বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

প্রসঙ্গ : ভূমি সচিবের গাড়ি বিলাস এবং সরকারের আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত

আপডেট: December 6, 2019, 1:03 am

ফিকসন ইসলাম


হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের মহান স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান আজ থেকে সাড়ে চার দশক আগে ১৯৭৩ সালে মানে দেশ স্বাধীনতার পরপরই এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘আমার কৃষক দুর্নীতি করে না, আমার দিন মজুর দুর্নীতি করতে জানে না, আমার শ্রমিক জানেই না দুর্নীতি কি জিনিস, দুর্নীতি কাকে বলে, এদেশে দুর্নীতি করে শিক্ষিত জনগণ, দুর্নীতি করে প্রশাসনের লোকজন, দুর্নীতি করে আমার চারপাশে যারা আমাকে ঘিরে থাকে তারা…” দীর্ঘ ৪৬ বছর পর বঙ্গবন্ধুর ওই কথার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে এদেশের রন্ধে রন্ধে।
সম্প্রতি দেশের একটি বেসরকারি চ্যানেলের এক সংবাদে রীতিমত বিস্মিত হতে হয়। যমুনা টেলিভিশনে প্রচারিত প্রায় চার মিনিটের সংবাদ থেকে জানা যায় সরকারি পদস্থ কর্মচারীর দুর্নীতির বিবরণ। সংবাদের শিরোনাম ছিলো “ভূমি সচিবের গাড়ি বিলাস-পরিবার পরিজন নিয়ে মেতে উঠেছে বর্তমান ভূমি সচিব মাসুদুর রহমান পাটোয়ারী” অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে রীতিমত চমকে যেতে হয়। বঙ্গবন্ধুর সেই দিনের বক্তব্য হুবহু মিলে যায় এই সরকারি কর্মচারীর লাগামহীন অপকর্ম আর দুর্নীতিতে। প্রতিবেদনটি সচিত্র হওয়ায় দর্শকদের বুঝে নিতে এতটুকু কষ্ট হয় না যে, সচিবালয়ের একটি মন্ত্রণালয়ের প্রধান কর্তাব্যক্তি কিভাবে দিনের পর দিন অনিয়ম আর অপকর্ম করে যাচ্ছেন। মাননীয় ভূমি মন্ত্রী যত ভাল ভাল কথা বলুন না কেন তাঁর দপ্তরের দপ্তর প্রধানেরই যখন এই অবস্থা তখন দেশ ও জাতি তাকিয়ে থাকবে মাননীয় ভূমি মন্ত্রী কি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন তার অধীনস্থ এই কর্মচারীর বিরুদ্ধে।
ভূমি সচিব মাসুদুর রহমান পাটোয়ারীর বিরুদ্ধে মারাত্মক অভিযোগ। তিনি একসঙ্গে চারটি সরকারি গাড়ি ব্যবহার করছেন। সাবেক ভূমি মন্ত্রী শরীফ শামসুর রহমান ডিলু ব্যবহার করতেন ঢাকা মেট্রো ১৫-৬৯৪৮ নম্বরের বিলাসবহুল পাজেরো গাড়ি। বর্তমান ভূমি মন্ত্রী ব্যয় কমানোর জন্য সরকারি গাড়ি ব্যবহার করছেন না, কিন্তু তাতে কি, গাড়িতো আর বসে নেই। এই সরকারি গাড়িটি ব্যবহার করছে ভূমি সচিবের কন্যা ও স্ত্রী। কন্যা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে। ভূমি মন্ত্রীর নামে বরাদ্দকৃত এই বিলাসবহুল পাজেরো জিপটি ব্যবহার হচ্ছে ভূমি সচিবের পারিবারিক কাজে, বাজারহাট করা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাতায়াতে। বর্তমান ভূমি মন্ত্রী সাইফ্জ্জুামান চৌধুরী যেখানে ব্যয় কমাতে চেয়েছেন সেখানে ব্যয় কয়েক গুন বেড়ে গেছে। হয়ত বা মন্ত্রী মহোদয় বিষয়টি জানেনই না। যাহোক ভূমি সচিব মাসুদুর রহমান পাটোয়ারীর ছেলে ব্যবহার করে টাঙ্গাইল জোনাল সেটেলাইট অফিসার বা জেডএমওর প্রাইভেট কারটি। দীর্ঘদিন যাবৎ টাঙ্গাইলের ZS0 পদে কোনো কর্মচারী না থাকায় ওই প্রাইভেট কারটি ভূমি সচিবের ছেলে একেবারে প্রাইভেট করে নিয়েছেন। এ ছাড়া ভূমি সচিবের জন্য বরাদ্দকৃত আরেক বিলাসবহুল জিপটি তো সচিব নিজে দাপ্তরিক কাজে ব্যবহার করছেনই।
সবচেয়ে চমকে দেবার মত ঘটনা হচ্ছে এই ভূমি সচিব কিন্তু বিনা সুদে লম্বা সময়ের জন্য সরকারের ৩০ লক্ষ টাকা ঋণ নিয়ে একটি প্রিমিও গাড়ি কিনেছেন ঢাকা মেট্রো-গ-১৫-০৮৬৮ নম্বরের গাড়ি। বিনা সুদে প্রাপ্ত এই গাড়ির বিপরীতে তিনি প্রতি মাসে ৫০ হাজার করে টাকা সরকারি কোষাগার থেকে উঠিয়ে নিচ্ছেন, কিন্তু গাড়িটি ব্যবহৃত হচ্ছে না। ব্যাটারি যাতে ডাউন হয়ে না যায় এজন্য সরকারি ড্রাইভার দিয়ে সপ্তাহান্তে অন্তত একবার করে স্টার্ট দিয়ে সচল রাখার ব্যবস্থা করা হয়। সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক এক সময়ে সকল যুগ্ম সচিব ও তদুর্ধ্ব প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বিনা সুদে লক্ষ্য সময়ের জন্য এককালীন ৩০ লক্ষ টাকা করে ঋণ দেয়ার বিধান চালু করা হয়েছিলো। বছর তিনেক আগে আরো একধাপ নীচের কর্মচারী তথা উপসচিবদেরও একই শর্তে ঋণ সুবিধা দেয়া হয় এবং প্রতিটি গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ মাসে বেতনের সাথে ৫০ হাজার করে টাকা দেয়া হচ্ছে। সরকারের ইচ্ছে ছিলো বা যে অর্থে এত কোটি কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ঋণ দেয়া হয়েছে-উদ্দেশ্য একই যা সরকারি পরিবহন ব্যবস্থার উপর চাপ কমানো এবং ব্যয় হ্রাস করা। ফলে সরকারি কর্মচারীদের এই ঋণ সুবিধা দেবার শর্তে উল্লেখ করা আছে। তিনি সরকারি ঋণে গাড়ি কিনলে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করতে পারবেন না। তবে তিনি যদি তার নামে স্পেশালভাবে বরাদ্দকৃত (Air marked) গাড়ি ব্যবহার করেন তাহলে প্রতিমাসে অর্ধেক টাকা পাবেন। অথচ দুর্নীতিবাজ এই ভূমি সচিব প্রতিমাসেই বেতনের সাথে নগদ ৫০ হাজার টাকা উত্তোলন করে আসছেন। তাঁর নামে সরকারি বরাদ্দকৃত গাড়িটিও ব্যবহার করছেন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে তার অধীনস্থ দপ্তরের আরো দুটি গাড়ি ব্যবহার করেই চলেছেন যা যমুনা টেলিভিশনে সচিত্র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
কেবল ভূমি সচিব নয়, যুগ্ম সচিব থেকে শুরু করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে উপসচিবগণও একই মাত্রায় সরকারি ঋণে কেনা গাড়ি ব্যবহারের পাশাপাশি সরকারি গাড়ি ব্যবহার করছেন। আমার জানা মতে কমলকান্তি বৈদ্য নামের একজন যুগ্ম সচিবকে জানতাম। তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সীমান্ত অধিশাখায় দায়িত্ব পালনকালীন বিনা সুদে একটি গাড়ি ক্রয় করলেও প্রতিদিনই অধীনস্থ সরকারি দপ্তরের একটি পাজেরো জিপ ব্যবহার করতেন। এ বিষয়ে ২০১৪ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দাখিল করা হলেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। কথা হলো- এই লেখার শিরোনামে বলা হয়েছে সরকারের আত্মঘাতি সিদ্ধান্তের কথা। কেবল মাত্র প্রজাতন্ত্রের গুটিকতক কর্মচারীকে খুশি রাখার জন্যই ‘বিনা সুদে’ এই গাড়ি দেয়াসহ প্রতিমাসে নগদ ৫০ হাজার টাকা প্রদান করা কতটুকু যৌক্তিক? প্রথমত সত্যিকার অর্থে কি একজন সরকারি কর্মচারীর গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ (গাড়ি চালক, তেল মবিল ইত্যাদি) বাবদ মাসে ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়, না হতে পারে? তাহলে পরোক্ষভাবে একজন কর্মচারীকে ইচ্ছাকৃতভাবেই বৈধপথে ‘অবৈধ সুবিধা’ প্রদান করা হচ্ছে। দ্বিতীয়তঃ গাড়ি ক্রয়কারী কোনো কর্মচারীই নিজের কেনা গাড়িতে না চড়ে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করছেন। ফলে বাজার ব্যয় মাত্রাতিরিক্ত ভাবে বেড়েই চলেছে। ২০১২ সালে সরকার যখন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছিলেন তখন অনেকেই আপত্তি করেছিলেন কিন্তু সেসব আপত্তি আমলে না নিয়ে অর্থমন্ত্রী খানিকটা গায়ের জোরেই এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছিলেন। তৃতীয়ত এই বিনাসুদে গাড়ি ক্রয়ের সুবিধা দিতে গিয়ে যাচ্ছেতাইভাবে রাষ্ট্রীয় কোষাগার শূন্য হতে চলেছে তা ভূমি সচিবের কর্মকাণ্ড থেকেই স্পষ্টত প্রতীয়মান। সর্বোপরি সরকারি গাড়ি এবং বিনাসুদে প্রাপ্ত গাড়িগুলোর লগবই পরীক্ষা করলেই এর সত্যতা পাওয়া যাবে। চতুর্থতঃ বিনাসুদে গাড়ি ক্রয়ের সুবিধা প্রদানের ফলে ঢাকা মহানগরীর যানজট তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে যাচ্ছে। আর এ কারণেই এ ধরনের সরকারি সিদ্ধান্ত আত্মঘাতি বলে মনে হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে এদেশের সকল নাগরিক সমান সুযোগ লাভ করবেন। ফলে বিনাসুদে যদি গাড়ি ঋণ দিতেই হয় তাহলে কেন কেবল একটি বিশেষ গোষ্ঠি ও শ্রেণিকে সে সুযোগ দেয়া হচ্ছে। কেবল মাত্র যদি ক্যাডার সার্ভিস ও এর কথা বলা হয়। তাহলে এ দেশের ২৯টি ক্যাডারের সকল সদস্যকে কি এই শর্তে বিনাসুদে ঋণ সুবিধা দেয়া হচ্ছে? জানা মতে বিসিএস প্রশাসন এবং বিসিএস ইকোনমিক ক্যাডার এর সদস্যরা এই সুবিধা ভোগ করছেন। এছাড়াও অন্যান্য ক্যাডার থেকে আসা উপসচিব বা তদুর্ধ্ব কর্মচারীদের এই সুবিধা দিলেও তাদের সংখ্যা অতিনগন্য। ইতোমধ্যে এই অস্বাভাবিক অসমতার জন্য উচ্চ আদালতে একটি মামলাও হয়েছে। বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে একের জন্য একেক নিয়ম চালু করা হচ্ছে। প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগপ্রাপ্ত সকলেরই একই প্রকার ও সমান সুযোগ সুবিধা পাওয়া উচিত যা সংবিধানে সংরক্ষিত করা আছে। অথচ সেটা দেখা অনুপস্থিত। সরকারি কর্মচারী হিসেবে একজন উপসচিব যদি বিনাসুদে ৩০ লক্ষ টাকা ঋণ পেতে পারেন তাহলে একই বেতন স্কেল তথা ৫ম গ্রেডভুক্ত অন্যান্য সরকারি কর্মচারীরা এ সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের একজন সহযোগী অধ্যাপক এর বেতন স্কেল উপসচিবের সমান, কিংবা অন্যান্য ক্যাডারেরও যথেষ্ট পরিমাণ ৫ম গ্রেডের কর্মচারী রয়েছেন তাদের বঞ্চিত করে কেবল মাত্র একটি শ্রেণি ও গোষ্ঠির জন্য এ ধরনের সুবিধা প্রদান তো সংবিধানের মর্যাদাকেও ক্ষুণ্ন করে। ফলে সরকারের উচিৎ হবে অবিলম্বে এই বিনাসুদে গাড়ি ক্রয়ের টাকা প্রদানের আদেশটি স্থগিত করা এবং যাদের কে এ সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। যেহেতু ভূমি সচিব মাসুদুর রহমানের কৃত অপকর্ম থেকে বিষয়টি প্রমাণিত তাই সকল ঋণের অর্থ প্রত্যাহার করা। তাহলেই ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা হবে এবং সংবিধানের মর্যাদা সমুন্নত হবে।
পুনশ্চঃ একই যাত্রায় দুই ফল। বাংলাদেশের সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের সকল নাগরিকের সমান সুযোগের কথা বলা হলেও তার ব্যত্যয় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঘটে চলেছে। দুই মাস অধিক আগে জামালপুর জেলার ডেপুটি কমিশনার আহমদ কবিরের যৌনচারের সংবাদ দেশব্যাপি নানা বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় ওঠে। একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। উক্ত ডেপুটি কমিশনারকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করে পরিবেশ সামাল দেবার ব্যবস্থা করে সরকার। কিন্তু আজ পর্যন্ত উক্ত ডিসির বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। পক্ষান্তরে পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে জানা যায় ওই অপকর্মের জন্য উক্ত ডিসি আহমদ কবিরের প্রণয়লীলার সঙ্গী কালেকটরেট ভবনের নিম্ন কর্মচারী ‘সাধনা’ কে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে কিন্তু আহমদ কবিরের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কি না তা জানা যায়নি। এখানেও সংবিধান এর পাশাপাশি মানবাধিকার (Human Rights) লঙ্ঘিত হয়েছে।
লেখক: প্রকৌশলী