প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম: অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২১, ১২:১১ পূর্বাহ্ণ

মুহাম্মদ শহীদুল ইসলাম :


১৯৩৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যে ‘বানান সংস্কার সমিতি’ গঠন করেছিল তার সভাপতি ছিলেন রাজশেখর বসু। তিনি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বাংলা বানানের নিয়ম’ (তৃতীয় সংস্করণ, ১৯৩৭) প্রকাশিত হওয়ার ষোল বছর পর, সেকালের অনেক লেখকের রচনায় ওই নিয়ম লঙ্ঘিত হতে দেখে দুঃখ করে বলেছিলেন: ‘বাঙালীর নিয়মনিষ্ঠার অভাব আছে। রাজনীতিক নেতা বা ধর্মগুরুর আজ্ঞা বাঙালী ভাবের আবেগে সংঘবদ্ধ হয়ে অন্ধভাবে পালন করতে পারে, কিন্তু কোনও যুক্তিসিদ্ধ বিধান সে মেনে নিতে চায় না।’ [বাংলা ভাষার গতি, বিচিন্তা]
কথাগুলি মিথ্যে নয়। কিন্তু তা সত্য হলেও, বাংলা বানানে নিয়মের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়াস থেমে থাকেনি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে পরবর্তীকালে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান একই লক্ষ্য অর্জনে সচেষ্ট হয়েছে, বানানের নিয়ম প্রণয়ন করে তা প্রকাশ ও প্রচার করেছে। ‘প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’, আমাদের ভাষা-সাহিত্যের জাতীয় প্রতিষ্ঠান, বাংলা একাডেমির এমনই একটি প্রচেষ্টার ফসল।
বাংলা একাডেমি এই নিয়ম প্রণয়নে উদ্যোগী হয় ১৯৯২ সালের এপ্রিল মাসে। প্রথমে, এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একাডেমি একটি বিশেষজ্ঞ-কমিটি গঠন করে। এই কমিটি বানান সম্বন্ধে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে একাডেমির কাছে পেশ করে। নভেম্বর, ১৯৯২ সালে একাডেমি তা ‘বাংলা একাডেমী প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ নামে ছাপিয়ে মতামত জরিপের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছে পাঠায়। পরে, প্রাপ্ত মতামত পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে, একাডেমি নীতিমালাটি চূড়ান্ত করে এবং ১৯৯৪ সালের জানুয়ারি মাসে এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করে। ২০০০ সালের নভেম্বর মাসে এর তৃতীয় সংস্করণ প্রণীত হয়। আর, ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত হয় এর পরিমার্জিত অর্থাৎ চতুর্থ সংস্করণ।
উল্লেখ্য যে, ‘বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ বানানে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় বাংলা একাডেমির প্রথম নয় বরং দ্বিতীয় ও সাম্প্রতিক প্রচেষ্টার ফসল। এক্ষেত্রে একাডেমি প্রথম প্রয়াসটি চালিয়েছিল ১৯৬৩ সালে। সে-সময় একাডেমি বাংলা বানান ও লিপির সংস্কার সম্বন্ধে একটি সুপারিশমালা প্রকাশ ও প্রচার করে। কিন্তু এদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানই ওই সুপারিশমালা গ্রহণ করেনি। বাংলা একাডেমির পুস্তক-পত্রিকাদিতেও তা অনুসৃত হয়নি। যে-বিশেষজ্ঞগণ একাডেমির সুপারিশমালা প্রণয়নের কাজে যুক্ত ছিলেন তারাও কেউ কখনো নিজেদের রচনায় প্রস্তাবিত বানান-পদ্ধতি অনুসরণ করেননি। শুধু তা-ই নয়, ওই বিশেষজ্ঞদের অনেকেই ‘পরবর্তীকালে ভিন্নমত প্রচার করেন।’ [মুনীর চৌধুরী, বাঙলা গদ্যরীতি]
এক কথায়, বাংলা একাডেমির সেই সংস্কার-প্রয়াস ব্যর্থ হয়েছিল শোচনীয়ভাবে। সম্ভবত সে-কারণেই দ্বিতীয় ও সাম্প্রতিক প্রয়াসে একাডেমি বানান-সংস্কারের পরিবর্তে বানানের নিয়ম বেঁধে দেওয়ার কাজ করেছে। প্রমিত বাংলা বানানের নিয়মের প্রথম সংস্করণের মুখবন্ধে একাডেমি এবিষয়ে বলেছে: ‘আমরা এই নিয়মে বানান বা লিপির সংস্কারের প্রয়াস না করে বানানকে নিয়মিত, অভিন্ন ও প্রমিত করার ব্যবস্থা করেছি।’
বাংলা একাডেমির প্রাক্তন মহাপরিচালক ড. মনসুর মুসা, তাঁর ‘বানান: বাংলা বর্ণমালা পরিচয় ও প্রতিবর্ণীকরণ’ (২০০৭) গ্রন্থের ভূমিকায়, প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম সম্বন্ধে একটি গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। বলেছেন, ১৯৯২ সালে একাডেমি যে বানান কমিটি গঠন করেছিল তার একজন সদস্য কর্তৃক প্রণীত ‘আদর্শ বাংলা বানান: নিয়ম ও শব্দকোষ’ (১৯৯০) পুস্তিকায় বিধৃত বানানবিধি ‘কিছু এদিক-ওদিক করে এবং একটি নতুন ভূমিকা লিখে… বাংলা একাডেমীর বানান হিসেবে গ্রহণ করে কাউন্সিলের অনুমোদন নিয়ে’ প্রচার করা হয়েছে। এই অভিযোগ একেবারে ভিত্তিহীন নয়। ‘বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়মে’র প্রথম তিন সংস্করণের যে কোনোটির কপি আর ‘আদর্শ বাংলা বানান’ পুস্তিকা পাশাপাশি রাখলে একাডেমির নিয়মের সঙ্গে ঐ পুস্তিকার নিয়ম অংশের বিবরণের বেশ মিল পাওয়া যায়। যেমন, প্রমিত বাংলা বানানের নিয়মের প্রথম তিন সংস্করণের ২.০৯ সংখ্যক বিধিÑ
‘ও
বাংলায় অ-কারের উচ্চারণ বহুক্ষেত্রে ও-কার হয়। এই উচ্চারণকে লিখিত রূপ দেওয়ার জন্য ক্রিয়াপদের বেশ কয়েকটি রূপের এবং কিছু বিশেষণ ও অব্যয় পদের শেষে, কখনো আদিতে, কখনো যথেচ্ছভাবেে া-কার ব্যবহার করেছেন। যেমন ছিলো, করলো, বলতো, কোরছ, হোলো, যেনো, কেনো (কীজন্য), ইত্যাদি ও-কারযুক্ত বানান লেখা হচ্ছে। বিশেষ ক্ষেত্রে ছাড়া অনুরূপে া-কার ব্যবহার করা হবে না। বিশেষ ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে এমন অনুজ্ঞাবাচক ক্রিয়াপদ এবং বিশেষণ ও অব্যয় পদ বা অন্য শব্দ যার শেষে ে া-কার যুক্ত না করলে অর্থ অনুধাবনে ভ্রন্তি বা বিলম্ব ঘটতে পারে। যেমন: ধরো, চড়ো, বলো, বোলো, জেনো, কেনো (ক্রয় করা), করানো, খাওয়ানো, শেখানো, করাতো, মতো, ভালো, আলো, কালো, হলো।’
আর ‘আদর্শ বাংলা বানান: নিয়ম ও শব্দকোষ’-এর ‘ও’ শীর্ষক নিয়ম হলো-
‘ও
বাংলায় অ-কারের উচ্চারণ বহুক্ষেত্রে ও-কার হয়। এই উচ্চারণকে লিখিত রূপ দেয়ার জন্য ক্রিয়াপদের বেশ কয়েকটি রূপের এবং কিছু বিশেষণ ও অব্যয় পদের শেষে, কখনো আদিতে, কখনো যথেচ্ছভাবেে া-কার ব্যবহার করেছেন। যেমন ছিলো, করলো, খাবো, বলতো, কোরছে, হোলে, যেনো, কেনো (কীজন্য), নোতুন ইত্যাদি ও-কারযুক্ত বানান লেখা হচ্ছে। বিশেষ ক্ষেত্রে ছাড়া অনুরূপে া-কারের ব্যবহার পরিহার্য। বিশেষ ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে এমন অনুজ্ঞাবাচক ক্রিয়াপদ এবং বিশেষণ ও অব্যয় পদ বা অন্য শব্দ যার অন্তেে া-কার যুক্ত না করলে অর্থ অনুধাবনে ভ্রন্তি বা বিলম্ব ঘটতে পারে। যেমন: ধরো, করো, চড়ো, বলো, বোলো, জেনো, কেনো (ক্রয় করা), করানো, খাওয়ানো, শেখানো, করাতো, মতো, ভালো, আলো, কালো, ইত্যাদি।’
(চলবে)
রাইজিংবিডির সৌজন্যে