প্রকৌশলী দেলোয়ার হত্যা ও আমার দেশ

আপডেট: June 2, 2020, 12:07 am

সামসুল ইসলাম টুকু:


প্রত্যেক অফিসের বড় কমকর্তার অধীনে সহকারী, বড়বাবু, অ্যাকাউন্ট্যান্ট গোপনীয় সহকারী প্রভৃতি পদ আছে। এসব পদে যারা অবস্থান করেন তারা নিছক কেরানি পদমর্যাদার হলেও ভীষণ প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর। তাদের এই শক্তির মদদদাতা অফিসের বড় কর্মকর্তা। বড় কর্মকর্তার সবচেয়ে বিশ^স্ত এবং অনুগত চাকর হচ্ছে এরা। তাই এদের পারস্পারিক সম্পর্কও খুব মধুর হয়। কর্মকর্তার সবকিছুর বাহন এরা, পাশাপাশি দুর্নীতিবাজদেরও। তাই বড় বড় দুর্নীতি, অঘটন এদের সাথে জড়িত থাকে। কর্মকর্তা যদি দুর্নীতিবাজ নাও হয় তবে তাকে দুর্নীতিপ্রবণ করার জন্য যতো রকম ফুসমন্ত্র দেওয়া দরকার সব প্রয়োগ করে। যদি ব্যর্থ হয় তবে ওই কর্মকর্তার উপরের স্তরের বা নিচের স্তরের কর্মকর্তাদের (যারা খুব লোভী) তাদের ব্যবহার করে। এ সংস্কৃতি বহুকাল ধরেই চলে আসছে। বর্তমানে এটা ব্যাপকতা লাভ করেছে। আর এর জের ধরে বদলি, ওএসডি, চাকরিচ্যুতি এমনকি হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত সংঘটিত হচ্ছে। এমনই একটি সাম্প্রতিক ঘটনা প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেনের নির্মম হত্যাকাণ্ড।
তিনি ছিলেন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের কোনাবাড়ী অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী ও একজন সৎ কর্মকর্তা। সিটি কর্পোরেশনের নিম্নমানের উন্নয়ন কাজ করায় তিনি বেশ কয়েকজন ঠিকাদারের অন্ততপক্ষে শত কোটি টাকার বিল আটকে দিয়েছিলেন। এ জন্য এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট তাকে একবার ওএসডিও করতে সক্ষম হয়। সেখানে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত হত্যার পরিকল্পনা করে ও তা বাস্তবায়নও করে। এ হত্যাকাণ্ডের সাথে সিটি কর্পোরেশনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের যোগসাজশ থাকতে পারে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আভাস দিয়েছেন। খুনিরা পরিকল্পনা অনুযায়ী ১১ মে সকালে প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেনকে তার বাসা থেকে ডেকে নিয়ে মাইক্রোতে উঠিয়ে নিয়ে শ^াসরোধ করে হত্যা করে দিয়াবাড়ী বেড়িবাঁধের জঙ্গলে ফেলে আসে। পুলিশ সেই দিন দুপুরেই দেলোয়ার হোসেনের লাশ উদ্ধার করে। পরে মৃতের স্ত্রী খাদিজা আক্তার তুরাগ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। হত্যাকণ্ডের ঘটনায় পুলিশ গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের সহকারী প্রকৌশলীসহ ৬ জনকে আটক করেছে। এদের মধ্যে ৩ জন এ হত্যার সাথে সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে বিচারকের কাছে জবানবন্দি দিয়েছে। এরা হচ্ছে ছাড়াটিয়া খুনি শাহীন, মাইক্রো চালক হাবিব ও সহকারী প্রকৌশলী সেলিম। সেলিমকে ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। রিমান্ড শেষে হয়তো আরো কারো এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের নাম বেরিয়ে আসবে। জনৈক নেতার নির্দেশে এই সিটি কর্পোরেশনে বিনা টেন্ডারে কোটি কোটি টাকার কাজ সম্পন্ন হওয়ার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। ওই নেতার সিন্ডিকেট কতো শক্তিশালী হলে বিনা টেন্ডারে ঠিকাদারি কাজ হয় সেটাই প্রথমে খুঁজে বের করে জনসম্মুখে প্রকাশ করা দরকার।
কিছু টাকার জন্য কতো নির্মম এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করলো যারা তারা কি মরবে না। কোটি টাকা কি তাদের বাঁচিয়ে রাখতে পারবে। নিশ্চয়ই পারবে না। মরতে তো হবেই তখন কি তাদের স্ত্রী সন্তানরা তার কবরে ওই টাকা রেখে আসবে। নিশ্চয়ই না। এই সত্যটা বুঝতে হবে খুনিদের। শুধু তাই নয়, তার কৃত দুর্নীতি ও খুনসহ কোনো পাপেরই অংশীদার হবে না তার স্ত্রী-সন্তানরা। এরাই অপরাধ জগতের মাফিয়া ডন। এরাই ক্যাসিনো, পাপিয়াদের শ্রষ্টা। শুনেছি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও এদের মেপে চলে। সমাজে এদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। এরা অপরাধ ছাড়া ভালো কিছু করতে জানে না। এরা সব সময়ই ক্ষমতার সাথে থাকে ও বহাল তবিয়তে অপরাধ করে যায়। এ ক্ষেত্রেও দেখা যাবে যারা খুন করিয়েছে তারা আইনের ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাবে। নতুন প্রকৌশলী যোগদান করবে, বিল পাশ করে দেবে কোটি টাকার তাদের হস্তগত হবে। সরাসরি খুনের সাথে যারা জড়িত তাদের হয়তো বিচার হবে। কিন্তু খুন করার সিস্টেমটা অটুট থাকবে, আরো শক্তিশালী হবে। দেলোয়ার হোসেনের স্ত্রী-সন্তানরা কেঁদে কেঁদে মনে শান্ত¦না খুঁজবে যে ভাগ্যে ছিলো তাই তারা স্বামী ও বাবাকে হারিয়েছে।
যে কথাটা দিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম সেদিকে ফিরে আসি। সরকারি অফিসগুলোর সহকারী ও বড় বাবুদের কথা। এদের দেখে বোঝা যাবে না যে এরা কতো ভয়ঙ্কর। শুধু তার কাছে বিল নিয়ে যান তাহলেই বুঝতে পারবেন। যেমন ভ্রমণ বিল, ওভারটাইম বিল, ঠিকাদারি বিল, মালামাল সরবরাহের বিল, চাকরি শেষে প্রভিডেন্ট ফান্ড গ্রাচুইটির বিল। যে বিলই নিয়ে যাওয়া হোক না কেন, খুঁজে খুঁজে তার ত্রুটি বের করবে এবং ঘুষ চাইবেÑ ত্রুটি না পেলে বখশিষ চাইবে, না পেলে বিল পাশ করতে আপনার ধৈর্যচ্যুতি ঘটাবে। অথচ আপনি তার উপরের পদের স্টাফ। আপনি চাপ দিলে বলবে স্যারকে বলেন বা বড় কর্মকর্তার কাছে যান। কারণ বড় কর্মকর্তা ওই ঘুষের টাকা নেন। এ ছাড়া সরকারিভাবে এমন কিছু মোটা অঙ্কের টাকা বরাদ্দ আসে যা কর্মকর্তা ও বড়বাবু ছাড়া কেউ জানতে পারে না। ওই টাকা দুজনে মিলে পুরোটাই আত্মসাৎ করে। তা না হলে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা শিক্ষা অফিসের উচ্চমান সহকারী কাম অ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রদীবকুমার মণ্ডলের ৫ কোটি টাকায় আলিশান বাড়ি কিভাবে হয়। উচ্চমান সহকারীর যদি এমন বাড়ি হয় তাহলে কর্মকর্তার কী হতে পারে। দুর্নীতি বিভাগ এগুলো বুঝতে পারে না প্রমাণ হাজির করলেও কিছু হয় না। সাম্প্রতিককালে স্বাস্থ্য বিভাগের বিশাল বিশাল দুর্নীতির খবর বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশ হলো দফায় দফায়, চিহ্নিত করা হলো সিন্ডিকেটদের, আঙুল গুণে বুঝিয়ে দেওয়া হলো কতো কোটি টাকার দুর্নীতির চিত্র সারাদেশ জুড়ে। লক্ষ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে দিতে হয় না। সড়ক ও জনপথ পরিবহন শ্রমিকদের কল্যাণ ট্রাস্ট্রের লক্ষ কোটি টাকা লোপাট হয়ে যায়, বড় বড় মেগা প্রকল্পের কোটি কোটি টাকার খোঁজ খবরই পাওয়া যায় না, সেখানকার দুর্নীতির কাছেই পৌঁছানো যায় না। এ সব দেখে মনে হয় দেশটা দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য। এ যেন প্রতিরোধযোগ্যই নয় অথবা পাহারাদাররা অন্ধ ও বধির।
এমন নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি একদিনে সৃষ্টি হয়নি। বহুকাল আগে থেকে শুরু হয়েছে। অনিয়মটা নিয়মে পরিণত হয়েছে। অন্যায়টা ন্যায় হয়ে গেছে, দুর্নীতি বৈধতা পেয়েছে, বিচারপ্রার্থীরা লাঞ্ছিত হচ্ছে। এ সব দেখে রাজনীতিবিদরাই বিদেশে তাদের আখের গুছিয়ে নিয়েছে। ছেলেমেয়েদের বিদেশে লেখাপড়াসহ সেখানেই প্রতিষ্ঠিত করছে, গ্রিন কার্ডও পেয়ে গেছে অনেকে। শুধু সুযোগ বুঝে প্রস্থানের অপেক্ষায়। রাজনীতিবিদরা যেমনটা বুঝেছে, এদেশটা আশান্তি অরাজকতা আর খুনের দেশ, নিরাপদ মোটেই নয় এবং ভদ্রলোকদের বসবাসের যোগ্য নয়। তেমনটা বুঝেছে দেশের উচ্চ শিক্ষিত মানুষগুলো। দেলোয়ার হোসেনের মতো যেন মরতে না হয় সেজন্য ক্রমান্বয়ে তারাও বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। যারা দুর্নীতির সাথে যুক্ত হতে পারছে না, বিবেক বাধা দিচ্ছে, নিরাপত্তা পাচ্ছে না, খুন হওয়ার ভীতি সর্বদা কাজ করছে তারা দেশের বড় চাকরি ছেড়ে চলে যাচ্ছে এবং অনেকে দ্রুত দেশ ত্যাগের অক্লান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যাদের বিদেশ পাড়ি দেওয়ার সুযোগ নেই তারা এসব অন্যায় নিরবে হজম করছে অথবা বাধ্য হয়ে দুর্নীতির সাথে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে বিবেককে নির্বাসন দিয়ে। কিছুদিন আগে বলা হতো মেধা পাচার হয়ে যাচ্ছে। কারণ ওই একটাই। অনেকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য বিদেশে যাচ্ছে। কিন্তু আর ফিরছে না। ক্লিনারের কাজ করে বেঁচে থাকছে কিন্তু দেশে ফিরতে চাইছে না। কারণ সে দেশগুলোতে আইন আছে, শান্তি আছে, নাগরিক অনেক সুযোগ সুবিধা আছে, দুর্নীতিবাজ ডনও নেই, মাথা নোয়াতেও হয় না, দেলোয়ার হোসেনের মতো করুণ পরিণতি ভোগ করতে হয় না। এমন হাজার হাজার বাংলাদেশি মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যারা বিদেশি মুদ্রা পাঠিয়ে দেশকে সমৃদ্ধ করছে আজও। দেলোয়ার হোসেনের মতো যাদের হত্যার শিকার হতে হয়েছে সেই সব হত্যকারীদের ও তাদের মদদদাতাদের ও সিন্ডিকেটের মাফিয়া ডনদের বিচার করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না করতে পারলে অদূর ভবিষ্যতে দেশটা হবে মাফিয়াদের ও তাদের মদদদাতাদের এবং মেধাবীদের একটা অংশ বিদেশে পাড়ি জমাবে এবং দেশটা হবে মেধাশূন্য।
লেখক : সাংবাদিক