পার্শি বিশি শেলি: সমুদ্রে ডোবা বিসুভিয়াস

আপডেট: আগস্ট ২৫, ২০১৭, ১:৩২ পূর্বাহ্ণ

রফিকুজ্জামান রণি


ইংরেজি সাহিত্যের বিপ্লবী কবি পার্শি বিশি শেলি ছিলেন প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসের বিরুদ্ধচারণকারী, আর স্বাধীনতাকামী মানুষের পক্ষে সরাসরি অবস্থান গ্রহণকারী একজন কলমসৈনিক। মাত্র আট বছর বয়সে ‘Verses on a Cat’ রচনার মাধ্যমে তিনি নিজের ব্যক্তিত্ব, স্বকীয়তা ও ব্যতিক্রম প্রতিভার স্বাক্ষর দেখাতে করতে সক্ষম হন। শেলির ব্যক্তিগত মতাদর্শ ও চিন্তাচেতনার কারণে জীবনের পদে পদে তাঁকে চরমভাবে মূল্য দিতে হয়েছে। অযৌক্তিক রীতিধারায় গা ভাসিয়ে চলার প্রবণতাকে কখনোই তিনি প্রশ্রয় দেননি। প্রেম-প্রকিৃত ও দ্রোহ-উল্লাসে বিশ্বময় দাপিয়ে বেড়ানো কবি পার্শি বিশি শেলিকে দেখার পর ম্যাথু আর্নল্ড-এর মতো গুণীব্যক্তিরা যদিও ‘দেবশিশু’ শব্দজোড়া উচ্চারণ করছিলেন কিন্তু সুঠাম-সৌম্য দৈহিকগড়নের চিরচঞ্চল এই মানুষটিকে কখনোই পুরোদস্তুর শান্ত-স্থির হতে দেখা যায়নি। সারাক্ষণ তাঁর অশান্ত মন লৌকিক ধর্ম-সংস্কৃতির বাহুল্যতা, সামাজিক অবক্ষয়, ক্ষমতার প্রতিপত্তি, মৌলিক অধিকার হরণকারীদের বিরুদ্ধে তীব্রভাবে বিদ্রোহ ঘোষণা করতো। খুব অল্পবয়সে হাজার রকমের হতাশাঘন পরিস্থিতি মোকাবেলা করার পরও কবিতার ঝুড়িতে যে স্বপ্ন-আশার নুড়ি তুলেছেন তিনি তা একেবারেই তুলনারহিত।
বাংলাসাহিত্যের প্রথম আধুনিক কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের মতো ইংরেজি সাহিত্যের বহুমুখী কবি পার্শি বিশি শেলিও ছিলেন একজন ধনাঢ্য ঘরের সন্তানÑ বাবা-মায়ের আদরের পুত্তলি। কিন্তু মহান দুজন কবিকেই ধর্মীয় তলোয়ারের তিক্ষè ফলায় ক্ষতবিক্ষত হতে হয়েছে। মাইকেল ধর্মান্তরিত হয়ে হারিয়েছেন মা-বাবা-পরিবার-পরিজনের ¯্নহে-সম্পদ; শেলি ধর্মদ্রোহী হয়ে হারিয়েছেন পারিবারিক আভিজাত্যের গৌরবময় অধ্যায়, আর্থিক সহযোগিতা। কেননা, ১৯১১ সালে The Necessity of Atheism তথা নাস্তিকতার প্রয়োজনীতা শিরোনামের একটি পুস্তিকা রচনা করে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে শেলি বহিষ্কৃত হন। বেনামীতে বাজারজাতকৃত The Necessity of Atheism বইখানা চারোদিকে তুমুলভাবে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় তুলেছিলো। বইটি প্রকাশের সহযোগী হিসেবে কবির সহপাঠী বন্ধু টমাস জেফারসন হগ-কেও সেদিন বিদ্যানিকেতনের ছাত্রত্ব খোয়াতে হয়েছিলো। এখানেই শেষ নয়, একই অভিযোগে পরিবার থেকেও শেলিকে বহিষ্কার করেন তাঁর রক্ষণশীল পিতা। শেলির লাগামহীন ধর্মবিরোধী যুক্তি-বাহাসের খেসারতস্বরূপ তাঁর প্রথম প্রেমিকা হ্যারিয়েট গ্রোভও দুজনের মধ্যেকার সম্পর্কোচ্ছেদের অনাকাঙ্খিত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছিলেন। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে শেলি কিছুটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন বৈকি! কিন্তু তিনি কি আর দমে থাকার পাত্র? শেলির মতো একজন আশাবাদী কবির এ কথা অবশ্যই জানা ছিলো যে, ‘শীতের অভিশাপে মৃত্যুকূপে পতিত হওয়া বৃক্ষের ডালপালাতে ভর করেই ছুটে আসে রংবাহারি ফুলেল বসন্ত।’ তাই ১৮১৭ সালে আরেক কালজয়ী বই The Revolt of Islam রচনার সাহস দেখিয়ে পুনরায় তিনি তুমুলভাবে সমালোচনার মুখোমুখি হন। বিরাগভাজন হন দেশ-বিদেশর নানা-কিসিমের মানুষের কাছে। ক্ষেপাটেপনা এই কবি ক্রমশ মা, বাবা আর ভাইদের চক্ষুশূলে পরিণত হলেও সবর্দাই তাঁর পাশে বোনদের অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ় ছিলো।
শেলিকে বিশ্বসাহিত্যে আলাদাভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্যে তাঁর বিখ্যাত `Ode to the West Wind’ কাব্যখানাই যথেষ্ট। ১৮১৯ সালের শরতে লেখা এই কবিতাটি প্রথমবারের মতো ১৯২০ সালে প্রকাশিত হয় ফ্লোরেন্সে। কবিতাটিতে তিনি সৃষ্টি ও ধ্বংসের দ্বৈতবিহারে অবস্থান নিয়ে পৃথিবীকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। দুহাত ভরে প্রকৃতির সুষমা-সৌন্দর্য ছেকে আনার সময় পশ্চিমের বুনো হাওয়া মধ্যে শুনতে পেয়েছেন শরতের দীর্ঘশ্বাস। তারুণ্যের জয়গান করতে গিয়ে ঘোষণা করেছেন ‘ঘুমের মরণ নয়; চাই জীবনের জাগরণ।’ এবং নতুন ও পুরাতনের বৈপরিত্য আর যৌবন ও বার্ধক্যের মধ্যে সরাসরি পার্থক্য নির্দেশন করে কবি জানান দিয়েছেনÑ

Thy vice, and sudden grow grey with fear.

And tremble and despil themselves;

Oh, hear!

If a were a dead leaf thou mightest bear;

If I were a swift cloud to fly with thee;

A wave to pant beneath thy power, and share.
প্রতীক-প্রতিমায় ছাওয়া শেলির `Ode to the West Wind’ নামের কাব্যের মতো গ্রীকসভ্যতার প্রাচীন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অবলম্বনে লেখা তাঁর বিশ্বনন্দিত ‘Ozymandias’ কবিতাটিও বিশ্বময় অমরত্ব দান করেছেন তাঁকে। ঐতিহাসিক ডিডোরাসের বর্ণনারীতির সহযোগিতায় নিয়ে লেখা, মাত্র ১৪ লাইনের সনেটীয় স্টাইলের এই গীতিকবিতায় তিনজন বর্ণনাকারীর মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছে গ্রীক সভ্যতার প্রভাব-প্রতিপত্তিসম্পন্ন Ozymandias নামের নিষ্ঠুরতম এক স্বৈরশাসকের সর্বশেষ পরিণতির রহস্য। মরুভূমির একটি ভগ্নদশা প্রস্তরমূর্তির প্রতীকে তিনি পুরো লৌহসময়ের হালহকিকতের নান্দনিক ইঙ্গিত দিয়েছেন। গ্রীকপুরাণে শাসক ওজিমানদিয়াসকে (গ্রিকের দ্বিতীয় রাজা রামসেসকে স্থানীয় ভাষায় Ozymandias হিসেবে ডাকা হতো) মনে করা হতো রাজাদেরও রাজা। তার দুর্দান্ত প্রতাপ-প্রতিপত্তির কাছে সবাই ছিলো বীতশ্রদ্ধ। কালের প্রবাহে সেই রাজার রাজাও ক্ষমতা শূন্য হয়ে যায়, তলিয়ে যায় তার ধনভান্ডার; নিঃশেষ হয়ে যায় তার সৈন্যসামন্ত। আলোচ্যমাণ কবিতায় রাজার ‘ÔMy  name is Ozymandias king of King/ Look on my works, ye Mighty and despair!’ -এই খেদোক্তি থেকে অনুমান করা যায় তার শেষ পরিণতি কতটা ভয়ংকর হয়েছিলো। ‘ওজিমানদিয়াস’ কবিতায় তিনি সেই করুণচিত্র সাজিয়ে রেখেছেন শিল্প-প্রাচুর্যের দেয়ালে
পুরাকীর্তির দেশ হতে আসা এক ভ্রমণকারীর সাথে হয়েছে সাক্ষাৎ
সে আমাকে বলেছে অতিকায় দুটো পাথরের পা শরীরবিহীন
দন্ডায়মান মরুভূমে, একটু দূরেই বালিতে অর্ধঢাকা
মুখমন্ডল ভ্রুকুটিরত আর কুঞ্চিত ভ্রুযুগল তার
দিচ্ছে শীতল নির্দেশ, মনে হয় জীবন্ত যেন,
এই ভাস্কর্য বলে দেয় প্রচন্ড রোষের কথা;
এ যাবৎ টিকে আছে খোদাই করা জড়রূপে
কৃত্রিম দুটো হাত প্রমাণ দেয় নিষ্ঠুরতার
বেদিতে উৎকীর্ণ শিলালিপি সে কথা বলে।
ওজিমানদিয়াস মোর নাম, রাজার রাজা
তাকাও আমার কর্মের পানে, গর্ব আর হতাশায়,
নেই, চারপাশে মোর কেউ নেই,
শুধু পড়ে আছে বিশাল মূর্তির ধ্বংসাবশেষ
শুধুই একা আর সমান লয়ে বালু উড়ে যায় দূরে। (‘ওজিমানদিয়াস’, অনু. খুররম হোসাইন, জয়নুল আবেদীন)
স্বাধীনপিয়াসী কবি পার্শি বিশি শেলির কবিতায় দেখা যায় প্রেম ও দ্রোহের যুগলছাপ। তাঁর প্রেম শুধুমাত্র আত্মিক, সেটাকে কোনোভাবেই আর্থিক কিংবা দেহলালিত্যেময় প্রেমের অপবাদ দেয়া যায় না। এটাকে Platonic love হিসেবেও কেউ কেউ আখ্যায়িত করছেন। পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক প্লেটো যদিও তার আদর্শ রাষ্ট্র থেকে কবির মতো ভাবুক ব্যক্তিকে নির্বাসনে পাঠানোর কথা বলেছিলেন; তারপরও শেলি ছিলেন প্লোটোর একজন অনুরাগী পাঠক, অন্ধভক্ত। তিনি প্লোটোর প্রেমদর্শনকে সঙ্গীতের সাথে তুলনা করে বলেছেন ‘Music is then the knowlede of that which relates to love in harmony and system. In the very sysyem of harmony it is easy to distinguish love.’
দুঃশাসন, কুসংস্কার, লৌকিকতা, অসুরশক্তি এবং শৃঙ্খলিত জীবনের বিরুদ্ধে শেলি ছিলেন সোচ্চার। শেলিকে যেমন দেখা যায় প্রেয়সীর দিকে পূজার্ঘ তুলে দিয়ে ‘One World is too Often Profaned’ শিরোনামের কবিতায় আপোসহীনভাবে বলে উঠতে ‘স্বর্গও প্রেমকে প্রত্যাখান করতে পারে না।’ তাকেই আবার আইরিশ জনগণের ক্যাথলিক মুক্তি আন্দোলন তুঙ্গে ওঠারকালে আন্দোলনকে জোরদার করার জন্যে আয়ারল্যান্ডে এসে একাত্মতা পোষণ করতে এবং আন্দোলনকে আরো চাঙ্গা করার প্রেরণায় Address to The Irish People  নামের প্রচারপত্র রচনা করতে।
সম্পর্কবিচ্ছেদ, সমাজচ্যুতি, কাঁধে ঘৃণাসমেত নাস্তিক্যবাদের বোঝা, আপন-পরের বৈরি আচরণ এবং বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচালে যখন বিমর্ষ হয়ে পড়েছিলেন শেলি তখনই পরিচয় ঘটে তাঁর প্রিয় লেখক ও রাজনৈতিক দার্শনিক উইলিয়াম গডউইনের সাথে। দার্শনিক উইলিয়াম গডউইনের ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত Political Justice গ্রন্থখানা পড়ে ইতোপূর্বে শেলি তাঁর ভক্ত বনে গেছেন। গডউইনের দর্শনতত্ত্বের সাথে তিনি নিজের মতার্দশের মিল খুঁজে পেলেন। ফলে ধীরেলয়ে তার সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। এই সুবাদে গডউইনের প্রতিভাসিক্ত ও স্বর্ণকুন্তলা কন্যা মেরী ওলস্টন ক্রাফটের সাথেও তাঁর ঘনিষ্ঠতা বাড়তে শুরু করে। অতঃপর প্রেম এবং বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন। বিয়ের প্রস্তুতিপর্বে শেলিকে ত্যাগ করে চলে যাওয়া তাঁর সাবেক স্ত্রী হ্যারিয়েট ওয়েস্টব্রুক আত্মহনন করেন। মেরিকে বিয়ের পর প্রাক্তন স্ত্রীর হ্যারিয়েট ওয়েস্টব্রুককের পিতা কর্তৃক আদালতে শেলির বিরুদ্ধে মামলা ঠোকা এবং কন্যাদ্বয়কে আইনি প্রক্রিয়ায় দূরে সরিয়ে রাখার ঘটনায় চরমভাবে মর্মাহত হন তিনি। এসময় জগৎখ্যাত কবি ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিকযুগের দিকপাল জন কিটস্ এবং তৎকালীন প্রভাবশালী পত্রিকা The Examiner-এর সম্পাদক লী হান্ট-এর সাথে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে তাঁর সখ্যভাব। এসময় শেলি ও কিটস্ দুই বন্ধুর লেখা Examinerপত্রিকার সম্পাদক লী হান্ট প্রকাশনায় এনে চারোদিকে ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে জোরালো তৎপরতা চালানো শুরু করে দিলেন।
কাকতালীয়ভাবে বিশ্বসাহিত্যের দুই ক্ষণজন্মা কবি পার্শি বিশি শেলি ও জন কিটস্রে মধ্যে দ্রুত বন্ধুত্বভাব গড়ে ওঠে এবং মৃত্যু অবধি সে সম্পর্ক অটুট থাকে। কিট্স যেমন শেলি ও তাঁর লেখার প্রতি ছিলেন শ্রদ্ধাশীল; তেমনিভাবে ব্যক্তি কিটস্ ও তার নৈরাশ্যবাদী সাহিত্যকর্মগুলোকেও খুব পছন্দ করতেন শেলি। সমালোচকদের কেউ কেউ লিখেছেন, শেলির সলিল সমাধিরকালে তার পকেটে কবি জন কিটসের বেশ কিছু কবিতা ছিলো। শেলির প্রায় দশদিনের ডুবন্ত লাশ উদ্ধারকালে সঙ্গে কবিতাগুলোও পাওয়া গিয়েছিলো। তবে কিটস্কে যে কতোটা ভালোবাসতেন তিনি তা জীবদ্দশাতেই কবিতার মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন শেলি। যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত মৃত্যুপথযাত্রী কবি জন কিটস্কে অনেকবার নিজের এলাকা ছেড়ে শেলির কাছে চলে আসার নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ডাক্তারি পরামর্শও ছিলো রোগীকে পারিবারিক পরিবেশের বাইরে গিয়ে অবস্থান করার। কিন্তু মানসিকভাবে বিধ্বস্ত কিট্স বন্ধুর সান্নিধ্য নিতে রাজি হননি, ভ্রাম্যমাণরোগ শরীরে বহন করে বন্ধুকে ঝামেলায় ফেলতে চাননি। শেলি অবশ্যই জানতেন কিট্সের মরণব্যামোটা তাকেও আক্রমণ করতে পারে; তারপরও বন্ধুত্বের কাছে সেই রোগ তুচ্ছজ্ঞান করেছেন তিনি। হয়তোবা জন কিট্সও বন্ধুকে যক্ষ্মা-রোগের আক্রমণ থেকে বাঁচানোর জন্যে দূরে দূরে থাকার চেষ্টা করেছেন। রোগটা তো পেয়েছিলেন পারিবারিকসূত্রেই। তাই অন্য কাউকে এই রোগের অংশিদারিত্ব দিয়ে বিপদে ফেলাতে চাননি। বন্ধুকে তো নয়-ই। মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়েসে যক্ষ্মারোগের কাছে পরাহত হয়ে চিরতরে হারিয়ে যাওয়া জন কিটস্রে মৃত্যুতে শেলি রচনা করেছেন ‘Adonais’ শিরোনামের ৫৫ স্তবকের ৪৯৫টি পঙক্তির সুদীর্ঘ শোকগাথা। প্রিয়বন্ধু আর্থারের মৃত্যুতে ইংলেন্ডের ‘পয়েট লরিয়েট’-খ্যাত ভিক্টোরিয়ান যুগের কবি আলফ্রেড লর্ড টেনিসনের লেখা ইন মেমোরিয়াম শোকগাথাটির মতোন শেলির ‘Adonais’ কাব্যটিও পৃথিবীতে ঐতিহাসিক দলিলের মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়ে আছে। কবিতার একাংশে তিনি দৃঢ়তার সাথে উচ্চারণ করেছেন চির অমর কিটসকে কালের ঝাপটা নির্বাপিত করতে পারবে না।’ কিটস্রে জন্যে বিশ্বমাতাকেও ক্রন্দন করার জন্যে তিনি আহ্বান জানিয়েছেন কবিতায়:

Oh, weep for adonis—he is dead!

Wake, melancholy mother, Wake and weep!

Yet wherefore? quench within their bunning bed

Thy fiery tears, and let thy loud heart keep

Like…

He will awake no more, oh, never more!

Wake thou, cried misery, childless mother rise…

His head was bound with pansies overblown,

And faded violets, White, and pied, and blue
কিটস্রে বিয়োগে যখন কাব্যিকতা মিশিয়ে শেলি উচ্চারণ করেন He will awake no more, Oh, never more! তখন পাঠকমহলেরও শোকে মুহ্যমান না হয়ে উপায় থাকে না।
ইংরেজি সাহিত্যের দুই কিংবদন্তির বন্ধুত্বের গভীরতাকে মৃত্যু যেন আরো প্রগাঢ় করে দিলো, দিলো পূর্ণতার ছোঁয়া। মৃত্যুও যেন দুজনের বিচ্ছিনতাকে মেনে নিতে পারেনি। তাই কিটসের মৃত্যুর ঠিক একবছরের ব্যবধানে শেলিও পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। প্রিয়বন্ধু জন কিট্স ১৮২১ সালে যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার একবছর মাথায় স্পেজিয়ার কাসা মগনীতে এক সান্ধ্যাকালীন নৌভ্রমণে ঝড়ের কবলে পড়ে, ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে বন্ধু উইলিয়ামের সাথে বিশ্বসাহিত্যের কালজয়ী এই কবি সমুদ্রে ডুবে মারা যান, মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে। সলিল সমাধির মাধ্যমে অবসান ঘটে বিসুভিয়াসের অগ্নিসঞ্চারি তপ্ত লাভার মতো একটি প্রতিবাদমুখর জীবনের। তবে তাঁর রেখে যাওয়া মলাটবদ্ধ প্রতিবাদভাষ্যের আবেদন এখনো ফুরিয়ে যায়নি, হয়তো বা ফুরাবেও না কখনো। কিট্স এবং শেলি দুই বন্ধু ঘুমিয়ে আছেন রোমের প্রোটেস্টেট সমাধিভূমিতে। মৃত্যুর আগে জন কিটস্ নিজের সমাধিভূমির জন্যে যে এফিটাপ লিখে রেখে গিয়েছিলেন, সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন ‘এখানে শায়িত আছেন এমন একজন ব্যক্তি যার নাম ছিল জলরেখায় লিখিত’ [Here lies one whose name was write in water]।
কিটস্রে ব্যক্তিগত এফিটাপে উল্লেখিত এই বক্তব্যটি প্রিয়বন্ধু পার্শি বিশি শেলির সলিলসমাধির পূর্ব-ইঙ্গিত ছিলো কি-না, এমন প্রশ্ন যদি কেউ তোলেন, তাহলে সেটা কি একেবারেই অবান্তর বলে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ আছে?