পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে ঐকমত্য জরুরি

আপডেট: অক্টোবর ৭, ২০১৯, ১:১৬ পূর্বাহ্ণ

গোলাম কবির


পত্র-পত্রিকায় দেখছি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত মহতী উদ্যোগ মানতে নারাজ। স্বাধীনতা ভোগের অধিকার সবার আছে; কিন্তু সে স্বাধীনতা যদি পৈত্রিক সম্পত্তি ভোগের অধিকার হিসাবে গণ্য হয়, তবে আইন-শৃঙ্খলা রসাতলে যাবে। দেশ ও সমাজকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য বিধি-বিধানের ব্যবস্থা থাকে। সেখানে বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সুবিধা দানের ব্যবস্থা থাকলে তা সার্বজনীন হয় না। রবীন্দ্রনাথ রাশিয়ার জনগণের উন্নয়নকে অভিনন্দিত করলেও ব্যক্তিবিশেষের কপাল খোলা কিংবা ব্যক্তিত্ব খর্বিত করার বিধান মেনে নিতে পারেন নি। বলেছিলেন : ‘ব্যাষ্টি বর্জিত সমষ্টির অবাস্তবতা কখনই মানুষ চিরদিন সইবে না।’ রাশিয়ার চিঠি। আমাদের দেশের পৃথক পৃথক গোষ্ঠী সমগ্র দেশ ও জাতির পরিচায়ক নয়। লেখাবাহুল্য, সেই গোষ্ঠীকে স্বচ্ছন্দে থাকার ব্যবস্থা জনগণ করে দিয়েছে। এদের সবাইকে নিয়ন্ত্রণের বিধানই হলো রাষ্ট্রব্যবস্থা। রাষ্ট্র পরিচালনার জনকল্যাণ বিধির অসহযোগিতা বোধকরি কাম্য নয়।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন তথা সরকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের নানাবিধ অনিয়মের প্রবণতাকে সুশৃঙ্খল করার উদ্যোগ নিয়েছে। যদি তা দুরভিসন্ধি না হয়, তবে তাকে স্বাগত জানানো উচিত। দেখা যাচ্ছে অনেকক্ষেত্রে অনৈতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। রাশিয়ার চিঠির রবীন্দ্র অনুযোগের সূত্র ধরে বলা যায়, গড় মেধা দিয়ে সাধারণ কাজ চলে; কিন্তু অসাধারণ কিছু পাওয়ার জন্য ধীমান ব্যাষ্টি অপরিহার্য।
স্বায়ত্ব শাসনের উদ্দেশ্য হলো নিজেদের স্বাধীনভাবে নিয়মতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ। এ নিয়ন্ত্রণ তো তালগাছটা নিজের জিদ ধরে থাকা নয়! তাছাড়া যারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করবেন, তাদের ভরণ-পোষণের অর্থ ব্যয় জনগণকেই করতে হয়। এই ব্যয়ের লক্ষ্য, রাষ্ট্রীয় তথা জাতীয় নানাবিধ উন্নয়নের জ্ঞান ভিত্তিক উৎকর্ষের পথ প্রদর্শন। যে বিষয়টি বারোয়ারী নিয়োগ ব্যবস্থায় নেই বললেই চলে। বঙ্গবন্ধু স্বাধীন জাতিকে স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বায়ত্বশাসন দিয়েছিলেন তার সদ্ব্যবহার হয়নি। বিপরীতে সৎ চিন্তার পরিবর্তে আগাছা চাষের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্ষুন্নিবৃত্তির চিন্তা করতে হয় না বলে অলস মস্তিষ্ক রাজাউজির মারার ভ্রান্তপথ উদভাবনে ব্যস্ত থাকে। দলীয় লেজুড়বৃত্তি করে নিজের আখের গোছানোর ফিকিরে ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাগুরুদের কাছে শিক্ষানুরাগী জনগণ এই দুরভিসন্ধি প্রত্যক্ষ করতে চায় না। ঘটনাক্রমে তাই হচ্ছে। আমাদের মনে হয়, সে অবস্থার পরিবর্তনের জন্য নতুনভাবে শিক্ষক নিয়োগ পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
অতীতে দেখা গেছে বঙ্গবন্ধুর অপরিমাণ সমর্থক শিক্ষক আত্মরক্ষার স্বার্থে ঘাতক বিপরীত শক্তিতে অভিনন্দন জানিয়েছেন। মানবকল্যাণে উচ্চশির শিক্ষক সক্রেটিস এবং ইমাম মালেককে বসে আনতে না পেরে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এমনতর শিক্ষাব্রতী শিক্ষক দেখতে চাই। গড্ডালিকার শিক্ষক নিয়োগ নয়। রবীন্দ্রনাথ যে ব্যষ্টির কথা বলে জাতীয় উন্নয়নের স্বপ্ন দেখাতে চেয়েছেন। বোধকরি তা পোষ্য কিংবা অনুগত দিয়ে সুদূর পরাহত। কারণ এরা নিজের উত্তরপুরুষদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা বড়ো করে ভাবছেন। ফলে জাতির তিমিরাচ্ছন্নতা ঘনীভুত হয়ে চলেছে এবং শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ডে কোথাও জায়গা হচ্ছে না।
সর্বক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুবিধাদানের পরিণতি শুভ হয় না। এসত্য বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন বলে বিচার-বিবেচনা না করে শিক্ষার একটি পর্যায়কে জাতীয়করণ করতে চাননি। অথচ পরবর্তীকালে ঘাতক শক্তি সস্তা জনপ্রিয়তার লোভে আগাছার চাষ করেছিলেন। তার ধারাবাহিকতা বজায় আছে। তাই এখনো অনেকে শূন্যপাত্র বাজিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের তকমা নিতে উদগ্র। তাদের জানা উচিত মহাকাল অপ্রয়োজনীয় প্রতাপ ছেঁটে ফেলে।
কালের যাত্রার ধ্বনি অবশ্যই শোনা দরকার। শুভ ফলের প্রতীক্ষা ধৈর্যশীলরা করেন। তবে সে প্রতীক্ষার ফল অশ্বডিম্ব হলে তা জাতিধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একটি জাতির শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়ক তার শিক্ষা-সংস্কৃতি। একদা শিক্ষার আলো দিয়ে বাঙালির পরিচয় উদ্ভাসিত হয়েছিলো। তাঁরা জ্ঞানকে কুক্ষিগত রাখা কিংবা সস্তা খেলনা করার অভিসন্ধি উদ্ভাবন করেন নি। ভাবেন নি জীবিকার অন্যতম সুলভ পন্থা। তাঁরা বুঝতেন, শিক্ষকতা স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিভা। তারা সাদরে আমন্ত্রিত হতো শিক্ষার মহানব্রতে। সেদিন বাসি হয়েছে। এখন স্তাবক, কৃত্রিম আর লেজুড়দের জয়জয়কার। অথচ মনে রাখা দরকার শিক্ষা ভুয়া দিয়ে চলে না। তার প্রবণতা দৃশ্যমান। ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। অনেক শিক্ষক আছেন, যাঁদের সন্তান-সন্ততি যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন। যারা সন্তানকে নিজে কর্মরত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান না। মেধাবী সন্তানরা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে সম্মানজনক কর্মে নিয়োজিত। যারা তুলনামূলক দুর্বল, তাদের অভিযোজিত করে সুলভ কর্মসংস্থানে পদায়নের জন্য আদাজল খেয়ে অভিসন্ধিতে প্রবৃত্ত। জাতিধ্বংসের জন্য এটা মোক্ষম অস্ত্র। এটা চলতে দেয়া সমীচীন নয়।
উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়ে, জাতিগঠনের উদ্দেশ্যে শিক্ষকতার মতো পবিত্রব্রতে যোগ্য ব্যক্তিরা এগিয়ে আসলে সুকৃতির সংস্কৃতি ফিরে আসবে। এব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্মোহ হতে হবে। নতুবা কতিপয়ের স্বাচ্ছন্দ্যের বিনিময়ে জাতিকে আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত করার পথ হবে প্রশস্ত।
তাই শিক্ষক নিয়োগে বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ অমূলক বিরোধিতা নয়, সুচিন্তিত সহযোগিতা কাম্য। জন স্টুয়ার্ট মিলের ডেমোক্রাসির ভেগ আইডিয়ার অধিকার প্রাধান্য পেলে শিক্ষা রসাতলে যাবে এবং অচিরে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান নির্ণয়ের মাপকাঠিতেও স্থান পাওয়ার সম্ভাবনা রহিত হবে।
লেখক: সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ