প্রসঙ্গ : শিশুর হাতের লেখা

আপডেট: জানুয়ারি ২৯, ২০২০, ১২:০১ পূর্বাহ্ণ

মোহাম্মদ হারুন মিয়া


একটি পরিবারে শিশুর জন্ম খুবই আনন্দের। শিশুটি ছেলে কিংবা মেয়ে যে শিশুই হোক না কেন। শিশু হাঁটি-হাঁটি-পা-পা করে বেড়ে ওঠা থেকে শুরু করে স্কুলে যাতায়াত, বাসায় ফেরত আসা ইত্যাদি নিয়ে পিতা-মাতা, দাদা-দাদী ও আত্মীয়দের চিন্তার কোনো শেষ থাকে না অর্থাৎ জন্মের পর থেকেই শুরু হয় শিশুর ভবিষ্যৎ/ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে। শিশুর সকল কিছুই নির্ভর করে পিতা-মাতা তথা পরিবারের আত্মীয়-স্বজন কিংবা কর্তাব্যক্তিদের উপর।
শিশু ভূমিষ্ট হওয়ার পর থেকেই শিশুকে নিয়ে বিভিন্ন চিন্তা, উৎকন্ঠা, কল্পনা-জল্পনা, কিভাবে শিশুটি বড় হবে, কিভাবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে শিশুকে স্কুলগামী করা যায়, স্কুলের ভর্তি প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে স্কুলিং পর্যন্ত ইত্যাদি বিষয় নিয়ে শিশুর পিতা-মাতার চিন্তার অন্ত থাকে না। আগত শিশুটিকে কিভাবে মানুষের মতো মানুষে কিংবা কিভাবে ফুলে-ফলে বিকশিত করা যায় তার জীবন, জীবন ব্যবস্থা। শিশুর হাতের লেখা, পড়াশুনার টুকিটাকি, শিশুর হাতের লেখা কেমন হওয়া উচিৎ এই বিষয় নিয়ে নিম্নে কিছুটা আলোকপাত করা হলো :
১. লেখার সফলতা
পৃথিবীর সমস্ত সৃষ্টিকুলের মধ্যে মানুষই শ্রেষ্ঠ (আশরাফুল মাখলুকাত)। পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ পাওয়া যাবে না যে সৃষ্টিকে ভালোবাসে না, সুন্দরকে পছন্দ করে না। সুন্দরকে পছন্দ করা, সুন্দরকে ভালোবাসা, সুন্দরের কাছাকাছি থাকা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি অর্থাৎ মানুষ মাত্রই সুন্দরের পূজারী। মানুষের হাতের লেখাও সুন্দরের মধ্যেই পড়ে। সুন্দর হাতের লেখা একটি শৈল্পিক কাজ। এই শৈল্পিক কাজের অধিকারী হতে হলে মানুষকে সাধনায় লিপ্ত থেকে লেখা সুন্দরের সফলতায় নাম লেখানো। হাতের লেখা সুন্দর করার জন্য সাধনার পাশাপাশি চর্চার অভ্যাস গড়ে তুলতে হয়। তবেই সফলতার মুকুট পরা সম্ভব। প্রবাদ আছে – Practice makes a man parfect.
২. লেখার বিফলতা
অনেকে আছে হাতের লেখার প্রতি কোনো গুরুত্ব দেয় না। মনে করে, লেখাতো লেখাই, হলেই হলো। কী সুন্দর কী-বা আবার অসুন্দর। কোনো রকম হলেই হলো, বুঝতে পারলেই হলো। হাতের লেখা একটি কারুকাজ, হাতের লেখা সুন্দরের গুরুত্ব ও মর্যাদার কথা সেই মুহূর্তে মনে থাকে না। কেউ কেউ হাতের লেখা খুব ছোট করে কেউবা আবার বড় করে লিখে। লেখা সুন্দর, স্পষ্ট, পরিপাটি ও সহজে বুঝায় যায় এমনই হওয়া উচিৎ। অসুন্দর হাতের লেখায় সফলতাতো নেইই বরং আছে বহুগুণ বিফলতা। এই বিফলতা পরিহার করে, সুন্দর হাতের লেখাকে সাধুবাদ জানিয়ে সফলতার জয়গান গাওয়া উচিৎ। লেখার সময় একটুকু মনোযোগী হলে লেখা সুন্দর করা সম্ভব। প্রবাদ আছে – Where there is well, there is a way.
৩. লেখায় কাটাকুটি করা
লেখাতো লেখাই। লিখতে গেলে খানিকটা কাটাকুটি হবেই। কাটাকুটি না করলে লেখায় শুদ্ধতা আসেনা, লেখা শোভন হয় না, সার্থক হয় না। তবে কাটাকুটি যাতে না হয় সেই দিকটার প্রতি সজাগ দৃষ্টি দেয়া উচিৎ। কাটাকুটি লেখার মাধুর্যতা নষ্ট করে। এমন লেখা কারো কাম্য নয়। লেখায় সফলতা আনয়নে নির্ভুল লেখা আবশ্যক। নির্ভুল লেখা লেখার মান বাড়ায়। ছোটবেলা হতে হাতের লেখা সুুন্দর করার জন্য বাবা-মায়ের প্রচেষ্টা থাকা খুবই জরুরি। অতএব হাতের লেখা হতে হবে সঠিক, নির্ভুল এবং সর্বজন বিদিত।
৪. লেখা সুন্দর ও দ্রুত হওয়া
বার বার লেখালেখি করলে হাতের লেখা সুন্দর না হওয়ার কোনো উপায় নেই। বার বার লেখালেখি করলে লেখা সুন্দর ও দ্রুত হয়। লেখা সুন্দর ও দ্রুত করার জন্য মনোযোগ দরকার। লেখালেখির ফলে কলমের ডগা তার আপন গতিতে চলতে থাকে। একবার কলমের ডগা চলতে থাকলে তাকে আর থামানো যায় না। শিশুরা কাদামাটির মতো, তারা খুব অনুকরণ প্রিয়। তাই হাতের লেখা সুন্দর ও দ্রুত করার অভ্যাস শিশুকাল থেকেই গড়ে তোলা জরুরি।
৫. লেখায় বানান ভুল কম হওয়া
লেখালেখি একটি অভ্যাস। অভ্যাস মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়, এটি চিরন্তন। বেশি বেশি লেখালেখি করলে বানান ভুল কম হয়। বানান ভুল কম হলে লেখায় স্ট্যান্ডারাইজেশন চলে আসে। গবেষণা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, গল্প, ছোটগল্প, রম্য রচনা ইত্যাদি লেখালেখিতে বানান ভুল কম হলে লেখকের লেখা সর্বজনগ্রাহ্য হয়, লেখকের সুনাম অর্জিত হয় এবং লেখালেখি দ্বারা লেখক সমাজে প্রতিষ্ঠিত একজন লেখক হিসেবে সম্মানীয় ব্যক্তিত্বের আসন অলংকৃত করেন।
৬. সুন্দর হাতের লেখা প্রশিক্ষণ একাডেমি
Life is not a bed of roses. জীবন মানে যুদ্ধ, জীবন মানে প্রতিযোগিতা। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। এখানেও আছে। প্রতিযোগিতা ছাড়া বর্তমান বিশ্বে শীর্ষে আগুয়ান হওয়া যায় না। প্রতিযোগিতাই মানুষকে লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করে। হাতের লেখা সুন্দরের প্রতিযোগিতা সবসময়ই ছিলো, আছে এবং থাকবে। সুন্দর হাতের লেখার প্রতি অনেকেরই মনোযোগ আকৃষ্ট হয়। ইদানিংকালে হাতের লেখার সুন্দর করার জন্য “হাতের লেখা সুন্দর প্রশিক্ষণ একাডেমি” নামে কিছু সাইনবোর্ড, দেয়াল লিখন দেখতে পাওয়া যায়। এই সমস্ত একাডেমিতে শিশুদের হাতের লেখা সুন্দর করার জন্য প্রয়োজনে প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে পারে। একাডেমিতে হাতের লেখা সুন্দর করার বিভিন্ন কলা-কৌশল শেখানো হয়। সচেতন অভিভাবকরা ইতোমধ্যেই তাঁদের শিশুদের এই প্রশিক্ষণ একাডেমিতে ভর্তি করিয়ে শিশুদের হাতের লেখা সুন্দর করার প্রতিযোগিতায় নেমে গেছেন। এতে উপকারতো আছেই। জীবনের শুরুতে হাতের লেখা সুন্দরের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে শিশুরা বেশ আনন্দ উপভোগ করে। প্রশিক্ষণ শেষে একাডেমি শিশুদের হাতে সার্টিফিকেট. শিশু কিড্্স নামক কিছু সামগ্রী উপহার দেয়ার রেওয়াজ বিদ্যমান।
৭. সাধনাই সফলতা
যে কোনো কাজ করার জন্য মনোযোগ ও সাধনা দরকার। সাধনাই শিক্ষার বুনিয়াদ, সাধনাই শিক্ষা। যা মানুষকে সফল হতে সাহায্য করে। সাধনার দ্বারা অসাধ্যকে সাধন করা যায়। বিশ্ব সমাজে প্রতিষ্ঠিত মণীষীরা কেউ আলালের ঘরের দুলাল কিংবা সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন নি। সাধনার মাধ্যমেই তারা সকল ঘাত-প্রতিঘাতকে আপন মহিমায় দূর করে নিজের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, মেধা ও প্রজ্ঞা দ্বারা জীবনযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে বিজয় অর্জন করতে সমর্থ হয়েছেন। লক্ষ্যে পৌঁছেছেন নিঃসন্দেহে। ইতিহাসতো তাই বলে। এই পৃথিবীতে সফল মানুষ ও সফলতার দাম সবার আগে, সবার উর্ধ্বে। সুতরাং বলা যায় সাধনাই সফলতার মূল মন্ত্র/চাবিকাঠি।
৮. সবাই পারে, আমিও পারবো
মহাবিশ্বের প্রতিপালক মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষ পারেনা, পারবেনা এমন কাজ পৃথিবীতে দেননি। একজনের পক্ষে কাজ করা সম্ভব না হলেও অন্যজন কিন্তু ঠিকই পারছে। কাজটিকে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পাদন করার জন্য প্রয়োজন আত্মউপলদ্ধির। নিজের মনে পোষণ করতে হবে সবাই পারে, আমি পারি, আমি পারবো, নিজের জীবন নিজে গড়বো। আমাকে পারতেই হবে-যে কোনো মূল্যে। লক্ষ্য ঠিক করে অদম্য সাহস ও প্রতিজ্ঞা নিয়ে এগিয়ে গেলে জয়ের মুকুট একদিন পড়া যাবেই। হাতের লেখা সুন্দর করার বেলায়ও একথাটির গুরুত্ব কোনো অংশে কম নয়।
৯. দৃঢ় মনোবল ও আত্মবিশ্বাস
দৃঢ় মনোবল ও আত্মবিশ্বাসের জংশনই হলো সফলতা। আত্মবিশ্বাসে বলিয়ান হয়েই মানুষ আজ পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় আনতে, পৃথিবীকে জয় করে চাঁদের দেশে বসতি স্থাপন করতে এবং সাগরের তলদেশে মিটিং-মিছিল করতে সমর্থ হয়েছে। আত্মবিশ্বাস মানুষকে তার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত করতে শক্তিধর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। সুতরাং বলা যায় -আত্মবিশ্বাসী হয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হও, এই হোক আজ আমাদের ব্রত।
১০. লেখা একটি শৈল্পিক কাজ
হাতের লেখা একটি শৈল্পিক কাজ। এই কাজটি সবাই পারে না, তবে কেউ কেউ পারে। এটিকে করতে হলে ছোটবেলা থেকে অধ্যবসায়ের ফিকির করতে হয়, অভ্যাস গড়ে তুলতে হয়, মনোযোগী হতে হয়। কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের দ্বারা হাতের লেখা সুন্দর করা সম্ভব। অন্যথায় নয়। আসুন, আমরা এই শৈল্পিক কাজটিকে হৃদয়ের গভীরে স্থান দিয়ে সুন্দরের পূজারী হই এবং হাতের লেখাকে সুন্দর করার প্রতিযোগিতায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই।
উপসংহার
পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থকে মানুষ তাদের আচার-আচরণ, কথা-বার্তা, চলাফেরা, মনের ভাব, মনের আকুতি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে প্রকাশ করার চিন্তা করতো, চেষ্টা করতো কিন্তু কোনো উপায় ছিলো না। জানতো না লেখালেখি, ছিলো না লেখালেখির কোনো উপকরণ। কালের বিবর্তনে লেখার উপকরণ না থাকলেও মানুষ তাদের কার্যকলাপগুলো মাটির ফলক, গাছের বাকলে, ভূর্জ্যপত্রে, পাহাড়ের পাদদেশে, গুহায় ও পাথরে লিখো রাখতো। তাঁদের অবচেতন মন জানতো একদিন এই লেখা মহিরূপে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে প্রকাশ পাবে। অনুসন্ধিৎসু মানুষের মনের এই তাগিদ থেকে আজকের বর্তমান সভ্যতার উদয় হয়েছে, সভ্যতার চরম শিখরে আহরণ করতে সক্ষম হয়েছে মানুষ। লেখালেখি এমন এক সত্তা যা কাল থেকে কালান্তরে অবিরত চলতে থাকে। জানান দেয় মানুষকে ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির কথা। তাইতো বলা হয়ে থাকে – লেখালেখি ছিলো, আছে এবং থাকবে চিরকাল।
লেখক : সহকারী পরিচালক, রিসার্চ সাপোর্ট অ্যান্ড পাবলিকেশন ডিভিশন, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন

harunugc @gmail.com