প্রধানমন্ত্রীর রাজশাহী সফর ও ‘উন্নয়ন ভিশন’ ভাবনা

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৭, ১২:৩২ পূর্বাহ্ণ

ড. সুলতান মাহমুদ রানা


আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী রাজশাহী আসবেন। শহরের অদূরে অবস্থিত রাজশাহী চিনিকল মাঠে এক জনসভায় তিনি বক্তব্য দিবেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর রাজশাহীবাসীর জন্য নিঃসন্দেহে আনন্দের। আসন্ন রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ও আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জন্য অন্যতম প্রাণশক্তি হিসেবেও এই সফরটি তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণত যেকোনো জেলাতেই প্রধানমন্ত্রীর আগমন নিঃসন্দেহে ওই অঞ্চলের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে বিবেচিত হয়। সঙ্গত কারণেই বলা যায়, রাজশাহীবাসীও তেমন আশীর্বাদপ্রাপ্ত হতে যাচ্ছেন। আমরা জানি, বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক বৃহত্তম অর্থনীতির ধারক হতে চলেছে। মানব উন্নয়নের সূচকে বাংলাদেশ সমমানের অনেক দেশকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলেছে। ইতোমধ্যেই নি¤্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যেই মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার প্রত্যয় রয়েছে। আওয়ামী লীগের ‘রূপকল্প-২০২১’ এখন হাতছানি দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক জরিপে সরকারের প্রতি জনগণের আস্থার পরিমাপ অনেক বেড়েছে। আর এসব কিছুই সম্ভব হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব ও গুণাবলিতে। বাংলাদশের প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যেই সারাবিশ্বে নেতৃত্বগুণে শীর্ষ তালিকায় পৌঁছে গেছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বের বর্তমান ১৮ জন নারী জাতীয় নেতার মধ্যে অন্যতম। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মানবাধিকার কর্মী ও শিক্ষাবিদ রিচার্ড ও’ব্রেইন এর লেখা নারী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শীর্ষক গ্রন্থের প্রচ্ছদে অপর ছয় বিশ্ব নেতার সঙ্গে শেখ হাসিনার ছবি মুদ্রিত হয়েছে। ওই গ্রন্থে শেখ হাসিনার গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় একনিষ্ঠতা ও কঠোর পরিশ্রম, জীবননাশের চেষ্টা এবং বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে হাসিনার ঐতিহাসিক অর্জন লিপিবদ্ধে তিন পৃষ্ঠা উৎসর্গ করেছেন লেখক। বাংলাদেশকে অধিকতর স্থিতিশীল ও অধিকতর গণতান্ত্রিক এবং অপেক্ষাকৃত কম হিংসাত্মক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে শেখ হাসিনার আন্তরিক প্রয়াসেরও প্রশংসা করেন তিনি। বিশ্ব জরিপে প্রধানমন্ত্রী যেমন অনেক উচ্চাসীন হয়েছেন তেমনি দেশের সাধারণ জনগণের আস্থার প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ফলেই আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে।
দলের কর্মী ও সমর্থকের সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক বেশি। স্বাভাবিকভাবেই আগামী ১৪ তারিখে রাজশাহীর জনসভায় সর্বসাধারণের ঢল নামবে। কানায় কানায় পূর্ণ হবে বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত মাঠ ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকা। ইতোমধ্যেই জনসভাকে ঘিরে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা। রাজশাহী জেলা ও মহানগরের সকল ইউনিটে প্রস্তুতিসভা চলছে। বিভিন্ন শহরে প্রধানমন্ত্রীর সফর এবং জনসভা সময়োপযোগী কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত হয় বলে দলে গতিশীলতা আসে। সেই সূত্র ধরে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ প্রধান তথা সরকার প্রধানের রাজশাহী আগমন উপলক্ষে দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিশেষ তোড়জোড় পরিলক্ষিত হচ্ছে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকেই রাজশাহী অঞ্চলে আওয়ামীবিরোধী একটি প্রতিকুল অবস্থা বিদ্যমান ছিল। ওইসব প্রতিকুল অবস্থাকে মোকাবেলা করে আওয়মী লীগ এখন অনেকটা এগিয়ে। বিশেষ করে জাতীয় চার নেতার অন্যতম এক নেতার বাড়ি রাজশাহী হওয়ায় এই জেলার দিকে সবারই আলাদা দৃষ্টি রয়েছে।
তৃণমূল থেকে রাজনীতি করে উঠে আসা এএইচএম খায়রুজ্জমান লিটন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহযোগ এএইচএম কামরুজ্জমানের সন্তান। পারিবারিক ঐতিহ্য ও নেতৃত্বের গুণ বিবেচনায় জাতীয় রাজনীতিতে তার পরিচিতি রয়েছে যথেষ্ট। খায়রুজ্জামান যতটা না উত্তরাধিকার সূত্রে, তার চেয়েও বেশি নিজের দক্ষতা, চেষ্টা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে তৃণমূল থেকে এ পর্যায়ে এসেছেন বলে নেতাকর্মীরা মনে করেন।
ইতোমধ্যেই আওয়ামী লীগের বয়স ৬৮ বছর পার হয়েছে। দীর্ঘ সময়ে দলটি নানা অনুকুল ও প্রতিকুল অবস্থার মুখোমুখি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ অনেক অর্জন রয়েছে দলের। বিশেষ করে একটানা সাড়ে আট বছরের বেশি ক্ষমতায় থাকায় দলটির পরিপক্কতা বেড়েছে যথেষ্ট। অন্যদিকে সাধারণ জনগণের প্রত্যাশাও বেড়েছে দলটির কাছে। সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগ প্রধানের বৈশ্বিক খেতাব, অর্জন, সাফল্য ও অসামান্য ভূমিকায় দলের উচ্চতার পাশাপাশি বৃদ্ধি পেয়েছে দেশের ভাবমূর্তি। আওয়ামী লীগের নাম পরিচয় এখন শুধু দেশে নয়, বিদেশেও উজ্জ্বল। এসব কারণেই দলীয় নেতা-কর্মীদের বাইরে আপামর জনসাধারণের একটি বিশেষ দৃষ্টি রয়েছে রাজশাহীবাসীর।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘উন্নয়ন ভিশন’ জনগণ গ্রহণ করেছে। এ ছাড়া তার ব্যক্তিগত সততা ও সাহসিকতার কারণেই তিনি অধিক আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন। আত্মবিশ্বাসী প্রধানমন্ত্রীর যেকোনো সফরেই চমক থাকে। ১৪ তারিখের জনসভায় রাজশাহীবাসীর জন্য কোনো চমক থাকবে কিনা সেটিও এখন আলোচনায়। দলের প্রধানের অসামান্য ভাবমূর্তি, সরকার পরিচালনায় দলীয় দক্ষতার স্বাক্ষর প্রভৃতি মিলিয়ে জনসভায় তাঁর ভাষণ দেয়ার বিষয়টি বিশেষ প্রাণিধানযোগ্য। একজন সফল বিশ্বমানের নেতা হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রধান দেশরত্ন শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প নেই। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রীর উদার নেতৃত্বই তাকে বিশ্বনেতায় পরিণত করেছে। বছরখানেক আগে সংবাদ সম্মেলনে প্রসঙ্গকথায় আওয়ামী লীগের সভাপতি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের প্রধানের পদে না থাকার উদার দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্ত করায় তাঁর প্রয়োজনীয়তা দলের নেতা-কর্মীদের নিকট আরো অধিকভাবে অনুভূত হয়েছে। তত্ত্বগতভাবে নেতা হওয়ার জন্য যেমন রাজনৈতিক যোগ্যতা, দক্ষতা, অবদান, ব্যক্তিগত ইমেজ, কাজকর্মে স্বচ্ছতা, পারিবারিক ঐতিহ্য, সাংগঠনিক নেতৃত্ব, দলের জন্য ত্যাগ-তিতিক্ষা, দলের অভ্যন্তরীণ, জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের সমন্বয়েরই অন্যতম মাপকাঠি। প্রধানমন্ত্রীর সেই যোগ্যতার কোনোটিতেই বিন্দুমাত্র কমতি নেই।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক যাত্রায় আওয়ামী লীগের যে পরিপক্কতা এসেছে, তা অতুলনীয়। সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্য মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে তিনি জাতিসংঘসহ শক্তিশালী দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালানোয় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। চীনের সঙ্গে ওয়ান বেল্ট, ওয়ান ওয়েতে যুক্ত হচ্ছে। রাশিয়ার সহযোগিতায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়াও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ, যুদ্ধজাহাজ ক্রয়সহ সামরিক সরঞ্জামাদি আমদানি, বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে যুক্ত করে সবার সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করে চলেছেন। নিজের গৃহীত দৃষ্টিকাড়া সব উন্নয়ন, জনপ্রত্যাশা পূরণে দল ও সরকারে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার মানসিকতা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির বাস্তবতায় আবারো ক্ষমতায় আসার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর এই আত্মবিশ্বাসের ছোঁয়া পেতে চায় রাজশাহীবাসী। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর উপলক্ষে প্রস্তুত দলীয় নেতাকর্মী ও সর্বস্তরের মানুষ। অপরূপ সাজে সজ্জিত হয়েছে রাজশাহী। জনসভাস্থলে নেয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
প্রধানমন্ত্রীর আকাশসম আত্মবিশ্বাসের ছিটে-ফোঁটা রাজশাহীবাসীর ওপর পড়লে আগামীতে সকল পর্যায়ের নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের বিজয় নিশ্চিত হবে। আর এই নিশ্চয়তাই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
আমরা আশা করবো, রাজশাহী এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় জনমতের প্রতিফলন ঘটবে। রাজশাহী সফরের মধ্য দিয়ে দলে বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ সকল সংকট ও প্রতিকূলতা থেকে মুক্ত হয়ে আগামীতে আওয়ামী লীগের সরকার গঠনের যাত্রা সুন্দর ও শুভ হোক।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

sultanmahmud.rana@gmail.com

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ