পৌর নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ ভোট বাড়ছে আওয়ামী লীগের

আপডেট: মার্চ ৩, ২০২১, ৩:০৬ অপরাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভোট ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলেছে। দলটি আগের পৌরসভা ভোটের তুলনায় এবার ৫ শতাংশ ভোট বেশি পেয়েছে। বিপরীতে ভোট কমছে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির। দলটি ২০১৫ সালের পৌরসভা নির্বাচনের তুলনায় সাড়ে ৬ শতাংশ ভোট কম পেয়েছে। সদ্য অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
রবিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) শেষ ধাপসহ ৫টি ধাপে দেশের ২৩০টি পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা ১৮৫টি পৌরসভায় মেয়র পদে নির্বাচিত হয়েছে। বিএনপি জিতেছে ১১টি পৌরসভায়। এ ছাড়া জাতীয় পার্টি ও জাসদ একটি করে পৌরসভায় মেয়র পদে নির্বাচিত হয়েছে। অপরদিকে ৩২টি পৌরসভায় স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়লাভ করেছেন। তাদের প্রায় সকলেই ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন।
পাঁচ ধাপে অনুষ্ঠিত ২৩০টি পৌরসভায় ৭৭ লাখ ২৪ হাজার ৮৯৭ ভোটারের মধ্যে ৪৯ লাখ ৭২ হাজার ৯৬৭ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। ভোটের হার ৬৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
নির্বাচনে মেয়র পদে যেমন আওয়ামী লীগের জয়জয়কার, তেমনি কাস্টিং ভোটের বড় অংশও তারা পেয়েছে। কাস্টিং ভোটের দুই তৃতীয়াংশই পেয়েছে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা।
নির্বাচনে ৪৯ লাখ ৭২ হাজার ৯৬৭ কাস্টিং ভোটের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থীরা নৌকা প্রতীকে পেয়েছেন ২৯ লাখ ৭৯ হাজার ৮২৫ ভোট। কাস্টিং ভোটে দলটির প্রাপ্ত ভোটের হার শতকরা ৫৯.৯২ ভাগ। বিএনপি পেয়েছে ১০ লাখ ৪৬ হাজার ৩৬ ভোট।
এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ অন্যান্য দলের প্রার্থীরা কাস্টিং ভোটের মধ্যে নয় লাখ ৪৭ হাজার ১০৬ ভোট (১৯ শতাংশ) পেয়েছে।
দলীয় ভিত্তিতে প্রথম অনুষ্ঠিত ২০১৫ সালের পৌরসভা নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ বেশি ভোট পেয়েছিল। তবে, আগেরবারের চেয়ে এবার দলটির ভোট ৫ শতাংশের মতো বেড়েছে। ওই সময় অনুষ্ঠিত ২৩৫টি পৌরসভায় আওয়ামী লীগ ভোট পেয়েছিল ৫৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ। বিএনপির ভোটের হার ছিল ২৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ। গতবারের চেয়ে দলটি সড়ে ৬ শতাংশ ভোট কম পেয়েছে।
গত ৩০ ডিসেম্বর ২০১৫ থেকে ১২ জানুয়ারি ২০১৬ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ২৩৫টি পৌরসভার মধ্যে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ ১৮২টিতে এবং বিএনপি ২৪টিতে বিজয়ী হয়েছিল। এ ছাড়া জাতীয় পার্টি থেকে একজন এবং স্বতন্ত্র ২৮ জন মেয়র পদে নির্বাচিত হন। গতবারের চেয়ে আওয়ামী লীগ মেয়র পদে তিনটি পৌরসভায় বেশি জিতেছে। অপরদিকে বিএনপির জয়ের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। গতবার ২৪টিতে জিতলেও এবার ১১টিতে জিতেছে।
গতবার কাগুজে ব্যালটে ভোট হয়েছিল। এবার প্রায় অর্ধেক পৌরসভায় ইভিএমে এবং বাকি অর্ধেকে ব্যালটে ভোট হয়। ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে ইভিএমে ভোট তুলনামূলক কম পড়েছে।
এবার ১০৩টি পৌরসভায় বিএনপির প্রার্থী জামানত হারিয়েছে। অপরদিকে নৌকার প্রার্থীরা জামানত হারিয়েছেন তিনটি পৌরসভায়। ২০১৫ সালের ভোটে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ২ জন এবং বিএনপির ৩৫ জন মেয়র প্রার্থী জামানত হারান। নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের ৮ ভাগের ১ ভাগ ভোট না পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত হয়।
প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ বিএনপির তুলনায় অনেক বেশি ভোট পায়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৭৬.৮০ শতাংশ ভোট। বিএনপি পেয়েছিল ১৩.৫১ শতাংশ। ২০০৮ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পেয়েছিল যথাক্রমে ৪৮.০৪ ও ৩২.৫০ শতাংশ ভোট। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৭২.৫৯ শতাংশ ভোট পেলেও এই নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি।
১ম ধাপ: গত ২৮ ডিসেম্বর প্রথম ধাপের পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদের মোট ভোটের ৬৪ দশমিক ০৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। ২৪টির মধ্যে ১৯টিতেই দলটির প্রার্থীরা মেয়র পদে বেসরকারিভাবে জয়ী হয়েছেন। অপরদিকে বিএনপির প্রার্থীরা পেয়েছেন ১৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ ভোট। দুটিতে বিজয়ী হয়েছেন তারা। আর ১২টিতে জামানত হারিয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। এ ছাড়া তিনটিতে জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী।
প্রথম ধাপের এই ২৪ পৌরসভার সবক’টিতে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা হয়েছে। প্রথম ধাপের নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ৬ লাখ ২৪ হাজার ৬৭০ জন। এর মধ্যে ভোট পড়েছে ৪ লাখ ৭ হাজার ৮১১। বাতিল ভোটের সংখ্যা ৭৭৪টি।
২৪টি পৌরসভায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের পাওয়া ভোটের সংখ্যা ২ লাখ ৬১ হাজার ২৫১টি। যা প্রদত্ত ভোটের ৬৪.০৬। অপরদিকে এসব পৌরসভায় বিএনপি প্রার্থীদের পাওয়া ভোটের সংখ্যা ৫৪ হাজার ৩৯৯টি, যা প্রদত্ত ভোটের ১৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
দ্বিতীয় ধাপ: দ্বিতীয় ধাপের পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা ৪৫টিতে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। অপরদিকে বিএনপি থেকে মাত্র চারজন মেয়র পদে নির্বাচিত হয়েছেন। দ্বিতীয় ধাপের পৌরসভায় ভোট পড়েছে ৬১ দশমিক ৯২ শতাংশ।
দ্বিতীয় ধাপে ১২ লাখ ৯৫ হাজার ২৩৬ জন ভোট দিয়েছেন। এসব পৌরসভায় মোট ভোটার ছিলেন ২০ লাখ ৯১ হাজার ৬৮১ জন। ভোট পড়ার হার ৬১ দশমিক ৯২ শতাংশ। এ ধাপে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীরা নৌকা প্রতীকে ভোট পেয়েছেন ৭ লাখ ৭৭ হাজার ৬১২টি; যা প্রদত্ত ভোটের ৬০ দশমিক ০৩ শতাংশ। অপরদিকে বিএনপির মেয়র প্রার্থীরা পেয়েছেন ২ লাখ ৩১ হাজার ৯৮২টি, যা প্রদত্ত ভোটের ১৭ দশমিক ৯১ শতাংশ।
তৃতীয় ধাপ: তৃতীয় ধাপের পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের তুলনায় অর্ধেকেরও কম ভোট পেয়েছে বিএনপির প্রার্থীরা। ৬১টি পৌরসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা পেয়েছেন আট লাখ ৩১ হাজার ৩৬৯ ভোট। যা মেয়র পদে পড়া ভোটের ৬১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। দলটির দুজন মেয়র প্রার্থী জামানত হারিয়েছেন।
অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থীরা পেয়েছেন তিন লাখ ৯৯ হাজার ৯১১ ভোট; যা প্রদত্ত ভোটের ২৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ। জামানত হারিয়েছেন ২৭ জন প্রার্থী। এ ধাপে নওগাঁর ধামইরহাট পৌরসভায় সর্বোচ্চ ৯২ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং মৌলভীবাজার সদরে সর্বনিম্ন ৪১ দশমিক ৮৭ শতাংশ ভোট পড়ে।
তৃতীয় ধাপে মোট ভোটার ছিলেন ১৯ লাখ আট হাজার ৬১৫ জন। ভোট পড়েছে ১৩ লাখ ৪৪ হাজার ১৬টি। এ ধাপে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা আট লাখ ৩১ হাজার ৩৬৯ ভোট পেয়েছেন।
চতুর্থ ধাপ: চতুর্থ ধাপে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান অনেক বেশি। আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা পেয়েছেন ৫৭ দশমিক ৬২ শতাংশ। অপরদিকে বিএনপির প্রার্থীরা পেয়েছেন ১৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ। আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা পেয়েছেন ছয় লাখ সাত হাজার ৬১৮ ভোট। বিএনপির প্রার্থীরা পেয়েছেন এক লাখ ৭৩ হাজার ৩৭৮ ভোট। এ নির্বাচনে বিএনপির ২৩ জন মেয়র প্রার্থী তাদের জামানত হারিয়েছেন।
৫ম ধাপ: পঞ্চম ধাপের পৌরসভা নির্বাচনে ১৪ লাখ ৮৫ হাজার ৮২০ ভোটের মধ্যে কাস্ট হয় আট লাখ ৭১ হাজার ৭৭৩ ভোট। কাস্টিং ভোটের হার ৬৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এ ধাপে আওয়ামী লীগ পেয়েছে ৫ লাখ এক হাজার ৯৭৫ ভোট। কাস্টিং ভোটের বিবেচনায় এ হার ৫৭.৫৮ শতাংশ। এ ধাপে বিএনপি পেয়েছে এক লাখ ৮৬ হাজার ৩৬৬ ভোট। কাস্টিং ভোটের মধ্যে তারা পেয়েছে ২১.৩৮ শতাংশ।
তথ্যসূত্র: বাংলাট্রিবিউন