প্রবীণত্ব প্রকৃতির ধর্ম’ সহনীয় রাখা মনুষ্যত্বের কর্ম

আপডেট: অক্টোবর ২, ২০২১, ১২:১৩ পূর্বাহ্ণ

গোলাম কবির:


‘বিশ্ব প্রবীণ দিবস’ হিসেবে বছরের একটি দিনকে নির্ধারণ করে প্রবীণদের জন্য অনুকম্পা দেখাবার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। অথচ প্রবীণত্বে উপনীত হবার পর প্রতিটি মুহূর্ত ভুক্তভোগী প্রবীণের যন্ত্রণার যপমালা অনিবার চলতে থাকে।

নিকট অতীতের ফেলে আসা যৌথ পরিবার ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়তে শুরু করেছে শতবর্ষেরও আগে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি কর্মসংস্থান ইত্যাদি কারণে মানুষকে শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয়েছে। তাছাড়া বিচ্ছিন্নতাকামী ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধের প্রাবল্যে মানুষ আত্মজনদের অচেনা জ্ঞান করছে।

সমাজপতিরা একদা তাদের এলাকার মানুষের দেখভাল করতেন। এখন কর্মভার পড়েছে রাষ্ট্রের ওপর। ফলে ‘কেউ আসেনা কারো বাড়ি সবাই যেন পর’। বেতনভোগীরা সমাজের উপরিকাঠামো যতটুকু দেখতে পারে, পারিবারিক যন্ত্রণাদগ্ধ মানুষকে ততটা সামনে আনতে পারেনা। একদা প্রবীণরা যৌথ পরিবারে অনেকটা উদ্বেগহীনভাবে শেষ দিনের জন্য অপেক্ষা করতেন।

এখন প্রতিটি মানুষ যেন বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। কেউ কারো খবর রাখার সময় পায়না। যদিও ফেসবুকের সুবাদে গোটা বিশ্ব শয়নকক্ষের নিভৃতে স্থান করে দিয়েছে। তবে এগুলো অধিকাংশ বিশ্রম্ভালাপের অনুষঙ্গ। ব্যতিক্রম ছাড়া প্রবীণদের দৃশ্যপটে আনা হয়না। অপসৃয়মানদের মনে রেখে কী লাভ! বা কজন মনে রাখে? আজকাল অধিকাংশ সন্তান ভাবে, উপযুক্ত করে সঠিক ট্র্যাকে তুলে দেয়াই অভিভাবকদের দায়িত্ব। তাই তারা পেছন ফিরে চায় না। মানুষের মতো মানুষ করা নিয়ে যারা গর্ব করে, তারা তাদের ত্যাগের কথা স্বীকার না করে গাড়ি-বাড়ির গর্বে অনেকটা বেভুল থাকে। লোক দেখানো সম্পর্ক রাখতেও তারা চায়না। ব্যতিক্রম যে নেই, তা নয় তবে মুষ্টিমেয়।

রবীন্দ্রনাথ প্রবীণদের যন্ত্রণাদগ্ধ জীবন নিয়ে গল্প লিখেছেন। কবিতায় মাত্র একটি পঙক্তিতে বুঝিয়ে দিয়েছেন, প্রবীণত্ব কত বিশাল পাষাণভারের মতো। এ যেন করোনাক্রান্ত অক্সিজেন প্রত্যাশী রোগীর মরণ যন্ত্রণা। জীবন ও জগৎ প্রেমিক কবি প্রবীণত্বের বিভীষিকায় ‘দীর্ঘ আয়ু’কে ‘দীর্ঘ অভিশাপ’ বলে অভিহিত করেছেন।

আমরা বলছিলাম, সমাজ পরিচালনার ভার এখন রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র বাইরের দৃষ্টিগ্রাহ্য বিষয়গুলো সবার কল্যাণে মেরামত করে। ব্যক্তির অন্তর্নিহিত জীবনের সন্ধান রাখা সম্ভব কতটুকু! ভাড়াটে দিয়ে শোক সভা করা যায়, এমনকি কৃত্রিম চোখের জলও ফেলা যায়; কিন্তু প্রকৃত হৃদয়মথিত বেদনা জাগানো কী সহজ।

কোনো প্রাণী কর্মক্ষমতা হারালে অসহায় হয়ে পড়ে স্বাভাবিক নিয়মে। মুক্ত অনাবাসী প্রাণীর বিদায় দৃশ্য আমরা দেখিনা। তবে অনুমান করি। কারণ আমরা যূথবদ্ধ সবাকপ্রাণি। আবেগ বিলাসী সভ্যতা সেই অনুমান করার শক্তিটুকুও কেড়ে নিয়েছে। ব্যক্তির ওপরে ওঠার অভিলাষ হৃদয়ধর্মকে ভোলাতে যুদ্ধরত।

বলা হয়ে থাকে স্নেহের ধর্ম অধোগামী। মানতেই হয়, জনক-জননী তাদের সন্তানের সুখের জন্য জীবন পাতেও কসুর করেন না। নিজেদের সুখ-বিলাস পরিহার করে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে তৎপর থাকেন। সেই পিতা-মাতা প্রবীণ অক্ষম হয়ে আসলে সন্তান ভুলে যায় সে কোন পথ দিয়ে কেমন করে তার লক্ষ্য পর্যন্ত পৌঁছেছে। রবীন্দ্রনাথ পৃথক অভিধায় বলেছিলেন, ‘যে পথ দিয়ে চলে এলি সে পথ এখন ভুলে গেলি রে’ মনে হয় প্রবীণত্বের পরিস্থিতি নিয়ে গানের অংশটুকু প্রযোজ্য।

বিশ্বজোড়া করোনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, কী নিদারুণ মানবেতর অবহেলায় প্রবীণ-প্রবীণাদের পরিত্যক্ত করা হচ্ছে। অনেক পশু-পাখি তাদের মৃত সদস্যের বিদায় বেলায় নিজেদের ভাষায় হাহাকার করে। আর মানব সন্তান! আক্রান্ত জনক-জননীকে ঝোপ-ঝাড়-জঙ্গল অথবা নির্জন রাস্তায় ফেলে যায়। এ যেন অপরিহার্য বর্জনীয় বস্তু।

খেটে খাওয়া মানুষ, যাদের নুন আনতে পান্তা উজাড়, তারা হয়তো যন্ত্রণা গোপন করে উদাসীনতার ভান করে, কিন্তু মধ্যবিত্ত! আগাম সম্পত্তি প্রাপ্তির উন্মাদনায় পিতার মৃত্যু কামনা করে। দুঃখ ভাগ করতে চায়না।

ধর্মে কঠোর নির্দেশ আছে, প্রবীণ, বিশেষ করে পিতা-মাতার প্রতি নমনীয় হবার জন্য। এটা কতজন মান্য করে! তাছাড়া আইন করে ভালোবাসা উৎপাদন করা যায়না। এটা নিতান্ত মানবিক উপলব্ধির ব্যাপার। আবেগ-অনুভূতি পারিপাশির্^কের চাপে ক্ষীণ হয়ে আসলে নীতিবাক্য ও হাস্যকর হয়ে যায়।

প্রাচীন ভারতে পঞ্চাশোর্ধ পুরুষ বাণপ্রস্থে গিয়ে সংসার যন্ত্রণা ভুলে থাকতেন। নারীকুল সম্পর্কে বলা হয়নি। তাঁদের সর্বংসহা মনে করে নাকি অবহেলিত ভেবে! অথচ কষ্টের শিকার তারা কম নয়।

ব্যাধি-রোগ-শোক বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানুষের বয়সের সাথে পাল্লা দিয়ে অভাবও বাড়ছে, মানুষের স্বভাব পরিবর্তন হয়না। আরবিতে যাকে বলা হয়েছে ‘আল খাসলাতু লা ইয়ারুদ্দো ইল্লাল কাজা।’ তাই বলে কি প্রবীণরা মানবেতর জীবের চেয়েও শেষ জীবনের ভয়ঙ্কর দিনগুলোকে নিয়তি নির্দেশিত বিশ্বস করে নিষ্ক্রিয় থাকবে? আইনের প্রতাপ বা ধর্মনীতির ভয়ে সহসা সবাই প্রবীণ হিতৈষী সাজবে না। আমরা মনে করি রাষ্ট্র্রে বিধি ব্যবস্থা এমনটি হওয়া দরকার, যাতে নির্ধারিত সময়ে অক্ষম সহায়তাপ্রার্থী মানুষ মোটামুটি কষ্ট না পেয়ে চিরবিদায় নিতে পারে। তবে দেখতে হবে যাদের হাতে বিধি ব্যবস্থার দায়িত্ব থাকবে, তারা যেন কঠিনভাবে জবাবদিহির আওতায় আসে। আইন থাকলেও কঠোরতার অভাবে গরিব বেচারাদের টাকা নয়-ছয় হয়, তার নজির আছে।

প্রসঙ্গত একটা কথা বলে রাখি, প্রবীণদের সমস্যা নির্ণয়ে তরুণ বা মাঝ-বয়সীদের ভাবা উচিত। কারণ তারা অচিরেই প্রবীণত্বের স্থান দখল করবে। অথচ লেখছে প্রবীণরা, যাদের একপা চলে গেছে কবরে। তরুণরা কম ভাবছে। এটা বোধকরি বয়সের ধর্ম। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, তরুণরা নিজের কিংবা জগতের অন্ত পায় না। তাই প্রবীণত্ব নিয়ে ভাবার অবকাশ তাদের থাকে না। আমরা মনে করি প্রবীণত্ব প্রাকৃতিক নিয়ম। একে সংশ্লিষ্টদের সহনীয় করে তোলার দায়িত্ব মনুষ্যত্বের কর্মের।
লেখক: সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ