প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে রাস্তা সংস্কারের নামে এসব কী হচ্ছে! বিএনপিপন্থী ঠিকাদারদের কাজ প্রদান

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৭, ১:৪০ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


রাজশাহীতে প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে রাস্তা সংস্কারের নামে চলছে হরিলুট। সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলীর নেতৃত্বে লুটপাটের এ কর্মযজ্ঞ চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আর নির্বাহী প্রকৌশলীর এ কাজে সহযোগিতা করছেন উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী ইউনুস আলী। কাগজ-কলমে ব্যবহার করা হচ্ছে ঠিকাদারদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নাম। কিন্তু বাস্তবে সওজ নিজস্ব লোকবল ও যন্ত্রপাতি নিয়েই সড়ক সংস্কারের এ কাজ করছে। টেন্ডার না দিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর নিজস্ব বরাদ্দ থেকে মাত্র ১৫ দিন আগে থেকে রাস্তা সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে। নামমাত্র কাজ করে বিএনপিপন্থী ঠিকাদারদের নিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হাসান ও তার অধীনস্থরা পকেট ভারি করেছেন। সরেজমিনে উঠে এসেছে এসব চিত্র।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হাসানের নামে বিশেষ বরাদ্দ রয়েছে সাড়ে চার কোটি টাকা। টেন্ডার ছাড়াই ‘কোটেশন’ এর মাধ্যমে নির্বাহী প্রকৌশলী যেকোনো ঠিকাদারকে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকার কাজ দিতে পারেন। আর এ সুযোগটিই কাজে লাগিয়েছেন তিনি। প্রায় ২০ জন ঠিকাদারের মাঝে চার কোটি টাকার কাজ ভাগ করে দিয়েছেন তিনি। একেকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ক্ষেত্র বিশেষে ১৫ থেকে ২০টি করে সংস্কারের কাজ দিয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হাসান।
সওজ রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগামি ১৪ সেপ্টেম্বর রাজশাহী আগমন উপলক্ষে রাস্তা সংস্কারের জন্য বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়। এ নির্দেশনার প্রেক্ষিতে রাজশাহী শাহ মখদুম বিমানবন্দর থেকে আমচত্বর, আমচত্বর থেকে বেলপুকুর, বেলপুকুর থেকে বানেশ্বর মোড় হয়ে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাকাডেমি পর্যস্ত প্রায় ৩৫ কিলোমিটার রাস্তা সংস্কারের কাজ শুরু করে সওজ। এরপর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স কাগজে-কলমে ব্যবহার করে রাস্তা সংস্কারের কাজে নামে সওজ।
যেসব ঠিকাদারদের এসব কাজ দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন, রাজপাড়া থানা বিএনপির সদস্য আবদুস সালামের শিশির ব্রাদার্স, সাবেক বিএনপি নেতা সদ্য আওয়ামী লীগে যোগদানকারী রাজশাহী সিটি করপোরেশনের তিন নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হাবিবুর রহমানের হাবিব ব্রাদার্স, হাবিবুর রহমানের ভাই রাজপাড়া থানা যুবদলের সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক সেন্টুর সেন্টু এন্টারপ্রাইজ, বিএনপি নেতা হারুন অর রশিদের ডন এন্টারপ্রাইজ, রাজপাড়া থানা বিএনপির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক বদিউজ্জামানের বদি এন্টারপ্রাইজ, নগরীর কাজলা এলাকার বাসিন্দা মারুফ হোসেনের তাসিন এন্টারপ্রাইজ এবং শালবাগান এলাকার মন্টু এন্টারপ্রাইজ।
অভিযোগ রয়েছে, সবচেয়ে বেশি কাজ পেয়েছে তাসিন এন্টারপ্রাইজ, শিশির ব্রাদার্স, হাবিব ব্রাদার্স, ডন এন্টারপ্রাইজ ও মন্টু এন্টারপ্রাইজ। এর মধ্যে শিশির ব্রাদার্সের সত্ত্বাধিকারী বিএনপি নেতা আবদুস সালাম বর্তমানে সওজ রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেন। আর তাসিন এন্টারপ্রাইজের মারুফ হোসেনের সাথে পারিবারিক সখ্যতা রয়েছে নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হাসানের। এছাড়া উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী ইউনুস আলীর মন্টু এন্টারপ্রাইজের মন্টুর সঙ্গে সখ্যতা রয়েছে। সওজ’র প্রকৌশলীদের সঙ্গে এসব ঠিকাদারের ‘বিশেষ সম্পর্ক’ গড়ে উঠেছে। আর এতে বড় ভূমিকা রাখেন উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী ইউনূস আলী।
ঠিকাদারদের একটি সূত্র জানায়, সংস্কারের পাঁচ লাখ টাকার কাজ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেয়ার আগেই তাদের কাছ থেকে নেয়া হচ্ছে নগদ দুই লাখ ৭০ হাজার টাকা। এরপর আবার বিল করার সময় নেয়া হবে আরো ৯০ হাজার টাকা। অভিযোগ রয়েছে, এ ৯০ হাজার টাকা সওজ কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে নি¤্নস্তরের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে দেয়া হয়। এছাড়া ভ্যাট ও ট্যাক্সসহ ঠিকাদারকে আরো খরচ করতে হবে ৫০ হাজার টাকা। সবমিলিয়ে পাঁচ লাখ টাকার কাজে একজন ঠিকাদারের থাকবে ৯০ হাজার টাকা।
এদিকে ঠিকাদাররা নিজেরাই জানেন না তাদের কাজ কোন এলাকায় চলছে। এসব সংস্কারের কাজ করছেন সওজ’র নিজস্ব লোকজন। গত রোববার দেখা গেছে এরকম চিত্র। রাজশাহী নগরীর বেলপুকুর এলাকায় চলছিল রাস্তা সংস্কারের কাজ। সেখানে কাজের তত্ত্বাবধান করছিলেন উপ সহকারী প্রকৌশলী এনামুল হক। দেখা গেছে, সেখানে কাজ করছেন সওজ’র দৈনিক মজুরিভিত্তিক অস্থায়ী শ্রমিকরা। ব্যবহার করা হচ্ছে সওজ’র ট্রাক ও রোলার। আর সওজ’র নিজস্ব প্ল্যান্ট ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে নগরীর শালবাগান থেকে ট্রাকে করে আনা হচ্ছে পিচ ও পাথর। ঘটনাস্থলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কোন লোকজন নেই। ঘটনাস্থল থেকে পরে প্ল্যান্টে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে সওজ’র শ্রমিকরা পিচ ও পাথর মেশানোর কাজ করছেন।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন কোথায় এবং সংস্কারের কাজটি কোন প্রতিষ্ঠান করছে এ ব্যাপারে উপ সহকারী প্রকৌশলী এনামুল হককে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি কোন কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর বেশ কয়েক বার তাকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, এ কাজটি কোন প্রতিষ্ঠান করছে তা আমার জানা নেই। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আমাকে কাজটি দেখভালের জন্য পাঠিয়েছেন, তাই আমি এখানে এসেছি। এর বেশি আমি বলতে পারবো না। বেলপুকুরের পরে রাস্তা সংস্কারের আওতাধীন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন নেই।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক সওজ’র একজন ঠিকাদার জানান, ঠিকাদারদের একেকটি লটে পাঁচ লাখ টাকার কাজ দেয়া হয়েছে। প্রভাবশালী ঠিকাদারদের কেউ কেউ ১৫ থেকে ২০টি পর্যন্ত কাজ পেয়েছেন। কিন্তু তারা জানেন না, সংস্কারের কাজ কোথায় চলছে। সওজ’র নিজস্ব লোকজনই এসব বাজ করছেন। ঠিকাদাররা শুধু টাকা যোগান দিচ্ছেন। আর সংস্কারের জন্য পিচ, পাথর ও বালু সওজ’র প্ল্যান্ট থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতিবছর টেন্ডারের মাধ্যমে সওজ এসব সামগ্রী কেনে। অন্য কোন স্থানের কাজ দেখিয়ে এসব পিচ, বালু ও পাথরের ঘাটতি পূরণ করবে সওজ। তিনি আরো জানান, সওজ পাঁচ লাখ টাকার প্রতি লটে সর্বোচ্চ ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকার কাজ করছে। কোন কোন জায়গায় একেবারেই কাজ হচ্ছে না। ফলে প্রতিটি পাঁচ লাখ টাকার কাজের বিপরীতে সওজ’র প্রকৌশলী ও কর্মচারীদের পকেটে যাচ্ছে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা। অভিযোগ করা হচ্ছে, লেনদেনের তত্ত্বাবধান করছেন উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী ইউনুস আলী।
বিএনপিপন্থী ঠিকাদারদের নিয়ে লুটপাট ও রাষ্ট্রীয় অর্থ তছরুপের ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করে সওজ’র কার্যালয় সংলগ্ন লক্ষ্মীপুর কাঁচাবাজার এলাকার বাসিন্দা ও রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের ছয় নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি সোহেল রানা বাবু বলেন, প্রধানমন্ত্রীর রাজশাহী আগমন উপলক্ষে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ব্যস্ত রয়েছেন। আর এ সুযোগে সওজ’র প্রকৌশলীরা বিএনপি নেতাকর্মীদের নিয়ে রাস্তা সংস্কারের নামে জনগণের টাকায় পকেট ভারি করছেন। আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই। এ ধরনের দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করছি এবং সংশ্লিষ্টদের শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।
অভিযোগের ব্যাপারে উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী ইউনূস আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, রাস্তার কাজে কোন অনিয়ম হচ্ছে না। আর ঠিকাদারদের কাছ থেকে অর্থ নেয়ার অভিযোগ সঠিক না। বিধি অনুসরণ করেই কাজ চলছে। এসব কাজ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের করার নিয়ম থাকলেও, তা সওজ নিজস্ব উদ্যোগে করছে কেন- এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হন নি।
এরপর গতকাল সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার সময় মোবাইল ফোনে নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এসময় তিনি বলেন, আপনি (সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক) উপ বিভাগীয় প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন আমি পাশেই ছিলাম। তাই এ ব্যাপারে নতুন করে আমার বলার কিছু নেই। এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে তাকে আবারো ফোন দেয়া হলে তিনি রিসিভ করেন নি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ