পাবনা ও দিনাজপুরে সড়কে ঝরলো ১৩ প্রাণ

আপডেট: জুলাই ৬, ২০২৪, ১২:১২ পূর্বাহ্ণ

ঈশ্বরদী ও ফুলবাড়ী প্রতিনিধি:


পাবনার ঈশ্বরদীতে সাত বন্ধু এক সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে পাঁচ জনই বাড়ি ফিরে এসেছেন লাশ হয়ে। বাকি দুজন এখনো মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালের জরুরি বিভাগে। অন্যদিকে, দিনাজপুর-গোবিন্দগঞ্জ মহাসড়কে আমবোঝাই একটি ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে শিশুসহ আটজন নিহত হয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (৪ জুলাই) রাত ৯টার দিকে ঈশ্বরদী-পাবনা মহাসড়কের দাশুড়িয়ায় পাবনা সুগার মিলের সামনে প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ৫ বন্ধু মারা যান। নিহতরা হলেন. ঈশ্বরদীর দাশুড়িয়া ইউনিয়নের আজমপুর গ্রামের মাসুম আলীর ছেলে সিফাত হোসেন (১৯), একই গ্রামের ইলিয়াছ আহমেদের ছেলে শিশির (১৯), আনোয়ার কবিরের ছেলে বিজয় (১৯), রেজাউল করিমের ছেলে জিহাদ (১৯) ও সলিমপুর ইউনিয়নের ভাড়ইমারি গ্রামের ওয়াজেদ আলীর ছেলে শাওন হোসেন (১৯)। এ ঘটনায় গুরুতর আহত অবস্থায় নাইম ও শাহিদ রামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গুরুতর আহত দুজন এখনো লড়ছেন মৃত্যুর সঙ্গে। স্থানীয় বাসিন্দা আলমাস হোসেন হিটু জানান, বন্ধুদের মধ্যে বিজয় ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানে গাড়ি চালক হিসেবে কর্মরত।

সে ছুটিতে বাড়ি এলে তার সহপাঠি বন্ধুদের ডেকে নিয়ে তার গাড়িতে করে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরতে যেতো। বৃহস্পতিবারও বিজয় ঢাকা থেকে ছুটিতে বাড়ি এসে তার ঘনিষ্ট ৬ বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছিল। বিকেল থেকে ঈশ^রদীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ফিরে রাত ৯টার দিকে তারা দাশুড়িয়া থেকে কালিকাপুরের দিকে যাচ্ছিল। ৯টার দিকে ঈশ্বরদী-পাবনা মহাসড়কের দাশুড়িয়ায় পাবনা সুগার মিলের সামনের মিলগেট এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাদের গাড়িটি রাস্তার পাশের পাশের বৈদ্যুতিক খুঁটি ও গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ঘটনাস্থলেই তিনজন মারা যান। আহত ৪ জনকে উদ্ধার করে ঈশ^রদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর সেখানে ২ জনকে মৃত ঘোষণা করেন কর্তব্যরত চিকিৎসক।

ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ হতাহতদের উদ্ধার করে। এ ঘটনায় ঈশ্বরদী থানায় অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। দুর্ঘটনা কবলিত গাড়িটি উদ্ধার করা হয়েছে।
ঈশ্বরদী ইউএনও সুবীর কুমার দাস বলেন, উপজেলা প্রশাসন থেকে আমরা নিহতদের পরিবারের খোঁজখবর রাখছি। তাদের যেকোনো প্রয়োজনে আমরা তাদের পাশে আছি। সরকারিভাবে যতটুকু সম্ভব তাদের সহযোগিতা করা হবে।

এদিকে, ঢাকা থেকে ৪২ জন যাত্রী নিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল যাচ্ছিল নাবিল পরিবহন নামের একটি বাস। পথে দিনাজপুর-গোবিন্দগঞ্জ মহাসড়কে আমবোঝাই একটি ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে শিশুসহ ছয়জন নিহত হন। আহত হন ২৮ জন। এ ঘটনার অদূরে ট্রাকের ধাক্কায় এক ভ্যানচালক ও দুপুরে ফুলবাড়িতে দুজনসহ জেলায় একদিনেই আটজন নিহত হয়েছেন।

শুক্রবার (৫ জুলাই) ভোর ৬ টায় দিনাজপুর-গোবিন্দগঞ্জ মহাসড়কের সড়কের সদর উপজেলার শশরা ইউনিয়নের চকরামপুর ও জালিয়াপাড়ায় এবং বিকেলে ফুলবাড়িতে পৃথক এ তিনটি দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন, ট্রাকের চালক ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার মিত্রপট্টি গ্রামের মৃত সুরা মিয়ার ছেলে হাসু মিয়া (২৮), নাবিল পরিবহনের সুপারভাইজার দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার সেতাবগঞ্জ মিলরোড এলাকার মৃত লন বাহাদুরের ছেলে রাজেশ বাহাদুর (৩০), বাসের যাত্রী পীরগঞ্জ উপজেলার দানেশ আলীর ছেলে মোহাম্মদ আলী (৫২), বোচাগঞ্জ উপজেলার জাহিদের মেয়ে বিভা (১০), চিরিরবন্দর উপজেলার খোচনা গ্রামের মমিনুলের পাঁচমাস বয়সী শিশু সায়মা মেহনাজ এবং ভ্যানচালক সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর গ্রামের স্বদেশ রায় (২৩)।

ফুলবাড়ির ঘটনায় নিহতরা হলেন, জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার ধরঞ্জি ইউনিয়নের পারুইল গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে ভটভটিচালক মেনহাজুল ইসলাম (৪০) ও একই থানার বালিঘাটা ইউনিয়নের নওনা গ্রামের গরু ব্যবসায়ী আমান হোসেন (৩০)।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভোরের দিকে ঢাকা থেকে যাত্রী নিয়ে নাবিল পরিবহন একটি বাস ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল যাচ্ছিল। একই সময় বিপরীত দিক সদর উপজেলা থেকে আমবোঝাই একটি ট্রাক গোবিন্দগঞ্জের দিকে যাচ্ছিল। দুটি গাড়ি পাঁচ বাড়ি বাজারের শশরা এলাকায় পৌঁছালে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই দু’জন ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দু’জন মারা যান। এ ঘটনায় অন্তত ২৮ যাত্রী আহত হন। তারা দিনাজপুর এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

এরআগে একই এলাকার চকরামপুর থেকে এক কিলোমিটার দূরে জালিয়াপাড়ায় একটি ট্রাক ধানবোঝাই ভ্যানকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যায়। এতে ভ্যানচালক স্বদেশ রায় গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে দিনাজপুর এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেলা ১১টায় তিনি মারা যান।

অপরদিকে, দুপুর আড়াইটার দিকে ফুলবাড়ী থেকে একটি খালি ট্রাক দিনাজপুর যাচ্ছিল। একই সময় আমবাড়ি হাট থেকে ৯টি গরু নিয়ে একটি ভটভটি (ইঞ্জিনচালিত) ফুলবাড়ী হয়ে পাঁচবিবি যাচ্ছিল। পথে ফুলবাড়ী পৌর শহরের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সংলগ্ন উত্তর সুজাপুর এলাকায় এলে দিনাজপুর-গোবিন্দগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের বাঁক ঘুরতে গিয়ে দুই গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় গাড়ির সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায়। এ ঘটনায় ঘটনাস্থলেই দুজনের মৃত্যু হয়।

দুর্ঘটনা আহত নাবিল বাসের যাত্রী খানসামা উপজেলার জান্নাতুন আরা বলেন, ছোট ভাইয়ের বিয়ের দাওয়াত খেতে রাতে ঢাকা থেকে নাবিল পরিবহনে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। আমাদের দিনাজপুরে নামার কথা ছিল। কিন্তু পৌঁছার আগেই হঠাৎ একটি ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে চোখের সামনে সব এলোমেলো হয়ে যায়। মাথায় ও বুকে আঘাত পেয়ে এখন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি।

এ বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার শাহ ইফতেখার আহমেদ বলেন, বাস দুর্ঘটনাটি ঘটার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ আমরা জানতে পেরেছি। এরমধ্যে অন্যতম চালকের আসনে হেলপারকে বসানো হয়েছিল। হেলপারের আসনে চালক বসেছিলেন। গাড়িটি বেপরোয়া গতিতে চলছিল বলে জানতে পেরেছি। হেলপার কাউসারকে রংপুরে রেফার করা হয়েছে। এদিকে দুর্ঘটনাটি তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জানে আলমকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন।
জেলা প্রশাসক শাকিল আহমেদ জানান, তদন্ত কমিটি আগামী সাতদিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে। পাশাপাশি নিহতদের দাফন ও আহতদের চিকিৎসার জন্য জেলা প্রশাসন থেকে আর্থিক সহযোগিতা করা হয়েছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ