পালিত হলো সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৬২তম বার্ষিকী

আপডেট: জুলাই ৭, ২০১৭, ১২:২৪ পূর্বাহ্ণ

আব্দুস সাত্তার তপু


ইংরেজি বর্ষপুঞ্জিকানুযায়ী ক্যালেন্ডারের পাতায় শুক্রবার দিনটি ছিলো ৩০ জুন ২০১৭। বেশ আনুষ্ঠানিকতায় এ দিনটি পালিত হলো ১৬২তম ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস হিসেবে। শুধু বাংলাদেশে নয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৩০ জুনকে ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্্েরাহ দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ১৮৫৫ সালে এই দিনে জমিদার, মহাজন, ঠিকাদার, পুলিশ ও ব্রিটিশ সরকারের জুলুম, অত্যাচার, হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাটের প্রতিবাদে সাঁওতালসহ সকল শ্রেণির সংগ্রামী মানুষ সমবেত হয়ে কৃষকদের অধিকারের দাবিতে সংগ্রাম গড়ে তোলেন এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। ওই যুদ্ধে সাঁওতালদের প্রায় ২৫হাজার যোদ্ধা জীবন দিয়েছিলো। ফি বছর এই দিনে আমাদের মনের আয়নায় ভেসে ওঠে স্বাধিকার আন্দোলনকামী সাঁওতালদের উপর ইংরেজদের চালানো বর্বরতার সেই মর্মস্পর্শী ঘটনাবলি এবং নাড়া দেয় আমাদের বিবেক। দেশ-বিদেশের পত্র-পত্রিকায় সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবসের উপর সংবাদ এবং উপ-সম্পাদকীয় ছাপা হয়। অতীতে সাঁওতাল বিদ্রোহ নিয়ে গণমাধ্যমগুলিতে মামুলিভাবে তথ্য উপস্থাপন করা হতো। এখন কলামিস্ট ও গণমাধ্যম সাঁওতালদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে বিশদভাবে তুলে ধরছে। সময়ের ব্যবধানে এসে কিছুটা হলেও সাঁওতালসহ আদিবাসীরা যে মানবসমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ তা আধুনিক সমাজের শিক্ষিত মানুষের মাঝে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আদিবাসীদের সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে সভা-সেমিনার হচ্ছে। পিছিয়ে পড়া এ জনগোষ্ঠির জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতির উন্নয়ন নিয়ে ভাবা হচ্ছে। প্রকৃতিপ্রেমি আদিবাসীদেরকেও দেশের সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের পারিবারিক সুরক্ষা এবং তাদেরকে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠায় আমাদেরকে আরও এগিয়ে আসতে হবে।
আজ থেকে ১৬২ বছর পূর্বে ৩০ জুন সাঁওতাল দরিদ্র জনগোষ্ঠির মাঝে দেবতারূপে আবির্ভুত হয়েছিল সিধু, কানু, ভৈরব ও চাঁদ। ১৮৫৫ সালের এই দিনে তাদের আহ্বানে ভগনাডিহি গ্রামে দরিদ্র সাঁওতাল জনগোষ্ঠির বাঁধভাঙ্গা উপস্থিতি ঘটেছিল। ওই মহাসমাবেশে সিধু-কানু’র বক্তৃতায় সাঁওতাল জীবনে তাদের নানা দুঃখ-কষ্ট ও অত্যাচারিত হওয়ার কথা উঠে এসেছিল। সাঁওতাল আদিবাসীরা ভগনাডিহি গ্রামে সেদিনের মহাসমাবেশে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিল যে তারা আর জমিদার, মহাজন, পুলিশ ও পাইক পেয়াদার অত্যাচার সহ্য করবে না। কালো মানুষগুলোর কন্ঠে সেদিন উচ্চারিত হয়েছিল ‘দেলায়া বিরিদ পে দেলায়া তিঙ্গু প্’ে অর্থাৎ ‘জাগো ওঠো, সাঁওতাল রাজ কায়েম কর।’ মহাসভা থেকে ১৪০ মাইল দূরে তৎকালীন ভারতের রাজধানী কলকাতা অভিমুখে অগ্রসর হয়েছিল সিধু-কানুর নেতৃত্বে হাজার হাজার সাঁওতাল- তাদের দাবি-দাওয়া বড় লাটের কাছে গিয়ে পেশ করবে। উইলিয়াম হান্টার’র লিখা এক গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, ‘১৮৫৫ সালের ৩০ জুন কলকাতার দিকে এই বিপুল অভিযান শুরু হয়। ওই অভিযানে কেবল নেতাদের দেহরক্ষী বাহিনীর সংখ্যাই ছিল ত্রিশ হাজার।’ ভারতের ইতিহাসে এটাই প্্রথম গণপদযাত্রা-এমনকি সম্ভবত বিশ্ব ইতিহাসেও। ঐতিহাসিকভাবে ১৮৫৫ সালের ৩০ জুনের বিদ্্েরাহটি ‘সাঁওতাল বিদ্্েরাহ’ হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিলেও তারও প্্রায় ৭৫ বছর পূর্বে এ বিদ্্েরাহের সূচনা করেছিলেন বাবা তিলকা মাঝি (তিলকা মুর্মূ )। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশী যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা ও বিহারের ক্ষমতা দখলে নেয়। ক্ষমতা দখলের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লোকজন খাজনা আদায়ের নামে  ধন-সম্পদ অবাধে লুট করতে থাকে। অতীত ইতিহাস থেকে জানা যায়, রাজমহল থেকে হাজারিবাগ ও মুঙ্গেরের সীমান্ত পর্যন্ত এলাকাটি ছিল গভীর জঙ্গলে ভরা। ভয়ঙ্কর ও বিষাক্ত জীব-জন্তুর সাথে লড়াই করে সাঁওতাল, পাহাড়ি, মাল পাহাড়ি আদিবাসীরা জঙ্গলে বসবাস করতো। এরা কোন পরাধীনতায় অভ্যস্ত ছিল না। ১৭৭২ সালে ক্যাপ্টেন ব্রুক একদল সৈন্য নিয়ে পাহাড়িদের দমন করতে গিয়ে তীরের আঘাতে অধিকাংশ সৈন্য প্রাণ হারালে ব্রুক পশ্চাদগমনে বাধ্য হয়েছিল। ১৭৭৯ সালে অগস্টাস ক্লিভল্যান্ড ভাগলপুরের কালেক্টর নিযুক্ত হন এবং তিনি দামিন-ই-কোহ বা পাহাড়ের প্রান্তদেশ নামে একটি উপনিবেশ স্থাপনের চেষ্টা করেন। কিন্ত পাহাড়িরা সেখানে যেতে রাজি হলো না। সাঁওতালরাও জমির ওপর খাজনা দেওয়াকে অন্যায়-অনায্য মনে করে খাজনা দিতে চাইল না। তখন খাজনা আদায়ের ছুতোকে কাজে লাগিয়ে ইংরেজ সৈন্যরা পাহাড়িদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়ে, সাঁওতালদের সম্পদ লুট করে এবং তাদের ভাগলপুর ধরে নিয়ে গিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করে। আদিবাসীদের উপর নির্যাতন দেখে ক্ষেপে উঠেন বাবা তিলকা মাঝি। সাঁওতালদের নিয়ে তিনি মুক্তিবাহিনী গঠন করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন। ১৭৮৪ সালের ১৩ জানুয়ারি বাবা তিলকা মাঝির বাটুলের আঘাতে প্রাণ হারান ক্লিভল্যান্ড। ক্লিভল্যান্ডের মৃত্যুতে হিংস্র হয়ে উঠলো ইংরেজরা। হাজার হাজার ইংরেজ সৈন্য নির্মম দমন পীড়ন চালিয়ে অগণিত সাঁওতাল নারী, পুরুষ, শিশুকে হত্যা করলো, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিল, হাতি দিয়ে সাঁওতালদের ঘরবাড়ি মাটির সাথে মিশিয়ে দিল- তার কোন হিসাব রইল না। অসংখ্য নিরস্ত্র সাঁওতালকে হত্যা করে বিদ্রোহ দমন করল ইংরেজ বাহিনী। তিলকা মাঝি ইংরেজ বাহিনীর হাতে ধরা পড়লো। তাকে ধরে নিয়ে ভাগলপুরে এনে নিদারুনভাবে চাবুক মারা হলো। ঘোড়ার সঙ্গে বেঁধে টেনেহিঁচড়ে শহরময় ঘোরানোর পর তিলকা মাঝিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। এভাবেই নিভে যায় অরণ্য দেশের প্রথম বিদ্রোহ।
১৭৮৯ সালে আদিবাসী সাঁওতাল বিদ্রোহীরা আবার একত্রিত হয়ে ১৭৯১ পর্যন্ত ৩ বছরে সেখানে এমন অবস্থার সৃষ্টি করে যে ইংরেজ শাসন অচল হয়ে যায়। সে সময় ইংরেজরা আবারো কৌশলের আশ্রয় নিয়ে বীরভূমে জঙ্গল কেটে অদিবাসীদের বসতি স্থাপনের অনুমতি দিয়ে শান্ত করে। ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবন্ত চুক্তির ফলে জমির মালিক হয় জমিদার এবং তারা আদিবাসীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত খাজনা আদায় করতে থাকে। এক সময় জমিতে নীল চাষ শুরু হলে শস্য উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব পড়ে এবং শস্যের দাম বেশি বেড়ে যাওয়ায় মহাজনরা সাঁওতাল গ্রামগুলোতে এসে ঘাঁটি গড়ে তোলে। মহাজনরা সাঁওতালদের আর্থিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তাদেরকে ঋণ দেওয়া শুরু করলো। ঋণের সুদ চড়া হওয়ার কারণে যে একবার ঋণ নিতো সে আর ঋণ পরিশোধ করতে পারতো না। ঋণগ্রস্ত সাঁওতালরা বংশাণুক্রমিক মহাজনের ক্রীতদাসে পরিণত হতো। ১৮শ’ সালের শেষ দিকে এসে ব্যাপকহারে নীল চাষ শুরু হলে কৃষকদের ওপর নেমে আসে অবর্ণনীয় অত্যাচার। যদি কেউ নীল চাষ করতে অস্বীকার করতো তাহলে তার উপর জোর-জুলুম, মারধর করা হতো। বিদ্রোহী চাষিদের আটক করে নীলকুঠির কয়েদখানায় বন্দি করে রাখা হতো। নীলকরদের হাতে ধরাপড়া নেতৃস্থানীয় বিদ্রোহী চাষিদের অনেককে পরবর্তিতে খুঁজে পাওয়া যেতো না। সময়ের ব্যবধানে সাঁওতালদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভুত ক্ষোভ বিদ্রোহে রূপ নেয়। সিধু, কানু, ভৈরব ও চাঁদ চারভাই অত্যাচারের শিকার জনগোষ্ঠির নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে অসে। সিদু-কানুর বিশ্বাস ছিল আদিবাসীদের জাগিয়ে তুলতে হলে ধর্মের গান গাইতে হবে। তাই তারা প্রচার করতো, তারা ঠাকুরের নির্দেশ পেয়েছে। ১৮৫৫ সালে ১৫ জুন সিধু-কানু গ্রামে গ্রামে সাঁওতালদের কাছে ‘গিরা’ পাঠালো। ‘গিরা’ সাঁওতালদের কাছে ধর্মীয় আহ্বান, জাতির একতার ডাক। সিধু, কানু, ভৈরব ও চাঁদকে কাছে পেয়ে সাঁওতালদের মাঝে প্রাণের সঞ্চার জাগে, অভূতপূর্ব সাঁড়া পড়ে অত্যাচারিত জনগোষ্ঠির মাঝে। পাহাড়-পর্বত-অরণ্যব্যাপি একই সুর ওঠে ‘দেলা দোমেলা দোমেল, দেলা লগন লগন দেলা ভগনাডিহি।’ অর্থাৎ চল চল, দলে দলে চল, ভগনাডিহি চল। তাদের ধর্মীয় গানের সুরে নদী-নালা, পাহাড়-পর্বত, মাঠ-ঘাট ডিঙিয়ে সাঁওতালরা তীর, ধনুক, টাঙ্গি, কুড়াল, ধামসা, মাদল, বাঁশি নিয়ে ভগনাডিহি গ্রামে সিধু-কানুর পাশে এসে দাঁড়ায়। সিধু ও কানু সাঁওতালদের আদি কাহিনি শোনায়। সেই হিহিড়ি পিপিড়ি. চায়-চাম্পা, সাতভূই, শিখরভুই হাজারিবাগ হয়ে দামিন-ই-কোহতে বনবাদাড় কেটে পাহাড় ভেঙ্গে কেমন করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তাদের পূর্বপুরুষরা আবাদি জমি তৈরি করেছিল। সাঁওতালদের ভোগদখলীয় জমি কেমন করে জমিদার, নায়েব, গোমস্তা, পুলিশ ও মহাজনরা দখল করে নিয়েছে। তারা ফসল লুট ও ফসলের জমিতে গরু, ঘোড়া, হাতি দিয়ে ফসল নষ্ট করেছে, ঋণের জালে আবদ্ধ করে ক্রীতদাস বানিয়েছে; শান্ত-নিরীহ সাঁওতালদের জেলে ভরে নির্যাতন করে হত্যা করেছে। রেলপথের সাহেবরা কীভাবে সাঁওতাল নারীর ইজ্জত হরণ করেছে, মাঝি-মোড়লদের লাঠিপেটা করেছে। এসব কাহিনি বর্ণনা শেষে সিদু-কানু সবাইকে বলেন, সব উৎপীড়নকারীকে উচ্ছেদ করে সাঁওতালদের স্বাধীন জীবন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাদের এই আহ্বানে সাঁওতাল বিদ্রোহীরা জমিদার মহাজনদের হত্যা এবং ধন-সম্পদ লুট করে সাঁওতাল বিদ্রোহীদের রণশক্তি বৃদ্ধির কাজে ব্যয় করতে লাগলো। সাঁওতালরা নীল কুঠির ধ্বংস করে আগুন জ্বালিয়ে দিলো। এসময় অনেক জমিদার-মহাজন পালিয়ে যায়। অনেকে সিদু-কানুর কাছে প্রাণ ভিক্ষা চায়। তাদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া হয় কিন্ত হিসাবের খাতা ও দলিলপত্র পুড়িয়ে ফেলা হয়। ১৮৫৫ সালের ১৫ জুলাই মেজর ব্যারোজ বিরাট সৈন্য বাহিনী নিয়ে পিয়ালপুরে হাজির হলেন সাঁওতাল বিদ্রোহীদের দমনে। যুদ্ধ শুরু হলো দুপুর বেলা। ইংরেজ সৈন্যদের কামান-বন্দুকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বৃষ্টির মতো তীর ছুঁড়তে থাকে সাঁওতালরা। ইংরেজ সৈন্যেদের আধুনিক অস্ত্র-শস্ত্র ও বিচক্ষণতার কাছে সাঁওতালরা পরাজিত হয়। ১৮৫৫-১৮৫৭ সালে সাঁওতাল বিদ্রোহে ২৫ হাজার বিদ্রোহী মারা গেছে বলে জনৈক ইংরেজ লেখকের ভাষ্যমতে জানা যায়।
বিদ্রোহে সাঁওতালরা পরাজিত হলেও তাদের বিদ্রোহ একেবারে বৃথা হয়ে যায়নি। ইংরেজরা সাঁওতালদের জন্য আলাদা বিচার ব্যবস্থাসহ সাঁওতাল পরগানা করতে বাধ্য হয়েছিল এবং সাঁওতাল পরগানা থেকে হিন্দু ব্যবসায়ী মহাজনদের বের করে দিয়েছিল। কিন্তু ইংরেজরা সুকৌশলে সাঁওতাল জনগোষ্ঠির মধ্যে খ্রিস্টানিজমের বীজ ঢুকিয়ে দিয়ে আদিবাসীদের মাঝে স্থায়ীভাবে  বিভেদ সৃষ্টি করে দিয়ে যায়। যার ফলে ১৮৫৫ সালের পরবর্তীতে সাঁওতালরা তাদের অধিকার আদায়ের জন্য আর একজোট হতে পারে নি। তাই বলে তারা নিজেদের অধিকার আদায়ের চিন্তা-চেতনা থেকে সরে যায় নি। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে সাঁওতাল বিদ্রোহকে তৎকালীন ভারতবাসী ব্্িরটিশবিরোধী সংগ্রাম হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেও সময়ের ব্যবধানে তাদের ধারণার পরিবর্তন হয়েছে। ইংরেজদের শোষণ, লুন্ঠন ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাঁওতালরাই যে সর্ব প্রথম সংগ্রাম ও বিদ্রোহ করেছিল তা এখন আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ওই বিদ্রোহ শুধু সাঁওতাল জনগোষ্ঠির নয়, তা ছিল তৎকালীন নিম্নবর্ণের হিন্দু, কর্মহারা মুসলমান কৃষক, কামার, জেলে, তাঁতী, দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষের সমষ্টিগত বিদ্রোহ। জাতি, দল-মত নির্বিশেষে বিদ্রোহীরা যে শ্রেণি সংগ্রামের চেতনায় সেদিন উজ্জীবিত হয়েছিল তা শুধু ইতিহাসের পাতায় নয়, প্রতিটি বিপ্লবী মানুষের কাছেই স্মরণযোগ্য। কিন্তু এক সময় যারা রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে বিষাক্ত পোকামাকড়ের ছোবল খেয়ে পাহাড়-জঙ্গল কেটে অগোছাল ভুমিকে চাষযোগ্য ও ফসল ফলাতে অবদান রেখেছে, দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভুমিকা রেখেছে, সেই স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে তারা আজও উপেক্ষিত। দেশের আনাচে কানাচে সমতল ও পাহাড়ে বিছিন্নভাবে বসবাসকারী আদিবাসীরা বর্তমান সময়েও পারিবারিক-সামাজিক ও সম্পত্তির নিরাপত্তার ক্ষেত্রে টিকে থাকার সংগ্রামে দিনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় করছে। তাদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া সম্পদ হারানোর পর অবশিষ্ট যে টুকু আছে সে টুকুরও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। ক্ষমতার পালা বদলে স্বল্প সময়ে শরীরের রঙ পাল্টিয়ে ক্ষমতার সুফল ভোগী এক শ্রেণির ভূ-গ্রাসীরা উচ্ছেদ ও প্রাণহানীর ভয়ভীতি দেখিয়ে মাথা গুজার ভিটে টুকুও নাম মাত্র মূল্যে হাতিয়ে নিচ্ছে। তাদের কথা না শুনলে জাল কাগজপত্র তৈরি করে পেশিশক্তির বলে দখল করে নিচ্ছে শেষ সম্বল টুকু। প্রশাসনের কাছে ধরণা দিয়েও কাক্সিক্ষত সাড়া না পাওয়ার অভিযোগের ইয়াত্তা নেই। রাষ্ট্র এবং সমাজে তাদের পরিচয় নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠি এবং সংখ্যালঘু হিসেবে। কিন্তু সভ্যতার রঙ মেখে আধুনিকতাকে ডিঙিয়ে অত্যাধুনিক জীবন যাপনের অভিপ্রায়ে যখন এ সমাজ উন্মাদের মতো ছুটে চলছে। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীবের ভার কমাতে যখন মঙ্গলগ্রহে বসবাসের উপযোগিতা খোঁজা হচ্ছে। যে সময়ে বিশ্বব্যাপি শিশু দিবস, ভালোবাসা দিবস, মানবাধিকার দিবসসহ নানা দিবস পালন করা হচ্ছে, তখনও আমরা আমাদের মতই রক্ত-মাংসে গড়া আদিবাসী জনগোষ্ঠির অধিকার নিয়ে ভাবি না। এখনও আদিবাসীরা সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং হারানো ভূমি ফিরে পেতে সভা-সেমিনার, আন্দোলন করছে। তাদের দাবি আমাদের কর্ণকুহরে পৌঁছাচ্ছে না। অনগ্রসর ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া জাতিটিকে জাগিয়ে তুলতে দেশের সচেতন-প্রভাবশালী মানুষগুলোর মনের মাঝ থেকে জেগে জেগে ঘুমানোর প্রবণতা পরিহার করতে হবে। সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস পালনের পাশাপাশি বর্ণ বৈষম্য ভুলে এ জনগোষ্ঠির অধিকার বিষয়ে সচেতনতার সাথে সমাজ এবং রাষ্ট্র দায়িত্ব পালন করলেই কেবল এই দিবসের স্মৃতিচারণ সার্থক হবে।
লেখক:সাংবাদিক