পুলিশ জনগণের বন্ধু হবে কবে?

আপডেট: এপ্রিল ১০, ২০২১, ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ

সামসুল ইসলাম টুকু:


বলিউডের সবচেয়ে ভাল দেসাত্মবোধক হিন্দি সিনেমা ‘ইন্ডিয়া’। এন নটরাজন পরিচালিত ও ২০০১ সাল মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবিতে প্রধান চরিত্রগুলোতে অভিনয় করেছেন সানি দেওল, শিল্পা শেঠি, ওমপুরি, ড্যানি, রাজবাব্বার। মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন সানি দেওল- একজন পুলিশ অফিসার হিসেবে। সিনেমার কাহিনীতে দেখা যায়, ভারতের একজন দোর্দ- প্রতাপশালী রাজনীতিবিদ, শিল্পপতি ও গডফাদারের কন্যা এক গরিব ছেলেকে ভালবেসে বাড়ি ত্যাগ করে। এরপর পুলিশ তাদের আটক করে ছেলেটিকে বেধড়ক পেটাতে থাকলে পুলিশ অফিসার সানি দেওল বাধা দেন। এতে অন্যান্য পুলিশ অফিসাররা ভীষণ নাখোশ হন এবং সানি দেওলকে ওই গডফাদারের প্রচ- প্রভাব ও শক্তির বর্ননা দিয়ে শান্ত থাকতে বলেন। কিন্তু সানি দেওল ইতোমধ্যে গডফাদারের সকল অপকর্মের ইতিহাস সম্পর্কে অবগত হন। এরপরেও তার ব্যাপারে পুলিশ বিভাগের নতজানু আচরণ, তারই গুনগান এবং তাকে কিছু বলা হলে পুলিশের ইমেজ নষ্ট হবার ভীতি প্রদর্শন সানি দেওলকে পীড়িত করে। প্রেক্ষিতে সানি দেওল পুলিশ কর্মকর্তাদের এক সভায় গঠনমূলক বক্তব্য দেন। হুবহু সেটাই তুলে ধরছি ।
“পুলিশ ডিপার্টমেন্টের ইজ্জত কোন উচ্চতায় আছে? আর ইজ্জত তারই যায় যার ইজ্জত আছে। দেশের জনগণের কাছে পুলিশ ডিপারটমেন্টের ইমেজ কী আছে তা আমরা সবাই জানি। দুর্নীতিবাজ ঘুষখোরের চেয়ে ভাল ইমেজ পুলিশের নয়। একজন গরিবের যখন পকেটমারা হয় সে তখন থানায় অভিযোগ করতে আসে। তখন তাকে এমনভাবে জেরা করা হয়, মনে হয় সেই যেন আসামী। কোথায় পকেট মারা হলো, তখন কয়টা বাজে, তুমি ওখানে কী করছিলে, তোমার পকেটে কত টাকা ছিল, আরে এত টাকা কোথায় পেলে? উল্টো পাল্টা প্রশ্ন করতে করতে বেচারার জবান বন্দ করে দেয়। তারপরে বলে ঠান্ডা নিয়ে এসো, সেইসাথে সিগারেটও নিয়ে এসো। বাধ্য হয়ে তাকে যেতে হয়। সে যাবার সাথে সাথে সবাই আলোচনায় বসে। এই এলাকায় পকেটমার কে আছে? ঠান্ডু? না না সেতো গ্রামে গেছে। তাহলে সাজু বোধহয় পকেট মেরেছে। সাজুকে ডাকা হয়। তাকে এরেস্ট করার জন্য নয়। টাকার ভাগ নেওয়ার জন্য। আর এ কারণে পুলিশ ডিপার্টমেমটের ইজ্জত অনেক বেড়ে যায়। সকালে তাড়াহুড়ো করে অফিসে যাবার সময় স্কুটারওয়ালা যদি ভুলে একটু সিগন্যাল ক্রশ করে তবে মুসিব্বত এসে যায়। স্কুটার সাইডে রাখো, লাইসেন্স দেখাও, তোমার স্কুটারে লাইট জ্বলে, হাওয়া আছে টায়ারে, পেট্রল আছে? এমনভাবে জিজ্ঞাসা করে যেন সে সিগন্যাল ক্রশ করেনি, বর্ডার ক্রশ করেছে। আর এসব আইনের জন্য করা হয়না। নিজের পকেটের জন্য করা হয় ৫০/১০০ টাকা যা পাওয়া যায়। এসব কারণে আমাদের পুলিশ ডিপার্টমেন্টের ইজ্জত অনেক বেড়ে যায়।
পুলিস স্টেশনে ধান্দাবাজ, দালাল, ক্রিমিনালদের অভ্যর্থনা করা হয়। তাদের চেয়ারে বসতে দেওয়া হয়। তাতে অনেক ইজ্জত বেড়ে যায় আমাদের ডিপার্টমেন্টের। ক্রাইম যদি দিনে দিনে বেড়ে গিয়ে থাকে এজন্য দায়ী আমরাই। কাল যারা মানুষের পকেট কাটতো আজ তারা গলা কাটছে এজন্য দায়ি আমরা। দুদিন আগে যারা চরস গাঁজার ব্যবসা করতো আজ তারা অস্ত্রের ব্যবসা করে।
এজন্য দায়ি আমরা। সন্ত্রাসীরা সন্ত্রাস করতে করতে যদি সরকার চালানেওয়ালা হয়ে যায় এজন্য দায়ী আমরা।
প্রত্যেক মাসের ১ তারিখে বেতন নিতে চলে আসি। কিন্তু সে টাকা কোথা থেকে আসে? সরকার থেকে? মন্ত্রী এমপি থেকে ? না এই টাকা জনগণের? যে জনগণের সাথে আমরা সুন্দরভাবে কথাও বলিনা। জনগণ দেশের হেফাজতের জন্য বর্ডারে জোয়ান রেখেছে আর জানমালের হেফাজতের জন্য আমরা। জোয়ানরা তো দেশের হেফাজত করছে। কিন্তু আমরা? দেশের জন্য জোয়ানরা যখন শহিদ হয়, জাতি কাঁদে। কিন্তু একজন পুলিশওয়ালা মরলে জনগণ খুশি হয়। বলে, ভাল হয়েছে। একজন ঘুষখোর কমে গেল। নাহ! আমাদের এই সিচুয়েশন বদলাতে হবে। যেন জনগণ বলে পুলিশ ভাল। পুলিশ স্টেশনে মসজিদ মন্দির বানালে হবেনা। সুন্দর সুন্দর কথা দেয়ালে লিখে প্রচার করলে হবেনা। আমাদের কিছু করতে হবে। পুলিশের পোশাকের শক্তি বোঝাতে হবে। সে পকেটমার হোক, ভুমিদস্যু হোক, কালো টাকার পাহাড় হোক, যে কেউ হোক।”
ভারতের পুলিশের সাথে আমাদের দেশের পুলিশের কর্মকা-ের বিশেষ কোনো তফাৎ নেই। তবে ইদানিং আমাদের দেশে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু নির্যাতন গুম ক্রশফায়ার বিনাদোষে নিরপরাধ মানুষকে আটক করে হাজতবাস করানোর খবর গণমাধ্যমে আসে। এগুলোতে পুলিশের ইমেজ নষ্ট হচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নাই। তাই বলে পুলিশের অর্জনও কম নয়। তাছাড়া অনিয়ম দুর্নীতি শৃঙ্খলাভঙ্গ সহ বিভিন্ন অপরাধের জন্য পুলিশের শাস্তি পাওয়ার সংখ্যা অন্য যে কোনো বিভাগের চেয়ে বেশি। অথচ অন্যান্য বিভাগে অনিয়ম ও দুর্নীতির সংখ্যা অনুযায়ী শাস্তি পাওয়ার সংখ্যা খুবই কম। এ থেকে প্রমাণ হয় যে, পুলিশ বিভাগীয় বিচারের ক্ষেত্রে অনেক শক্ত ভূমিকা রাখে। তারপরেও পুলিশকে জনগণের বন্ধু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। আমাদের পুলিশ প্রধান প্রায়ই বলেন, পুলিশকে গণমুখি করে সাজানো হচ্ছে, বিদেশে উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অপরাধ দমনে নতুন নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, কোনো অপরাধীকেই ছাড় না দেবার কথা দৃঢ়কন্ঠে বলেন। তাই পুলিশ প্রধানের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ, সানি দেওলের মত তিনি একবার গর্জে উঠুন। পুলিশকে জনগণের বন্ধু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কিছু করুন। অপরাধী যেই হোক না কেন তাকে পুলিশের পোশাকের শক্তি বোঝানোর জন্য দৃষ্টান্তমুলক ভূমিকা রাখুন।
সম্প্রতি পুলিশের ভুলের কারণে বিনা দোষে ৪ ব্যক্তি জেলখানার সাজা ভোগ করেছে বলে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ পেয়েছে। প্রায় ৫ বছর কারাভোগ করেছেন পল্লবীর সম্পূর্ণ নির্দোষ মানুষ বেনারসি কারিগর আরমান। বরগুনার ঢলুয়া ইউনিয়নের বাদল মিয়াকে ভূয়া গ্রেফতারি পরোয়ানার ভিত্তিতে পুলিশ দুবার আটক করে ৩৫ দিন হাজতে রাখে। যশোরের বেনাপোলে নির্দোষ মিন্টু মোল্লা ৪ মাস জেল খেটেছেন। একই ঘটনা ঘটেছে শরীতপুর জেলার সখীপুর উপজেলার মানিক হাওলাদারের জীবনে। এরা ৪ জনই উচ্চ আদালতে গিয়ে মুক্তি পেয়েছেন। এদিকে দুদকের একটি এফআইআর-এ পশ্চিমের পরিবর্তে পূর্ব লেখার কারণে নোয়াখালী সদর উপজেলার পূর্ব রাজারামপুরের কামরুল ইসলাম একটি জালিয়াতি মামলায় ১৫ বছরের সাজা মাথায় নিয়ে উচ্চ আদালতে গিয়ে মুক্তি পান। ইতোপুর্বে বিনা অপরাধে জাহালামের জেল খাটার ঘটনা সর্বজনবিদিত।
এখনতো এমনটা হওয়া উচিত নয়। কারণ পুলিশ বাহিনী এখন অনেক শিক্ষিত এবং প্রশিক্ষিত। তাদের ভুলের কারণে নির্দোষ মনুষ শাস্তি ভোগ করবে এটা মেনে নেয়া যায়না। বিনা অপরাধে যে কটি দিনই শাস্তি করুক না কেন তা তার জীবনে কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে এবং এসময়ে তার যে আর্থিক মানসিক ও সামাজিক ক্ষতি হবে তার ক্ষতিপূরণ করার ক্ষমতা পুলিশের কেন কারোরি নেই ।
লেখক-সাংবাদিক ও কলামিস্ট