প্রধানমন্ত্রীর বিমানে সঙ্কট ‘মানবসৃষ্ট কারণে’

আপডেট: ডিসেম্বর ৪, ২০১৬, ১২:২২ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


হাঙ্গেরিগামী প্রধানমন্ত্রীর বিমানের তুর্কমেনিস্তানে জরুরি অবতরণের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে যান্ত্রিক ত্রুটিকে কারণ দেখানো হলেও প্রাথমিক তদন্তে দেখা যাচ্ছে, রক্ষণাবেক্ষণে সংশ্লিষ্টদের গাফিলতিই এর কারণ হতে পারে।
সরকার প্রধানের বিমানে এই দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তিনটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার একটি করেছে বিমান। ওই তদন্ত কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সমস্যার মূলে ছিল দৃশ্যত ‘মানবসৃষ্ট কারণ বা হিউম্যান এরর’।
“ওই দিন বিমানে বড় কোনো ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা যায়নি। যা হয়েছে সেটি হিউম্যান এররের কারণে ঘটা সমস্যা বলে প্রাথমিক তদন্তে বোঝা গেছে।”
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, সেদিন উড়োজাহাজটিতে জ্বালানি বা ফুয়েলের কোনো সমস্যা ছিল না, ইঞ্জিন অয়েল বা লুব্রিক্যান্টের ট্যাংকের একটি নাট ঢিলা হয়ে গিয়েছিল। সেটা ‘টাইট দেওয়ার পর সমস্যা কেটে যায়’।
কয়েকদিন আগে লুব্রিক্যান্ট ট্যাংকের পাশের অয়েল-অয়েল হিট এক্সচেইঞ্জার বা অয়েল প্রেসার সেন্সরে ‘ছোটখাটো একটি কাজ’ করা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্ত কমিটির এই সদস্য বলেন, “সেখানে যারা কাজ করেছেন তারা ‘ইচ্ছা বা অনিচ্ছায়’ কিংবা ‘প্রয়োজনে বা অপ্রয়োজনে’ ওই নাটটি ধরেছিলেন বা লুজ করেছিলেন। সেটি পরে ঠিক করা হয়েছে কি না, দায়িত্বশীল কোনো ইঞ্জিনিয়ার তা দেখেননি, যদিও সেটি তার দায়িত্ব ছিল।”
প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে গত ২৭ নভেম্বর বুদাপেস্টের পথে রওনা হওয়া বিমানের বোয়িং উড়োজাহাজটি ওড়ার চার ঘণ্টা পর আকস্মিকভাবে তুর্কমেনিস্তানের রাজধানী আশখাবাতে জরুরি অবতরণ করে।
শেখ হাসিনার বিমানের ওই ঘটনা নিয়ে নানা গুঞ্জন চলছে। বেসামরিক বিমান পরিবহনমন্ত্রী রাশেদ খান মেননও কর্তব্যরতদের গাফিলতির কথা বলছেন। তিনি শনিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ওই ঘটনায় গঠিত প্রাথমিক তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই ওই দিন যারা ইন্সপেকশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন, তাদের ছয়জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।”
গাফিলতির কারণে ছয় কর্মকর্তাকে বরখাস্তের খবর তিন দিন আগেই বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয় সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শনিবার তার হাঙ্গেরি সফর নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিকের প্রশ্নে বলেন, “এটা একটা যান্ত্রিক দুর্যোগ ছিল, আর কিছু না।” “তবে অ্যাক্সিডেন্ট যান্ত্রিক ত্রুটিতেও হতে পারে, আবার মনুষ্যসৃষ্ট কারণেও হতে পারে,” মন্তব্য করে নিজের জীবনের উপর নানা হামলার কথা তুলে ধরেন তিনি।
ক্যাপ্টেন ফারহাত জামিল
প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিশেষ ফ্লাইটে সেদিন বাংলাদেশ বিমানের প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন ফ্লাইট অপারেশন্স বিভাগের পরিচালক ক্যাপ্টেন ফারহাত জামিল। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষে উড়োজাহাজে উপস্থিত দায়িত্বপ্রাপ্ত সর্বোচ্চ কর্মকর্তা হিসেবে তিনিই পরিস্থিতি নিয়ে তখন প্রধানমন্ত্রীকে ‘ব্রিফ’ করেছিলেন।
ক্যাপ্টেন জামিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ছোট্ট একটা যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিয়েই কাছের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে আশখাবাতে জরুরি অবতরণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। খুব কম সময়ে ত্রুটি সারিয়ে আবার আমরা যাত্রা শুরু করি।” তদন্ত চলার মধ্যে এ বিষয়ে আর কিছু বলতে রাজি নন অভিজ্ঞ এই পাইলট। পরে হাঙ্গেরি থেকে যে বিমানে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরেন, তা ক্যাপ্টেন জামিলই চালিয়ে আনেন।
পাইলটদের দায়
দুই বছর আগে বিমানবহরে যোগ হওয়া উড়োজাহাজটি চালাচ্ছিলেন ক্যাপ্টেন এ বি এম ইসমাইল, যার কমপক্ষে ৪ হাজার ঘণ্টা বোয়িং ৭৭৭ উড়ানোর অভিজ্ঞতা ইতোমধ্যে হয়েছে। এই ঘটনায় কী করতে পারতেন দুই যুগের কর্মজীবনে ২০ হাজারের বেশি ঘণ্টা উড়োজাহাজ নিয়ে আকাশে থাকা ক্যাপ্টেন ইসমাইল?
বাংলাদেশ এয়ারলাইন পাইলটস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পাইলটকে এয়ারওয়ারদি (যান্ত্রিক ত্রুটিমুক্ত) বিমান হস্তান্তর করা হয়। তারা সেটি চালিয়ে গন্তব্যে নিয়ে যায়। আকাশে কোনো ত্রুটি দেখা দিলে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।”
তবে ওই দিন কী হয়েছিল, তা নিয়ে কিছু বলতে রাজি হননি অভিজ্ঞ এই পাইলট। তার বক্তব্য- এটি তদন্তাধীন বিষয়।
উড়োজাহাজ চালনায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একাধিক ব্যক্তি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বিমানের ইঞ্জিনের গায়ের সঙ্গেই লাগানো থাকে অয়েল প্রেসার লাইন (ড়রষ ঢ়ৎবংংঁৎব ষরহব), প্রধানমন্ত্রীর উড়োজাহাজে অয়েল ট্যাংকের নাটটি ঢিলে হয়েছিল। অয়েল প্রেসার লাইন দিয়ে ইঞ্জিনে যায় ইঞ্জিন অয়েল। এর ‘বি’ নাট ((ই ঘঁঃ) ঢিলা হয়েছিল।
অয়েল প্রেসার লাইনের পাশেই থাকে অয়েল-অয়েল হিট এক্সচেইঞ্জার (ড়রষ-ড়রষ যবধঃ বীপযধহমবৎ)। অয়েল রিজার্ভারে (ঙরষ জবংঁৎাড়রৎ) অয়েল থাকে। সেখান থেকে অয়েল প্রেসার লাইন দিয়ে হিট এক্সচেইঞ্জারের মাধ্যমে তাপমাত্রা কমিয়ে ইঞ্জিনে চলে যায় লুব্রিক্যান্ট।
পাইলটরা বলছেন, যদি কোনো কারণে লুব্রিক্যান্ট পড়ে গিয়ে নির্ধারিত পরিমাণের নিচে নেমে যায়, তাহলে এসওপি-স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রোসিডিউর (ঝঙচ-ঝঃধহফধৎফ ঙঢ়বৎধঃরহম চৎড়ংরফঁৎব) অনুযায়ী ইঞ্জিন বন্ধ করে দিতে হয়।
বোয়িং ৭৭৭ এ দুটি ইঞ্জিন থাকে। একটি ইঞ্জিন বন্ধ থাকলে আরেকটি দিয়ে জাহাজ চালিয়ে নেয়া সম্ভব বলে জানান তারা।
বিমানে জ্বালানি হিসেবে জেট ফুয়েল ব্যবহার করা হয়। ফুয়েল লাইনের সঙ্গে অয়েল প্রেসার লাইন কিংবা অয়েল-অয়েল হিট এক্সচেইঞ্জারের কোনো সম্পর্ক নেই।
তদন্ত কমিটির প্রধানরা চুপ
এই ঘটনা তদন্তে বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়, বেবিচক ও বিমানের তিনটি তদন্ত কমিটির প্রধানদের কেউ মুখ খুলতে চাচ্ছেন না। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) গঠিত তিন সদস্যের কমিটি ইতোমধ্যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
কমিটির প্রধান সাবেক বৈমানিক ক্যাপ্টেন ফরিদুজ্জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হলেও তার আগেই দিয়ে দেয়া হয়েছে। যেহেতু বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে, তাই এটা নিয়ে কিছু বলতে চাই না।”
বিমানের চার সদস্েযর তদন্ত কমিটির প্রধান বিমানের চিফ টেকনিক্যাল অফিসার ফজল মাহমুদ চৌধুরী। তদন্তে কী পাওয়া গেছে- জানতে চাইলে মুখ খুলতে চাননি তিনি।
মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত সচিব স্বপন কুমার সরকারের সঙ্গে কথা বলতে একাধিক বার তাকে কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
এদিকে প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে যে ছয়জনকে বরখাস্ত করা হয়েছে, তারা হলেন বিমানের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের কর্মকর্তা এস এস রোকনুজ্জামান, সামিউল হক, লুৎফর রহমান, মিলন চন্দ্র বিশ্বাস ও জাকির হোসাইন এবং কারিগরি কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমান। মন্ত্রী মেনন বলেছেন, “আর কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।”
এই ঘটনার পর রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর জন্য আলাদা বিমান কেনার পরিকল্পনা করে বিমান মন্ত্রণালয়। তবে শনিবার সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী এই পরিকল্পনাকে ‘বিলাসিতা’ বলে নাকচ করে দেন।- বিডিনিউজ