পাসপোর্ট প্রাপ্তির দীর্ঘসূত্রীতা : জনগণ ভুক্তভোগী হবে কেন?

আপডেট: জানুয়ারি ১৫, ২০২০, ১২:৫৬ পূর্বাহ্ণ

মো. আবদুল কুদ্দুস


পাসপোর্ট করবো শুনে আমার নিকটতম অনেক বন্ধু-বান্ধব সমস্বরে বলে উঠলো, ওরে বাবা সে তো ভীষণ জটিলতা! পদে পদে ভোগান্তি! আমি বললাম না, এখন আর কোনো জটিলতা নেই। পাসপোর্ট আবেদন এখন ঘরে বসে অনলাইনেই করা যায়। সবাই এবার আরো জোরে চিৎকার করে বললো- সেটি আরো ঝামেলাপূর্ণ। কেন এতো ভোগান্তি হয়, তার ব্যাখ্যাও তারা আমাকে দিলো। আমি অবশ্য সেই সময় আমার বন্ধুদের কথাগুলো তেমন আমলে নেই নি। তবে এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করার পর আমি বিষয়টি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেয়েছি। দেখেছি পদে পদে মানুষের ভোগান্তি। মানুষের কষ্ট। অর্থের অপচয়। আইনের জটিলতা। কর্মকর্তাদের বাহাদুরি। সুতরাং এই ভোগান্তিসমূহ হলো- অনলাইন পদ্ধতির, ভোগান্তি পাসপোর্ট আইনের, ভোগান্তি পাসপোর্ট কর্মকর্তাদের আসহযোগিতার মাধ্যমে সৃষ্টি। এসব ভোগান্তির কারণ ও তার সমাধানে কিছু করণীয় উপায় এখানে তুলে ধারার চেষ্টা করছিÑ
বাংলাদেশ বর্তমানে ডিজিটাল বাংলাদেশ হতে চলেছে। সর্বক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়ে চলেছে। সেকারণে সরকার অনলাইন পাসপোর্ট আবেদন পক্রিয়া শুরু করেছে। আপাত দৃষ্টিতে সেটি সুসংবাদ মনে হলেও বাংলাদেশের কত শতাংশ মানুষ ইন্টারনেটের আওতায় তা ভেবে দেখা দরকার। কতজন মানুষ প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ তাও ভেবে দেখা দরকার। কেননা দেশের একটি বড় অংশের খেটে মানুষ তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় বিদেশে গমন ও নিজের অথবা আত্মীয় স্বজনদের চিকিৎসার জন্য পাসপোর্টে করে থাকেন। তাদের অনেকের ইন্টারনেট ব্যবহার করার দক্ষতা নেই। এমনকি অনলাইন তথ্য উপস্থাপনের যথেষ্ট অবকাঠামো তাদের দোরগোড়ায় নেই। এজন্য তাদের কোনো দোষও নেই। তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য আমাদের প্রচেষ্টা কতটুকু সেটি বিবেচ্য বিষয়। ডিজিটাল প্রযুক্তির দক্ষতা উন্নয়নের ঘাটতির কারণে তাদেরকে নানা ভোগান্তির স্বীকার হতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে অনেককে পাসপোর্ট অফিসের রাস্তায় আঁড়ি পেতে দাঁড়িয়ে থাকা ফরম পূরণকারী দালালদের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। এই সুযোগে একটি মোটা অংকের টাকা ও দালালদের না দিলে পাসপোর্ট আর হয়না। অনেকটা বাধ্য হয়ে কাজটি করতে হয়। অন্যদিকে আমার জনামতে সরকারি ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তা বা সমাজের কোনো প্রভাবশলী মহলের মানুষকে পাসপোর্ট অফিসের লাইনে দাঁড়িয়ে আবেদন জমা দিতে হয়না। আবার পাসপোর্ট নিতে অফিসে যেতেও হয়না। তাদের একটি ফোন কলই পুরো পক্রিয়ার জন্য যথেষ্ট। শুনেছি তাদের বাড়িতে এসে তথ্য নিয়ে গিয়ে পাসপোর্ট পৌঁছে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ পাসপোর্ট বিধিমালা ১৯৭৪ মোতাবেক নতুন পাসপোর্ট আবেদনকারীর জন্য একটি নির্ধারিত ফরম রাখা হয়েছে। অনলাইন আবেদনের পর ওই একই ফরম প্রদর্শিত হয়। যার একটি হার্ড কপিতে ছবি ও ফি জমাদানের রশিদ সংযুক্ত করে অফিসে জমা দিতে হয়। এই ফরমে অনলাইন আবেদনকারীর জন্য নানা জটিলতা রয়েছে। প্রথমত এই আবেদন ফরমে অনলাইনে বাংলায় নিজের নাম লিখার কোনো ব্যবস্থা নেই। অন্যদিকে পাসপোর্ট আবেদনে জাতীয় পরিচয়পত্রের সাথে মিল করে তথ্য প্রদান করতে হয়। কিন্তু এই ফরমে তার কোনো নির্দেশনা নেই। ফরমের ২ নম্বর দিকনির্দেশনায় লিখা আছে আবেদনকারীর নাম, আপনি যেমনভাবে পাসপোর্টে দেখেতে চান- সেভাবে ৪৮ ক্যারেক্টারে লিখুন। এই ভুল নির্দেশনার কারণে অনেক আবেদনকারী অনলাইনে তাদের নিজেদের নাম, পিতা-মাতার নাম ভুল করে লিখে থাকেন। ভুল বলতে অনেকে তাঁদের শিক্ষাসনদ মোতাবেক লিখে থাকেন। এই ভুলের জন্য প্রতিনিয়ত অসংখ্য আবেদন জমাদানকালে প্রত্যাখ্যাত হয়। এজন্য একটি বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে আগত দূরদূরান্তের জেলা অথবা থানা শহর থেকে আসা মানুষের যেমন ভোগান্তির শেষ নেই, তেমনি অর্থেরও ব্যাপক অপচয় হয়। ফরমের ১৫ নম্বর নির্দেশনা মোতাবেক উচ্চতার হিসাব সেমি. অথবা ইঞ্চি তে দিতে হয় যা আমার দেশের অনেক মানুষ বের করতে জানেনা। সেকারণেও দালালের পরামর্শ নিতে বাধ্য হয়। কারণ অফিসারদের কোনো সাহায্য নেই। এই তথ্যগুলো ফিট-এ থাকলে কী অসুবিধা হবে তা আমরা বুঝতে পারি না। অন্যদিকে ১৯ ও ২০ নম্বর নির্দেশনা মোতাবেক বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দেশের একজন নাগরিক যদি পেশাগত কারণে স্থায়ী ঠিকানা বাদে দেশের অভ্যন্তরে অন্য ঠিকানায় অবস্থান করে তবে তাকে দুটি ঠিকানায় লিখতে হয়। আর সেখানে বেশ বড় বিড়ম্বনা হলো দুই ঠিকানায় পুলিশ তদন্ত হয়ে থাকে। পুলিশ তদন্তে হয়রানির স্বীকার হয়নি এমন পাসপোর্ট আবেদনকারীর নাম আমি শুননি।
পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারিদের অসহযোতিার মধ্যে আছে- আবেদনে ভুল খুঁজে বের করে তার সমাধান না করে সরাসরি প্রত্যাখান করা। তথ্যগত সহযোগিতা না করে মানুষকে দ্বারে দ্বারে ঘুরানোর মানসিকতাও আছে কর্মকর্তাদের। আবেদন জমা দেওয়া ও ছবি তোলার সময় নির্ধারণ তাদের মর্জির উপর নির্ভর করে। কথিত সকাল ১০ ঘটিকা হতে দুপুর ১ ঘটিকা পর্যন্ত আবেদন জমা নেওয়ার সময় নির্ধারণ করে- এরপরে অফিসে আসা মানুষদের ফিরিয়ে দিয়ে পরবর্তী কর্মদিবস নির্ধারণ করে দেওয়াও কর্মকর্তাদের আসহযোতিার সামিল। সম্প্রতি এই জটিলতা আরো বেড়েছে। সাধারণ ফি প্রদান করে পাসপোর্ট প্রত্যাশীদের চূড়ান্ত পাসপোর্ট পেতে প্রায় তিন মাস বা তার অধিক সময় ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কারণ জানতে চাইলে অধিদপ্তরে রক্ষিত হটলাইন নম্বরের (নম্বর ০১৭৩৩৩৯৩৩৯৯) কল রিসিভকারী একজন কর্মকর্তা জানালেন, আমাদের সকল পাসপোর্ট ঢাকা থেকে প্রিন্ট হচ্ছে। সেখানকার অনেক প্রিন্টিং মেশিন নষ্ট। কাগজের ঘাটতি। পাসপোর্ট বইয়ের ঘাটতি। একটু ধৈর্য্য ধরুণ। সাধারণ আবেদনকারীরা তিন মাসের মাধ্যেই পাসপোর্ট পেয়ে যাবেন। এটি শুধু ভোগান্তি নয়। অধিদপ্তরের ব্যর্থতারও লক্ষণ। কোনো মানুষ খামখেয়ালিপনা থেকে পাসপোর্ট তৈরির আবেদন করেন না। অতি প্রয়োজনেই পাসপোর্ট করে থাকেন। সেজন্য তাঁর কাছে তিন মাস সময় অনেক বেশি এবং এটি অনেক বড় ভোগান্তি। নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে যথা সময়ে পাসপোর্ট পাবে সেটিই আমাদের প্রত্যাশা। আর দেশের সব জনগণ জরুরি ফি দিয়ে পাসপোর্ট করার সামর্থ্য সবসময় রাখে না।
এমন সব সমস্য সমাধানে আমাদের করণীয় হতে পারে, প্রথমত অনলাইন পাসপোর্ট আবেদনের নির্দেশনা স্পষ্ট করতে হবে। যেহেতু দেশের সকল কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশন হয়ে যাচ্ছে- সুতরাং অনলাইন আবেদন ফরম পূরণ করার ক্ষেত্রে নির্বাচন অফিসের তথ্য ভাণ্ডারের সাথে অধিদপ্তরের একটি লিংঙ্ক সংযুক্ত করা দরকার যেখানে এক ক্লিকেই সকল তথ্য এসে পাসপোর্ট ফরমে প্রদর্শিত হবে। দেশের যে সমস্ত জনগণ অনলাইন পদ্ধতির ব্যবহার জানে না তারা শুধু ন্যাশনাল আইডেন্টিটি কার্ড (এনআইডি) বা জাতীয় পরিচয়পত্র ও নির্ধারিত ফি ব্যাংকে প্রদান করে অধিদপ্তরের সেবা প্রদানকারী অফিসে জমা দিলেই তা প্রাথমিক আবেদন হিসেবে প্রক্রিয়া করার ব্যবস্থা কর্মর্তাগণ করবেন। সেক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্রে প্রদত্ত তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পুলিশি তদন্ত হবে এবং তদন্ত শেষে প্রতিবেদন ইতিবাচক হলে আবেদনকারী অধিদপ্তর কর্তৃক নির্ধারিত ফরমে পূর্ণাঙ্গ আবেদনপত্র অফিসে জমা দেওয়ার পর পাসপোর্ট ইস্যু করা হবে।
অনলাইনে আবেদন করার পর যেহেতু একটি নম্বর প্রদান করা হয়- সে কারণে আবেদনকারীকে লাইনে দাঁড়িয়ে আবেদনের হার্ড কপি জমা দেওয়ার কোনো সুবিধাজনক কারণ আছে বলে আমি মনে করি না। যদি তা করতেই হয় তবে, অনলাইনে সাবমিটকৃত আবেদনে কোনো ভুল ত্রুটি থাকলে জমা নেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট তথ্য গ্রহণকারী কর্মকর্তা তাৎক্ষণিক সার্ভারে ঢুকে প্রদত্ত নম্বর ব্যবহার করে সংশোধন করে দিলে সাধারণ জনতার দুই-পাঁচবার অফিসে এসে ধর্না দিতে হবে না। এতে ভোগান্তি কমবে। পাসপোর্ট লেখক দালালদের দৌরাত্ম্যও কমবে। হার্ডকপি আবেদন জমা দেওয়ার দিনেই ছবি তোলার কাজ শেষ করে ফেললেও মানুষের ভোগান্তি অনেক কমে যাবে। এই অধিদপ্তরের কাজকে সরকারের অন্য অফিসের সাথে মিলিয়ে কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করতে হবে- এমন বিধি থাকার দরকার নেই। প্রয়োজনে কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত সময় সেবা প্রদানের মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশ দুর্বার গতিতে উন্নয়নের শিখরে এগিয়ে যাচ্ছে। মানুষের সুযোগ-সুবিধা বাড়ছে। জীবনযাত্রার মান বাড়ছে। উন্নয়ন ও দক্ষতায় বাংলাদেশ পৃথিবীর রোল মডেল হিসেবে দাঁড়াতে শুরু করেছে। পাসপোর্ট অফিসের শৃঙ্খলা সুসংবদ্ধ করার মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি এদেশের সাধারণ মানুষের নিকট যেমন উচ্চ মর্যাদা পাবে তেমনি ভালো কাজ করার জন্য জনগণের মাঝে প্রেষণা জাগাবে। বাংলার মেহনতি মানুষের জয় হোক। তাঁদের মর্যাদা পূর্ণ হোক। মেহনতি মানুষের শক্তি বাংলাদেশর উন্নয়নের ভিত্তি।
লেখক: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক
shyamoluits@gmail.com