প্রতিকূলতা মাড়িয়ে গলদা চিংড়ির রেনু উৎপাদনে শতভাগ সাফল্য নতুন সম্ভাবনায় গলদা চাষ

আপডেট: জুন ৯, ২০২১, ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ

মাহাবুল ইসলাম:


রাজশাহীতে সময়ের সঙ্গে বাড়ছে মৎস্য চাষ। গতানুগতিক ধারায় লাগছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। আবার আধুনিক ফার্মিঙের মাধ্যমে মৎস্য চাষে বিনিয়োগও বাড়ছে। আর এক্ষেত্রে লাভজনক মাছ চাষে ঝুঁকছেন চাষিরা। এমনিই লাভজনক গলদা চিংড়ি চাষ। কিন্তু রাজশাহীতে গলদা চিংড়ির রেনু উৎপাদন না হওয়ার গত দুই বছর আগেও রাজশাহীর চাষিরা লাভজনক এ মাছ চাষে উদাসীন ছিলেন। তবে বর্তমানে সরকারি উদ্যোগে রাজশাহী সিড ম্যাল্টিপুলেশন ফার্মে গলদা চিংড়ির রেনু উৎপাদনে শতভাগ সাফল্য অর্জনসহ লাভজনক এ মাছ চাষে কৃষকদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করছে। এতে হাতের কাছে কম দামে রেনু পাওয়ায় লাভজনক গলদা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এক্ষেত্রে চাষিদের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য সহায়তা বৃদ্ধি করা গেলে চিংড়ি চাষে রাজশাহী রোল মডেল হিসেবে উপস্থাপিত হবে বলে মনে করছে-মৎস্য বিভাগ।
জানা যায়, গলদা চিংড়ি মিষ্টি ও স্বাদু পানির মাছ। তবে বাচ্চা ফোটাতে আবশ্যিকভাবে লোনা পানির প্রয়োজন। বাকি সময় মিষ্টি ও স্বাদু পানি হলেই চলে। এছাড়া এসময় নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও বাড়তি পরিচর্যারও প্রয়োজন। একারণে গলদা চিৎড়ি চাষে খরচ বেশি। তবে দেশ ও দেশের বাইরে চাহিদা থাকায় চড়া দামেও বিক্রি করা যায়। একারণে ২০১৭ সালে দেশব্যাপি স্বাদু পানির গলদা চিংড়ির বীজ উৎপাদনক্ষম অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য ১৯ টি ক্ষুদ্র হ্যাচারি ও নার্সারি সংস্কারের মাধ্যমে চিংড়ির বীজ উৎপাদন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সরকার। এরই আওতায় রাজশাহীর মৎস্য বিভাগের অধীন রাজশাহী সিড ম্যাল্টিপুলেশন ফার্মে গলদার রেনু উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু টানা তিনবছর সাফল্যের মুখ দেখেনি এ কর্মসূচি। এরপর গতবছর প্রথম গলদার রেনু উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৮০ ভাগ অজর্ন করতে সক্ষম হয় এ ফার্ম। এবার করোনাকালীন বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও লক্ষ্যমাত্রার শতভাগ পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে এ ফার্ম।
রাজশাহীতে মিশ্র পদ্ধতিতে গলদা চিংড়ি চাষে অপার সম্ভাবনা কথা জানিয়েছেন রাজশাহী মৎস্য অফিসের ফিস সিড ম্যাল্টিপুলেশন ফার্ম ম্যানেজার ড. জিন্নাত আরা রোকেয়া চৌধুরী জানান, গলদা চিংড়ির চাষ একক ও মিশ্র দুই পদ্ধতিতেই করা যায়। তবে চাষিরা মিশ্র পদ্ধতিতে কার্প জাতীয় মাছের সঙ্গে গলদার চাষ করতে আগ্রহী। আর একক পদ্ধতির চেয়ে মিশ্র পদ্ধতিতে লাভও বেশি।
তিনি জানান, রাজশাহীতে গলদা চিংড়ির চাষে বড় চ্যালঞ্জ ছিলো লার্ভা উৎপাদন। লার্ভাকে সহজলভ্য করা গেলে চিংড়ি চাষের মধ্য দিয়ে রাজশাহী আরও একধাপ এগিয়ে যাবে। আর এই লার্ভা উৎপাদন প্রক্রিয়াটা খুবই জটিল ও ব্যয়বহুল। এই উৎপাদন প্রক্রিয়াটা জটিল হওয়ায় ব্যক্তি পর্যায়ে এ বিষয়ে তেমন উদ্যোগ নেই। কিন্তু লাভজনক ও সম্ভাবনাময় হওয়ায় সরকার এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছে।
ড. জিন্নাত আরা রোকেয়া চৌধুরী জানান, গলদা চিংড়ির ডিম সংগ্রহ থেকে শুরু করে পোস্ট লার্ভায় পরিণত হওয়া পর্যন্ত পুরো নার্সিং প্রক্রিয়ায় বায়ো-সুরক্ষা বজায় রাখতে হয়। রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে ডিম থেকে লার্ভা পাওয়া যায়। লার্ভা থেকে পোস্ট লার্ভায় পৌঁছাতে ১১টা পর্যায় পার করতে হয়। এ সময় ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্য, তাপমাত্রা, বায়ু সঞ্চালনসহ পানির গুণমান কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। লার্ভা উৎপাদনে খাবারের ভারসাম্যটাও অত্যন্ত সুরক্ষার সঙ্গে করা হয়। এ সময় লার্ভাকে আর্টিমিয়া খাবার হিসেবে দেয়া হয়। সেটা খুবই দামি একটি খাবার। এ সময় লার্ভাগুলোকে ২৫ থেকে ৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে রাখতে হয়। এর কম বা বেশি তাপমাত্রা হলেই লার্ভার মৃত্যু হার বাড়ে।
তিনি জানান, ডিম থেকে পোস্ট লার্ভা পর্যায়ে আসতে প্রায় দুই মাস পরিচর্যা করতে হয়। লার্ভা পোস্ট লার্ভায় রূপান্তরিত হলে এটা চাষিদের কাছে সরবরাহ করা হয়। এই লার্ভা তারা মে-জুন মাসের দিকে কৃষকদের সরবরাহ করে থাকেন। মার্চ মাস থেকে লার্ভা উৎপাদনের প্রস্তুতি নেয়া হয়। প্রথম পর্যায়ে পিরোজপুরের পচা নদী থেকে ডিম সংগ্রহ করে ও কক্সবাজার থেকে নোনা পানি সংগ্রহ করে কাজ শুরু হয়। এই পানিকে কয়েকটি ধাপে সংশোধন করে লার্ভার উপযোগী করা হয়েছে। কয়েকটি শেডে এই লার্ভা উৎপাদন করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, গত বছরের ন্যায় এবারও ১ লক্ষ রেনু উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিলো। যেটা শতভাগ অর্জন হয়েছে। গতবছর একেকটি লার্ভা এক টাকা দরে চাষিদের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে। এবারও একই দামে সরবরাহ করা হবে। রেনুর দাম ব্যক্তিপর্যায়ে এতটা কম দেওয়া সম্ভব না।
নগরীর মেহেরচন্ডী বুধপাড়া এলাকার চাষী ইব্রাহিম জানান, গলদা চিংড়ির চাষ লাভজনক। কিন্তু পরিচর্যা বেশি লাগে। আবার পুকুর গভীর হলেও এর উৎপাদন ভালো হয় না। পুকুরের গভীরতা ৪ থেকে ৫ ফিটের মধ্যে রাখতে হয়। তিনি প্রায় ১০ কাঠামতো পুকুরে এবার গলদা চাষ করবেন। তিনি সরকারি ফার্ম থেকেই রেনু সংগ্রহ করেন। এখানকার রেনু দাম কিছুটা বেশি হলেও গুনগত মান ভালো।
রাজশাহী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা অলক কুমার সাহা জানান, রাজশাহীতে গলদা চিংড়ি চাষের সম্ভাবনা আছে। প্রদর্শনী খামারে চিংড়ি চাষ করা হচ্ছে। এছাড়াও অনেক কৃষক চিংড়ি চাষ করছেন। তারা নিয়মিত চাষিদের পরামর্শ দিচ্ছেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ