প্রকৃতির স্বর্গভূমি সিমলা

আপডেট: December 4, 2016, 12:00 am

ড. এম. হাসিবুল আলম প্রধান



গত ২৪ ও ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ দিল্লিস্থ’ ন্যাশনাল ল’ ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত “ঞৎধহংঢ়ধৎবহপু ধহফ অপপড়ঁহঃধনরষরঃু রহ ঔঁংঃরপব অফসরহরংঃৎধঃরড়হ ঝুংঃবস: ঈযধষষবহমবং ধহফ ঝড়ষঁঃরড়হং” শীর্ষক একটি আন্তর্জাতিক সস্মেলনে আমন্ত্রিত হয়ে যোগ দিতে গিয়েছিলাম। ভারতে যাবার পূর্বে দেশে বসেই ঠিক করেছিরাম সম্মেলন শেষ করেই ঘুরতে যাবো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে লীলাভূমি হিমাচল প্রদেশের রাজধানী সিমলা। এ বছরের জানুয়ারিতে সপরিবারে দিল্লি গেলেও বিরূপ আবহাওয়া আর প্রচ- ঠান্ডার কারণে সিমলা যেতে পারিনি। এবার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলাম. দিল্লি গেলে কোনভাবেই স্বপ্নের সিমলা মিস করব না। শুধু সৌন্দর্য্য উপভোগ তা নয়, একজন আইনের শিক্ষক হিসেবে ইতিহাসের নানা ঘটনার সাক্ষি সিমলা ভ্রমণের ইচ্ছাটি ছিল দীর্ঘদিনের। বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করার পর আইনের ইতিহাস পড়াতে গিয়ে ভারতের স্বাধীনতার প্রসঙ্গে এলেই বারবার উচ্চারিত হতো সিমলার নাম। এই জায়গাতে ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে বৃটিশ শাসকগোষ্ঠীর নানা বৈঠক ও চুক্তি হয়েছিল।  দেশে বসেই হিমাচল প্রদেশের অপরূপ সৌন্দর্য্য আর নীলচে পাহাড় ঘেরা প্রকৃতির স্বর্গরাজ্য মায়াবি সিমলার অপরূপ নৈসর্গিক দৃশ্য ইন্টারনেটে দেখে ভীষণ মুগ্ধ হয়েছিলাম, কী অপূর্ব সিমলার নীলচে পাহাড় আর শুভ্র মেঘের স্নিগ্ধতা। সেপ্টেম্বর মাস সময়টা মোটামোট উত্তম সিমলা ভ্রমণের জন্য। কারণ হালকা বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও হালকা শীতের আমেজ ঘেরা সিমলা তার অপরূপ রূপ মেলে ধরে পর্যটকদের নিকট। আর বরফ ঢাকা শুভ্র সিমলা দেখতে হলে যেতে হবে ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে. কারণ তখন সিমলায় তাপমাত্রা নেমে আসে ৪/ ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে আবার কখনও কখনও নেমে আসে মাইনাস ডিগ্রি সেলসিয়াসে। যাদের বরফের উপর স্কেটিং করার অভ্যাস বা ইচ্ছা তারা সাধারণতঃ এই সময়টায় সেখানে ভ্রমণে যায়। আবার চলচিত্রের সুটিং-এর জন্যও অনেক পরিচালক তার টিম নিয়ে এসময় সিমলা চলে আসেন।
২৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সস্মেলন শেষ হলে রাতেই ব্যাগ গুছিয়ে সেরে নিলাম সিমলা যাবার সব প্রস্তুতি। দেশে বসেই টিকেট কনফার্ম করেছিলাম দিল্লি থেকে কলকার। দিল্লি থেকে ট্রেনে সিমলা গেলে প্রথমে যেতে হবে কলকা এবং তারপর কলকা থেকে টয় ট্রেনে সিমলা। ইন্টারনেটে বসেই জেনেছিলাম কলকা থেকে সিমলা ট্রেনে যাবার পথে চোখে পড়বে নীলচে পাহাড়, পাহাড়ি ঝর্না আর প্রকৃতি কীভাবে অপরূপ সাজে আপন মহিমায় সেজেছে তার দৃশ্য। ২৬ সেপ্টেম্বর ভোরে দিল্লির দরকায় অবস্থিত ন্যাশনাল ল’ ইউনিভার্র্সিটি থেকে মেট্রো ধরে গেলাম দিল্লি নিউ রেলওয়ে স্টেশনে। সেখান থেকে ৭টা ৪০ মিনিটে কলকা শতাব্দী ধরে রওয়ানা দিলাম কলকার উদ্দেশ্যে। কলকা যাওয়ার পথে অপরূপ দৃশ্য দেখতে দেখতে বারবার মুগ্ধ হচ্ছিলাম। কোথাও কোথাও দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ আবার কখনও কখনও সবুজ পাহাড়ের মতো ছোট্ট টিলা। কলকা যেতে পথে দেখা হলো হরিয়ানা ও পাঞ্জাব প্রদেশের প্রকৃতি ও সংস্কৃতি। কারণ কলকা ট্রেনে যেতে হলে এ দুটি প্রদেশের উপর দিয়ে যেতে হবে এবং পথে দেখা মিলবে হরিয়ানা ও চন্ডীগড় স্টেশন দুটির। কলকা যাওয়ার পথেই অনুভব করছিলাম কী অসাধারণ হতে পারে কলকা থেকে টয় ট্রেনে সিমলা যাবার যাত্রাটি। ঠিক সময়মত দুপুর ১১টা ৪৫ মিনিটে কলকা এসে পেঁৗঁছালাম। স্টেশনে নেমেই অনুভব করলাম শীতের মৃদু হাওয়ার মতো বাতাস এসে স্পর্শ করলো শরীর। কলকা হরিয়ানার পানচকুলা জেলার ছোট্ট ছিমছাম শহর, স্টেশনটি ছোট্ট হলেও দেখতে খুব সুন্দর। এখান থেকে টয় ট্রেনে সিমলা যাবার কারণে কলকা শহরটির নাম শুধু ভারতে নয়, এ উপমহাদেশে অনেকের কাছে পরিচিত। কলকা-সিমলা রেলপথ নির্মাণ হয়েছিলো ১৮৯৮ সালে। তারও অনেক আগে ১৮৬৪ সালে বৃটিশ রাজ সিমলাকে ভারতবর্ষের জন্য ’সামার ক্যাপিটাল’ হিসেবে ঘোষণা করে অর্থাৎ গরমের সময় এখান থেকে বৃটিশ শাসকরা ভারত শাসন করবে। রেলনির্মাণের পূর্বে গ্রামের মধ্য দিয়ে মুক্ত চাকা বেষ্টিত  ছোট্ট গাড়ি অথবা ছোট্ট মোটর গাড়িতে করে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে বৃটিশরা সিমলা যেতো এবং অনেক সময় লাগতো। টয় ট্রেনে কলকা  থেকে  সিমলা  যেতে পথে পড়বে প্রায় ১০৭টি টানেল এবং ৮৬৪টি ব্রিজ। কলকা থেকে সিমলার দূরত্ব প্রায় ৯৬.৫৪ কিলোমিটার যা টয়ট্রেনে যেতে সময় লাগে প্রায় ৬ ঘণ্টা। বেশি সময় লাগার কারণ হলো রেল লাইনটি  হধৎৎড়ি মধঁমব ( ২ ফুট ৬ ইঞ্চি) । কলকা থেকে সিমলার  এই রেল যোগাযোগ এবং ট্রেইনগুলিকে ২০০৭ সালে হিমাচল প্রদেশ হেরিটেইজ সাইট হিসবে ঘোষণা করে এবং পরবর্তীতে ২০০৮ সালে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেউজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করে। ইউনেস্কো মোটাামুটি ভারতের সকল পাহাড়ি রেলকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেউজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করেছে।
কলকা স্টেশনে নেমেই খুব বেশি অপেক্ষা করতে হলো না, প্রায় ১৫ মিনিটের মাথায় সিমলার উদ্দেশ্যে টয় ট্রেনের দেখা মিললো। ট্রেনে উঠেই দারুণ এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি অনুভব করলাম। ট্রেইনটি’র বগি খুব প্রশস্ত নয়, আমি যে কামরায় উঠলাম সেখানে আমার মত বেশিরভাগই অন্য দেশ থেকে আগত। দুপুর সাড়ে ১২টায় ট্রেন কলকা ছাড়লো সিমলার উদ্দেশ্যে। বেশ কয়েক মিনিটের মধ্যে ট্রেন ঢুকে গেলো হিমাচল প্রদেশের সীমানায়। শুরু হলো নীলচে পাহাড় ঘেরা অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্যের সমারোহ। পাহাড়ের গা বেয়ে ট্রেনে না গেলে এমন চোখ জুড়ানো মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের দেখা তেমনভাবে মিলবে না। পাহাড়ের প্রতি আমার টান ও নেশা অদম্য। এর আগে দুবার জিপে করে এঁকে বেঁকে দার্জিলিং গিয়েছি, পথে দেখেছি নীলচে উঁচু পাহাড়। ২০১৫ সালের আগস্ট মাসে গিয়েছিলাম শীলং-এ (মেঘালয় রাজ্যের রাজধানী), সেখানেও ট্যাক্সি নিয়ে দেখেছি পাহাড় আর সবুজ প্রকৃতি। তবে এবার টয় ট্রেনে সিমলা যাবার পথে পাহাড়, পাহাড়ি ঝর্না আর নানা জাতের সবুজ গাছ-পালা দেখার মজাটাই আলাদা। পাহাড় দেখতে দেখতে পাহাড়ের রূপ, রস, গন্ধ নিজের মধ্যে প্রবলভাবে অনুভব করছিলাম, কখনও মনে হচ্ছিল ট্রেন থেকে নেমে উঠে যাই পাহাড়ের চুঁড়ায়। অন্ধকার টানেলের মধ্য দিয়ে ব্রিজ পেরিয়ে রেলগাড়ি যখন তার ছন্দ তুলে এঁকে-বেঁকে ক্রমশ: উঁচু থেকে আরো উঁচুতে অগ্রসর হচ্ছিল, নান্দনিক দৃশ্য আর প্রকৃতির নৈসর্গ আরো প্রবল আকারে  মুগ্ধতার তরঙ্গ বাজিয়ে সুরের অপরূপ মুর্ছনা ছড়িয়ে দিচ্ছিল অনুভুতিতে। সিমলা যেতে যেতে পথে পড়লো অনেকগুরো পাহাড়ি স্টেশন যা খুবই সুন্দর আর ছিমছাম। এই স্টেশনগুলির নাম-কান্দাঘাট, তারাদেবী, রেরগ, সালোগরা, সোলান. তোফা, সামার হিল। পথে সবচেয়ে যে বড় টানেলটি পড়েছিল তা হলো বেরগ। পাহাড় আর প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে করতে যখন সিমলা এসে পৌঁছালাম তখন প্রায় সন্ধ্যা ৬টা। ইতিহাস সমৃদ্ধ সিমলা স্টেশনে তেমন ভীড় নেই। ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মিশ্রনে ছিমছাম স্টেশনে নেমে সিমলার মাটি স্পর্শ করা মাত্রই প্রচ- আনন্দ শিহরিত হলাম। স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় নিজের ভিতর দারুণ এক রোমাঞ্চ অনুভব করলাম। স্টেশনে দাঁড়াতেই অনুভব করলাম হালকা শীতের জাপটা স্পর্শ করলো শরীর। স্টেশন থেকে ট্যাক্সি নিয়ে ছুটলাম হোটেলের সন্ধানে , এখানে আসার আগেই নেটে মোটামুটি হোটেলগুলো সম্পর্কে একটা ধারণা নিয়েছিলাম। ট্যাক্সি গিয়ে দাঁড়ালো অকল্যান্ড টানেলের নিকট, এখান থেকে এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বিভিন্ন হোটেলগুলিতে যেতে হবে পায়ে হেঁটে। সিমলা শহরের হোটেলগুলোর বেশিরভাগই অবস্থিত মাল রোড এবং রিডজ এলাকায়। এই দুই এলাকায় পর্যটকদের পদচারণাও সবেেচয়ে বেশি, আছে সৌন্দর্য্য ও  ইংরেজদের ঐতিহ্যের বিস্তার। পর্যটকদের সুবিধার্থে এবং যানজট এড়াতে এই দুই জায়গায় ট্যাক্সি চলাচল নিষিদ্ধ। ফলে এইসব এলাকার প্রায় দুই কিলোমিটারের মত রাস্তা পর্যটকদের পায়ে হেঁটে চলাফেরা করতে হয়। অকল্যান্ড টানেল থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে লক্কর বাজার-এর সন্নিকটে হোটেল সৎকার-এ উঠবো- এমনটি আগে থেকেই ঠিক করেছিলাম। হোটেলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা বেজে গেলো। হোটেলের বারান্দা থেকেই দেখা যায় হোটেলের সামনে অবস্থিত ইন্দিরা গা›ন্ধী মেডিকেল কলেজÑ যেটি হিমাচল প্রদেশের সবচেয়ে বড় মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতাল, দেখা যায় দূরের নীলচে পাহাড়। এখান থেকে মাল এবং রিডজ এর দূরত্ব প্রায় ১ কিলোমিটার। হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে যখন সিমলার রূপ দেখছিলাম তখন অনুভব করলাম শীতের মাত্রা একটু একটু করে বাড়ছে, দেখলাম অনেকের গায়ে শীতের কাপড়। হোটেল থেকে অলোর ঝলকানিতে প্রজ্জ্বলিত রাতের সিমলার রূপ দেখতে দেখতে এতটাই মুগ্ধ হলাম যে- সিদ্ধান্ত নিলাম রাতেই হেঁটে হেঁটে সিমলার রূপ আর প্রকৃতি অবগাহন করবো। আনন্দ আর উত্তেজনায় এতটাই শিহরিত ছিলাম যে ভ্রমণক্লান্তি বলে কোন কিছই আমাকে স্পর্শ করেনি।
সিমলা শহরটি সমতল থেকে ৭,৪৬৭ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। আজকের সিমলা অষ্টাদশ শতাব্দীতে হিমালয়ের পাদদেশে পাহাড়ি বনভূমি অধ্যুষিত একটি এলাকা ছিল। শুধু এখানে জ্যাকো মন্দির এবং মন্দিরকে ঘিরে কিছু অধিবাসী ছিল। হিন্দু দেবী শ্যামলা দেবীর (ঝযুধসধষধ উবার) নাম থেকে পরবর্তীতে সিমলা শহরের উৎপত্তি। বৃটিশরা এই এলাকার সৌন্দর্যে প্রচ- মুগ্ধ হয়। ১৮১৭ সালে বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দখল করে এই অঞ্চলের দায়িত্ব গ্রহণ করে। ১৮১৯ সালে হিল স্টেটস-এর সহকারি পলিটিক্যাল এজেন্ট লেফটেন্যান্ট রোজ সিমলা আসেন এবং একটি কাঠের বাসভবন তৈরি করেন। ১৮২৭ সালে বালার গভর্নর জেনারেল লর্ড অ্যামহারর্স্ট সিমলা বেড়াতে এসে এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হন। এর পরের বছর ১৮২৮ সালে বৃটিশ ফোর্সের কামান্ডার-ইন-চিফ লর্ড কম্বারম্যর সিমলায় বেড়াতে এসে অভিভুত হন। ১৮৩২ সালে ডালহৌসি সিমলা সফর করেন। এরপর থেকে বিভিন্ন গভর্নর জেনারেল এবং কামান্ডার-ইন-চিফ গরমের সময় নিয়মিত সিমলা সফরে আসতে শুরু করেন। ১৮৩০-এর দিকে সিমলা ক্রমান্বয়ে থিয়েটার এবং প্রদর্শনীর কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়। এসময় অনেক তরুণ ইংলিশ কর্মকর্তা এবং তাদের আত্মীয় স্বজনরা বিয়ের পরে মধুচন্দ্রিমার জন্য সিমলা পাড়ি জমাতে থাকেন এবং অনেকেই চাকরিসূত্রে পরিবার নিয়ে বসবাস করতে থাকেন। এরই ধারাবাহিকতায় সিমলা একসময় হানিমুন, উৎসব এবং পার্টির জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠে। পরবর্তীতে এখানে ভালো স্কুল গড়ে উঠে, গড়ে উঠে বিনোদন কেন্দ্র, রেস্তোরা এবং বৃটিশ আদলে ক্লাব, পার্টি সেন্টার, আসতে থাকেন ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে অভিজাত পরিবারের সদস্যরা।  ইউরোপীয়ান নাগরিকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৯৪৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর এখানে ক্রিস্ট চার্চ হিল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়। ১৮৬৩ সালে ভারতের ভাইসরয় জন লরেন্স বৃটিশ রাজের সামার ক্যাপিটাল সিমলায় সিফট করার সিদ্ধান্ত নেন এবং ১৮৬৪ সালে বৃটিশ রাজ সিমলাকে ভারতবর্ষের জন্য সামার ক্যাপিটাল হিসেবে ঘোষণা করে । ভারতের ভাইসরয় লর্ড লাইটন ১৮৭৬ সাল থেকে সিমলাকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেন এবং এসময় তিনি ভাইসরিগ্যাল লজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন যা পরবর্তীতে ১৮৮৪ সাল থেকে ১৮৮৮ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই লজটি এখন রাষ্ট্রপতি নিবাস নামে পরিচিত এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডি। আঠারোশ সালের ত্রিশের দশক থেকেই সিমলা রাজনৈতিক আলোচনার জন্য কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠে। ১৮৩২ সালে প্রথম রাজনৈতিক সভা অনুষ্ঠিত হয় গভর্নর জেনারেল উইলিয়াম ব্যান্টিংক এবং মহরাজা রনজিৎ সিংহের কূটনীতিকদের মধ্যে। পরবর্তীতে এখানে সম্পাদিত হয় ১৯১৯ সালের সিমলা চু্িক্ত এবং অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৫ সালের ঐতিহাসিক সিমলা কনফারেন্স। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষের বিভক্তি এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয়ের পর এই সিমলাতেই প্রথম ১৯৭২ সালের ২ জুলাই উপমহাদেশে শান্তি আনয়নে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভূট্টো ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যা ইতিহাসে ’সিমলা চুক্তি’ নামেই পরিচিত।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্বর্গভূমি সিমলার মূল শহরের মধ্যে পর্র্যটকদের মধ্যে আকর্ষণীয় হলো ভাইসরয় লজ বা রাষ্ট্রপতি নিবাস (ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব এডভান্সড স্টাডি) , দি ক্রিস্ট চার্চ, জ্যাকো টেম্পল, দ্য মাল এবং রিডজ। এগুলোকে একত্রে বলা হয় সিটি সেন্টার।  শহরের মধ্যে রয়েছে বিখ্যাত সিমলা স্টেট মিউজিয়াম, রয়েছে স্ক্যান্ডাল পয়েন্ট। শহরের বাইরে ৫ থেকে ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে আকর্ষনীয় যে জায়গাগুলো রয়েছে সেগুলো হলো গ্রিন ভ্যালি, কুফরি, আনন্দ ভিলাস, নলধেরা, সামার হিল , তারা দেবী এবং জুংঙ্গা। শহরের মধ্যে মোটামুটি সবগুলো দেখা হলেও শহরের বাইরে শুধু কুফরি ও গ্রিন ভ্যালিতে যাওয়ার সুয়োগ হয়েছিল। ২৬ সেপ্টেম্বর রাতেই মোটামুটি শহরের ভেতরটা হেঁটে একবার দেখে নিয়েছিলাম। ২৭ সেপ্টেম্বর সকালে রওনা দিলাম কুফরির উদ্দেশ্যে। এটি সিমলা থেকে প্রায় ১৬  কিলোমিটার দূরে এবং সমুদ্রভাগ থেকে আট হাজর ছয়শত ফুট উচ্চতায়। হিমালয়ের পাদদেশের পাহাড়গুলিতেই কুফরির অবস্থান। এখান থেকে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার মনোমুগ্ধকর পরিবেশ পর্যটকদের নিকট খুবই নান্দনিক। পথে যেতেই গ্রিন ভ্যালি চোখে পড়লো। অপরূপ সাজে সজ্জিত নীলাভ দৃশ্য মন কেঁড়ে নেয় অনায়াসে। কুফরি যাওয়ার রাস্তা অতি দুর্গম, ঘোড়ার পিঠে চড়ে যাওয়া ছাড়া কোনভাবেই সেখানে যাওয়া যায় না। পুরুষ. নারীা, কিশোর-কিশোরী ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধা সবাই ঘোড়ার পিঠে চড়ে চলছে কুফরি। অন্যদের মত আমিও ঘোড়ার পিঠে চড়লাম এবং প্রায় আধা ঘণ্টা দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে কুফরির পর্যটন স্পটে পৌঁছালাম। ঝলমল রোদ প্রকৃতিকে উজ্জ্বল করে মেলে ধরেছিল পর্যটকদের নিকট। কারণ সিমলায় হঠাৎ করে বৃষ্টি আসা নতুন কিছু নয়। সেখানে একটি প্রাচীন মন্দিরসহ আপেল গার্ডেন রয়েছে, রয়েছে বেশ কিছু দোকান এবং সিমলার ঐতিহ্যবাহী পোষাকে ছবি তোলার ব্যবস্থা। সিমলার মধ্যে উচুঁতম এই শৃঙ্গ থেকে হিমালয়ের রূপ ও  সিমলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার অপূর্ব অনুভূতি স্মৃতিতে জমা থাকবে অনেকদিন। সেখানে দেখা হলো ঢাকা থেকে আসা একটি বাংলাদেশি পরিবারের সাথে। তাদের কাছে শুনলাম সিমলা থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত নলধেরা আরো সুন্দর এবং রূপবতী। সেখানকার গলফ ক্লাব-এর খ্যাতি ও সৌন্দর্য বিশ্বজোড়া। কুফরি ঘুরে আবার সিমলা শহরটাকে পাশ কেটে ট্যাক্সি যোগে আমরা ছুটে চললাম ভাইসরয় লজ-এ যেখানে বর্তমানে ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডি অবস্থিত। এখানে আসার সাথে সাথে ঝলমল রোদকে গ্রাস করে দুর্দান্ত গতিতে ছুটে এলো রিমঝিম বৃষ্টি। বৃষ্টির ছন্দে ভাইসরয় লজ ও এর পাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে ভালোই লাগছিলো। বৃষ্টি শেষ হলে ছুটলাম ভিতরের দিকে।  লজের সামনের গার্ডেনটি এবং ভবনটি এখনও বৃটিশ ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। এই লজটি ভারতবর্ষের নানা ঐতিহাসিক ঘটনার  সাক্ষি। এখানেই বৃটিশ গভর্নর জেনারেল এবং ভারতের তৎকালীন রাজনৈতিক নেতা ও দলগুলোর মধ্যে নানা চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। লজটি এমন করে নির্মিত যে এখান থেকে সিমলার প্রকৃতি আপন মহিমায় ধরা পড়বে। লজে রয়েছে একটি মিউজিয়াম যা সেই ঐতিহাসিক ঘটনাগুলিকে জীবন্ত করে রেখেছে ছবি ও লেখার বর্ণনায়। ভাইসরয় লজ থেকে বেরিয়ে হোটেলে ফিরে সামান্য বিশ্রামের পর ছুটলাম মাল এবং রিডজ এলাকায়। উদ্দেশ্য রাতের ঝলমল আলোয় এলাকা দুটি ভালো করে দেখা এবং কিছু ছবি ক্যামেরায় তোলা। ক্রিস্ট চার্চের সামনে খোলা জায়গায় সন্ধ্যার পর থেকে পর্যটকদের ভীড়। বিশেষ করে নব দম্পতি ও জুটিরা এখানে ভীড় জমায়। সকালে ভীড় জমায় নরম রোদের আশায় আর সন্ধ্যার পর হালকা শীতের হিমেল বাতাস গায়ে মাখতে। রাতের আলোয় অপরূপ সাজে সজ্জিত সিমলাকে সত্যিই এতটাই দৃষ্টিনন্দন লাগছিলো যেন চোখের পলক পড়ছে না। পরেরদিন সন্ধ্যায় এই শহরটি ছেড়ে আবার দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা হতে হবে ভাবতেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে। মাল এলাকায় অর্থাৎ মাল রোডের দুধােের রয়েছে অসংখ্য শপিং মল, দোকান, খাবার হোটেল, বার আর আবাসিক হোটেল। রিডজ এলাকাতেও অসংখ্য আবাসিক হোটেল আর বার রয়েছে। রাতের বেলাতেও মাল ও রিডজ এলাকা জমজমাট, রাতের লাল নীল আলোয় অসম্ভভ সুন্দর লাগছিলো শপিং সেন্টার ও দোকানগুলো। কাশ্মিরি সাল ও সোয়েটার সুলভ মূল্যে এখানে পাওয়া যায়।
২৮ সেপ্টেম্বর সকাল, স্বর্ণালী রোদ হোটেলের বারান্দায় এসে উষ্ণতায় ভিজিয়ে দিলো শরীর। সকাল থেকে বিদায়ের সুর বাজতে শুরু করলো অন্তরে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে একবার স্মরণ করে নিলাম দিল্লি ফেরার পূর্ব নির্ধারিত সময়সূচি। সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে আবার টয় ট্রেনে সিমলা থেকে কলকা। তারপর রাত ১১ টা ৫৫ মিনিটে কলকা মেইল ধরে আবার দিল্লি। ট্রেন সন্ধ্যায় বিধায় দিনের আলোয় আবার একবার সিমলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার জন্য মনটা আনচান করে উঠলো। কাঁধে ক্যামেরা ঝুলিয়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়লাম। রিডজ আর মাল এলাকায় ইতোমধ্যে বসে গেছে পর্যটকদের মেলা। ক্রিস্ট চার্চের সামনে রিডজ রোডের মূল এলাকায় রয়েছে মাহাত্ম্য গান্ধী ও ইন্দিরা গান্ধীর দুটি ভাস্কর্য। এই দুই ভাস্কর্যকে ঘিরে চলছে পর্যটকদের ছবি তোলার ধূম। সকালের সোনালী রোদের রেশ ধরে জেগে উঠা সিমলাকে প্রকৃতির স্বর্গভূমি বলেই মনে হচ্ছিলো। রিডজ রোডের মূল অংশ অর্থাৎ ক্রিস্ট চার্চের সামনে যে বিরাট খোলা জায়গা, সেখান  থেকে দিনের আলোয় চোখের সীমানায় যে সিমলা ভেসে ওঠে তার নয়নাভিরাম রূপ যেন  বিশ্বখ্যাত শিল্পীর  তুলির আঁচড়ে আঁকা একঠি শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম। ৭টি পাহাড়ের উপর গড়ে উঠা সিমলা যেন রূপের মাধুরী মিশিয়ে সেজে থাকে পর্যটকদের সামনে তার রূপ মেলে ধরতে। দিনের সোনালী আলোয় বেশ কিছু ছবি তুলতে ও কিছু কেনা-কাটা করতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল এলো। বিকেলের ম্লান অলোয় নতুন আর এক রূপে উদ্ভাসিত হলো সিমলা। আমি ছুটলাম সিমলা রেলওয়ে স্টেশনে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই সিমলা স্টেশনে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম দূরের নীলচে পাহাড়গুলি ক্রমশঃ ফিকে হয়ে আসছে। ট্রেনে উঠতেই অনুভব করলাম বিদায়ের সুর যেন আছড়ে পড়লো সমস্ত সত্ত্বায়। হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন সিমলা শহরটিকে পেছনে ফেলে পাহাড়কে আলিঙ্গন করে এগিয়ে যেতে শুরু করলো গন্তব্যে। আর আমি জানালা দিয়ে শেষবারের মতো চোখের সীমানায় ভেসে ওঠা সিমলার রূপ দেখে বিদায় জানালাম প্রকৃতির স্বর্গভূমি সিমলাকে ।
লেখক পরিচিতি: প্রফেসর, আইন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
ঊসধরষ: যঢ়ৎড়ফযধহ@ুধযড়ড়.পড়স