প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম: অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২১, ১২:২০ পূর্বাহ্ণ

মুহাম্মদ শহীদুল ইসলাম :


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
বাংলা একাডেমির প্রমিত বাংলা বানানের নিয়মের প্রথম তিন সংস্করণের সঙ্গে সর্বশেষ অর্থাৎ পরিমার্জিত সংস্করণের মিল কম, অমিল বেশি। এই সংস্করণে নিয়মের বিবরণ বহু জায়গায় বদলানো হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিবরণ হয়েছে সংক্ষিপ্ত। কোনো কোনো নিয়মের বক্তব্য পরিবর্তিত হয়েছে। নতুন একাধিক নিয়ম যুক্ত হয়েছে, বাদও গেছে কোনো কোনো নিয়ম। এই অদল-বদল, সংযোজন-সংক্ষেপণ, পরিবর্তন-পরিবর্জনের কারণ সম্পর্কে যদি কেউ অবহিত হতে চান, অথবা নিয়মগুলির বক্তব্য অনুধাবনের জন্য ব্যাখ্যা আশা করেন তাহলে হতাশ হতে হবে তাকে। কারণ এসব ব্যাপারে প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম পুস্তিকায় বিশেষ কিছু বলা হয়নি। পুস্তিকার পরিমার্জিত সংস্করণের ‘মুখবন্ধে’ জানানো হয়েছে যে, বানান কমিটির ‘‘সভাসমূহে ‘বাংলা একাডেমী প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ শীর্ষক পুস্তিকা ছাড়াও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রণীত বাংলা বানানের নিয়ম বিস্তারিত আলোচনার পর ‘বাংলা একাডেমী প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’-এর পরিমার্জিত সংস্করণ চূড়ান্ত করা হয়।’’
এই বক্তব্যে যে-প্রতিষ্ঠানগুলির নাম এসেছে সেগুলির মধ্যে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড আর পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি তাদের বানানবিধির বেশিরভাগ সিদ্ধান্তই প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ উপস্থাপন করে ভালোভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। (দেখুন, পাঠ্য বইয়ের বানান, আনিসুজ্জামান সম্পাদিত, ২০০৫ এবং আকাদেমি বানানবিধি, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি. ২০০৮)। বাংলা একাডেমি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা করেনি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তার ‘বাংলা বানানের নিয়ম’-এর তৃতীয় সংস্করণের মুখবন্ধে আগের সংস্করণের কোন নিয়ম কেনো বর্জন বা গ্রহণ করা হলো সে-বিষয়ে কৈফিয়ত দিয়েছে। বাংলা একাডেমি তা দেয়নি। একাডেমি ঐসব প্রতিষ্ঠানকে অনুসরণ করলে, নিঃসন্দেহে, প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম সমৃদ্ধ হতো, নিয়ম ব্যবহারকারীদেরও সুবিধা হতো।
‘বাংলা একাডেমী প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’-এর প্রথম তিন সংস্করণ পরীক্ষা করে দেখা গেছে, নীতিমালার অনেক নিয়মেই অস্পষ্ট-অসম্পূর্ণ-ত্রুটিযুক্ত বক্তব্যের সমাবেশ ঘটেছে। এছাড়াও, কোনো কোনো ক্ষেত্রে, নিয়মে বর্ণিত নির্দেশ নিয়মের বিবরণেই লঙ্ঘিত হয়েছে। প্রমিত নিয়মের চতুর্থ সংস্করণও অপূর্ণতা-অসঙ্গতিমুক্ত হতে পারেনি। এতে ফাঁক আছে, ফাঁকিও আছে। যথেষ্ট পরিমাণে আছে। যেমন:
প্রমিত বানানরীতির ‘তৎসম শব্দ’ শীর্ষক পরিচ্ছেদের শুরুতে, ১.১ সংখ্যক নিয়মে, বলা হয়েছে, ‘‘এই নিয়মে বর্ণিত ব্যতিক্রম ছাড়া তৎসম বা সংস্কৃত শব্দের নির্দিষ্ট বানান অপরিবর্তিত থাকবে।’’ এরপর ব্যতিক্রমের একটি তালিকা দেওয়া হয়েছে। তবে তালিকাটি যত দীর্ঘ হওয়া উচিত ছিল ততটা হয়নি। যেমন— অধিক প্রচলনের কারণে অনেক তৎসম শব্দে, ব্যাকরণের বিধি লঙ্ঘন করে, আমরা হস-চিহ্ন বর্জন করি। ব্যতিক্রমের তালিকায় বিষয়টি অনুল্লিখিত থেকে গেছে।
একাডেমির বানানরীতিতে ‘অতৎসম শব্দ’ বলতে বোঝানো হয়েছে, ‘‘তদ্ভব, দেশি, বিদেশি, মিশ্র’’ এই চার শ্রেণির শব্দকে। অর্ধ-তৎসম (‘বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ’ অনুসারে ভগ্ন-তৎসম) শব্দের কথা এর মধ্যে নেই।
২.৪ সংখ্যক নিয়মে, ঙ-ং সম্পর্কিত বিধিতে, একাডেমি বলেছে, ‘‘শব্দের শেষে প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রে সাধারণভাবে অনুস্বার (ং) ব্যবহৃত হবে।” এখানে ‘প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্র’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে? এ প্রশ্ন ওঠার কারণ, ২.২ সংখ্যাক নিয়মের উদাহরণে ‘ব্যাঙ’ শব্দে, ঙ নয়, ব্যবহার করা হয়েছে ং।
নীতিমালার ২.৫ সংখ্যক নিয়ম ‘ক্ষ, খ’ শীর্ষক। তবে এতে ক্ষ সম্বন্ধে কিছু বলা হয়নি। বলা হয়েছে কেবল খ -এর ব্যবহার সম্বন্ধেই। নিয়মটির বক্তব্য এরকম, ‘‘অতৎসম শব্দ খিদে, খুদ, খুদে, খুর (গবাদি পশুর পায়ের শেষ প্রান্ত), খেত, খ্যাপা ইত্যাদি লেখা হবে।’’ একথার মানে কী? এরকম কত শব্দে খ হবে?
একাডেমি তার নীতিমালার, ২.৬ সংখ্যক বিধিতে, জ ও য ব্যবহারের নিয়ম নির্দেশ করতে গিয়ে কেবল বিদেশি শব্দের কথাই বলেছে, অন্যবিধ শব্দের বানান-প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছে পুরোপুরি। ২.৮ সংখ্যক বিধিতে শ, ষ ও স -এর ব্যবহারবিধি বর্ণনা করতে গিয়েও একাডেমি একই রকমের কাজ করেছে।
প্রমিত বানানরীতির ‘অতৎসম শব্দ’ শীর্ষক পরিচ্ছেদে তৎসম-অতৎসম প্রত্যয়, উপসর্গ ইত্যাদি সহযোগে গঠিত মিশ্র শব্দের বানানের ক্ষেত্রে ঐ সব শব্দের তৎসম অংশের বানান অপরিবর্তিত থাকবে কি না এবিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
(চলবে)