পুঠিয়ার হাওয়াখানা

আপডেট: এপ্রিল ১৬, ২০১৭, ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ

বুরহানুর রহমান



ঝুম বৃষ্টির মধ্যে আমি হাওয়া খানাতে পৌঁছালাম। হাওয়ার দেখা মেলেনি কিন্তু বৃষ্টির শোভা ছিল অপরূপ। হাওয়া খানা রাজশাহীর পুঠিয়াতে অবস্থিত অন্যতম প্রতœতাত্বিক স্থাপনা। পুঠিয়ার বিখ্যাত রাজা চারআনি চারআনি জমিদারদের হাওয়া খানাটি ঐতিহাসিক পুঠিয়ার ১৭টি পুরকীতির একটি। ঠিক কে বা কারা, কি উদ্দেশ্যে এ হাওয়া খানা নির্মাণ করেছিলেন তা সঠিক ভাবে জানা যায় না।
পুঠিয়া রাজবাড়ি থেকেও দূরত্ব কম নয়, প্রায় ৩ কিলোমিটার। স্নিগ্ধ হাওয়ার পরশ নিতে রাজাবাহাদুররা ঘোড়ায় চেপে দিঘির পাড়ে গিয়ে ডিঙি নায়ে চড়ে উঠতেন হাওয়া খানাতে। উলেখ্যঃ পুঠিয়া রাজবাড়ি থেকে হাওয়াখানাপর্যন্ত, কান্দ্রা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে যে রাস্তা চলে গেছে, সে রাস্তার সাবেক নাম ‘রথগলি’।
১০ একর আয়তন এক দিঘির মাঝখানে অবসর বিনোদনের জন্য নির্মিত হয়ে ছিল চুন সুড়কি আর পাতলা ইটের গাঁথুনি দিয়ে। ভবনটির দৈর্ঘ্য ৪৫ ফুট ,প্রস্থ ৪২ ফুট আর উচ্চতা ৩৪ ফুট। দরজা জানালা বিহীন ভবনটির প্রথম তলা পানির নীচে।
দ্বিতীয় তলায় আছে পশ্চিম দেয়ালে ১টি অবশিষ্ট ৩ পাশে ৩ টি করে মোট ১০ টি দরজা। ভবনের চার পাশে আছে ৬ ফুট চওড়া বারান্দা। তৃতীয় তলায় ওঠার জন্য আছে ৩ ফুট চওয়া একটি সিড়িঁ। চুন সুড়কি আর পাতলা ইটের গাঁথুনি দিয়ে তৈরি লাল রঙের দ্বিতল ইমারতের নীচতলা আর্চযুক্ত।
ভবনটির প্রথম তলা পানির নীচে এবং দরজা জানালা বিহিন। এ ইমারতের দোতালায় উঠার জন্য দক্ষিণ পাশে সিড়ি আছে। তৃতীয় তলায় তিন পাশে ৩টি দরজা থাকলেও পশ্চিম দেয়ালে কোন দরজা নেই। ভবনের চার পাশে ৬ ফুট চওড়া বারান্দা আছে।
পুঠিয়া রাজবাড়ির সদস্যরা রাজবাড়ি থেকে রথ বা হাতিযোগে, পুকুরে নৌকায় চড়ে এসে অবকাশ যাপন করতেন। এবং পুকুরের খোলা হাওয়া উপভোগ করতেন। জলঘরে খাবার ছিটিয়ে পুঠিয়ার রাজা বাহাদুর দিঘির মাছ দেখতেন বলে জনশ্রুতি আছে। বিকাল বেলা স্নিগ্ধ হাওয়ার পরশ নিতে রাজাবাহাদুর ঘোড়ায় চেপে দিঘির পাড়ে গিয়ে ডিঙি নায়ে চড়ে দিঘির কাজল কালো জলে ভেসে গিয়ে উঠতেন হাওয়াখানা ভবনে। কোন কোন সময় ডিঙ্গি নায়ে দিঘিময়ে ঘুরে বেড়াতেন রাজাবাহাদুর।
এক সময় দিঘির চার পাশে বসত রথযাএা মেলা। জলঘরে খাবার ছিটিয়ে পুঠিয়ার রাজা বাহাদুর দিঘির মাছ দেখতেন বলে জনশ্রুতি আছে।
তবে ভবনটির সর্বশেষ ব্যবহারকারী রাজার নাম নরেশ নারায়ন রায়, যিনি কমর বেগম নামে এক মুসলিম মহিলাকে বিয়ে করার সময় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নূরুন্নবী রায় নাম ধারণও করে ছিলেন। সেখানে রাজা বাহাদুর ফূর্তি আমদ, দাবা, তাস, পাশা, খেলতেন। কারো কারো মতে এক একটি মন্দির, রথযাত্রার সময় ঠাকুর সেখানে গিয়ে পূঁজা করতেন। দেশ বিভাগের সময় রাজা নরেশ নারায়ন রায় ওরফে নূরুন্নবী রায় পুঠিয়া ছেড়ে কলকাতা যাবার কালে গনি ম-ল ও দেলজান ম-ল নামে দুই কর্মচারীকে হাওয়াখানা দিঘিটি পওন দিয়ে যা। ফলে দিঘির মাঝমাঝি বাঁধ দিয়ে ভাগাভাগির কারণে হাওয়া খানাসহ দিঘির সৌন্দর্য্য হানি হয়েছে। এছাড়া প্রথম তলার স্নানাগার মাটি দিয়ে ভরাট করে ফেলা হয়েছে। দিঘির মাঝখানের বাঁধ তুলে দিয়ে সরকারি বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে চার পাড়ে সংস্কার করে ছোট ছোট ডিঙ্গি নাও ভাসানো হলে এবং হাওয়া খানা ভবনটি সংস্কার করা হলে পুঠিয়ার তারাপুর হাওয়াখানা উত্তরাঞ্চলের পর্যটন কেন্দ্র গুলোর মধ্যে অন্যতম হবে বলে এলাকাবাসীর অভিমত। এছাড়া পুঠিয়ার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক সাড়া ফেলবে বলে স্থানীয় পর্যটকদের ধারণা। হাওয়াখানা ভবনটি আশু সংস্কার প্রয়োজন।
কিভাবে যাবেন : পুঠিয়া উপজেলা সদরের রাজ প্রাসাদ থেকে ৩ কিলোমিটার এবং পুঠিয়া বাজার থেকে ৩ কিলোমিটার পশ্চিমে তারাপুর গ্রামে হাওয়াখানাটি অবস্থিত। একটি বিশাল পুকুর এর মধ্যবর্তী স্থানে এই দ্বিতল ভবনটি অবস্থান করছে। ( জাগোনিউজের সৌজন্যে লেখাটি ছাপানো হল)