প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম: অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২১, ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ

মুহাম্মদ শহীদুল ইসলাম :


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
বাংলা একাডেমির প্রমিত বানানরীতির প্রথম তিন সংস্করণে, ৩.০১ সংখ্যক নিয়মে, যুক্তবর্ণগুলিকে ‘‘যতদূর সমম্ভ স্বচ্ছ” করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। ‘বাংলা একাডেমী বাংলা বানান অভিধানে’ (প্রথম সংস্করণ ১৯৯৪, দ্বিতীয় সংস্করণ ২০০১, তৃতীয় সংস্করণ ২০০৮) ঐ পরামর্শ অনুসারে অনেক যুক্তবর্ণের স্বচ্ছরূপ ব্যবহার করা হয়। একাডেমির বানানরীতির সর্বশেষ সংস্করণে নিয়মটি নেই। তাছাড়া, এই সংস্করণে নিয়মের বিবরণ ছাপার কাজে যুক্তবর্ণের প্রথাসিদ্ধ রূপই ব্যবহার করা হয়েছে, বানান অভিধানে নির্দেশিত রূপ নয়। এসব দেখে মনে হয়, প্রমিত নিয়মের পূর্ববর্তী সংস্করণগুলিতে যুক্তবর্ণ ‘‘যতদূর সম্ভব স্বচ্ছ’’ করার যে নীতির কথা আছে তা থেকে একাডেমি সরে এসেছে। কিন্তু, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন’ (এটুআই) প্রকল্পের উদ্যোগে, বাংলা একাডেমি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাফিক্স ডিজাইন বিভাগের সহযোগিতায় নির্মিত ‘শাপলা’ নামের যে-ফন্টটি ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ তারিখে ইন্টারনেটে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে তাতে যুক্তবর্ণের প্রথাসিদ্ধ রূপের পরিবর্তে স্বচ্ছ রূপ লক্ষ করা যায়। আবার, একাডেমির বহুলালোচিত ‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে’(২০১৬)ও অনেক যুক্তবর্ণের স্বচ্ছ রূপ ব্যবহৃত হয়েছে। অবশ্য এই অভিধানে যুক্তবর্ণের স্বচ্ছরূপ ব্যবহারের ক্ষেত্রে শাপলা ফন্ট অনুসরণ করা হয়নি। শাপলা ফন্টের যুক্তবর্ণ আর আধুনিক বাংলা অভিধানে ব্যবহৃত যুক্তবর্ণ আকৃতিতে-অবয়বে সব ক্ষেত্রে একরকম নয়।
১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমি যে-বানানবিধি প্রণয়ন করেছিল তা একাডেমির বইপত্রে অনুসৃত হয়নি। অনুসরণের জন্য বিশেষ কোনো উদ্যোগও তখন নেয়া হয়নি একাডেমির পক্ষ থেকে। প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম যাতে বইপত্রে অনুসৃত হয় সেজন্য একাডেমি চেষ্টা চালিয়ে আসছে ১৯৯২ সাল থেকেই। কিন্তু নিয়ম মানার ব্যাপারে একাডেমির লেখক-সম্পাদকদের আন্তরিকতার অভাব আছে। দৃষ্টান্ত দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। প্রথমে ‘বাংলা একাডেমি বাংলা বানান অভিধান’র কথা বলা যাক। প্রমিত নিয়মের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এমন বহু বানান স্থান পেয়েছে এই অভিধানে। ‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান’র কথাও এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। রাইজিবিডি.কম-এ বিগত ১৫ জুলাই ২০২০ তারিখে প্রকাশিত ‘বাংলা একাডেমি আধুনিক অভিধান: বানান-প্রতর্ক’ শীর্ষক প্রবন্ধে অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর দেখিয়েছেন যে, “বাংলা একাডেমির ২০১২ সালের ‘প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ অনুসারে ‘আধুনিক বাংলা অভিধান’ প্রণীত হয়েছে বলে এর ‘মুখবন্ধ’-এ ঘোষণা করা হলেও এ দুয়ের মধ্যে অনেক ব্যত্যয় লক্ষ করা যায়।”
তিনি দৃষ্টান্তসহ ‘ব্যত্যয়’গুলির একটি তালিকা দিয়েছেন এবং বলেছেন, “যে দৃষ্টান্তগুলো দেওয়া হলো, প্রতিটি ক্ষেত্রে এর চেয়ে অনেক দৃষ্টান্ত অনুল্লিখিত থাকল।” ‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে’র সম্পাদক জামিল চৌধুরী। জনাব চৌধুরী বাংলা একাডেমির বানান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কমিটির একজন সদস্য। এই কমিটির আরেকজন সদস্য গোলাম মুরশিদ। তিনি ‘বাংলা একাডেমি বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান’ (২০১৩)-এর সম্পাদক। অভিধানটির ভূমিকায়, রীতিমতো ঘোষণা দিয়ে, তিনি “বিশ শতকের প্রথমার্ধের” বানান ব্যবহার করেছেন, আধুনিক বাংলা বানানের একাধিক নিয়ম (নিয়মগুলি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়মেও আছে) উদ্ধৃত করে সেগুলির কড়া সমালোচনা করেছেন এবং জানিয়েছেন যে, অভিধানের মধ্যে বানান ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি মধ্যমপন্থা অবলম্বন করেছেন— পুরানো আর নতুন এই দুই বানান-পদ্ধতির কোনোটিই অনুসরণ করেননি। তিনি লিখেছেন:
‘… বানান-বিপ্লবের বন্যায় বাংলা ভাষার পুরনো নিয়ম-রীতির অনেক বেড়া, অনেক সাজসজ্জা সম্প্রতি ভেসে গেছে। ১৯৩৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কার করা বানান পদ্ধতি দিয়ে কাজকর্ম বেশ চলে যাচ্ছিলো। কিন্তু বানান-বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি নিয়ে গবেষণা আরম্ভ করেন। তারই ভিত্তিতে তাঁরা কয়েকখানি বই প্রকাশ করেন বিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে। তাতে তাঁরা খুঁজে খুঁজে বের করেছেন, ১৯৩৬ সালের সুপারিশের ওপর তাঁরা নতুন আর কী কী সুপারিশ করতে পারেন। অসংস্কৃত শব্দের ক্ষেত্রে সমস্ত দীর্ঘ ঈ এবং দীর্ঘ ঊ আর ণ-এ ব্যবহার, তাঁদের মতে, অবান্তর হয়ে গেলো। তার থেকেও বৈপ্লবিক তাঁরা যা করলেন, তা হলো: তাঁরা খুঁজে বের করলেন, কোন কোন সংস্কৃত শব্দে হ্রস্ব এবং দীর্ঘ উভয় স্বর ব্যবহার করা যায়। যেমন, এই ভূমিকায় আমি লিখেছি ‘সারণী’। তাঁদের মতে এটি লেখা উচিত ‘সারণি’। ‘শ্রেণী এবং ‘শ্রেণি’ উভয়ই নাকি শুদ্ধ। অতিসাম্প্রতিক কালের আগে পর্যন্ত শ্রেণীই লেখা হয়েছে। এখন ‘শ্রেণী’র বদলে ‘শ্রেণি’ লিখলে যে বিভ্রান্তি তৈরি হবে তা বিবেচনা না-করেই অনেকে নতুনের কেতন ওড়ানোর আনন্দেই নতুন বানানে ‘শ্রেণি’ লিখতে চান। সুগন্ধী তাঁদের মতে সুগন্ধি। রচনাবলী রচনাবলি। দেশী দেশি। সার্বজনীন সর্বজনীন। আমরা এ অভিধানে অতোটা আধুনিক হতে পারিনি। তাই বলে আমি এই ভূমিকা বিশ শতকের প্রথমার্ধের যে-বানান রীতিতে লিখেছি, তাও এ অভিধানে অনুসরণ করিনি।’
বাংলা একাডেমির প্রমিত নিয়ম অনুসারে প্রণীত ‘বাংলা একাডেমী বাংলা বানান-অভিধান’র প্রথম সংস্করণের (১৯৯৪) ‘প্রসঙ্গ-কথা’য় একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য একটি অভিন্ন বানান পদ্ধতি সম্পর্কে সকলকে সচেতন করে তোলা।’ একাডেমির সেই উদ্দেশ্য সফল হয়েছে কি? এ প্রশ্নের একটা উত্তর পাওয়া যায় বানান-অভিধানের তৃতীয় সংস্করণের ‘প্রসঙ্গ-কথা’য় একাডেমির সে-সময়কার মহাপরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদের বক্তব্যের মধ্যে। তিনি বলেন, ‘এই অভিধানে বাংলা একাডেমী যথাসম্ভব বিকল্প বর্জন করে বাংলাদেশে সম-ধরনের বানান প্রচলন করতে চেয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেটি করা সম্ভব হয় নি।’ কথাগুলি ২০০৮ সালের। তারপর ১২ বছর অতিবাহিত হয়েছে। পরিস্থিতি বদলেছে কি? না, বদলায়নি। একাডেমির বানানপদ্ধতি ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়নি। দেশের বহু সঙ্ঘ-সংস্থা, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, পত্রপত্রিকা, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া আর বানান ব্যবহারকারী সাধারণ মানুষকে প্রমিত বানানে অভ্যস্ত করে তোলা যায়নি। এর কারণ কি? আমাদের বিবেচনায় এর একটা বড় কারণ হলো, একাডেমির নিয়ম একাডেমির বইপত্রেই ঠিকমতো মানা হয় না। আর একটা কারণ, একাডেমি এমন বানানরীতি প্রণয়ন করতে পারেনি যা দিয়ে বাংলা বানানের সকল সমস্যা-সঙ্কুল এলাকায় নিয়মের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এসবের পাশাপাশি ‘বাঙালীর নিয়মনিষ্ঠার অভাব’ তো আছেই। বাংলা একাডেমির প্রমিত বাংলা বানানের নিয়মের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা তাই খুব বেশি আশাবাদী হতে পারছি না।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, খুলনা সরকারি মহিলা কলেজ