প্রযুক্তির ব্যবহার

আপডেট: এপ্রিল ৬, ২০১৭, ১২:২০ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রারানী চন্দ


সভ্যতার অগ্রযাত্রার সাথে অনেক বিষয়ের মতো প্রযুক্তির সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। প্রযুক্তির ব্যবহার কাজের প্রকৃতিতে এনেছে পরিবর্তন, বাড়িয়েছে কাজের মান। এখন লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, প্রতিদিনের কাজের সাথে প্রতিটি মানুষ কোন না কোন সময় প্রযুক্তির ব্যবহার করছেন। প্রাচীনকালে প্রযুক্তির আবিষ্কার এবং ব্যবহার দু’টোই ছিল সীমিত। কিন্তু প্রযুক্তির নতুন নতুন উদ্ভাবন ও ব্যবহার সময় ও কালের সীমা পেরিয়ে পুরো বিশ্বকে নিয়ে এসেছে হাতের মুঠোয়। নিঃসন্দেহে এটা বিস্ময়কর। প্রযুক্তির আশীর্বাদে মানুষ ঘরে বসেই করতে পারছে নানা কাজ-যেগুলো একসময় করা তো দূরের কথা, ভাবাই যেতো না। সাধারণ নৈমিত্তিক গৃহকর্ম থেকে শুরু করে শিল্প, শিক্ষা, বাণিজ্য, সংস্কৃতি, ব্যবসা বাণিজ্য, আর্থিক-লেনদেন, সামাজিক যোগাযোগ সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য।
যোগাযোগের মাধ্যম চিঠিপত্র এক সময় ছিল প্রায় একমাত্র উপায়। মনের ভাব প্রকাশ, সংবাদ আদান-প্রদান, সামাজিক, আর্থিক বা মানবিক সম্পর্ক উন্নয়ন সম্ভব ছিল চিঠি ছাড়াও প্রত্যেকের শারীরিক উপস্থিতির মাধ্যম। বিনোদনের মাধ্যম ছিল প্রধানতঃ বই পড়া। রেডিও, টিভি চ্যানেল ছিল হাতে গোনা- তাও সবার সুযোগ হতো না সেগুলো উপভোগ করবার। এ যুগে ভাবাই যায় না-বিনোদনের কত অসংখ্য মাধ্যম ও চ্যানেল। বই পড়তেও বই প্রয়োজন হয় না-প্রযুক্তির সুবাদে। দেশ-বিদেশে এখন পড়তে যাবার জন্য সেখানে গিয়ে ভর্তি পরীক্ষাও দিতে হয় না অনেক ক্ষেত্রেই। অন-লাইনে ইন্টারভিউর মাধ্যমে হয়ে যাচ্ছে ভর্তির কাজটি সহজেই। প্রযুক্তির উদ্ভাবন-মানুষের কাজের গতি বাড়িয়েছে, সময় বাঁচাচ্ছে এবং একই সাথে কাজের মান বাড়িয়েছে।
মানুষ তার সৃষ্টিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে প্রকাশ করার সুযোগ পাচ্ছে এবং সেগুলোকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে অতি অল্প সময়ের ভেতরে অসংখ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। শুধুমাত্র তাই নয়, বিজ্ঞ মতামত ও পরামর্শের মাধ্যমে সেগুলো সংশোধনের সুযোগও থাকে। প্রচার, প্রসার ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির অনন্য অবদান অবর্ণনীয় ও বর্ণনা করাও মার কাছে মাসীর গল্প বলার মতোই। কারণ বর্তমান যুগে প্রযুক্তি নাগালের ভেতরে থাকায় সবাই কম-বেশি পরিচিত ও অভিজ্ঞ এ বিষয়ে।
প্রযুক্তির সুবিধা যেমন মানুষকে দিয়েছে অনেক স্বস্তি ও স্বাচ্ছন্দ্য, তেমনি বাড়িয়েছে অস্বস্তি ও বিড়ম্বনা। কারণ প্রতারণা ও অপব্যবহার এক শ্রেণির মানুষের নেশা ও পেশা। ফলে তারা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে নানাভাবে। ধরুন, মোবাইল ব্যাংকিং-এর কথা। কখনও ভুয়া পরিচয় দিয়ে অথবা অন্য উপায়ে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা গ্রহণকারীর পিন কোডটি জেনে নিয়ে তার সব অর্থ আত্মসাৎ করে নেয়। কখনও বা কাউকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করে অর্থ আদায় করে নেয়।
অনেকে ফেসবুকে মন্তব্য করছে যে কোন ব্যক্তি সম্পর্কে সে শিক্ষক, সম্মানিত, বয়োজ্যেষ্ঠ কেউ কিংবা অসম বয়সী কারও সম্পর্কে। ছবি তুলে ছবির বিকৃতি ঘটিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করা হচ্ছে এবং নানা অশালীন মন্তব্য করা হচ্ছে। মানসিক বিকৃতি বাড়ছে ক্রমশঃ এসব অনৈতিক কাজের মাধ্যমে।
শুধু তাই নয় অনেকে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে নষ্ট করছে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় ও সুযোগ। ছাত্ররা লেখাপড়া বাদ দিয়ে যখন ফেসবুকে আসক্ত হয়ে পড়ে তখন তাদের অনেক ক্ষতি হয়। তবে যারা নিয়ন্ত্রিতভাবে ফেসবুক ব্যবহার করে তারা এ ক্ষতির হাত থেকে বড্ড বেঁচে যায়। কিশোর বা যুবকদের ক্ষেত্রে এটা একটা অশনিসংকেত।
অনেকের পারিবারিক জীবনে অশান্তি এমনকি বিবাহবিচ্ছেদের কারণও হয়ে পড়ে এ ফেসবুক। একদিকে তারা সময়ের অপচয় করে এবং অন্যদিকে ফেসবুক ব্যবহারকারী অনেকেই আসক্ত হয়ে পড়ে অন্য নারী বা পুরুষের প্রতি। ফলে বিচ্ছেদ অনিবার্য হয়ে পড়ে। ফেসবুকে অতিরিক্ত সময় দেবার ফলে পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনীয় সময় ও সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখতে বাধ্য হয়। অনেকক্ষেত্রে অবিবাহিতরাও নিজেদের ভবিষ্যত সম্ভাবনাটি বিনষ্ট করে। অবাধ ব্যবহারের সুযোগ থাকায় বন্ধুত্ব হয় অনেকের ভেতরে অসম, বয়স, শিক্ষা এমনকি অসম সামাজিক মর্যাদাসম্পন্ন ছেলে-মেয়েদের ভেতরে। অল্প বয়সে আবেগতাড়িত হয়ে অনেকে অজানা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে অকালে পা বাড়ায়-ফলে অনেকক্ষেত্রে অঘটন ঘটে যায়। এমনকি নিজেদের প্রাণও বিসর্জন দিতে হয়।
প্রকৃতপক্ষে, সব প্রযুক্তিক বা উদ্ভাবনের ভালো দিক থাকে। কিন্তু তাকে বিতর্কিত করে কিছু অসতর্ক, অসৎ ও খামখেয়ালি মানুষ। তাদের অপব্যবহার অন্যদের বিপথগামী করে কিংবা শঙ্কিত করে।
বিষয়টি আমাদের তরুণ-কিশোর সন্তানদের জন্য ভয়ঙ্কর। তাদের ভেতরে যদি নিয়মানুবর্তিতা, সততা, পরিশীলিত আচরণ, সুস্থ চিন্তা-চেতনা, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, সম্পর্কে সম্মান ও মর্যাদা-সুশিক্ষা সর্বোপরি সুশিক্ষা দিতে না পারি তাহলে আমাদের অনেক অর্জনের মাঝেও যুব ও কিশোর সমাজকে সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হবো এবং এ ব্যর্থতা দেশের বা অনেক ব্যক্তি মানুষের অর্জনকে ম্লান করে দেবে-এটা অবধারিত। কিন্তু আমরা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ২০২১ সালের প্রযুক্তিক বাংলাদেশের স্বপ্নকে বাস্তবায়নের সঙ্গে সহমত পোষণ করি। এ সম্পর্কে এগিয়ে নিতে এবং বাস্তবে রূপ দিতে সর্বস্তরের মানুষের প্রযুক্তির সাথে পরিচয় ঘটানো যেমন অপরিহার্য তেমনি এ ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও অপব্যবহারকারীর আইনগত শাস্তির ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে আইসিটি আইন থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির অপব্যবহার ঠেকানো যাচ্ছে না।
প্রযুক্তির ব্যবহারে একটা সুস্থ সংস্কৃতি তৈরি ও  প্রচলন করার ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা অপরিহার্য। পরিবার থেকে শেখাতে হবে-নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে পরিশীলিতভাবে প্রযুক্তির ব্যবহার করতে। পরবর্তী দায়িত্ব বর্তায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের উপর। শিক্ষার্থী যথাসময়ে শিক্ষায়তনে আসছে কিনা, লেখা-পড়া নিয়মিত করছে কিনা, লেখা-পড়ায় মনোযোগী কিনা, তার আচরণে কোন অসঙ্গতি আছে কিনা ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষকদের মনোযোগ ও দায়িত্ব গ্রহণ করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সমাজের ভূমিকাও অগ্রগণ্য। দৈনিক ‘প্রথম আলোয় ৩ এপ্রিলে প্রকাশিত ফেসবুক ব্যবহারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগ এবং ফেসবুকের ব্যবহারে নিয়মকানুন কিংবা নিষেধাজ্ঞা জারি করা একটা অত্যন্ত সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। আন্তরিক ধন্যবাদ ও সাধুবাদ জানাই তাঁকে। কোন কোন পত্রিকায় এ সংবাদের সত্যতা, নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে যদি এটি সত্যি হয় তাহলে সেটি হবে শান্তির বার্তা। বিশেষ করে ছাত্রদের জন্য। তাদের অনিয়ন্ত্রিত ফেসবুক ব্যবহারের ফলে তারা অসুস্থ হয়ে পড়ছে শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে অনেকেই। ফলে লেখাপড়াও বিঘিœত হচ্ছে অসুস্থতার কারণে। তৈরি হচ্ছে অসুস্থ সামাজিক পরিবেশ ও সম্পর্ক। প্রকারান্তরে যেটা পরিবার, সমাজ, জাতি, দেশ কিংবা আন্তর্জাতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে।
সুতরাং, সুস্থ মননশীলতা, সৃষ্টিশীলতা, সংস্কৃতি, রীতি-নীতিও মূল্যবোধ তৈরি, সততা, নৈতিকতা, কর্তব্য ও দায়িত্বশীলতার চর্চা সর্বোপরি মানব কল্যাণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার সুনিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ একটা দেশকে এগিয়ে নিতে যুব সমাজের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কেউ একা হয়তো অনেক কিছু করতে পারে না কিন্তু সকলের সচেতনতা ও আন্তরিক প্রচেষ্টা অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। আমরা আমাদের সন্তানদের সুশিক্ষা দিতে প্রযুক্তির সুফল গ্রহণ করি এবং তাদের উৎসাহিত করি সৃজনশীল, কল্যাণকর কাজে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে প্রযুক্তির ব্যবহার করতে। সুস্থ চিন্তা-চেতনা, মেধা-মনন ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে উঠুক আমাদের আগামী প্রজন্ম।