প্রত্যয় হোক লোভ সংবরণের সাধনা

আপডেট: ডিসেম্বর ১, ২০২১, ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ

গোলাম কবির:


বলা হয়ে থাকে মানবমাহাত্ম্যের বিকাশে প্রধান শুত্র হলো ষড়রিপু। মানুষ পদবাচ্য প্রাণীর তা থাকবে, তবে নিয়ন্ত্রিত থাকা বাঞ্ছনীয়। বিশেষ করে মানবসেবায় যাঁরা নিবেদিত যেমন, শিক্ষক, রাজনীতিক, ধর্মপ্রচারক ইত্যাদি।

একটা প্রত্যয় সবার মাঝে নিরন্তর থাকা উচিত। তাহলো নিজেকে গর্বিত করার অসীম ক্ষুধা যেন সীমিত হয়। রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলি : ‘নিজেরে করিতে গৌরবদান, নিজেরে কেবলি করি অপমান।’ যেন সুশীল মানুষ বিস্মৃত না হয়। তবে ধারণা করা যায়, মান-অপমান বোধের পরিবর্তন হয়ে গেছে। না হলে শিক্ষকতাব্রতীর অবক্ষয় সংশ্লিষ্টদের বিমর্ষ করে না কেন! হয়তো মনুষ্যত্ব বিকাশের অপরাপর সদগুণাবলীর সাথে লজ্জাও পালিয়ে মুখ ঢাকছে। লজ্জার মাহাত্ম্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘আল হায়ায়ো সো’বাতু মিনাল ইমান’ বিশ্বাসের অন্যতম শাখা লজ্জা। প্রাপ্ত বয়স্কদের বিশেষ স্থান আচ্ছাদিত রাখাকে প্রাথমিকভাবে বলে লজ্জা-নিবারণ। এটা খুব কঠিন ব্যাপার নয়। অপ্রকৃতিস্থ, ন্যুড আর নাগা-সন্ন্যাসী ছাড়া। লজ্জা অনুভবের পরিধি ব্যাপক।

এই পরিধি যার সুদৃঢ় ও বিস্তৃত তিনি অক্ষয় পৌরুষের আধিকারী। বাংলার মাটি এবংবিধ মানুষ খুব বেশি জন্ম দিতে পারেনি। যাওবা দিয়েছে, তারা সত্যিকার মূল্য পায়না। আমাদের ছেলেবেলায় চারপাশে দেখা যেত প্রচুর লজ্জাবতী নামের ছোট্ট গাছ। হাত দিলেই জড়সড় হয়ে যেত। শোনা যায়, জগদীশচন্দ্র বসু নাকি এই গাছ দেখার পর গাছের প্রাণ আছে, তা আবিষ্কার করেছিলেন।

প্রকৃতিতে সেসব গাছ দুর্লভ্য হয়ে গেছে। জগদীশ চন্দ্র বসুর মতো শিক্ষক আর জন্মিছেনা। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে উৎসাহিত করতে গিয়ে ১৯০১ খ্রীষ্টাব্দের ২৫ শে জুলাই এক চিঠিতে লিখেছিলেন: আত্মার উদ্ভাসিত সত্য একদিন বৈজ্ঞানিক সিংহাসনে অভিষিক্ত হইবে। শহীদুল্লাহ কায়সার দুঃখ করে বলেছিলেন, বাংলার মাটি কি আর একটি রবীন্দ্রনাথের জন্ম দিতে পারেনা। জগদীশ চন্দ্র বসু সম্পর্কে একই মন্তব্য করা যায়। আমরা দীর্ঘশ্বাস ফেলি কাজী নজরুল ইসলামের মতো ‘আগের মানুষের’ সন্ধানে ফিরি।

সমাধানের পথ পাইনা।
আজকের দিনের আমরা শিক্ষক, সামান্য এক টুকরা ফেলনা মাংসখন্ডের লোভে লাঙ্গুল দোলাই, যা দেখে সারমেয়কুল বোধকরি লেজনাড়া ভুলে গেছে।
সত্যিকার আদর্শশিক্ষক আর অনৈতিক কাজে সহায়তাকারী লোকরঞ্জক শিক্ষকের পার্থক্য আমরা বুঝিনা। তাই আপাত জনপ্রিয়দের ওপরে উঠাই। এযে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া! ফলে নীতিহীনরা কেউকেটা সাজে। আর ত্যাগী, জ্ঞানসাধক, দেশপ্রেমিকরা নেপথ্যে রয়ে যায়। নকল বই ছাপিয়ে সফল লেখকের সম্মাননা পায়। পক্ষান্তরে লজ্জায় কুণ্ঠিত নিরাসক্ত মানুষটির ভাগে লবডঙ্কা। এটা বোধকরি অনাদিকালের নীতিহীন রীতি।

সক্রেটিশকে আমরা নৈতিকতার আদর্শ হিসেবে জানি। অথচ দ্বিগুণ উৎসাহে নীতিহীনতার পানে ধাবিত হই। আমরা এমনি নির্লজ্জ যে, জানিনা, আমাদের জানার পরিধি কত সংকীর্ণ। ফেসবুকে ভুলের পাহাড় জমাই। আর লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে ক্ষমতাসীনদের কৃত্রিম সমর্থক সেজে মোসাহেবির মাধ্যমে উচ্চ আসনে উপবিষ্ট হই। এসব দেখে নানা কুকীর্তির নায়করা বীভৎস খেলায় মেতে ওঠে। এই যে, মুরারীচাঁদ কলেজের কীর্তিমান নায়কদের অপকীর্তি হয়তো আমরা একদিন ভুলে যাব; এখানে শতাব্দী কালেরও আগে রবীন্দ্রনাথের আগমন এবং উচ্চশির সুরসিক লেখক-শিক্ষক সৈয়দ মুজতবা আলীকে ভুলি কেমনে!

পাকিস্তানি জজবা সুরক্ষিত রাখার ভৌতিক তাগিদে এই মাতৃভাষা প্রেমি মাথা না নোয়নো শিক্ষককে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিলো। তাঁকে সততা এবং ত্যাগের মহিমা স্মরণ করিয়ে দিতে গিয়ে ১৯১৯ সালে এক পত্রে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন; ‘কল্যাণীয়েষু;’ আকাক্সক্ষা উচ্চ করিতে হইবে, একথাটার মোটামুটি পথ এই যে, স্বার্থটি যেন মানুষের চরম লক্ষ্য না হয়, …যদি তাহাতে স্বার্থপরতা, অহংকার, যশোলিপ্সা প্রভৃতি মিশ্র থাকে তবেই ভুল হইয়া যায়।’ তাঁকে দেখেছি, মেশার সুযোগ হয়নি। তাঁর দ্বিতীয় সন্তান ডা. সৈয়দ জগলুল আলীকে রাজশাহী কলেজে একাদশের ছাত্র হিসেবে পেয়েছি। বাবার মতো সেও নৈয়ায়িক।

আমরা সেখান থেকে অনেক এগিয়ে এসেছি, তবে দেশের জন্য গর্ব করার মতো তিনটি স্তম্ভ কি আমাদের অগ্রগতিকে বিঘিœত করছেনা। স্তম্ভগুলো শিক্ষকতা, রাজনীতি এবং ধর্মীয় আচরণ।

শিক্ষককে আমরা প্রথমে রেখেছি এজন্য যে শিক্ষকের কর্মকান্ড শিক্ষার্থী আদর্শ হিসেবে অনুসরণ করে। আর রাজনীতিককে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মানবকল্যাণে নিবেদিত থাকার কথা। আমরা দেখছি, শিক্ষকরা তাদের ট্রাক থেকে সরে যাচ্ছেন। যার কর্ম আমরা প্রত্যক্ষ করছি। লোভ রাজনীতির আদর্শকে পরাস্ত করেছে। এ বিশ্বাস রবীন্দ্রনাথের। এর প্রতিফলন আমরা দেখছি, পত্র পত্রিকার প্রতিবেদনে: সম্প্রতি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের হানাহানি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এইযে দেখছি স্থানীয় নির্বাচন, এতে প্রাণহানি কম ঘটছেনা। রাজনীতির উদ্দেশ্য যদি মানবসেবা হয়, তবে এতসব হানাহানি কিসের আলামত! লোভের নয় কী?
এরকদা ধর্ম সমাজ পরিচালনার অগ্রভাগে ছিলো। ধর্মপ্রবর্তকগণ ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন। অথচ দেখা যাচ্ছে, ব্যক্তিগত তরক্কির জন্য বিভেদ সৃষ্টি করে মানবতার ধর্মকে ক্ষুন্ন করছে কিছু ক্ষমতালিপ্সু মানুষ। যা দুর্গাপূজা উপলক্ষে ঘটে গেল।

এতসবের পুরোধা, অর্থলিপ্সা আর নেতৃত্বের ক্ষুধা। এ ক্ষুধা আদিম। একে সংযত করাই মনুষ্যত্বের পরিচায়ক। শিক্ষক, রাজনীতিক আর ধর্মবেত্তাগণই পারেন সমাজ ও রাষ্ট্রকে কলুষমুক্ত রাখতে। আজকের দিনে আমাদের প্রার্থনা হোক, দেশকে সবার উপরে তুলে ধরতে, লোভ সংবরণ করার প্রত্যয়। তখন আমরা বিশ্বাবাসীকে যথার্থই বলতে পারবো, ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাক তুমি।’
লেখক: সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ