‘পেট্রোল বোমায় দগ্ধদের খোঁজ রাখেনা কেউ’ || আজ ৫ জানুয়ারি

আপডেট: জানুয়ারি ৫, ২০১৭, ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ

শাহিনুল ইসলাম আশিক



‘কনকনে শীত। শরীররে তেমন কাপড় নেই। একদিকে শীত আর অন্যদিকে আগুনে পোড়া জ্বালা। সারা রাত জেগে কাটাতে হয়েছে। মাথার পাশে বউ-ছেলে মেয়ের কান্না। তাদের কিছু বলতে পারছি না। ভীষণ ব্যথায় ডাক্তাররা যেভাবে শুইয়ে দিয়েছেন, সেই ভাবে শুয়ে আছি। ডাক্তারদের মলম লাগানোর সময় মনে হয় হাতের সঙ্গে শরীরে চামড়া উঠে আসছে। চামড়ার নিচের চর্বি তেলের মত চকচক করছিলো।’
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সাতটার দিকে গত ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারিতে পেট্রোল বোমার আগুনে পুড়ে দগ্ধ রাজশাহী মেডিকেল কলেজ রামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের চিকিৎসাধীন থাকার সেই বেদনাদয়ক দিনগুলির কথাগুলো মুঠোফোনে বলছিলেন, রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার পিয়ারপুর এলাকার আশরাফুল হোসেন (৩৯)।
আশরাফুল বলেন, ‘রাতে খুব ব্যথা করে। মনে হয় পা কেটে ফেলি। বেশি পোড়া জায়গায় এখনো সেই দিনের মতই যন্ত্রণা করে। ভেতরে পোড়া ক্ষত রয়ে গেছে, শুধু চামড়ার উপরে কালো আবরণ পড়েছে। সব সময় মলম লাগিয়ে রাখি। দুই হাত দিয়ে তেমন কিছু করতে পারি না। পায়ের উপরের অংশে বেশি পুড়ে যাওয়ায় হাটা-চলাও তেমন করতে পারি না। বেশি হাটলে ব্যথা করে।’
তিনি বলেন,‘নিজের একটু জমি আর মানুষের জমিতে কাজ করার জন্য গরু কিনতে  গিয়েছিলাম চৌবাড়িয়ার হাটে। আমি বাড়িতে আসবো সেই জন্য হাট থেকে মিশুকে করে তানোর আসি। তারপরে রাজশাহীর বাসে উঠি। তানোর মহানগর ক্লিনিকের সামনে বিএনপি জামায়ত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা পেট্রোল বোমা মেরে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে আমার মুখ, দুই হাত ও দুই পা পুড়ে যায়।’
তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, আমাদের কেউ খোঁজ রাখে না। প্রতিদিন ৫০ টাকার ওষুধ লাগে। না খেলে রাতে ঘুমাতে পারি না। সারারাত মা-বাবারে করে চিৎকার করি। ঘটনার পরে অনেকই এসে চিকিৎসার কাগজপত্র নিয়ে গেছে। কোন কাজ হয়নি। খুব কষ্টে দিন যাচ্ছে বউ আর ছেলে-মেয়েকে নিয়ে। সরকারতো অনেক জনকেই অনেক কিছু করে দিচ্ছি আমাদের দিকে কেনো দেখে না ?
পেট্রোল বোমার আগুনে পুড়া দগ্ধ মোহনপুরের মকবুল হোসেন বলেন, দেখতে দেখতে দুই বছর পার হয়ে গেলো। বেকার হয়ে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতে হচ্ছে। আমাদের সেই সময় একটা বেসরকারি  ব্যাংকের মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা দেয়া হয়েছিলো। তারপরে আর কেউ কোন খোঁজ-খবর নেই না। আমরা অনেকেই পঙ্গুত্ব জীবনযাপন করছি। ডাক্তারের কাছে গেলে বলে বিদেশে যেতে হবে। তা না হলে ভালো হবে না। টাকার অভাবে তেমন খেতেই পারি না। আবার বিদেশে যাবো। সেদিন তো আমাদের কোন দোষ ছিলো না।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি রাজশাহীর তানোরে একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেয় বিএনপি  জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় শিশুসহ প্রায় ১০ জন পেট্রোল বোমার আগুনে দগ্ধ হয়। পরে তাদের উদ্ধার করে রামেক হাসপতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়।
এই ঘটনায় সেইদিনই তানোর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুনীরুজ্জামান ভূঁঞা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জড়িতদের খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়েছেন। আগুনে দগ্ধরা হলেন, রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার মকবুল হোসেন (৪৫), তার স্ত্রী আনোয়ারা বেগম (৪০), তানোর উপজেলার দেবীপুর গ্রামের নাজমা খাতুন (৩৫), উপজেলার ইলালদোহী গ্রামের জুলেখা (৩০), তার মেয়ে ফারজানা (৫), আশরাফ হোসেন (৩৯), আছিয়া খাতুন (৭), আইন উদ্দিন (৩৫), অপর দুইজনের নাম জানা যায়নি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ