পুরাকালে সত্যিই কি হয়েছিল মহাপ্লাবন? বিশ্বের প্রায় সব প্রাচীন গ্রন্থেই রয়েছে ভয়ঙ্কর ইঙ্গিত

আপডেট: আগস্ট ৩, ২০২২, ১২:৪৫ অপরাহ্ণ


সোনার দেশ ডেস্ক :


প্রলয়পয়োধি জল। তার মধ্যে ডুবে গিয়েছে সৃষ্টি। এমন অবস্থায় সৃষ্টিকর্তা রক্ষা করেন তাঁর সৃজনকে। প্রেরিত বা প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত পুরুষ তাঁরই নির্দেশে সেই সর্বনাশা প্লাবনে সৃষ্টিকে রক্ষা করেন। এমনই কাহিনি বলে ‘বাইবেল’-এর ‘পুরাতন নিয়ম’-এর ‘জেনেসিস’ অংশ। একই কাহিনি বর্ণনা করে ইসলাম।

শুধু ইহুদি, খ্রিস্টান বা ইসলামি ধর্মপুস্তক নয়, প্রাচীন বিশ্বে এক ভয়াবহ প্লাবনের কথা জানায় হিন্দু পুরাণ, গ্রিক পুরাণ, মেসোপটেমিয়ার প্রাচীন কাব্য ‘গিলগামেশ’। চিন, হাওয়াই, আয়ারল্যান্ড, এমনকি দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার প্রাচীন সভ্যতাগুলির লোককাহিনিতেও এই মহাপ্লাবনের কথা রয়েছে।

‘বাইবেল’-এর ‘জেনেসিস’ অংশ থেকে জানা যায় যে, সৃষ্টির প্রথম দিকে ঈশ্বর বেশ তৃপ্তই ছিলেন তাঁর সৃজন নিয়ে। কিন্তু পরে ক্রমেই তাঁর সৃষ্ট মানবসভ্যতার মধ্যে প্রবেশ করে দুর্নীতি। তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হন এবং মানুষ-সহ সমস্ত প্রাণীকে মুছে ফেলতে উদ্যত হন। তিনি লক্ষ করেন, একমাত্র এক জন ব্যক্তিই সঠিক পথে রয়েছেন। তাঁর নাম নোয়া।

ঈশ্বর ঠিক করেন কেবলমাত্র নোয়া এবং তাঁর পরিবারই রক্ষা পাবেন। বাকি সব কিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে। এমতাবস্থায় সৃষ্টিকে রক্ষা করতে নোয়া এক বিরাট জাহাজ বানাতে শুরু করেন, যেখানে তিনি, তাঁর পরিবার এবং একজোড়া করে প্রাণী (স্ত্রী ও পুরুষ) ঠাঁই পাবে। এ সবই তিনি ঈশ্বরের নির্দেশ মোতাবেক করেন।

নোয়ার জাহাজ নির্মাণ সম্পন্ন হলে এবং যাবতীয় প্রাণীকে সেই জাহাজে তোলা হলে শুরু হয় মহাপ্লাবন। প্রবল বর্ষণে জলস্তর বাড়তে শুরু করে। নোয়ার সুবিশাল নৌকা, যা ‘নোয়ার আর্ক’ নামে পরিচিত, তা ভাসতে শুরু করে।

‘বাইবেল’-এর ‘জেনেসিস’ অংশ থেকে জানা যায় টানা ৪০ দিন ধরে প্রবল বর্ষণে এই প্লাবনের সৃষ্টি হয়েছিল। নোয়ার নৌকায় আশ্রয়প্রাপ্ত মানুষ ও প্রাণীকুল ছাড়া বাকি সব কিছুই এই প্লাবনে ধ্বংস হয়ে যায়। সুবৃহৎ পর্বত শৃঙ্গগুলিও জলের তলায় চলে যায়।

১৫০ দিন ভাসমান অবস্থায় কাটানোর পর আর্ক আরারাত পর্বতে গিয়ে ঠেকে। সেখানেই কিছু দিন কাটে নৌকার বাসিন্দাদের। এর পর জলস্তর কমতে শুরু করে। কোথাও স্থলভাগ জেগে উঠেছে কি না জানতে নোয়া প্রথমে একটি দাঁড়কাককে উড়িয়ে দেন। কিন্তু এটি ফিরে আসে। নোয়া বুঝতে পারেন, কাকটি ডাঙার সন্ধান না পেয়েই ফিরে এসেছে।

কয়েক দিন পর তিনি একটি ঘুঘুপাখিকে উড়িয়ে দেন। সেটি একটি জলপাই পাতা ঠোঁটে নিয়ে ফিরে আসে। নোয়া বুঝতে পারেন, জল কমতে শুরু করে স্থলভাগ জেগে উঠছে।

মহাপ্লাবনের কথা উল্লিখিত রয়েছে ‘বাইবেল’-এর চেয়েও প্রাচীন গ্রন্থগুলিতে। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার ‘গিলগামেশ’ মহাকাব্যেও মহাপ্লাবনের বর্ণনা রয়েছে। সেখানে সব থেকে ক্ষমতাবান দেবতা এনলিল সৃষ্টিকে এক প্লাবন দ্বারা ধ্বংস করেন। কারণ, পৃথিবী বড় বেশি কোলাহলপূর্ণ হয়ে পড়েছিল।

মানব-সৃষ্টিকারী দেবতা ইয়া উৎনাপিশথিম নামে এক বীরকে আসন্ন প্লাবনের খবর দেন। উৎনাপিশথিম এক বিশাল নৌকা নির্মাণ করে বিশ্বে প্রাণের প্রবাহকে রক্ষা করেন। (সঙ্গের ছবিটি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত গিলগামেশ-এর ‘ফ্লাড ট্যাবলেট’-এর)
ভারতের প্রাচীন শাস্ত্রেও বিশেষ ভাবে বর্ণিত হয়েছে মহাপ্লাবন। ‘যজুর্বেদ’-এর ‘শতপথ ব্রাহ্মণ’-এ মহাপ্লাবন ও তা থেকে সৃষ্টিকে রক্ষা করতে বিষ্ণুর মৎস্যাবতার রূপ ধারণের উল্লেখ রয়েছে।

মৎস্যাবতারের আখ্যানে বলা হয়েছে যে, মনু নামে এক রাজার আমলে এই প্লাবনের ঘটনা ঘটে। মনু একবার মুখ-হাত ধোয়ার জন্য একটি পাত্রে জল নেন। সেই জলে এক অতি ক্ষুদ্র মাছকে তিনি দেখতে পান। মাছটি মনুর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে

। পরিবর্তে মনুকে সে আসন্ন প্রলয় থেকে রক্ষা করার প্রতিশ্রæতি দেয়। মাছটি দিনে দিনে আকারে বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত সেটি এত বড় হয়ে যায় যে, মনু তাকে মহাসমুদ্রে ছেড়ে দিয়ে আসেন। অবশেষে এক দিন মহাপ্লাবন শুরু হয়। মনু এক নৌকায় সপ্তর্ষি-সহ ভাসতে থাকেন। এমন সময় সেই মহামৎস্য দেখা দেয়। সে মনুর নৌকাকে হিমালয় পর্বতে নিয়ে যায়। সৃষ্টি রক্ষা পায়।

প্রায় প্রতিটি সভ্যতাতেই মহাপ্লাবনের বর্ণনা থাকায় অনেকেই মনে করেন, অতি প্রাচীন কালে সত্যিই মহাপ্লাবন ঘটেছিল। আধুনিক স্থলভাগের বিভিন্ন জায়গায় জলজন্তুর জীবাশ্ম পাওয়া যায়। এ থেকে আমেরিকার পুরাণ ও ইতিহাস বিশেষজ্ঞ আড্রিয়ান মেয়র মনে করেন, তুষার যুগের অন্তে কোনও প্লাবন সত্যিই ঘটেছিল। (সঙ্গের ছবিটি আড্রিয়ান মেয়রের)

অনেকে আবার মনে করেন, মহাসাগরের উপরে কোনও বৃহৎ উল্কাপাতের ফলে মহাপ্লাবন ঘটে থাকতে পারে।
এক মহাপ্লাবনে সৃষ্টি মুছে গিয়েছিল বলে উল্লেখ। আবার কি এক মহাপ্লাবন ঘটতে পারে? ধর্মতাত্তি¡ক থেকে শুরু করে বিজ্ঞানীরা পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে ভেবে চলেছেন। ২০২১ সালে পোপ ফ্রান্সিস এক সাক্ষাৎকারে জানান, ঈশ্বরের প্রত্যাদেশ অমান্য করার জন্য এবং পরিবেশ ঘটিত পরিবর্তনের কারণে আর একটি মহাপ্লাবন ঘটতেই পারে। (সঙ্গের ছবিটি পোপ ফ্রান্সিন্সের)

বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং মেরুপ্রদেশে হিমবাহের গলনক্রিয়ার বৃদ্ধির ফলে বাড়ছে গোটা পৃথিবীরই জলস্তর। এই বৃদ্ধিই কি মহাপ্লাবনের আকৃতি নিতে পারে? নাসার একটি সমীক্ষা জানাচ্ছে যে, ২০৩০-এর দশকে আমেরিকার উপক‚লবর্তী অঞ্চল বার বার প্লাবিত হতে পারে। সমুদ্রের জলস্তর এবং চাঁদের অবস্থানগত পরিবর্তন বন্যা পরিস্থিতির ঘন ঘন পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে বলেই মত প্রকাশ করছে নাসার সমীক্ষা।

ইহুদি, খ্রিস্ট এবং ইসলামে সৃষ্টি ধ্বংসের কথা বলা হয়েছে। হিন্দু পুরাণে ‘কল্পান্ত’-এর বর্ণনায় পুরনো সৃষ্টি মুছে গিয়ে নতুন সৃজনের কথা বলা হয়। এই ‘মুছে যাওয়া’ বা ‘অ্যাপোক্যালিপ্স’ (পৃথিবী ধ্বংসের পূর্বাভাস)-ই কি ডেকে আনবে আর এক মহাপ্লাবন?

ক্রমশ উত্তপ্ত হতে থাকা এই গ্রহে বাড়ছে জলস্তর। যে সব অঞ্চলে কখনও বন্যা হত না, সেই সব জায়গা ভাসছে প্রায়শই। নাসার বিজ্ঞানীকুল থেকে শুরু করে পরিবেশবিদবর্গ— সকলেই সাবধানবাণী শোনাচ্ছেন। ২০৩০-এর দশকেই নাকি দেখা যাবে আসন্ন বিপর্যয়ের সূত্রপাত।
তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা