পোরশায় একযুগ ধরে লুট হচ্ছে প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ

আপডেট: জুন ৬, ২০২৪, ১:০৪ অপরাহ্ণ


ডিএম রাশেদ পোরশা (নওগাঁ) :


নওগাঁর পোরশায় সব প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ লুট হয়ে যাচ্ছে। প্রায় একযুগ ধরে এসব প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ লুট হয়ে যাচ্ছে। অথচ এগুলো রক্ষায় আজ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

জানা যায়, পোরশা উপজেলার নিতপুর ইউনিয়নের পশ্চিম রঘুনাথপুর গ্রামের টেকঠা নামক মাঠে ১৩-১৪ বছর পূর্বে স্থানীয়রা একটি গর্ত থেকে কিছু মূল্যবান জিনিসপত্র পায়। এর পর থেকে ওই এলাকার যেখানেই মাটি গর্ত করে সেখানেই মূল্যবান জিনিসপত্র পায় স্থানীয়রা।

এসব মূল্যবান জিনিসপত্র আর গুপ্তধন পাওয়ার আশায় প্রতিযোগিতার মতো এখানকার মানুষ প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আবাদি জমি কেউ বা আবার রোপণকৃত ধানের জমি কেউ বা আবার আমবাগান খনন করেই চলেছেন। আর পাচ্ছেন দামি দামি সব আর গুপ্তধন। টেকঠা এলাকা পুনর্ভবা নদীর পুর্বপাড়। নদীর পূর্বপাড়ের প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলছে গুপ্তধন পাওয়ার প্রতিযোগিতা।

কেউ নিজের জমিতে আবার কেউ অন্যের জমি টাকার বিনিময়ে চুক্তিভিত্তিক কিনে নিয়ে খনন করেই চলেছেন। বিগত ১২-১৪ বছর পূর্বে এখানে কোনো ঘর বাড়ি ছিল না। ছিল ফাঁকা মাঠ। এখন এই গুপ্তধনকে কেন্দ্র করে গঠে উঠেছে জনবসতি।

স্থানীয়রা জানান, ঘটনাস্থল থেকে সে সময়ে সর্বপ্রথম পশ্চিম রঘুনাথপুর জেলেপাড়ার বৃদ্ধ আব্দুল কাদের বেশ কয়েকটি ক্ষুদ্র পাথর পান। পাথরের মাঝখানে ছোট ছিদ্র ছিল। পাথরগুলো দেখতে তসবির মতো। যেগুলো মুসল্লিরা ইবাদতে কাজে লাগান। তিনি তখন তার গ্রামের মসজিদে আজান দিতেন।

তিনি পাথরগুলো পাওয়ার পর কখনই চিন্তা করেননি যে সেগুলো মূল্যবান কোনো গুপ্তধন। তাই তিনি তাদের মসজিদে ইবাদতের কাজে লাগানোর জন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাথরগুলো দিয়ে তসবি তৈরি করেন এবং ইবাদত করেন। কয়েক মাস পর কোনো এক লোক ওই মসজিদে নামাজ পড়ে তসবিটি দেখে তার পছন্দ হয়েছে বলে বৃদ্ধ আব্দুল কাদেরকে জানান। দিতে না চাইলে সেটি তিনি কিনে নেয়ার প্রস্তাব দিলে তা ৫০০ টাকার বিনিময়ে ওই লোকের কাছে বিক্রি করেন আব্দুল কাদের।

এরপর বৃদ্ধ কাদেরের মনে সন্দেহ হয় সেটি নিশ্চয়ই মূল্যবান পাথর। বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকার লোকজন শুরু করেন মাটি খনন। সেই থেকে প্রতিদিন সকাল হলেই স্থানীয়রা যে যার মতো কোদাল ও খুনতি দিয়ে মাটি খনন করেই চলেছেন। আর পাচ্ছেন মূল্যবান সব জিনিসপত্র। প্রায় ৪ থেকে ৫ ফুট নিচে মাটি খনন করলেই পাওয়া যায় পয়সা, তাবিজ, তসবিহ, কলম, মার্বেল, চাকি, ঢোল, জালি পোটল, বোতামসহ মূল্যবান জিনিসপত্র।

এসব জিনিস লাল, কালো, সাদা, সবুজসহ একেকটির রং একেক রকম। এসব মূল্যবান পাথরের জিনিস পাওয়া মাত্র বিক্রি করে দেন স্থানীয়রা। সর্বনিম্ন যে পাথরটি তার দাম বর্তমানে দশ হাজার টাকা। আর সর্বোচ্চটির দাম দেড় থেকে দুই লক্ষ টাকা। বর্তমানে এ রকম দামেই বিক্রি হচ্ছে বলে জানান স্থানীয়রা।

স্থানীয় যুবক রবিউল ইসলাম জানান, তার বাড়ির পশ্চিম মাঠে পোরশা সদরের মৃত ওহাব শাহের জমি রয়েছে। তার কাছ থেকে তিন বছরের জন্য ২লক্ষ টাকার বিনিময়ে ৩ বিঘা জমি কিনে নেন তিনি। উদ্দেশ্য জমির মাটি খুঁড়ে মূল্যবান সব জিনিসপত্র উদ্ধার করা। এর পূর্বেও তিনি পোরশা সদরের এক জমির মালিকের নিকট থেকে জমি কিনে নিয়ে অনেক মূল্যবান সব জিনিসপত্র পেয়েছিলেন বলে জানান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক যুবক জানান, তিনি এক বছরের জন্য তিনবিঘা জমি কিনে নিয়ে মাটি খনন করছেন। অল্প দিনে তিনি ওই জমিতে মাটি গর্ত করে মূল্যবান ২টি চিরুণি পেয়েছেন যা ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। ২টি জালি পেয়েছেন যা ১৮হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। ৩টি ফুটবল পেয়েছিলেন যা বিক্রি করেছেন ২৫ হাজার টাকায় এবং কয়েকটি মার্বেল বোতামসহ অন্যান্য জিনিস বিক্রি করেছেন ১২ হাজার টাকায়। তবে তিন বিঘার মধ্যে এগুলো পেয়েছেন মাত্র ৫ শতক জমির মধ্যে।

একই এলাকার ফইমুদ্দিনের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম জানান, তার বাড়ির দক্ষিণ পাশে তাদের নিজের ৫ কাঠা জমি খনন করে ১টি চাকি পেয়েছেন। সেটি বিক্রি করেছেন ৫ হাজার টাকায়। ঠোল পেয়েছিলেন ২টি যা বিক্রি করেছেন ৫০ হাজার টাকায়। আর জালি পোটল ২টি পেয়ে বিক্রি করেছেন ১ লক্ষ টাকায়। কয়েকটি মার্বেল ও বোতাম পেয়ে সেগুলো বিক্রি করেছেন ২০ হাজার টাকায়। এসব মূল্যবান জিনিসপত্র নওগাঁ, বগুড়া, নাটোর ও পাবনা এলাকার কিছু ব্যবসায়ীদের নিকট তারা বিক্রি করে থাকেন।

স্থানীয়দের ধারণা, এ এলাকায় এক সময়ে হিন্দুদের বসবাস ছিল। এখান থেকে তারা চলে যাওয়ার সময় তাদের মূল্যবান জিনিসপত্রগুলো তারা নিয়ে যেতে পারেননি। পরে তাদের ঘরবাড়ি ও মন্দিরগুলো ভেঙে মাটির নিচে চাপা পড়ে। আর সেই মূল্যবান জিনিসগুলো এখন বের হচ্ছে।

প্রায় ১৫ বছর ধরে মাটির নিচের এসব মূল্যবান সম্পদ সবগুলো লুট হয়ে যাচ্ছে। অথচ আজ পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়নি।
তবে ২০২২ সালের ২৭ অক্টোবর সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এর প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক একটি চিঠি দিয়েছিলেন পোরশা উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর।

তিনি উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে ওই টেকঠা নামক স্থানের প্রত্নস্থানের ক্ষতিসাধন রোধ করে অবৈধ প্রত্নসম্পদ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে দেওয়া ওই চিঠিতে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এর প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক আরো উল্লেখ করেছিলেন যে, পোরশা উপজেলার এই টেকঠা নামক এলাকাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থান।

এ প্রত্নস্থানকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসাবে গেজেট প্রকাশের জন্য প্রাথমিক জরিপ কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। খুব শিগগিরই এটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসাবে ঘোষণা করা হবে।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরিফ আদনান জানান, তিনি বিষয়টি অবগত আছেন। এ ব্যাপারে তিনি অতিসত্তর প্রযোজনীয় ব্যবস্থা নিবেন বলে জানান।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ