প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ

আপডেট: নভেম্বর ২২, ২০১৬, ১২:০৩ পূর্বাহ্ণ

ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম
বিশ্বায়নের এই যুগে প্রযুক্তি নির্ভর অপরাধ পুরো বিশ্বকে ভাবিয়ে তুলেছে। প্রযুক্তি মানুষের সামাজিক ক্ষেত্রে যেমন সুফল বয়ে এনেছে, তেমনি এনেছে কুফলও। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বর্হিবিশ্বের টেলিভিশনে প্রচারিত হানাহানি, মারামারি, কুরুচিপূর্ণ ছবি, অপসংস্কৃতি ইত্যাদি অনুষ্ঠানগুলো অন্যদেশের মতো আমাদের সমাজকেও প্রভাবিত করছে। এসব দেখে অপরাধীরা প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন অপরাধ সংঘটনে উৎসাহিত ও প্রভাবিত হচ্ছেন। ইন্টারনেটে এমন কিছু অশ্লীল সাইট রয়েছে যেগুলো মানুষের নৈতিক স্খলন ঘটাতে সহায়তা করছে। সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে, এটা সামাজিক অবক্ষয় সৃষ্টির অন্যতম কারণ। প্রযুক্তির সুবিধা এতটাই বেড়েছে যে, এর অপব্যবহার করে অপরাধীরা অন্যান্য অপরাধের পাশাপাশি হ্যাকার আক্রমণের মাধ্যমে কম্পিউটারের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি পাচার, মুছে যাওয়া পাসওয়ার্ড ও ক্রেডিট কার্ডের নম্বর চুরির মাধ্যমে টাকা উত্তোলন এবং গোপনীয়তা প্রকাশের মত অপরাধ করছেন। বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে এটিএম বুথ থেকে টাকা উত্তোলন করে আত্মসাতের ঘটনা দেশে তুমুলভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এ ঘটনায় দেশি অপরাধীর সাথে সাথে বিদেশিরাও জড়িত ছিলেন। তাদেরকে পুলিশ ধরতে সক্ষম হয়েছে।
বাংলাদেশের নানা মাত্রার অপরাধের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে এক নতুন বিষয় সংযোজিত হয়েছে। তা হলো প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এই অপরাধের দ্রুত বিকাশ ও উন্নতি মানুষকে আতঙ্কিত করেছে। প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের কারণে শান্তিপ্রিয় নিরীহ মানুষকে পোহাতে হয় চরম ভোগান্তি। এই ভোগান্তি মানুষকে করে তুলে অনিরাপদ এবং অরক্ষিত। প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের সঙ্গে জড়িতরা তাদের পরিধি বিস্ময়করভাবে বাড়িয়ে চলেছে। অপরাধ দমনে নিয়োজিত বাহিনীর সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তারা প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন। এক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও আন্তরিকতার ক্ষেত্রে কোন ঘাটতি নেই। প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধীরা প্রযুক্তির সর্বশেষ উদ্ভাবন ও কৌশলকে কাজে লাগিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের দুনিয়াকে জটিল থেকে জটিলতর করে তুলছে। বিশ্বায়নের এই যুগে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ দিন দিন নতুন মাত্রা পাচ্ছে।
সন্ত্রাসী হামলা, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হুমকি ও কঠোর মৌলবাদীদের উন্মাদনা এক নতুন অপরাধ প্রবণতার সৃষ্টি করেছে। বিশ্বজুড়ে বিস্তৃতি লাভ করেছে নতুন আঙ্গিকে। তথ্যপ্রযুক্তির কারণে ঘরে বসে দূর দেশের সন্ত্রাসী, মৌলবাদী ও অপরাধীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে ধ্বংসাত্মক কর্মকা-ের পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন করা খুবই সহজ। যে কারণে সন্ত্রাসীরা এখন এই প্রযুক্তিকে কাজে লাগাচ্ছে। ইন্টারনেট, ইউটিউব, ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমকে ব্যবহার করে অপরাধীরা তাদের অপরাধ সা¤্রাজ্যের বিস্তার করে চলেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভূয়া ও গ্রুপ আইডি খুলে অপরাধীরা প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছেন।
প্রযুক্তি ব্যবহার করে সহজেই মিথ্যা প্রচারণা করা যায়। ফেস বুক, ওয়েবসাইট, ব্লকসাইটে কারো ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি, সংবাদ এডিট করে মিথ্যা ছবি বা তথ্য প্রকাশ করে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন বা মানহানি করা যায়। এসব কাজের মাধ্যমে ভয়াবহ দাঙ্গা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। ইন্টারনেট হ্যাকিং করে তথ্য চুরি হয় এবং গোপনীয়তা প্রকাশ পায়। অসত্য তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে সমাজে বিশৃঙ্খলা, পর্নোগ্রাফির মাধ্যমে সামাজিক অবক্ষয়ের সৃষ্টি ও সাইবার আক্রমণ সংঘটিত হয়। প্রযুক্তির মাধ্যমে অপসংস্কৃতির আমদানি হয়ে দেশের নিজস্ব সংস্কৃতির বিলুপ্তি ঘটে। অনেকেই স্প্যামিং (ঝঢ়ধসরহরহম) এর মাধ্যমে কিছু অনাকাক্সিক্ষত ও অপ্রয়োজনীয় মেইল পাঠিয়ে মানুষের বিরক্তি ঘটায়। তাছাড়া সফটওয়্যার পাইরেসির মাধ্যমে অনেকেই বিনা অনুমতিতে কোন সফটওয়্যার কপি করে নিজের নামে বিতরণ করে কিংবা কোন প্রকার পরিবর্তন করে নিজের নামে চালিয়ে দেয়। বর্তমানে প্রযুক্তির অবাধ স্বাধীনতার ফলে প্লেজিয়ারিজম (চষধমরধৎরংস)  একটি বড় ধরনের অনৈতিক কাজে পরিণত হয়েছে। প্লেজিয়ারিজম হলো অন্যের লেখা বা গবেষণালব্ধ তথ্য নিজের নামে চালিয়ে দেয়া। এগুলি সবই প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ যা অপরাধীরা প্রতিনিয়তই করে যাচ্ছেন। প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধীরা যোগাযোগ মাধ্যম সুচারুভাবে ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে পরিকল্পনার আদান প্রদান করে থাকে।
এদেশে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ দিন দিন আশংকাজনক হারে বেড়ে যাচ্ছে। এই বেড়ে যাওয়া নিয়ে মানুষ শংকিত। এই অপরাধ রাজধানীসহ দেশজুড়ে এক অশুভ পরিবেশ তৈরি করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই অপরাধ দমন ও প্রতিরোধে সজাগ। বিশেষভাবে পুলিশ বাহিনী প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ ও এর সঙ্গে জড়িতদের ব্যাপারে জিরো টলারেন্সের নীতি গ্রহণ করেছে। তবে পুলিশের সীমিত জনবল ও সুবিধাদি না থাকা সত্ত্বেও প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধীদের তীক্ষ্ম নজরে রাখছেন। তারপরও প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধীরা সক্রিয় থাকছে। সমাজ বিজ্ঞানীরা দেশের সাম্প্রতিক হত্যাকা-, অস্থির ও অরাজক এই পরিস্থিতির জন্য তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহারকেই দায়ী করেছেন। ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টির পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রের এই অস্থিতিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে একটি গোষ্ঠি বাংলাদেশকে বিশ্বের সামনে হেয় প্রতিপন্ন করতে চায়। অনেক সময় প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের শিকার ব্যক্তিরা অভিযোগ না করায়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে পারেন না। প্রযুক্তির কল্যাণে প্রযুক্তি নির্ভর অপরাধের মাত্রা ও ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ প্রতিরোধ ও দমনে বর্তমানে সিআইডি, র‌্যাব এবং গোয়েন্দা পুলিশের প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ প্রতিরোধ বিষয়ে পৃথক সেল রয়েছে।
প্রযুক্তির কারণে টেলিভিশন ও ইন্টারনেটে নগ্ন প্রচারণায় মানুষের নৈতিক চরিত্রের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও কিশোররা বিপথগামী হয়ে নানা অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের আচার-আচরণ, পোশাক-পরিচ্ছদ, মানসিকতা, চলাফেরা, শ্রদ্ধাবোধ প্রভৃতি বিষয়ে উদ্বেগজনক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধীরা বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে মাঝে মাঝেই রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা কিংবা ব্যক্তিগত পর্যায়ের ওয়েবসাইট হ্যাক করা সহ বিভিন্ন ব্লকে ধর্মকে কটাক্ষ করে মত প্রকাশ করে থাকে।
কিছুদিন আগে আমি দিনাজপুরে আমার গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। একদিন আমার নানী আমাকে ডেকে চুপিসারে বলেন, ‘এ বা হামার বাড়ির কাজের ছোয়ালটা রাইতত না নিন্দাই বিছানাত শুতি শুতি মোবাইল ফোনত কি বা দ্যাখে। মুই মানা করিলেও মোর কাথা শুনে না।  তুই রাইতত কি দেখিস কহিলেও ওয় আও কাড়ে না। বিহানে এক কাপড় পিন্দে তো বিকালত আরেক কাপড় গাওত লাগায়। তুই দেখিস তো বাহে।’ আমি দেখবো বলে নানীকে আশ্বস্ত করি। এর কয়েকদিন পর এক রাতে চুপিসারে তার চিলে কোঠার ঘরে সন্তর্পণে গিয়ে পিছন থেকে দেখি সে তার মোবাইলে অশ্লীল ছবি দেখছে। ‘এই তুই কী দেখছিস’ বলায় সে আমাকে দেখে চমকে উঠে হাত চেপে ধরে বলে, ‘মামা এই কাথা কুনঠেও কহিবেন না। মুই আর এই ছবি দেখিবা নাও।’ আসলে যুগের পরিবর্তন। ওর কথা বলি কেন? আমার মামাত ভাই নতুন বিয়ে করেছে। বউ এর সাথে যতটুকু না সময় দেয় তার চেয়ে বেশি সময় কাটায় ফেসবুকে।
সামাজিক যোগাযোগ নতুন অধ্যায়ের সূচনাকারী ফেসবুক এখন কাঠগড়াতে। ফেসবুক একদিকে মানুষের মত প্রকাশের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি ও সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করার পাশাপাশি অপরাধ তৎপরতা ও উত্তেজনা-সহিংসতা সৃষ্টির সহজ মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে ফেসবুক ব্যবহারের মাধ্যমে রাজনৈতিক সহিংসতা, সংঘাত ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে। ফেসবুক ব্যবহারের মাধ্যমে অপরাধ ও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস সৃষ্টির একটি বড় উদাহরণ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের সাম্প্রদায়িক ঘটনা। এক ব্যক্তির ফেসবুক টাইমলাইনে ফটোশপের মাধ্যমে বিকৃত করে একটি ছবি পোস্ট করে এ ঘটনার সূত্রপাত হয়। উগ্র ধর্মান্ধ একদল ব্যক্তি এ নিয়ে এলাকায় উত্তেজনার সৃষ্টি করে। তারপর সমাবেশ ঘটিয়ে একযোগে হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির এবং বাড়িঘরে হামলা চালায়। কক্সবাজারের রামুতেও একইভাবে ফেসবুকের অপব্যবহার করে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ চালানো হয়েছিল।
পুলিশের সব স্তরে নতুন নিয়োগ পাওয়া নতুন সদস্যদের প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ দমনে পুলিশকে আরও দক্ষ ও সময়োপযোগী করে তোলার বিষয়ে সকল মহল থেকে জোর দাবি জানানো হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে অপরাধীরা প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি, দেশকে অকার্যকর করতে একের পর এক পরিকল্পনা গ্রহণ করে নারকীয় উন্মাদনায় মেতে উঠেছিল। পুলিশ হত্যা থেকে শুরু করে সাধারণ নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে মেরে দেশে তৈরি করেছিল ভীতিকর পরিস্থিতি। পুলিশ বাহিনী এসব প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ শক্ত হাতে প্রতিহত করেছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও পরামর্শে পুলিশ বাহিনী প্রযুক্তিনির্ভর অপাধীদের নিবৃত্ত করেছে। এ ব্যাপারে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা ছিল সাহসিকতাপূর্ণ। দেশের ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাওয়া প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ দমনে বাংলাদেশ সরকারের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছে প্রকাশ করেছে জাপান। সন্ত্রাস, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ এবং ইন্টারন্যাশনাল অপরাধ দমনে প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা ও কারিগরি জ্ঞান বিনিময়ের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে দেশটি। প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ বিষয়ক আইন এদেশে নতুন একটি বিষয়। ফলে এই আইনে বিচার ও তদন্ত করার ক্ষেত্রে যে প্রযুক্তিগত দক্ষতা প্রয়োজন তা অনেকেরই নেই।
প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের শিকার হয়ে মানুষ বিশেষ করে নারীরা বিশেষভাবে লাঞ্ছনার শিকার হয়। ভুক্তভোগীকে সহ্য করতে হয় করুণ পরিণতি। কোন কোন ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের শিকার হওয়া নারীকে লোকলজ্জার ভয়ে আত্মহত্যা করতে হয়। এ রকম আত্মহত্যার ঘটনা বেশ কয়েকটি ঘটেছে দেশে। ইদানিং নারী নির্যাতনের দৃশ্যও মুঠোফোনে ধারণ করে নারীকে আরও অসহায় করে তুলেছে একটি বর্বর চক্র। সম্প্রতি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কলকাতায় প্রযুক্তিনির্ভর সংক্রান্ত অপরাধ দমনে লালবাজারে গড়ে তোলা হয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর থানা। অভিজ্ঞজনরা মনে করছেন ভারতের আদলে এদেশেও এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর থানা চালু করা উচিত। এতে করে এ সংক্রান্ত মামলার দ্রুত সুরাহা সম্ভব হবে। ইন্টারনেট সেফটি সলিউশন চালু করা গেলে প্রযুক্তিনির্ভর খাতে সংঘঠিত অপরাধ অনেকাংশে হ্রাস পাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ দমনের পাশাপাশি এর ওপর কঠোর নজরদারিও প্রয়োজন।
সাইবার অপরাধও প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ। সাইবার অপরাধ শুরু হয় ১৯৪৯ সালে মূলত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রোগ্রামের মাধ্যমে কম্পিউটার প্রসেসরকে হ্যাংগ বা স্লো করার জন্য। পরবর্তীতে ১৯৭০-১৯৭৯ সালের মধ্যে ভাইরাস প্রোগ্রাম তৈরি ও ফ্লপি ডিস্কের মাধ্যমে বিভিন্ন কম্পিউটারে ছড়িয়ে দেয়া হত। ১৯৮০-১৯৯০ সালের মধ্যে পর্ণ সাইটের মাধ্যমে বৃহৎ আকারে ভাইরাস ইন্টারনেট জগতে আসন গড়তে সক্ষম হয়। ১৯৯০ সালের পর থেকে সাইবার অপরাধ ব্যক্তিগত আক্রমণ, চুরি, আর্থিক জালিয়াতি ইত্যাদি বিষয়ে আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে। বিশ্বে সাইবার ঝুঁকিপূর্ণ ১০টি দেশ হলো ১) ভিয়েতমান, ২) বাংলাদেশ, ৩) নেপাল, ৪) মঙ্গোলিয়া, ৫) ভারত, ৬) সুদান, ৭) আফগানিস্তান, ৮) আলজেরিয়া, ৯) লাওস, ১০) কম্বোডিয়া। বাংলাদেশে বিগত দুই দশকে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। আর ব্যবহারকারীর সাথে সাথে অপরাধ ও অপরাধীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সবাই একই ধরনের অপরাধ করে না। উদ্দেশ্য ও সুবিধা ভেদে অপরাধীর অপরাধের ধরন ও প্রকৃতি ভিন্ন হয়ে থাকে। যেমন: ১. ব্যক্তিগত পর্যায়ে: ক) ই-মেইল হুমকি, খ) সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে স্ট্যাটাস, গ) ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ফাঁস।
২. সম্পত্তি সম্পর্কিত: ক) যান্ত্রিক উপায়ে সম্পত্তি জালিয়াতি, খ) ক্রেডিট কার্ডের তথ্য চুরি, গ) ইন্টারনেট ভিত্তিক বিনিময় ব্যাংকিং। ৩. সরকারি পর্যায়ে: ক) শেয়ার বাজার অচল করে দেয়া, খ) কম্পিউটারে ভাইরাস দ্বারা আক্রমণ, গ) জাতীয় ওয়েবসাইট হ্যাকিং, ঘ) ধর্মীয় প্রবঞ্চনা ছড়ানো, ঙ) রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা, চ) জঙ্গিবাদের বিস্তার।
বিগত বছরগুলোতে অপরাধীরা প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে দেশব্যাপী আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ও দেশকে অকার্যকর করতে একের পর এক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলো। পুলিশ হত্যা থেকে শুরু করে সাধারণ নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে মেরে ফেলে দেশে এক ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। ফটোশপের মাধ্যমে ভূয়া ছবি প্রচার করে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করেছিলো। পুলিশ বাহিনী এসব প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ শক্ত হাতে প্রতিহত করেছে। বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে হেয় করতে চেয়ে ব্যর্থ হয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধীরা। পুলিশ বাহিনী প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধীদেরকে নিবৃত্ত করেছে। এ ব্যাপারে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয় ও সাহসিকতাপূর্ণ।
তথ্য ও প্রযুক্তি যোগাযোগ আইন অনুসারে কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম ইত্যাদির অনিষ্ট সাধন, কম্পিউটার সোর্স বোর্ড পরিবর্তন, কম্পিউটার সিস্টেমের হ্যাকিং, ইলেকট্রনিক ফর্মে মিথ্যা, অশ্লীল অথবা মানহানিকর তথ্য ও ভূয়া ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর সার্টিফিকেট প্রকাশ, কম্পিউটার ব্যবহারের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটন ইত্যাদি প্রযুক্তি নির্ভর অপরাধের শাস্তির বিধান রয়েছে।
দেশে অব্যাহতভাবে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় জনমনে আতঙ্ক ও ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। প্রযুক্তি নির্ভর অপরাধ দমন করার জন্য পুলিশকে আরো বেশি ক্ষমতা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন এই নীতি অনুযায়ী তদন্ত কাজের জন্য পুলিশ প্রয়োজন মনে করলে কম্পিউটার হ্যাক, স্পাইওয়্যার ইনস্টল করতে, ই-মেইল পাঠ এবং যে কোন ফাইল নষ্ট করতে পারবে। তবে পুলিশ এই ক্ষমতা শুধু আদালতের অনুমোদন সাপেক্ষে ব্যবহার করতে পারবে। কোন কোন ক্ষেত্রে প্রযুক্তি নির্ভর অপরাধের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবাদ ভয়াবহ আকারে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে এবং প্রমাণ প্যারিসে সহিংস আক্রমণ। তথ্য প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে উন্নতবিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে। উন্নত বিশ্বের সেই ধারাকে অনুসরণ করে সরকারও এগিয়ে যেতে চায়। প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের জগৎ একটি বৃহৎ জগত, যেটি মোকাবিলায় পুরোপুরি করায়ত্ব করতে আমাদের কিছুটা সময় লেগে যাবে। তবে এই জগতটাকে অবজ্ঞা করার কোন সুযোগ নেই।
লেখক: পুলিশ কর্মকর্তা (অব.)(আই.জি ব্যাজ, জাতিসংঘ ও রাষ্ট্রপতি পদক প্রাপ্ত)