পুতুলের প্রার্থনা

আপডেট: ডিসেম্বর ১৫, ২০১৬, ১১:০৫ অপরাহ্ণ

সুখেন মুখোপাধ্যায় :


আদর্শ বিদ্যাপিঠে এবার বেশ বড়সড় করে বিজয় দিবস পালন করা হবে। হেডস্যারের কড়া হুকুমÑ একটা জাঁকজমকপূর্ণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর সাহিত্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে হবে। এ ব্যাপার আবেদ স্যারকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। বিদ্যালয় তহবিল থেকে কুড়ি হাজার টাকা বরাদ্দও পাওয়া গেছে। দায়িত্ব আর বরাদ্দ নিয়ে তো আবেদ স্যার খালি ঘামছেন, আর ঘামছেন। আর ঘামবেন না-ই বা কেন! যে বাঘরেশে হেডমাস্টার! পান থেকে চুন খসলেই হয়ে গেল! নির্ঘাত বদলি অন্য স্কুলে। উঃ! কত তকলিফ করে, এই দামি স্কুলটাতে ঠাঁই পেয়েছে। ভাবতে ভাবতে চলতি পথে ধাক্কা খেয়ে উনি খ্যাঁক করে  উঠলেন, এই কে রে? দেখেন, পুতুল মাটিতে উপুর হয়ে পড়ে। তিনি আবার চোখ লাল করে বলে¬ন, এই তুই কানা না কি? দেখে চলতে পারিস না? আজম স্যার তখন ওখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ ঘটনায় আজম স্যার খুবই বিরক্ত। তিনি আবেদ সাহেবকে বলে¬ন, আপনি তো জানেন, ওর পায়ে জন্মগত ত্রুটি আছে, ব্যালেন্স রাখতে পারে না। এই, ওঠো তো মা। লেগেছে?
আজম স্যারের সাহায্য না নেয়ায় পুতুলের উঠতে খানিকটা সময় লাগে। হাসিমুখে বলে, না স্যার, লাগেনি। কিন্তু মনে মনে ভাবে কতবার কার কত সাহায্য নেবে সে! হামেশায় ওর কয়েকজন সহপাঠী ওকে ল্যাং মারে। ও মাটিতে পড়তেই ওরা দাঁত বের করে হাসে। পুতুল ওদের হাসি সহ্য করে বার বার উঠে দাঁড়ায়। কখনো কারো কোনো সাহায্য নেয়  না। মা বলেছেন, কারো সাহায্য নিবি না। নিজেই নিজের পায়ে খাড়া হতে শেখ। লড়াইয়ে জিততে পারবি। মার কথা মনে হতেই ওর দুচোখ জলে ভরে উঠে। মা কত ভালোবাসে ওকে। আর ভালোবাসে ওর ক্লাসের ফার্স্টবয় তৌহিদ, আর ক্লাস ক্যাপটেন সরস্বতী। ওরা একই সঙ্গে বলে ওঠে, এই কী ভাবছিস? চল্, মিলনায়তনে যাই।
ঠিক আছে চল্।
ওরা মিলনায়তনের দিকে পা বাড়ায়।
মিলনায়তনে ঢুকেই দেখে হেডস্যার আবেদ আর আজম স্যারকে নিয়ে ট্রায়াল তদারক করছেন। আজম, সবাইকে সুশৃঙ্খলভাবে বসতে বলো। আর আবেদ, তুমি অভিনয়-আবৃত্তির স্ক্রিপ্ট ওদের হাতে হাতে দিয়ে দাও। ওরা একটু দেখে নিক।
এই দিচ্ছি স্যার।
আবেদ সাহেব স্ত্রিুপ্ট বিলি শেষ করতেই আজম সাহেব হেডমাস্টার মশাইকে অনুরোধ জানালেন, বিজয় দিবসের কর্মসূচি সম্পর্কে আপনি কিছু বলেন, স্যার।
না, না, তুমিই বলো।
ঠিক আছে, স্যার। এই ছেলেমেয়েরা, এবারে বলতো, ১৬ ডিসেম্বর কেন আমাদের বিজয় দিবস?
প্রশ্নের কোনো জবাব না পেয়ে আজম সাহেব আবার জিজ্ঞেস করেন, আচ্ছা বলতো, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষকের নাম কী?
আবার সবাই চুপ। কিন্তু পুতুলকে উসখুস করতে দেখে তিনি জিজ্ঞেস করেন, পুতুল, তুমি কিছু বলবে?
হ্যাঁ স্যার। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
সাবাস! তুমি জানলে কি করে?
স্যার, আমার দাদা মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ-কমিউনিস্টপার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন গেরিলা বাহিনীর সদস্য ছিলেন। তাঁর কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের অনেক গল্প শুনেছি।
বাহ্! চমৎকার! শোন তোমরা জেনে খুশি হবে যে, আমাদের হেডস্যারও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। এসো আমরা স্যারের কাছ থেকে বিজয় দিবস সম্পর্কে বিশেষ কিছু জেনে নিই। স্যার আপনি বলেন।
হ্যাঁ, শোনো। তোমাদের কাছে প্রথম প্রশ্ন ছিল, ১৬ ডিসেম্বর কেন আমাদের বিজয় দিবস।  শোন, ৭ মার্চ একাত্তরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের ডাক দেন। আর ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর তারিখে রেসকোর্স ময়দানে ভারতীয় বাহিনী ও বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পন করেছিল। আমরা বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী শহিদ তাজ উদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে চূড়ান্ত বিজয় লাভ করি। তোমাদের আরো বলি, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ছিলেন শহিদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রতিবেশী ভারত সহযোগিতা দিয়ে যেমন আমাদের বন্ধু, তেমনি সোভিয়েত রাশিয়াও আমাদের আর এক বড় বন্ধু। কারণ সোভিয়েত রাশিয়া পাশে না থাকলে যুদ্ধ জয় এত স্বল্প সময়ে সম্ভব হতো না। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভাল করে পড়ো, অনুসন্ধান করো। তাহলে অনেক অনেক না-জানা তথ্য, ঘটনা তোমরা জানতে পারবে।
স্যার, আপনি মাসে একদিন করে আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনান না। সরস্বতীর অনুরোধে হেডস্যার খুশিতে গদগদ।
বাহ! উত্তম প্রস্তাব। আগামী মাস থেকেই শুরু করবো। নাও আবেদ, তোমার কাজ শুরু করো।
হেডস্যারের অনুমতি পেয়ে আবেদ সাহেব কাজ শুরু করলেন, এবারে বিজয় দিবস অনুষ্ঠানে মমতাজ উদ্দীন আহমদের লিখা একটা নাটক হবে। আর থাকবে বিচিত্রানুষ্ঠান। তাহলে নাটকের ট্রায়াল আগে শুরু করি?
উত্তরে পুতুল উঠে দাঁড়ায়, জিজ্ঞেস করে, স্যার, আমি কিন্তু বিজয় দিবস অনুষ্ঠানে অংশ নিতে চাই।
তুই! বলে আবেদ সাহেব এমন একটা ভঙ্গি করলেন। এটা দেখে ছেলেমেয়েদের কয়েকজন মজা পেলেও বেশির ভাগ ছেলেমেয়ে পুতুলের পক্ষে গলা ফাটালো, ও পারবে স্যার। ওকে সুযোগ দেন।
শিক্ষক-ছাত্রদের আচরণে হেডমাস্টার ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে ধমক দিলেন, স্টপ! স্টপ! মিলনায়তনে তখন পিনপতন নীরবতা। নীরবতা ভেঙে হেডমাস্টার মশাই বোমা ফাটালেন, নাটক, বিচিত্রানুষ্ঠান সব বন্ধ। শুধু হবে রচনা আর অংকন প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতার বিষয় হবে ‘বিজয় দিবস’। আজম স্থান, তারিখ, বিভাগ উল্লেখ করে নোটিশ দিয়ে দাও। আবেদ, প্রতিযোগিতায় সবাই যাতে অংশ নিতে পারে তুমি তার ব্যবস্থা নিবে।
হুকুম জারি করে তিনি গট গট করে হেঁটে মিলনায়তন থেকে বেরিয়ে গেলেন।

২.
আজ হেডস্যারের নির্দেশ মতো প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে। পুতুল লিখেছে, বিজয় দিবসের কাব্য। সে লিখেছে:
মাননীয় বিভাগীয় কমিশনার সাহেব,
আপনাকে আমার সালাম আর শ্রদ্ধা। আমি আদর্শ বিদ্যাপিঠের ৫ম শ্রেণির একজন প্রতিবন্ধী ছাত্রী। পাঁচ কিলোমিটার দূর থেকে বাসে চড়ে স্কুলে আসতে হয়। বাংলাদেশ সরকার আমাদের জন্য ট্রেনে-বাসে সিট সংরক্ষণের ব্যবস্থা করলেও বাসে-ট্রেনে নির্দিষ্ট আসন না থাকায় আমাদের খুব কষ্ট হয়। আর একটা সমস্যাÑ স্কুলে আমাদের পৃথক টয়লেট নেই। ফলে আমাদের খুবই অসুবিধা হয়। যানবাহনে আমাদের বসার সুনির্দিষ্ট জায়গা থাকলে এবং পৃথক টয়লেটের ব্যবস্থা থাকলে আমাদের সুবিধা হবে। অনুগ্রহ করে আমাদের এ সমস্যাগুলোর সমাধান করে দেন। এবারের বিজয় দিবসে এই আমাদের প্রার্থনা।
বিনীত,
সকল প্রতিবন্ধীর পক্ষে, পুতুল
বিজয় দিবস রচনার খাতা দেখতে দেখতে পুতুলের খাতা পড়ে আবেদ সাহেব উষ্মা চেপে রাখতে পারলেন না-‘দেখেন আজম সাহেব, পুতুলের লেখা দেখেন। আপনি যে বলেন ওর মেধা ভাল, এই তার নমুনা?’ পুতুলের খাতা পড়তে পড়তে আজম সাহেব অভিভূত হয়ে যান। এক ফাঁকে লেখাটার ছবি তুলে বিভাগীয় কমিশনার বরাবরে পাঠিয়ে দিয়ে প্রতিযোগিতার ফলাফলের তালিকাটা পরীক্ষা করে দেখেন, পুতুল কিছুই হয়নি।
বিজয় দিবসের পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান চলছে। সবার সাথে পুতুলও এসেছে। বসে আছে মিলনায়তনে। পুরস্কার পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেনি বলে তার মনে কোনো খেদ নেই। মন দিয়ে প্রধান শিক্ষকের বক্তৃতা শুনছে সে। বক্তৃতার মাঝে আজম সাহেব হেডস্যারের কানে কানে কিছু বলতেই, তিনি বক্তৃতা থামিয়ে হন্তদন্ত হয়ে নিচে নেমে গেলেন। তারপর কেতাদুরস্ত একজন ভদ্রলোককে সঙ্গে নিয়ে মঞ্চে ফিরে এলেন। আদর-যতœ করে তাঁর চেয়ারে তাঁকে বসিয়ে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, সম্মানিত শিক্ষকম-লী ও আমার প্রিয় ছাত্রÑছাত্রীবৃন্দ, আজ আমাদের বড় আনন্দের দিন। আমাদের মহান বিজয় অনুষ্ঠানে বিভাগীয় কমিশনার মহোদয় তোমাদের সাথে কথা বলতে এসেছেন। এখন তিনি তোমাদের উদ্দেশে বাণী দিবেন। আসুন স্যার, আসুন।
বিভাগীয় কমিশনার সাহেব বক্তৃতা শুরুর প্রথমেই পুতুলকে মঞ্চে ডাকলেন। পুতুল দৃঢ়চিত্তে মঞ্চে উপস্থিত হতেই কমিশনার সাহেব তাকে কোলে তুলে নিয়ে বললেন, তোমরা একে চেনো?
মিলনায়তনে সমবেত আওয়াজ উঠলো, পুতুল! পুতুল!
কমিশনার সাহেব বললেন, হ্যাঁ, পুতুল, আমাদের আদর্শ মেয়ে। ও আমাদেরকে মহান বিজয় দিবসের তাৎপর্য বুঝিয়ে দিয়েছে। ও আমাদের বিজয় দিবসের সামনে দেশের একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছে। ট্রেনে-বাসে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্যে সংরক্ষিত আসন সুনির্দিষ্ট করে দেয়ার আবেদন করেছে এবং স্কুলে স্কুলে তাদের জন্য পৃথক টয়লেটের ব্যবস্থা চেয়েছে। মা জননী, আমি তোমার এ উত্তম প্রস্তাবকে সাধুবাদ জানাই। মন খারাপ করো না। আমি এর একটা সুব্যবস্থা করবই। কথা দিলাম।
ঘোষণা শেষ হতেই, মিলনায়তন করতালিতে মুখর হয় উঠলো। আর আবেদ সাহেব ছুটে এসে পুতুলকে কোলে তুলে নিয়ে বললেন, বড় ভুল হয়ে গেছে মামণি! আমায় ক্ষমা করে দাও।
স্যারের আকুতি শুনে পুতুলের নরম মনে দরদ উথলে উঠলো। পুতুল এবারে ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেললো।