পিপলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় || শতবছরেও পাঠদান চলছে খুঁড়িয়ে

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ৮, ২০১৭, ১২:২৪ পূর্বাহ্ণ

আনিসুর রহমান, গুরুদাসপুর


গুরুদাসপুরের পিপলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর বিদ্যালয়টি শতবর্ষ অতিক্রম করেছে আড়ম্বরপূর্ণভাবে। জীর্ণদশার ভবনটিতে লেগেছে রংয়ের আস্তর। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই, বিদ্যালয়টিতে নানা সমস্যা মোকাবেলা করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে পাঠদান। নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজীপুর ইউনিয়নের চলনবিল অধ্যুষিত ১৬ নম্বর পিপলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র এটি।
বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদ্যালয়ের দুইটি পাকাভবনে পাঁচটি কক্ষ রয়েছে। তার মধ্যে একটি অফিসকক্ষ, সিড়ি কক্ষটি লাইব্রেরি কাম স্টোর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্য চারটি কক্ষে চলে  প্রাকপ্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান। বিদ্যালয়টিতে রয়েছে প্রায় ৩শ শিক্ষার্থী। তাদের জন্য বসার বেঞ্চ রয়েছে নতুন পুরোনো মিলে ৪৩ জোড়া। আটজন শিক্ষক দরকার হলেও রয়েছে মাত্র পাঁচজন। তাছাড়া একটি পুরোনো ভবনের মেঝে দেবে গিয়ে প্লাস্টার উঠে গেছে। ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। মাঠটি অপেক্ষাকৃত নিচু হওয়ায়তে বর্ষার ৫ মাস সেখানে পানি জমে থাকে। শিক্ষার্থীদের এ্যাসেম্বেলি ও খোলাধুলা ওই সময়টাতে বন্ধ থাকে। পুরোনো টিনসেড ঘরটি জরাজীর্ণ থাকায় সেখানে পাঠদান নেয়াও সম্ভব হয় না।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) সাইদুর রহমান সরকার জানালেন, শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষক সঙ্কটের কারণে দুই শিফটে ক্লাস চালাতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা গাদাগাদি করে বসে ক্লাস করে। বাড়তি ক্লাস নিতে গিয়ে শিক্ষকরা ক্লান্ত হয়ে পড়েন। এ কারণে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করলেও আশাতীত ফলাফল করতে পারে না শিক্ষার্থীরা। উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, বিগত শিক্ষাবর্ষে (২০১৬) ৩৩ জন শিক্ষার্থী প্রাথমিক সমাপণীতে অংশগ্রহণ করে শতভাগ পাস করলেও এ প্লাস পেয়েছে মাত্র ৩ জন। ফলাফল ভালো না হওয়ার কারণ উল্লেখ করে প্রধান শিক্ষক আরো বলেন, ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিদ্যালয়টিতে ২-৩ জন শিক্ষক ছিলো। অবশ্য নতুন বছর থেকে ৫ জন শিক্ষক দিয়ে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। আগামীতে ভালো ফলাফলের আশা ব্যক্ত করেন তিনি।
গতকাল সোমবার বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, বিদ্যালয়ের নির্ধারিত পোষাকে শিক্ষার্থীরা এ্যাসেম্বলি করছে। দুইটি পাকা ভবনে নজরকাড়া রং। পঞ্চম ও চতুর্থ শ্রেণির দুইটি কক্ষের ভেতরে রং করায় চকচক করলেও মেঝের পাকা প্লাষ্টার উঠে গেছে। ছাদ চুইয়ে পানি পড়ায় বেশ কয়েক জায়গায় স্যাঁত স্যাঁতে হয়ে গেছে। শিক্ষার্থীরা গাদাগাদি হয়ে ক্লাস করছে।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী বৃষ্টি, মায়শা ও রাফী জানায়, একটি বেঞ্চ দুইজন করে বসার কথা থাকলেও ৩-৫ জন করে বসে ক্লাস করে তারা। এতে কষ্ট হয় তাদের। ক্লাসে মনোযোগ থাকে না। চতুর্থ শ্রেণিতে রয়েছে একই রকম সমস্যা। ওই ক্লাশের শিক্ষার্থী বাইজীদ, কৌশিক ও খালেদ জানায়, বসার জন্য তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকে। ক্লাশ শুরুর অনেক আগেই বিদ্যালয়ে আসতে হয় তাদের।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সারমিন আক্তার, রোজিনা ও রাজিয়া খাতুন জানালেন, শিক্ষক সঙ্কটের কারণে দুই শিফটে ক্লাস চালাতে গিয়ে মানসিক চাপে পড়তে হয় তাদের। নতুন শাখা অনুমোদন সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হলে তাদের ওপর চাপ কমবে। এতে ভালো ফলাফল হবে। বাড়বে বিদ্যালয়ের সুনাম।
বিদ্যালয় কমিটির (এসএমসি) সভাপতি প্রভাষক মো. এনামুল হক জানালেন, গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর বিদ্যালয়ের শতবর্ষ অনুষ্ঠানে এলাকার কৃতিসন্তান স্থানীয় সাংসদ মো. আবদুল কুদ্দুস ও মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের যুগ্মসচিব মো. সাইদুর রহমান, জেলা প্রশাসক  শাহিনা খাতুন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. ইয়াসমিন আক্তার উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলামসহ উচ্চপর্যায়ের অনেক অতিথি ছিলেন। সেখানে বিদ্যালয়ের নানা সমস্যা তুলে ধরা হয়।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, নতুন বছরে বিদ্যালয়টিতে দুইজন শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অন্য সমস্যাগুলো পর্যায়ক্রমে সমাধান করা হবে।
শতবর্ষ উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকায় প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে, ১৯১৩ সালে পিপলা এলাকার  আদালত পন্ডিত, কোরবার পন্ডিত, আবেদ পন্ডিত, জফের পন্ডিত ও মোজদার পন্ডিত নামে পাঁচ ব্যক্তি গ্রামের একটি বাড়িতে ছয়জন ছাত্র নিয়ে পাঠশালা প্রতিষ্ঠা করেন। তিন বছর চলার পর এলাকাবাসীর দান করা ৪০ শতক জায়গার ওপর ওই পাঠশালাটি গড়ে ওঠে পিপলা প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে। ২০১৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর বিদ্যালয়টির শতবর্ষ উদযাপন করা হয়।