প্রসঙ্গ: বই মেলা এবং প্রকাশিত গ্রন্থ ‘এই তো জীবন’

আপডেট: এপ্রিল ২৯, ২০১৭, ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ

ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম


এ বছরের জানুয়ারি মাসের ১ তারিখ। ইংরেজি নতুন বছরের প্রথম দিন। এ উপলক্ষে অনেকেই শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। সকাল ১০টার সময় বাসায় বসে তৃতীয় বই প্রকাশের জন্য লেখা প্রস্তুত করছি। প্রথম বইটির নাম “এই তো জীবন”, বইটি ঢাকার প্রকাশনী সংস্থা ‘অনিন্দ প্রকাশ’ এ ছাপানোর কাজ চলছে। দ্বিতীয়টি ছাপানোর অপেক্ষায়। হঠাৎ মোবাইলে রিং এলো। রিসিভ করে সালাম জানাতেই অপর প্রান্ত থেকে প্রকাশক আফজাল সাহেব নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, আমার জন্য একটি খুশির সংবাদ আছে। আর তা হলো, আমার “এই তো জীবন” বইটি ছাপানো শেষ। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত “২১ শে বই মেলায়” বইটির মোড়ক উন্মোচন করা হবে। আর এ কারণে ওই সময় আমাকে বইমেলায় উপস্থিত থাকতে হবে। বিশেষ করে বই কেনার সময় ক্রেতারা অটোগ্রাফ নেয়ার জন্য লেখকের সন্ধান করেন। তাছাড়া অনেক ক্রেতা বইটি কোন প্রেক্ষাপটে লেখা হয়েছে তা সরাসরি লেখকের কাছ থেকে জানতে চান। বইটি প্রকাশের জন্য প্রকাশক আফজাল সাহেবকে ধন্যবাদ জানিয়ে একুশে বই মেলার উপস্থিত থাকার কথা জানালাম। শেষে তিনি আরেকটি সুসংবাদ দিলেন, আমার দ্বিতীয় বইটির ছাপানোর কাজ দু’এক দিনেই শুরু হবে।
নতুন বছরের প্রথম দিনে বই প্রকাশের এবং দ্বিতীয় বই ছাপানোর কাজ চলছে জেনে খুবই ভালো লাগলো। আবার টেনশান ও উত্তেজনা যে হচ্ছে না তা কিন্তু নয়। আমি জাতীয় পত্রিকা দৈনিক সমকাল, দৈনিক ইত্তেফাক এবং রাজশাহীর স্থানীয় পত্রিকা দৈনিক সোনার দেশ, সানশাইন, সোনালী সংবাদ, ঢাকার এক ডজন সাপ্তাহিক, মাসিক ও পাক্ষিক পত্রিকা, রাজশাহীর চারটি অন-লাইন পত্রিকা ইত্যাদিতে নিয়মিতভাবে কলাম, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, অপরাধ বিষয়ক ফিচার, কবিতা ইত্যাদি লিখে থাকি। লেখার অভ্যাস ছোটবেলা থেকেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় দৈনিক আজাদে লিখতাম এবং আমরা পাঁচভাই মিলে “ফুলকুড়ি” নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করতাম। কিন্তু এবারই প্রথম আমার বই প্রকাশ হচ্ছে। চাকরি জীবনে বাধ্যবাধকতা থাকায় তা হয়ে উঠেনি। বর্তমানে এই বাধ্যবাধকতা না থাকায় এবং হাতে অফুরন্ত সময় পাওয়ায় এখন প্রতিনিয়তই লিখে যাচ্ছি।
৩১ জানুয়ারি রওয়ানা হয়ে ১ ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকায় পৌঁছালাম। বই মেলায় গেলাম বিকাল ৩টার সময়। গেট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতেই কানে এলো লেখকদের নাম উল্লেখপূর্বক তার রচিত বইয়ের নাম প্রচার করা হচ্ছে। প্রায় ৩০ মিনিট পর মাইকে প্রচার করা হলো-“এই তো জীবন” লেখক ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার। শুনে আমার খুব ভালো লাগলো। অনিন্দ প্রকাশকের স্টলে (৪৫৬-৪৫৯) যেতেই চোখে পড়লো অন্যান্য লেখকদের বইয়ের সাথে আমার লেখা “এই তো জীবন” বইটি ডিসপ্লেতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। আনন্দ আর উত্তেজনায় শিহরিত হয়ে উঠছিলাম। স্টলে গিয়ে পরিচয় দিতেই প্রকাশক আফজাল সালাম জানিয়ে করমদন করে ভিতরে নিয়ে সোফায় বসালেন। সেখানে আগে থেকে আরও ৭ জন লেখক বসে ছিলেন। তাদের অনেকেই আমার মতো নতুন। পুরানো লেখকরাও রয়েছে। প্রকাশক সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। পুরান লেখকরা আমাদেরকে উৎসাহ জোগালেন যা খুব ভাল লেগেছে। সবাই একত্রে নিজ নিজ বই হাতে নিয়ে দাঁড়ালাম। প্রকাশক সবাইকে ঘোষণার মাধ্যমে মোড়ক উন্মোচনের কথা প্রচার করেন। এ সময় স্টলের সামনে ক্রেতা ও দর্শনার্থীর সমাগম হয়। তারা সবাই করতালির মাধ্যমে আমাদেরকে অভিনন্দন জানান। প্রকাশক মোড়ক উন্মোচনের মুহুর্তটিকে ক্যামেরাবন্দি করেন। অতপর প্রকাশক আমাদেরকে চা দ্বারা আপ্যায়ন করেন। এর মধ্যে বই বিক্রি শুরু হয়ে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩ জন ছাত্রী আমার লেখা ৩টি বই কিনে লেখকের খোঁজ করলে প্রকাশক আমাকে দেখিয়ে দেন। তারা আমার বইটি লেখার প্রেক্ষাপট জেনে বইয়ের ওপর আমার অটোগ্রাফ নিয়ে আমার সাথে ছবি তোলেন। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জেনে তারা খুশি হন এবং আমার সাথে ছবি তোলেন।
আমি পুলিশের ৩০ বছর এবং র‌্যাবে ৫ বছর চাকরি করাকালীন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি। সমাজে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা অনেকেরই জানা সম্ভব নয়। বরং লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যায়। ওই সমস্ত না জানা সত্য ঘটনা গল্পাকারে লিখেছি। পাঠকেরা এ কথা জানতে পেরে আমার বই কেনার জন্য উৎসাহিত হয়েছেন। একজন নবীন লেখক হিসেবে আমার বইটি মেলায় সাড়া ফেলে দেয় যা আমার ভাল লেগেছে। আর লেখক হিসেবে এটাই আমার সার্থকতা।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় প্রতি বছরের মতো এবারও শুরু হওয়ায় অমর একুশে বই মেলা ১৯৭৪ সালে প্রথমবারের মতো বাংলা একাডেমি সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন হয়েছিলো। সাহিত্য সম্মেলনের উদ্বোধন করেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দীর্ঘ চার দশকের পর এবার পুনরায় আয়োজন করা হয়েছে সাহিত্য সম্মেলন। ফলে বই মেলা পরিণত হয়েছিল নবীন প্রবীণসহ লেখকদের মিলন মেলায়। লেখকদের অটোগ্রাফ নিতে এবং তাদের সঙ্গে আড্ডা দিতে ভিড় জমিয়েছিলেন পাঠক-পাঠিকারা।
ফেব্রুয়ারি ১ তারিখ থেকে ঢাকার বইমেলায় আয়োজন করা হয় যা আমর একুশে গ্রন্থমেলা নামেই পরিচিত। এবারও ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয় অমর একুশে বই মেলার। ১৯৮৪ সালে সাড়ম্বরে বর্তমানের অমর একুশে বই মেলার সূচনা হয়। বাংলা একাডেমি চত্বরে স্থান-সংকুলান না হওয়ায় ২০১৪ খ্রীস্টাব্দে বই মেলা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয়। ১৯৮০ সালে মেলার স্টল ছিল মাত্র ৩০টি। এবার স্টলের সংখ্যা ৬০০ শতাধিক। প্রতি বছরই মেলার দর্শক, পাঠক এবং ক্রেতার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এবারও একুশে বই মেলা বসেছিল বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গন এবং একাডেমির বিপরীত দিকে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রায় চার লাখ বর্গফুট জায়গায়। এ বার অমর একুশে বই মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশকে ১২টি অংশে সজ্জিত করা হয়। একাডেমি প্রাঙ্গনে ৮০ টি প্রতিষ্ঠানকে ১১৪টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৩২৯টি প্রতিষ্ঠানকে ৫৪৯ ইউনিট অর্থাৎ মোট ৪০৯টি প্রতিষ্ঠানকে ৬৬৩ টি ইউনিট এবং বাংলা একাডেমিসহ ১৫টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে মোট ৬ হাজার বর্গফুট আয়তনের ১৫টি প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ দেয়া হয়। ১০০টি লিটল ম্যাগাজিনকে বর্ধমান হাউসের দক্ষিণ পাশে ‘লিটল ম্যাগজিনের কলারে’ স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়। ফুড প্রকাশনা সংস্থা এবং ব্যক্তি উদ্যোগে, যারা বই প্রকাশ করেছেন তাদের বই বিক্রি ও প্রদর্শনের ব্যবস্থাও করা হয় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের স্টলে। বই মেলায় বাংলা একাডেমি প্রকাশিত বই ৩০ শতাংশ কমিশনে এবং মেলায় অংশগ্রহণকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ২৫ শতাংশ কমিশনে বই বিক্রি করেছে। একাডেমি প্রাঙ্গন এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছিল বাংলা একাডেমির ২টি প্যাভিলিয়ন, একাডেমির শিশু-কিশোর প্রকাশনা ভিত্তিক এবং সাহিত্য মাসিক উত্তরাধিকারের বিক্রয় কেন্দ্র। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়। ২০১৭ সালের এই বইমেলা উপলক্ষে বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছে ১০১ টি নতুন বই। গত বছর ৩৫২ টি প্রতিষ্ঠান অংশ গ্রহণ করেছিলো। এবার প্রায় ৪৫০ টি প্রকাশক প্রতিষ্ঠান অংশ গ্রহণ করে। প্রতিদিন মেলা শুরু হয়েছে বিকাল ৩টার সময়। শেষ হয়েছে রাত ৮টায়। তবে প্রতি শুক্র ও শনিবার বন্ধের দিনে মেলা ১১টা থেকে রাত সাড়ে ৮ টা পর্যন্ত চলে। শুক্র ও শনিবার বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত ১টা পর্যন্ত শিশুপ্রহর ঘোষণা দেয়া হয়।
মেলায় আসা ক্রেতা-পাঠকরা যেন কোন অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতিতে না পড়েন সে জন্য এবারের বই মেলায় নেয়া হয়েছিলো তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুরো মেলার বিভিন্ন স্থানে লাগানো হয়েছিলো ৩৫০টি সিসি ক্যামেরা। তিনটি ক্যাম্প থেকে এসব ক্যামেরা দ্বারা পুরোমেলার আনাচে কানাচে নজরদারি করা হয়েছে। মেলায় পুলিশের পক্ষ থেকে ৫টি এবং র‌্যাবের পক্ষ থেকে ৪টি ওয়াচ টাওয়ার বসানো হয়েছিলো। এছাড়া আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ১০০ সদস্য এবং সাদা পোশাকে বিপুল সংখ্যক সদস্য মেলা চলাকালীন টহলে থেকেছেন। একই সঙ্গে ২টি ইউনিটে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের ২৮ জন্য সদস্য দায়িত্ব পালন করেছেন। ছিল পানিবাহী গাড়ি, ২টি কৃত্রিম ওয়াটার রিজার্ভারসহ পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে শুক্র করে রাতে স্টল বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত টিএসি টু দোয়েল চত্বর সড়ক ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে রেখেছিলেন পুলিশ সদস্যরা। সরকারি গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স ও বাংলা একাডেমির গাড়ি ছাড়া অন্য কোন গাড়ি এমনকি গণমাধ্যম কর্মীদের গাড়িও ঢুকতে দেয়া হয়নি। দর্শনার্থীদের প্রবেশের জন্য নারী এবং পুরুষ আলাদা গেট করা হয়েছিলো। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশের জন্য ৬টি এবং বের হবার জন্য ৩টি গেট বসানো হয়েছিলো। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গনে প্রবেশের জন্য ২টি এবং বের হবার জন্য একটি গেট বসানো হয়েছিলো। গেটে বডি স্কানার সহ চেকিং ও তল্লাশির জন্য পুরুষ ও নারী পুলিশ সদস্যরা ছিলেন। বাইরে মোটর সাইকেল সার্বক্ষণিক টহল দেয় পুলিশ, র‌্যাব এবং ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা।
প্রতি বছরের মতো এ বছরেরও বই মেলায় খ্যাতিমান দেশি-বিদেশি অনেক লেখকের বই প্রকাশিত হয়েছিল। বই মেলা নিয়ে মানুষের প্রচণ্ড আগ্রহ ছিলো। মেলায় শিশুদের জন্য চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা, আবৃত্তি, সংস্কৃতি ও ভাষা শেখার জন্য বিভিন্ন আয়োজন করা হয়। গত বছর বই মেলায় ৪ হাজারের মতো বই প্রকাশ হয়েছিলো। এবার এই সংখ্যা আরও বেশি। বৃষ্টির কথা মাথায় রেখে প্রতিটি স্টলে টিনের ছাউনি দেয়া হয়েছিল। ৮০ হাজার বর্গফুট এলাকায় ইট ও বালু দিয়ে অস্থায়ী রাস্তা এবং উন্মুক্ত প্রান্তর নির্মাণ করা হয়েছিলো। শিশু কর্নারে এবার নতুন সংযোজন ‘মাতৃদুগ্ধ সেবা কেন্দ্র” এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ‘মুক্তমঞ্চে’ নাটক মঞ্চায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো।
শুক্র ও শনিবারে ১১ টা থেকে শুরু হতো শিশু প্রহর। মেলার দ্বার খুলতেই বাবা-মায়ের হাত ধরে আসা শিশু-কিশোরদের ঢল নামতো মেলায়। নানা বয়সী শিশুদের আনাগোনায় মেলা মখুরিত হয়ে উঠতো। বইয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়ানোর জন্য অনেকেই তাদের শিশুদের বই মেলায় আনতেন। মেলায় আসা ছোটদের অনেকেই বানান করে বই পড়ার মতো পরিণত হয়ে ওঠেনি, তবু তাদের বায়নার শেষ ছিল না। শিশু-কিশোরদের জন্য রচিত বইগুলি দেখলেই প্রতিটি বই তারা কিনতে চাইতো। ওরা কখনো ছুটেছে কার্টুন আর কমিকসের খোঁজে। নেড়ে চেড়ে দেখেছে বইগুলো।
যতদূর জানা যায়, ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের ৮ ফেব্রুয়ারি চিত্তরঞ্জন সাহা বর্ধমান হাউস প্রাঙ্গনে বটতলায় এক টুকরো চটের ওপর কলকাতা থেকে আনা ৩২টি বই সাজিয়ে বই মেলার গোড়াপত্তন করেন। এই ৩২টি বই ছিলো চিত্তরঞ্জন সহ প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ (বর্তমানে মুক্তধারা প্রকাশনী) থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশি শরণার্থী লেখকদের লেখা বই। এই বইগুলো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের প্রথম অবদান। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি বাংলা একাডেমি চত্বরে বইয়ের পসরা নিয়ে বসতেন। ১৯৭৬ সালে অন্যরা অনুপ্রাণিত হন। ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক ড. আশরাফ সিদ্দীকি বাংলা একাডেমিকে মেলার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত করেন। ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে মেলার সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি। এই সংস্থাটিও প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন চিত্তরঞ্জন সাহা।
মেলায় পাঠক আর দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভীড় ছিলো চোখে পড়ার মতো। প্রতিদিন প্রচুর লোকের সমাগম হতো। এ যেন বইপ্রেমিদের বাধভাঙ্গা জনজোয়ার। মেলায় বই বেচা-বিক্রির সাথে চলে পাঠকদের আড্ডা মারা, ছবি তোলা, বিভিন্ন স্টলে যেয়ে বইয়ের পাতা উল্টানো। বই মেলা এখন দেশবাসীর কাছে উৎসবে পরিণত হয়েছে। এ যেন সবার প্রাণের মেলা, আনন্দের মেলা। ছুটির দিনে পুরো পরিবার নিয়ে বইপ্রেমিরা মেলায় ছুটে আসতেন। মেলায় শিশুদের উপস্থিতি ছিলো চোখে পড়ার মতো। খুদে পড়–য়ারা পছন্দের বই কেনার জন্য বাবা-মায়ের হাত ধরে এক স্টল থেকে অন্য স্টলে ছুটে চলতো। ঘুরতে পেরে তারা খুব খুশি। বাংলা একাডেমি সূত্রে জানা গেছে এবার বই মেলায় মোট ৬৫ কোটি ৪০ লাখ টাকার বই বিক্রি হয়েছে। এর আগে ২০১৬ সালে ৪২ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ২০১৫ সালে ২১ কোটি ৯৫ লাখ এবং ২০১৪ সালে ১৬ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছিলো।
এবার বই মেলায় নতুন বই এসেছে ৩ হাজার ৬৪৬টি। গত বছরের চেয়ে এবার ২০২টি বই বেশি প্রকাশ হয়েছে। এবার কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে ১২ হাজার ১২২টি। প্রকাশের হিসেবে এটি সর্বোচ্চ। এ ছাড়া এ বছর উপন্যাস ৫৭৬টি, গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে ৫২০টি, প্রবন্ধ ১৬৮টি, শিশুতোষ ১১৮টি, ছড়াগ্রন্থ ১১৭টি, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই ৯৭টি, গবেষণা ৮৭টি জীবনীগ্রন্থ ৭১ টি ও ভ্রমণ ৬৯টি।
২০১৭- এর একুশে বই মেলা আমার কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এবারের বই মেলায় আমার রচিত এই তো জীবন বইটি শুধু প্রকাশিতই হয়নি, বইটি মেলায় সাড়া ফেলেছে এবং প্রচুর বিক্রিও হয়েছে। পাঠক ও ক্রেতারা বইটি কিনে যখন অটোগ্রাফ নেয়ার জন্য আসতো তখন যে কি ধরনের আনন্দ আর অনুভুতি হতো তা ভাষায় বলে প্রকাশ করা যাবে না। মেলাকে কেন্দ্র করে বাংলা একাডেমি যেমন সামগ্রিকভাবে চাঙ্গা হয়ে ওঠে তেমনি প্রকাশক, পাঠক, দর্শকরাও উদ্দীপিত হয় ওঠেন। বইমেলা, বই প্রকাশ ও বেচাকেনা- এসব মিলিয়ে ভাষার নাম ফেব্রুয়ারির বই মেলা বছর ধরে বই উৎসবের সাক্ষ্য হয়ে থাকুক এটাই আমাদের সবার একান্ত কামনা। আগামী বই মেলায় আরও ৬টি বই প্রকাশের অপেক্ষায় রইলাম।
লেখক: পুলিশ কর্মকর্তা (আই.জি ব্যাজ, জাতিসংঘ ও রাষ্ট্রপতি পদক প্রাপ্ত)