প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে এগিয়ে যাচ্ছে নারী রেফারিরা

আপডেট: December 3, 2020, 9:26 pm

নিজস্ব প্রতিবেদক:


সমাজের কুসংস্কার আর প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে খেলাধুলার জমতে বিশ্বদরবারে নিজেদের তুলে ধরছে নারী রেফারিরা। ১৯৯১ সালের নারী ফুটবল বিশ্বকাপের মধ্য দিয়ে নিজেদের স্বপ্ন যাত্রাকে এক নতুন আসনে অধিষ্ঠিত করেছে নারী রেফারিরা।
ফুটবল জগতে খেলোয়ারদেরকে গড়ে তোলার পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করে থাকে রেফারি ও কোচরা। একজন খেলোয়াড়ের সঙ্গে তাদেরকেও করতে হয় কঠিন পরিশ্রম। তাদের নেতৃত্বেই গড়ে উঠে একজন দক্ষ খেলোয়ার। এতে সারাবিশ্বে নারী রেফারিদের খ্যাতি তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একজন সফল রেফারি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে বাংলাদেশের জয়া চাকমা।
মঙ্গলবার (১ ডিসেম্বর) নগরীর মুক্তিযুদ্ধ স্মতি জেলা স্টেডিয়ামে অনুর্ধ্ব ১৪ মহিলা জাতীয় ফুটবলে রেফারির দ্বায়িত্ব পালন করতে আসা কয়েকজন মেয়ে রেফারিদের সঙ্গে আলাপকালে নানা প্রতিবন্ধকতা মাড়িয়ে উঠে আসার অনুভূতির কথা জানাচ্ছিলেন।
চট্টগ্রাম থেকে রেফারির দায়িত্ব পালন করতে আসা সুমাইয়া আফরিন শাহীন জানায়, আসলে মেয়েদের খেলা বলতে গেলে সহজ কথা না। পরিবার বা সমাজ কখনোই সহায়তা করে না। এলাকায় ও খেলতে দেখলে নানান কটু কথার সম্মুখীন হতে হতো। পরিবারে মা-বাবা কখনোই চাই নাই যে আমি খেলার সাথে জড়িত থাকি। তবে ছোট থেকে খেলার প্রতি আগ্রহ ছিল যার প্রেক্ষিতে স্কুলে বিভিন্ন খেলায় অংশ গ্রহন করতাম। পড়াশুনার মাঝে খেলা বাদ দিয়ে বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করি। পুলিশে যোগদানের পরে সেখানে বিভিন্ন খেলার মধ্য থেকে আবার খেলার জগতে এগিয়ে আসি। এবং রেফারিতে যোগদান করি। যখন আমি বড় জায়গায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছি তখন আর কেউ বাধা সৃষ্টি করে না। জীবনের সংগ্রাম থেকেই আমি এতদূরে উঠে আসতে পেরেছি। আমাদের ফুটবল জগত এখন অনেক এগিয়ে এই দেশের প্রধানমন্ত্রী একজন নারী, তিনি নারীদের উন্নয়নে সর্বক্ষণ কাজ করে যাচ্ছেন। তাই এখন কারও পিছিয়ে পরার কোন সুযোগ নেই। নতুনদেরকে এগিয়ে আসতে হবে। বাধা অনেক আসবে তা অতিক্রম করে খেলতে হবে।
টাঙ্গাইল থেকে অনুর্ধ্ব খেলায় রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে আসা মরিয়ম আক্তার জানান, অনেকের জীবনে খেলাধুলা করা কঠিন হয়ে পরে যদি পরিবারের সমর্থন না থাকে। তবে আমার ক্ষেত্রে অনেকটা ভিন্ন। পরিবারে আমাদের সবাই খেলা প্রেমী। বাবা ফুটবল খেলতো তার খেলা থেকে আমার খেলার প্রতি আগ্রহ অনেক বেশি। বলতে গেলে ফুটবল খেলা আমার রক্তের সাথে মিশে আছে। আশপাশের মানুষরা খেলা নিয়ে অনেক কথা শুনায়। কিন্ত পরিবার থেকে কখনো কোন বাধার সম্মুখীন হয়নি। বিয়ের পরে অনেকের দেখা যায়, স্বামীর পরিবার থেকে বাধা সৃষ্টি করে। কিন্ত আমার ক্ষেত্রে তা অনেক আলাদা আমি সবার কাছেই সহায়তা পেয়েছি। রেফারিতে আসার পেছনে আমাকে আমার পরিবার অনেক সহায়তা করে। আমার ছেলের অনুপ্রেরণায় আজ আমি এতদূরে পৌছাতে সক্ষম হয়েছি। ভবিষ্যতে রেফারিতেই নিজেকে সফলকরে চলতে চাই। যখন কেউ উপরে উঠে তখন তার সমালোচনা সবাই করে। যারা নতুন আছে তাদেরকেও অনেকের সমালোচনার শিকার হতে হবে। তবে যদি তোমাদের পরিবার সাথে থাকে তাহলে আর কারো চিন্তা করার প্রয়োজন তোমাদের নেই।
মানিকগজ্ঞের আফরোজা খন্দকার ২ বছর থেকে খেলায় রেফারির দ্বায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জানান, খেলা জগত তার কাছে ভালো লাগার এক অনন্য নাম। ছোট থেকেই ফুটবল খেলার প্রতি আসক্ত তিনি। পরিবারের সহায়তা তার সেই স্বপ্ন পূরণের পথকে আরো সহজ করে দিয়েছে। খেলা দেখার আসক্ত হওয়ায় তিনি মহিলাদের ফুটবল খেলা দেখতেন এবং রেফারি জয়া চাকমা ও সালমাকে দেখে তার মধ্যেও ইচ্ছা জাগে রেফারি হওয়ার। তিনি নিজেকে রেফারিতে নিয়ে আসেন। এবং নিজের স্বপ্নকে পূরণে এগিয়ে আসে।
চট্টগ্রাম থেকে আসা রেফারি আলেয়া বেগম জানায়, ছোট বেলাতেই মা বাকে হারিয়ে তিনি বোনদের সাথেই থাকতেন। খেলা জগত তার কাছে অনেক প্রিয়। খেলা নিয়ে অনেকেরই অনেক প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে যেতে হয় তিনিও তার ব্যতিক্রম না। পরিবারে তেমন কেউ তাকে সহায়তা করেনি খেলার বিষয়ে। নিজের উদ্যোগে আজ তিনি এতদূর এগিয়েছেন। এবং আজ আমি সফল হয়েছি। নতুনদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, নতুনদেরকে এগিয়ে যেতে হবে এইভাবেই যেন তারা নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
জীবনের পনেরোটি বছর রেফারি হিসেবে নিজের গতি পথ এগিয়ে নিয়ে গেছেন রাজশাহীর ফুটবল দলের রেফারি আক্তার হোসেন বলেন, রাজশাহীতে বিভিন্ন ক্লাবে খেলার সময় অন্য রেফারিদেরকে দেখতাম তাদের ক্রিড়া কৌশল আমার ভালো লাগতো। খেলাধুলার মাঠের প্রতি আমার আকর্ষণ ছিল অনেক। নিজেকে কিভাবে খেলার সাথে সংযুক্ত রাখা যায় তা ভাবতেই সিদ্ধান্ত নিলাম রেফারি হওয়ার। এরই প্রেক্ষিতে ২০০৫ সালে প্রথম রেফারির দ¦ায়িত্ব পালন করি। অনেক জায়গায় খেলায় দেখেছি নারীদের খেলার প্রতি আকর্ষণ অনেক। বাঁধাকে অতিক্রম করেও তারা এসেছেন খেলার মাঠে। সেই থেকে আমারও ইচ্ছা নারীদেরকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথে কাজ করার। এখন অনেক মহিলা ফুটবলাররা হয়েছেন সফল রেফারি। বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টের মাধ্যমে তা আরও প্রসারিত হয়। যার ফলে মেয়েরা এখন অনেকটা এগিয়ে যাচ্ছে। খেলার প্রতি মায়া না থাকলে কোন মেয়ে আজ এত প্রতিবন্ধকতা থেকে এগিয়ে আসতে পারতোনা।
রাজশাহীর আরেক রেফারি জানি আলম জানায়, ২০০৫ সালে রেফারি প্রশিক্ষণের মধ্যে থেকে আমার এই জগতে আসা। ৫২ জন মিলে আমরা প্রশিক্ষণ করি যার মধ্যে মেয়ে রেফারি আমরা পাই ৪ জন। ২০১১ সালের ফুটবল টুর্নামেন্টের মাধ্যমে মহিলা রেফারিরা আলোড়ন সৃষ্টি করে। আমরা আগে দেখেছি মেয়েদের ক্ষেত্রে অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিল যা এখন অনেকটায় কমে গেছে। ছেলে এবং মেয়ে উভয়ের উন্নয়ন একসাথে হলে দেশ খুব দ্রুত এগিয়ে যাবে। তবে খেলা শুধু জাতীয় পর্যায়ে না হয়ে স্থানীয় ক্লাবগুলোতেও হলে কোচ এবং রেফারির সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পাবে। নতুনদের উদ্দেশ্যে আমি একটি কথায় বলবো মেয়েদেরকে পড়াশোনার পেছনে খেলাতেও বেশি মনোযোগ দিতে হবে। আর সকল বাধাকে অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ