদের নাম লেখা রয়েছে পাবনা পুলিশ লাইন মাঠের শহিদ মিনারে। তাঁরা হলেন, আব্দুল জলিল (সাব ইন্সপেক্টর), মীর্জা হাবিবুর রহমান বেগ (সাব ইন্সপেক্টর), মজিবুল হক (সাব ইন্সপেক্টর), আলী আজম ভূঁইয়া (সাব ইন্সপেক্টর), তৌহিদ খান (সাব ইন্সপেক্টর), বিনয় ভূষণ সিংহ (সাব ইন্সপেক্টর),  গিয়াস  উদ্দিন (সাব ইন্সপেক্টর), মোনতোস আলী (সাব ইন্সপেক্টর), অনীল কুমার ঘোষ (সহকারী সাব ইন্সপেক্টর), ইসরাইল  হক (হাবিলদার), সিরাজুল ইসলাম সিদ্দিক (হাবিলদার), রজব আলী (হাবিলদার), আব্বাস আলী (নায়েক), এতিম আলী (কনস্টবল), রেনু মিয়া (কনস্টবল), মোসলেম উদ্দিন (কনস্টবল), আব্দুস  সামাদ (কনস্টবল), ইমান আলী মোল্লা (কনস্টবল), লাল খাঁ (কনস্টবল), ফয়েজ উদ্দিন (কনস্টবল), আবুল কাশেম (কনস্টবল), সহির উদ্দিন (কনস্টবল), রমজান আলী (কনস্টবল)।
নগরবাড়ি ঘাটের প্রতিরোধ যুদ্ধে পুলিশ সদস্যগণ জনতার সঙ্গে এক কাতারে থেকে যুদ্ধ করেন। পাকিস্তানি সৈন্যদের ভারি অস্ত্র এবং বিমান আক্রমণের কারণে পিছু হটতে বাধ্য হয় পুলিশ-বিডিআর এবং ছাত্র-জনতা। এর পর সবাই নিরাপদ স্থানে চলে যায়। পুলিশের আর আই আবুল খায়ের ভারতের কেচুয়াডাঙ্গা ক্যাম্পে মুক্তি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয়ার দায়িত্ব পান।
২৫ মার্চ রাতে হানাদারদের বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে স্বাধীনতার প্রথম বীজ বপণ করেছিলেন পুলিশ সদস্যগণ। সেই কাতারে পাবনায় কর্মরত পুলিশ সদস্যগণও ছিলেন।
পাবনা পুলিশ লাইনের শহিদ মিনারে খোদিত বীর শহিদ পুলিশ ভাইদের নাম এখন অস্পষ্ট। কালি উঠে গেছে লেখা পাঠোদ্ধার করা কষ্টকর।
আমাদের স্মৃতি এখন অনেকটাই ঝাঁপসা। কারণ আমরা  নিজেরা নিজেদের নিয়ে মহাব্যস্ত। স্বাধীনতার বীর সেনানীদের কথা আমরা ভুলতে বসেছি। বিভিন্ন জাতীয় দিবসে আমরা স্মৃতিচারণ করি। যুদ্ধের গল্প বলি। কিন্তু খুব কমই উচ্চারিত হয় পুলিশ ভাইদের কথা। যাঁরা  বুকের তাজা রক্ত দিয়ে  দেশ স্বাধীন করেছেন তাদের কথা স্মরণ করি না! দুর্জয় পাবনার পাদদেশে আমরা পুষ্পার্ঘ অর্পণ করি। কিন্তু পুষ্পার্ঘ দেখি না বা দেই না পুলিশ লাইনের মাঠে তৈরি শহিদ পুলিশ ভাইদের স্মৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে।
তবে এই অকৃতজ্ঞতার কিছুটা হলেও পূরণ হলো এবারের একটি অনুষ্ঠানে।  আমার জানা মতে স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরে পাবনায় পুলিশ বাহিনীর বীর পুলিশ যোদ্ধা এবং শহিদ পুলিশ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারকে সংবর্ধনা দেয়ার মহৎ কাজটি করা হলো। যিনি বা যার মাথা থেকে এই মহতী উদ্যোগটির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তাকে ধন্যবাদ দিয়ে খাটো করতে চাই না। তাকে শত কোটি স্যালুট। তিনি যে প্রকৃত পক্ষেই শহিদদের মর্যাদা প্রদানের কায়দাটা জানেন তা তিনি তার কর্ম দ্বারাই প্রামাণ দিলেন।
আরও একটি মহৎ কর্ম চোখে পড়লো। সেটি হলো : অতিসম্প্রতি পাবনা পুলিশ লাইনে প্রবেশ পথটি বা সড়কটির নামকরণ করা হয়েছে, ‘শহিদ হাবিলদার আব্দুর রাজ্জাক সড়ক’। ট্রাফিক পয়েন্ট থেকে সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের পাশ  দিয়ে প্রায় ২’শ মিটার সড়কটি চলে গেছে পুলিশ লাইনের অভ্যন্তরে। এটি সেই পুলিশ লাইন যার সঙ্গে পাবনার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জড়িত। পাবনার পুলিশ এবং পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগারের কথা উল্লেখ না করলে পাবনার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
পুলিশ লাইনের শহিদ মিনারের গা থেকে শহিদ ভাইদের নামগুলোর কালির আঁচড় উঠে গেলেও পাবনায় পুলিশে কর্তব্যরত বর্তমান কর্মকর্তাদের মন থেকে যে তাঁদের নাম মুছে যায়নি তা বোঝা গেল বিজয় দিবসে বীর পুলিশ সদস্য এবং শহিদ পুলিশ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারকে সংবর্ধনা প্রদানের মহৎ কর্মটি করা দেখে। পাবনা পুলিশ লাইন্স অডিটোরিয়ামের অনুষ্ঠানের খবরটি আগে জানতে পারলে বা নিমন্ত্রণ পেলে উপস্থিত থাকতাম। চোখ ভরে দেখতে পারতাম সেই সব মহান মুক্তিযোদ্ধা পুলিশ ভাইদের। কথা বলে জানতে পারতাম শহিদ পরিবারের সদস্যদের মনের কথা। যাক সেটা হয়নি, তাতে কী! যার পর নাই খুশি হয়েছি এমন একটি সুন্দর কাজের খবর পেয়ে।
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় (১৯৭১ খ্রি.) পাবনার জেলা প্রশাসক নূরুল কাদের খান এবং পুলিশ সুপার চৌধুরী এ গফ্ফার পাবনার মুক্তিকামী মানুষের পক্ষে ছিলেন সক্রিয়ভাবে। তারা তাদের পরিবারের কথা না ভেবে এবং নিজের জীবন বাজি রেখে দেশ মাতৃকার জন্য যুদ্ধ করেছেন।
যুদ্ধের সময় শত্রুর মোকাবেলা করার জন্য জীবন বাজি রেখে যারা যুদ্ধ করেন তারা ছিলেন লোভ লালসার ঊর্দ্ধে। ব্যাংক ও ডাকঘরে গচ্ছিত সরকারের বা জনগণের টাকা ছিল অক্ষত। মুক্তি সেনারা বিশেষ করে পুলিশ সদস্যগণ পাবনার সকল ব্যাংকের  এবং পোস্ট অফিসে রক্ষিত টাকা লুটে নিতে পারতেন। না তারা তা করেননি। নিজের জীবন, পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা সব কিছু তুচ্ছ করে পুলিশ মুক্তিযোদ্ধাগণ স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জনগণের সম্পদের হেফাজত করেছেন। ব্যাংক এবং পোস্ট অফিসের টাকার প্রতি তাদের সামান্যতম লোভ ছিল না।
পরে আবার এই নিয়ে লেখার ইচ্ছা রইল। আজ শুধু বলতে চাই সাঁথিয়া থানার সেকেন্ড অফিসার গোলাম মোস্তফা ১৯৭১-এর এপ্রিল মাসে থানার মধ্যেই নিহত হন। তখন যা জানতে পেরেছিলাম তা হলো, নক্সালপন্থিরা অস্ত্র সংগ্রহ করার জন্য দায়িত্বরত বা ডিউটিরত পুলিশ অফিসার গোলাম মোস্তফার কাছে ম্যাগজিনের চাবি চায়। তিনি তা দিতে অস্বীকার করলে থানার মধ্যেই নক্সালপন্থিরা তাকে হত্যা করে। অথচ আমরা দেখেছি মার্চের উত্তাল সময়ে যুবকদের রাইফেল চালানোর প্রশিক্ষণ দিতেন উক্ত শহিদ পুলিশ অফিসার গোলাম মোস্তফা। শুধু তাই না মুক্তিযোদ্ধারা যখন নগরবাড়ি ঘাটে প্রতিরোধ যুদ্ধে (১০ ও ১১ এপ্রিল) অংশ নেন তখন তাদের গুলি সরবরাহ করেন তিনি। পাবনার পুলিশ লাইন মাঠের শহিদ মিনারে উক্ত পুলিশ অফিসার গোলাম মোস্তফার নাম নেই। শহিদের তালিকায় তাঁর নামটি থাকা আবশ্যক মনে করি।
শহিদ হাবিলদার আব্দুর রাজ্জাক সম্পর্কে নতুন প্রজন্ম জানতে চায়। তাই আমি পুলিশ কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, পুলিশ লাইনমুখি যে সড়কটির নামকরণ করা হয়েছে ‘শহিদ হাবিলদার আব্দুর রাজ্জাক সড়ক’ সেখানেই বীর এই শহিদের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখে একটি পাথর স্থাপন করার জন্য। যা পড়ে নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে তাঁর বীরত্বের কথা।
শহিদ হাবিলদার আব্দুর রাজ্জাক-এর বাড়ি সাঁথিয়া উপজেলার নাড়িয়াগদাই গ্রামে। তিনি সিলেট পুলিশ লাইনে কর্তব্যরত ছিলেন। সেখানেই তিনি হানাদার সৈন্যদের গুলিতে শহিদ হন।
আমরা আশ্বস্ত হতে পারি পুলিশের বর্তমান কর্মকর্তার কর্মকা-ে। তিনি যেহেতু ৪৫ বছর পর পাবনায় পুলিশ মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে সংবর্ধনা বা সম্মান জানানোর মহতি কর্মটি করেছেন। দৃঢ় বিশ্বাস আমাদের তিনি পুলিশ লাইন স্কুলটির নামকরণ করবেন। অডিটোরিয়ামটিরও হয়তো একটি নাম রাখা হবে কোন এক শহিদ পুলিশ মুক্তিযোদ্ধার নামে। এভাবেই স্মরণ করা বা তাঁদের আত্মত্যাগের চিহ্ন থেকে যাবে পরবর্তী প্রজন্মের নজরে।
পাবনার অনুকরণে সকল জেলায় এভাবে শহিদ পুলিশ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে এবং বীর পুলিশ মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানানোর উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এতে মুক্তিযুদ্ধের সময় ত্যাগীদের সম্পর্কে ও তখনকার সময়ের মানুষের মুক্তির আকাক্সক্ষা সম্পর্কে অবহিত হতে পারবে নতুন প্রজন্ম।
(লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট)
যৎধযসধহ.ংধিঢ়ড়হ@মসধরষ.পড়স