প্রাচ্যের ড্যান্ডির ঐতিহ্য সোনারগাঁ

আপডেট: অক্টোবর ৩০, ২০১৬, ১১:৫৬ অপরাহ্ণ

মো. লুৎফর রহমান
সোনারগাঁও বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল প্রাচীন জনপদ। প্রাচীনবঙ্গে এটি এক বিশেষ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। এদেশের লোকশিল্প ও লোকজ ঐতিহ্য বিকাশের এক সমৃদ্ধ জায়গা সোনারগাঁও। পৌরাণিক তথ্যমতে সোনারগাঁও তিন হাজার বছরের প্রাচীন জনপদ। এখানকার লোক ও কারুশিল্প বিশ্ববিখ্যাত মসলিন, ঝিনুক, মুক্তার কাজ, কাঠের চিত্রিত হাতি, ঘোড়া, পুতুল ইত্যাদি একদা রপ্তানির মর্যাদা পেয়েছিল। এমন লোকসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পটভূমির প্রেক্ষিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সোনারগাঁয়ে লোক ও কারুশিল্পের নিদর্শনাদি সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রদর্শন ও পুনরুজ্জীবন তথা বাঙালি জাতিসত্তার পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে প্রথম আর্থিক সহায়তা ও পরামর্শ দিয়ে এদেশের মাটি ও মানুষের শিল্পী শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন পরিচালনার দায়িত্ব দেন। ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ একটি প্রজ্ঞাপন বলে সরকার সোনারগাঁয়ের প্রাণকেন্দ্রে লোকশিল্পের ঐতিহ্যের পটভূমিতে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করে। দেশিয় সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবনের পাশাপাশি এ বিষয়ে গবেষণায় নিয়োজিত একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন।


১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে জাহাঙ্গীর নগর- ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তরিত হওয়ার পর থেকে সোনারগাঁয়ের গুরুত্ব ম্লান হয়ে যায়। সোনারগাঁও প্রাচ্যের ড্যান্ডিখ্যাত নারায়ণগঞ্জ জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। ১৯৮৩ সালের ১৩ মার্চ বৈদ্যেরবাজার থানা থেকে সোনারগাঁ থানা এবং ১৯৮৪ সালে থানা থেকে সোনারগাঁ উপজেলায় উন্নীত হয়। এর আয়তন ১৭১.০৫ বর্গকিলোমিটার। নারায়ণগঞ্জ জেলা সদর হতে এটি প্রায় ২১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ঢাকা থেকে সোনারগাঁর দূরত্ব ২৭ কিলোমিটার। সোনারগাঁয়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্য এবং কালচারাল হেরিটেজ প্রত্যক্ষ না করলে অপূর্ণতা থেকে যায়।
সোনারগাঁও পরিচিতি
বাংলার প্রাচীন রাজধানী শহরের এক স্মৃতিময় নাম সুবর্ণগ্রাম। এর প্রকৃতির সৌন্দর্যের অবারিত আকর্ষণ, অনুপম স্থাপত্যশৈলী ও প্রাচীন নিদর্শনের ধ্বংসাবশেষ পর্যটকদের মনে বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। ঢাকার অদুরে শীতলক্ষা নদীর পূর্বতীরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দু’পাশ জুড়ে সবুজের সমারোহ আর বনানীর শ্যামলিমায় মনোরম স্থাপত্যশৈলী এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ছায়া ঢাকা, পাখি ডাকা, হৃদয় ছোঁয়া এক নৈসর্গিক পরিবেশে সোনাগাঁয়ের অবস্থান। সোনারগাঁয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য আমাদের গর্বের বিষয়। অতীত স্মৃতিতে অম্লান সুবর্ণগ্রামের ধারাবাহিক বিবরণ আজ অবধি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সোনারগাঁয়ের কোথাও অতীতের স্মারক চিহ্ন তেমন অবলোকন করা যায় না। এই সোনারগাঁয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সোনালি অতীতের এক সুবর্ণ অধ্যায়ের উল্লেখযোগ্য স্মৃতি।
সোনারগাঁ নামের উৎপত্তি
সোনারগাঁ নামের উৎপত্তি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন অভিমত রয়েছে। গবেষকদের মতে সোনাগাঁয়ের প্রাচীন নাম সুবর্ণবীথি বা সুবর্ণগ্রাম। এই সূবর্ণগ্রাম থেকেই সেনারগাঁ নামের উদ্ভব বলে জানা যায়।
ড. এসএম হাসানের মতে ‘ঝড়হধৎমধড়হ ড়ৎ সড়ৎব ধপপঁৎধঃবষু শহড়হি ভৎড়স ধহপরবহঃ ঃরসবং, ‘ঝাঁড়ৎহধমৎধস’ ষরঃবৎধষষু সবধহং এড়ষফবহ ারষষধমব’. ওহ পড়সসড়হ ঢ়ধৎষধহপব রঃ রং ধষংড় পধষষবফ ‘এড়ষফ ঃড়হি’ যিরপয ঢ়ৎড়াবং ঃযধঃ ঃযব ঃবৎসরহড়ষড়মু ‘ঝড়াধৎহধমৎধস’ সঁংঃ যধাব রহফরপধঃবফ রঃং ধহপরবহঃ ঢ়ৎব-গঁংষরস ধহঃরয়ঁরঃু. ঈঁহহরহমযধস রং ড়ভ ড়ঢ়রহরড়হ ঃযধঃ ধষঃযড়ঁময ঃযবৎব ধৎব ড়হষু ধ ভবি ভৎধমসবহঃং ড়ভ ঐরহফঁ ড়িৎশ হড়ি ষবভব ঃড় ধঃঃবংঃ ঃযব ভধপঃ, ওঃ সঁংঃ যধাব নববহ ঃযব পধঢ়রঃধষ ড়ভ ঐরহফঁ চৎরহপরঢ়ধষরঃু ধহঃবৎরড়ৎ ঃড় ঃযব রহাধংরড়হ ড়ভ  গঁযধসসধফ নরহ ইধশযঃরুধৎ কযধষলব’.
ওহ ঃযব ড়িৎফং ড়ভ জবহহবষষ ঝড়হধৎমধড়হ ড়ৎ ঝাঁধৎহধমৎধস ধিং ধ ষধৎমব পরঃু, ধহফ ঃযব ঢ়ৎড়ারহপরধষ পধঢ়রঃধষ ড়ভ ঃযব বধংঃবৎহ ফরারংরড়হ ড়ভ ইবহমধষ নবভড়ৎব উযধশধ ধিং নঁরষঃ. ইঁঃ রঃ রং ফরিহফষবফ ঃড় ধ ারষষধমব. জনশ্রুতি আছে, ‘মহারাজ জয়ধ্বজের সময় অত্র অঞ্চলে সুবর্ণবৃষ্টি হয়েছিল বলে এ স্থান সুবর্ণগ্রাম নামে পরিচিতি লাভ করে’।
তোফায়েল আহমদ ‘আমাদের প্রাচীন শিল্প’ গ্রন্থে জেমস্ টেইলর এর উদ্বৃতি দিয়ে লিখেছেন ‘সোনারগাঁ অথবা সুবর্ণগ্রাম সম্ভবতঃ নামকরণ হয়েছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের জন্য এখানে প্রচুর সোনা আমদানি হতো বলে।’ তিনি আরো বলেন ‘অতীতে পূর্ববঙ্গে (ঊধংঃবৎহ চধৎঃ ড়ভ ইবহমধষ) আরাকান ও পে- থেকে অনেক সোনা আসতো। উল্লিখিত দেশ থেকে জাহাজ যোগে চট্টগ্রাম আগমনকালে সিজার ফ্রেডরিকের (১৫৬৩) জাহাজ স্থির রাখার জন্য ভারি জিনিস (ইধষষধংঃ) ও নাবিকদের খাদ্য সামগ্রী ছাড়া সে জলযানে একমাত্র পণ্য বোঝাই করা হয় সোনারূপা। প্রাচীনকালে স্বর্ণই সোনারগাঁয়ের প্রধান আমদানি পণ্য ছিল।’ হয়তোবা এ কারণে এখানকার নামকরণ করা হয় সুবর্ণগ্রাম নামে।
নীহারঞ্জন রায়ের মতে, ‘প্রাচীন নি¤œবঙ্গে বা তার আশেপাশে সোনারখনি ছিল অথবা বুড়িগঙ্গা বা সুবর্ণগ্রামের পার্শ¦বর্তী নদীগুলোতে সোনার গুঁড়ো ভেসে আসতো এবং গুঁড়ো থেকে সুবর্ণ প্রাপ্তির ফলে সুবর্ণগ্রাম নামকরণ হ’তে পারে।’ কেউ কেউ বলেন, বার ভূঁইয়া প্রধান ঈসা খাঁর স্ত্রী সোনাবিবির নামানুসারে এর নাম হয়েছিল সোনারগাঁ।
প্রারম্ভ কথা
সোনারগাঁ বাংলাদেশের ইতিহাসের এ গৌরবোজ্জ্বল প্রাচীন জনপদ। সোনাগাঁ জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও শিল্পকলার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। সোনারগাঁও মধ্যযুগে ছিল মুসলিম সুলতানদের রাজধানী। বর্তমানে সেনারগাঁ প্রাচ্যের ড্যান্ডিখ্যাত নারায়ণগঞ্জ জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা। এটি মেঘনা তীরবর্তী স্থানে বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী বিক্রয়ের অন্যতম প্রসিদ্ধ বাজার ছিল। দূর-দূরান্ত থেকে জনগণ বৈদ্যেরবাজারে ব্যবসা-বাণিজ্যের নিমিত্বে আসতেন। একই সাথে নদী অববাহিকায় অবস্থানজনিত কারণে ওঝা- বৈদ্যরাও এ বাজারে আসতো এবং ধীরে ধীরে তারা এখানে বসতি স্থাপন করে। এই ওঝা-বৈদ্যরা বিভিন্ন তন্ত্র-মন্ত্রের মাধ্যমে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে। তাদের হাজারো পসরা বিক্রয়ের প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে বৈদ্যেরবাজারে রূপান্তরিত হয়। প্রশাসনিক সুবিধার্থে এটিকে নারায়ণগঞ্জ থানা হতে পৃথক বৈদ্যেরবাজারে থানা নামকরণ করে একটি থানা গঠন করা হয়। নদী ভাঙ্গনের ফলে এক পর্যায়ে বৈদ্যেরবাজারে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ফলে বৈদ্যেরবাজার থানা স্থানান্তর অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে।
‘১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দের ১৩ মার্চ বৈদ্যেরবাজার থানা থেকে সোনারগাঁ থানা এবং ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে থানা থেকে সোনারগাঁ উপজেলায় উন্নীত হয়। এর আয়তন ১৭১.০৫ বর্গ কিলোমিটার এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা সদর হতে প্রায় ২১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।’ মুঘল আমলে ২৪ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে ছিল এর অবস্থান। এখন এর পরিচিতি উপজেলা হিসেবে।
সোনারগাঁয়ের ইতিহাস জানার জন্য পৌরাণিক উপাখ্যান, কিংবদন্তির উপরই বেশি নির্ভর করতে হয়। মধ্যযুগীয় এই নগরটির অবস্থান নির্ণয় করা দুষ্কর। সোনারগাঁয়ের পূর্বে মেঘনা নদী, দক্ষিণ-পশ্চিমে শীতলক্ষা, দক্ষিণে ধলেশ্বরী এবং উত্তরে ব্রহ্মপুত্র দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকায় এলাকাটি খুব উন্নত ছিল। নদী অববাহিকায় অবস্থিত সোনারগাঁও অঞ্চলের জমি ছিল উর্বর। এখানে সেচ সুবিধা থাকায় প্রচুর ফসল উৎপন্ন হতো। এখানকার অধিবাসিরা ধনাঢ্য ও সমৃদ্ধশালী ছিলেন। রাজা-বাদশাহগণ সানন্দে সোনারগাঁয়ে বাংলার রাজধানী গড়ে তুলেছিলেন। এই সোনারগাঁয়ের ইতিহাস প্রাক-মুসলিম যুগ অথবা মুসলিম যুগ কোন সময় থেকে শুরু হয়েছে এ বিষয়ে এখনো ধারাবাহিক ইতিহাস প্রণীত হয়নি। সুলতান বলবানের সময়কাল ১২৬৫-১২৮৭ খ্রিস্টাব্দ অর্থাৎ ইতিহাসে সোনাগাঁয়ের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় প্রায় সাতশত বছর আগে। কিন্তু সোনারগাঁও জনপদ সাতশত বছরের চেয়েও অধিক প্রাচীন। পৌরাণিক সূত্রমতে সোনারগাঁওকে তিন হাজর বছরের অধিক প্রাচীন জনপদ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। ‘সোনারগাঁয়ের পূর্ব নাম সুবর্ণগ্রাম। মসলিনের ক্রয়-বিক্রয় অতি প্রাচীনকাল হতে সুবর্ণগ্রামেই সম্পন্ন হতো।’ কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে বঙ্গের সুক্ষ্ম বস্ত্রের উল্লেখ আছে। এ সুক্ষ্মবস্ত্র নিঃসন্দেহে মসলিন। জেমস্ টেলর বলেছেন, ঢাকা অঞ্চলের (নারায়ণগঞ্জ সোনারগাঁওসহ) মতো উৎকৃষ্ট কার্পাস পৃথিবীর কোথাও উৎপন্ন হয় না। কৌটিল্যের প্রসঙ্গ ধরে সোনারগাঁওকে আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন জনপদ বলা যায়।
ঐতিহাসিক স্বরূপচন্দ্র রায়ের মতে, ‘সুবর্ণগ্রাম একটি প্রাচীন গ্রাম। বৌদ্ধ আমল থেকেই সুবর্ণগ্রাম শুরু, পাল, দেব, প্রভৃতি রাজাদের রাজধানী হিসেবে মর্যাদা পেয়েছিল। সুবর্ণগ্রাম বা সোনারগাঁ প্রাচীন বঙ্গের বিশেষ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল।’ সোনারগাঁয়ের প্রাচীনতা সম্পর্কে বিক্ষিপ্ত সূত্রের দুঃসাধ্য যোজনার অভবেই হয়তো কোনো সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়নি। রমেশচন্দ্র মজুমদার  ‘ঐরংঃড়ৎু ড়ভ ইবহমধষ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, রঃ যধং যড়বিাবৎ, ঃড় নব ধফসরঃঃবফ ঃযধঃ ঃযবৎব রং হড় ফধঃবফ ৎবভবৎবহপব ঃড় ঝড়হধৎমধড়হ নবভড়ৎব ঃযব ঃযরৎঃববহঃয পবহঃঁৎু অউ. অর্থাৎ ‘ত্রয়োদশ শতাব্দীর পূর্বে সোনারগাঁয়ের কোনো নির্ভরযোগ্য ইতিহাস পাওয়া যায় না।’ অনুসন্ধানে সন তারিখের উল্লেখ পাওয়া না গেলেও প্রাচীন বঙ্গে সোনারগাঁয়েরনাম অবলোকন করা যায়।
ঐতিহাসিক ঠ.অ ঝসরঃয ‘ঞযব ঊধৎষু ঐরংঃড়ৎু’ ড়ভ ওহফরধ, গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘ঝধাড়ৎহধনঁসর এড়ষফবৎহ ঈড়ধংঃ ড়ভ ঃযব ঈযরহবংং. ঝপড়ভভ পড়হহবপঃং ঃযব হধসব রিঃয ঃযব এধহমবঃরপ ঢ়ড়ৎঃ ড়ভ ঝড়হধৎমধড়হ. সোনারগাঁয়ে প্রাক-মুসলিম পুরার্কীতির চিহ্ন খুঁজে পাওয়া না গেলেও এক সময় এ অঞ্চলে শিল্প-সংস্কৃতির প্রসিদ্ধ কেন্দ্র ছিল। চৌদ্দ শতকের প্রথমে দিল্লি সুলতানের প্রতিনিধি শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহ্ স্বাধীনতা ঘোষণা করে নিজ নামে সোনারগাঁ থেকে মুদ্রা প্রচারের পর ইতিহাসের পাথুরে পাতায় সুবর্ণগ্রামের নাম স্থান করে নেয়। সুবর্ণগ্রাম মুলতঃ নদী তীরবর্তী একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল।
‘আনুমানিক ১২৮১ খ্রিস্টাব্দে সুলতান গিয়াসুদ্দীন বলবন তুঘরিল খানকে দমনের উদ্দেশ্যে সোনারগাঁয়ে আগমন করেন। অতঃপর ক্ষমতাশীন রাজা রায় দনুজমর্দন দেব সন্ধিবদ্ধ হলে সোনারগাঁ দিল্লির সুলতানদের আওতাধীন হয়। পরবর্তী কয়েক শতাব্দী সোনারগাঁ মুসলিম শাসকদের রাজধানী হিসেবে মর্যাদা লাভ করে।’ ‘১৩৩৮-১৫৩৮ খিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমল বলা হয়। এই সুলতানি আমল বাংলার ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ বাংলার পূর্বাঞ্চল সোনারগাঁকে স্বাধীন বলে ঘোষণা করেন এবং এটি পূর্ব বাংলার স্বতন্ত্র রাজধানী হিসেবে প্রথম মর্যাদা লাভ করে।
এরপর শামস্-আল-দীন ইলিয়াস শাহ (১৩৪২-১৩৫৭), ইখতিয়ার- আল-দীন গাজী শাহ (১৩৪৯-১৩৫৩), সিকান্দার শাহ (১৩৫৭-১৩৯১), গিয়াস-আল-দীন-আযম শাহ (১৩৯২-১৪১০). সাইফ-আল-দীন-হামযা শাহ (১৪১০-১৪১১), আলা-আল-দীন হোসেন শাহ (১৪৯৩-১৫১৯) প্রমুখ ইলিয়াস শাহী এবং হোসেন শাহী সুলতানগণ বাংলার রাজধানী সোনারগাঁ থেকে শাসনকার্য পরিচালনা করেন।
বার ভুঁইয়া প্রধান মসনদ-ই-আলা ঈসা খানের আমলে (১৫৬০) সোনারগাঁ বাংলার রাজনৈতিক পরিম-লে খ্যাতির শীর্ষে আরোহণ করে। আনুমানিক ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে ঈসা খান মুঘল সৈন্যদের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। সুলতানি শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বেই সোনারগাঁও শহরাংশে দিল্লির সুলতান বলবনের আদেশে ১২৮২ সালে প্রসিদ্ধ মুসলিম সুফি শায়খ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা এসে ‘জামেয়া’ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই জামেয়া তৎকালীন বিশ্বে খুবই প্রশংসিত ছিল। এখানে বিভিন্ন দেশ থেকে ছাত্র ফিকাহ শাস্ত্র, হাদিস শাস্ত্র অধ্যয়ন করার জন্য আসতেন। বিহারের মানের প্রদেশের ইয়াহইয়া মানেরী এখানে এসে জ্ঞান আহরণ করে নিজ দেশে ফিরে গিয়ে প্রসিদ্ধ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর সমাধি আজও মানেরে বিদ্যমান আছে। আবু তাওয়ামা সোনারগাঁওকে শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রভূমি করেছিলেন। তিনি ১৩০০ সালে ইন্তেকাল করেন এবং তাঁর সমাধি সোনারগাঁয়ে চিহ্নিত হয়। পরবর্তী সময়ে এ জামেয়ার স্বনামধন্য শিক্ষকগণ নিজেদের গুণে তা পরিচালনা করেন। পান্ডুয়ার আলাউল হক এ জামেয়ার অধ্যাপনা করেন। সুলতান গিয়াসউদ্দিন ও আলাউলের পুত্র নূর কুতবে আলম ও খান আল আযম এখানে অধ্যয়ন করেন। তাঁরা প্রত্যেকেই সে যুগের বিখ্যাত সুফি, প-িত ব্যক্তি ছিলেন। এই সোনারগাঁয়ের মধ্যে দিয়েই নির্মিত হয় ষোড়শ শতকের দিল্লির শাসক শের শাহের প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক গ্রান্ড ট্রাংক রোড, যা সিন্ধু থেকে সোনারগাঁয়ে এসে শেষ হয়।
সোনারগাঁ শুধু প্রশাসনিক দিক দিয়েই নয় ধর্ম, সংস্কৃতি, শিল্পকলা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানেও প্রভুত উন্নতি সাধন করেছিল। এখানকার প্রাচীন সমাধি, মসজিদ ও স্থাপত্য নিদর্শনই এর যথার্থ প্রমাণ বহন করে। মধ্যযুগে সমাজ তথা রাজনীতি ও অর্থনীতিতে সোনারগাঁ বিদেশি খ্যাতনামা প্ররিব্রাজক ও ব্যবসায়ীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিল। মধ্যযুগে সোনারগাঁ ছিল একটি সমৃদ্ধশালী শহর।
ইবনে বতুতা (১৩৪৫-১৩৪৬) ‘সোনারগাঁকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী রূপে বর্ণনা করেন। তিনি চিন, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়দ্বীপের সঙ্গে সোনারগাঁয়ের সরাসরি বাণিজ্যিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন’। ইবনে বতুতার বর্ণনা থেকে আরও জানা যায় যে, ‘সোনারগাঁয় ধান, আখ, সরিষা উৎপন্ন হতো। প্রচুর চাউল সোনারগাঁও বন্দর দিয়ে শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি করা হতো।
‘চিনের পরিব্রাজক মাহুয়ান (১৪০৬) সোনারগাঁকে একটি বিরাট বাণিজ্যিক শহর হিসেবে দেখতে পান। ফাহিয়েন (১৪১৫) সোনারগাঁকে বহু পুকুর, পাকা সড়ক ও বাজার সমৃদ্ধ একটি সুরক্ষিত এলাকা এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্ররূপে উল্লেখ করেন। সেখানে সব ধরনের পণ্য সামগ্রী মজুদ ও বিক্রয় করা হতো।’
‘পর্যটক ভারথেমো সোনারগাঁও বন্দরকে সমৃদ্ধশালী বলেছেন। তাঁর মতে এ বন্দরের যত ব্যবসায়ী আছে এত আর কোনো বন্দরে তিনি দেখেননি। এ বন্দরে সোনা রূপার মুদ্রার পাশাপাশি কড়ি বিনিময়ের মাধ্যম ছিল। কড়ি সাধারণ লোকেরা ব্যবহার করত।’
রালফ্ ফিচ বর্ণনা করেছেন, ‘সেকালে সোনারগাঁ থেকে প্রচুর তাঁতবস্ত্র, পৃথিবী বিখ্যাত মসলিন, ভারত, শিংহল, পে-, মালাক্কা, সুমাত্রাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হতো। সোনারগাঁ থেকে এক সময় জাভাদ্বীপের সাথে জলপথে বাণিজ্য চলতো।’
‘১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দে ঈসা খানের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র মুসা খান ‘মসনদ-ই-আলা’ উপাধি ধারণ করে সোনারগাঁয়ের জমিদারিতে অভিষিক্ত হন। তিনিও তাঁর পরাক্রমশালী পিতার মতো মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বার ভুুঁইয়াদেরকে অনুপ্রাণিত করেন। তিনি স্বাধীনভাবে দেশ শাসন করতেন। সে সময় সোনারগাঁ একটি সমৃদ্ধশালী বাণিজ্যকেন্দ্র এবং কোলাহলমুখর গুরুত্বপূর্ণ নগরীতে পরিণত হয়’। সোনারগাঁ ঈশা খান ও তাঁর পুত্র মুসা খানের রাজধানী শহর ছিল। এই অঞ্চল মুঘল অধিকারে যাওয়ায় এটি মসলিন বিক্রয়ের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, একদা সোনারগাঁও অঞ্চল ব্যবসায়-বাণিজ্যে সারাবিশ্বে বিখ্যাত ছিল। ব্যবসায়-বাণিজ্যে প্রসিদ্ধতম জায়গা হিসেবে বিশেষ করে মসলিন কাপড়ের জন্য ‘সোনারগাঁও’ এবং সমুদ্রবন্দর জাহাজ নির্মাণ শিল্পের জন্য ‘চট্টগ্রাম’ এ দুটি জায়গার নাম সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। সোনারগাঁও এবং এর আশেপাশে তৈরি মসলিন রপ্তানি হতো ইউরোপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে। বাংলাদেশ চিরকাল বাণিজ্যের খ্যাতিতে প্রলুদ্ধ হয়ে আরবগণ স্মরণাতীতকাল থেকে বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপন করে এ দেশে শুভাগমন করেন। বাণিজ্যে এ অঞ্চলের শ্রীবৃদ্ধির ফলে ইতিহাসখ্যাত তাম্রলিপ্ত এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সপ্তগ্রামের সাথে এর প্রতিযোগিতা চলতো। এ অঞ্চলের বাণিজ্য খ্যাতি প্রাচ্যের দেশ ছেড়ে সুদূর ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। খিস্ট্রীয় ষোড়শ শতাব্দীতে প্রর্তুগিজরা এখানে এসে বাণিজ্য আরম্ভ করেন। তারা সপ্তগ্রামকে চড়ৎঃড় চরয়ঁবহড় এবং চট্টগ্রামকে চড়ৎঃড় এৎধহফড় নামে অভিহিত করেন।
মুঘল সুবেদার ইসলাম খানের সময়ে ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে জাহাঙ্গীরনগরে ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তরিত হওয়ার পর থেকে সোনারগাঁয়ের গুরুত্ব ম্লান হয়ে যায়। রাজধানী স্থানান্তরের অন্যতম কারণ ছিল নদী রেখার পরিবর্তন। ঊনিশ শতকের প্রথমার্ধে সুবর্ণগ্রাম জঙ্গলে পরিব্যপ্ত অঞ্চলে পরিণত হয়। এর উপকন্ঠে পরিত্যাক্ত জঙ্গলাবৃত অঞ্চলের সামান্য অংশে ধীরে ধীরে একদা গড়ে উঠে পানাম সিটি। সেখানে উপনিবেশিক সভ্যতার স্থাপত্য নিদর্শন প্রত্যক্ষ করা যায়। এখানে বেশ কিছু সনাতন ধর্মীয় ব্যবসায়ীর ভগ্নপ্রায় জমকালো ঘড়বাড়ি আজও বিস্ময় জাগায়। একদা সোনারগাঁয়ের খাসনগর দিঘির পাড়ে ভুবন বিখ্যাত মসলিন তৈরি হতো। এরই ধারাবাহিকতায় এখন সোনাগাঁয়ে তৈরি হয় আশা জাগানিয়া জামদানি। এখানকার পানাম সিটি এক সময়ে সোনাগাঁয়ের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল। তখন থেকে পানাম সিটি সোনারগাঁয়ের উল্লেখযোগ্য এবং অতীতের সমৃদ্ধশালী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এটি পরিখা দ্বারা পরিবেষ্টিত সুরক্ষিত দুুর্গের মতো ছিল।
দর্শনীয় স্থাপনা
সময়ের পালা বদলে প্রারম্ভিক প্রাচীন রাজধানী শহর সোনারগাঁয় এসেছে অনেক পরিবর্তন। দ্রুত নগরায়নের ফলে বদলে গেছে পুরোনো চেহারা। ইতিহাস ঐতিহ্যেঘেরা সোনারগাঁয় রয়েছে অনেক দর্শনীয় নিদর্শন। দর্শনীয় স্থাপনার মধ্যে পানাম সিটি, পানাম ব্রিজ, পানাম বন্দর, ট্রেজারার হাউস, গোয়ালন্দি মসজিদ, গ্রান্ডট্রাংক রোড, খাসনগর দিঘি, গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের সমাধি, পাঁচপীরের সমাধি, শাহ্ আব্দুল হামিদ মসজিদ মানা শাহ দরবেশের সমাধি, শেখ মাহমুদ সমাধি, ইব্রাহীম দানিশমাদের সমাধি, শায়খ শরফদ্দিন আবু তাও যামার সমাধি, জামেয়া বা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মুয়াজ্জামপুর মসজিদ, শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আশ্রম, সোনাকান্দা দুর্গ, লাঙ্গলবন্দে পূণ্য¯œান এবং সর্বশেষ বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন। ফাউন্ডেশনের প্রশাসনিক ভবনের সম্মুখের পুষ্পিত বাগানে ভাস্করশিল্পী শ্যামল চৌধুরী নির্মিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণদানের আদলে পিতলের তৈরি সুউচ্চ ভাস্কর্য। ফাউন্ডেশনের মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে নির্মিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেলের ভাস্কর্য। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের ভাস্কর্য। জাদুঘরের অভ্যন্তরে প্রদর্শিত নকশিকাঁথায় বাংলাদেশের মানচিত্র। লোক ও কারুশিল্প গ্রন্থাগার, সোনারতরী মঞ্চ। ভারতের ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আলাদা একটি স্থান দখল করে আছেন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী শ্রী জ্যোতি বসু। তাঁর পৈতৃক বাড়িটি সোনারগাঁয়ের বারদীতে অবস্থিত। মোগরাপাড়ায় ১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত শ্রী শ্রী গৌর-নিতাই জিউর আখড়া মন্দির। মানুষের বিনোদনের জন্য হালে নির্ণিত বাংলার তাজমহল সোনারগাঁ উপজেলার পেরাব গ্রামে অবস্থিত।
গিয়াস উদ্দিন আজম শাহের সমাধি
এ সমাধি সৌধটি সোনার গাঁয়ের শাহচিল্লাপুরে অবস্থিত। এটি সুলতানি আমলের তৈরি একটি প্রাচীনতম সমাধি সৌধ। গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ ইলিয়াস শাহী বংশের সবচেয়ে স্বনামধন্য সুলতান ছিলেন। বাংলার সুলতান সিকান্দার শাহ নিহত হলে ১৩৯৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সিংহাসনে আরোহন করেন। বাংলাদেশের সমস্ত স্বাধীন সুলতানদের মধ্যে তাঁর মত বর্ণাঢ্য চরিত্রের আর কোন সুলতান ছিলেন না। তাঁর ন্যায়বিচার, বদান্যতা, বিদ্যোৎসাহিতা, ধর্মানুরাগ ও কাব্যচর্চার বহু ঘটনা ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন।
পারস্যের খ্যাতনামা কবি হাফিজ শিরাজীর ‘দীওয়ান-ই-হাফিজ’ সংকলিত একটি কবিতা বাংলাদেশ ও সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহের নাম মুসলিম বিশ্বে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।
সুলতান গিয়াস উদ্দিন মক্কা শরীফে একটি মাদ্রাসা ও একটি মুসাফির খানা নির্মাণ এবং মক্কা বাসীদের পানি সরবরাহের সুব্যবস্থার উদ্দেশ্যে একটি পানির নহর খননের জন্য বহু সাহ¯্র স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় করেন। তাঁর অর্থে নির্মিত মাদ্রাসাটি গিয়াসিয়া মাদ্রাসা নামে পরিচিত ছিল। মাদ্রাসা ও মুসাফির খানা পরিচালনার ব্যয় নির্বাহের জন্য দু’টি খেঁজুর বাগান বহু অর্থে ক্রয় করে ওয়াকফ করে দেন। ইসলামি শিক্ষা বিস্তারে গিয়াসিয়া মাদ্রাসার বিরাট অবদান সর্বজনস্বীকৃত (তারিখে মক্কা, মুফতী কুতবুদ্দীন)।
পানাম সিটি
ড. হাবিবা খাতুন ‘ইতিহাস ও প্রতœতত্ত্বের নিরিখে সোনারগাঁ ও ঈসা খাঁন পরিচিতি’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, ‘পানাম নামের কোনো অর্থ পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি পানাম শব্দের ফার্সি উৎস সম্পর্কে জানা গেছে যে, এর অর্থ আশ্রয়স্থল হতে পারে। ঈসা খাঁ মুঘলদের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে সোনারগাঁয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। স্থানটি নিশ্চয়ই অধিকতর সুরক্ষিত ছিল। তাঁর এ আশ্রয়স্থল পানাম হতে পারে। যদিও ইতিহাসে ঈসা খাঁর আশ্রয়স্থল নির্দিষ্ট করা হয়নি।’

পানাম সিটির চারদিকে পরিখার মধ্যভাগে নির্মিত হয়েছিল লাল ইটের ইমরাত। পুরাতন ছোট ছোট ইট-সংযোগে তৈরি এ ইমারতগুলো প্রাচীনকালের গৌরবময় ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ব্রিটিশ সময়কালে ইংরেজরা এখানে নির্মাণ করেছিল নীলকুঠি, যা আজও ‘কোম্পানি কুঠি’ নামে পরিচিত। জমিদার এবং ব্যবসায়ীরা এখানে রাস্তার দু’ধারে আবাসিক কোয়ার্টার নির্মাণ করেছিলেন। এখানে মুঘল আর ব্রিটিশ শৈলী মিলে একাকার। কোথাও হাত মিলিয়েছে ভারতীয় আর ব্রিটিশ স্থাপত্য। কোথাও চোখে পড়ে সুক্ষ্ম পাথরের কারুকাজ।
আনুমানিক ৫ মিটার প্রশস্ত রাস্তার দু’পাশ ঘিরে গড়ে ওঠে এই পানাম সিটি। এটি একটি একক বৈশিষ্ট্যম-িত নয়নাভিরাম সিটি। বর্তমানে রাস্তার উত্তর পাশে ৩১টি এবং দক্ষিণ পাশে ২১টি ইমরাতসহ মোট ৫২টি ইমরাত রয়েছে। ইউরোপীয় স্থাপত্যের অনুকরণে রূপায়িত হয় পানাম সিটির ইমরাতগুলোর অলঙ্করণ নকশা। কোথাও কোথাও স্থানীয় নকশাও ব্যবহৃত হয়।
প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের প্রাক্তন মহাপরিচালক ড. শফিকুল আলম বলেন ‘বর্তমানে পানাম সিটির প্রাচীন স্থাপত্য অবকাঠামো সংস্কার সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। পানাম সিটির সুরম্য ভবনগুলো ও এর পরিবেশ সংরক্ষণ করে একটি আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করার উদ্দেশ্যে এ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। মুঘল ও ব্রিটিশ সময়ে নির্মিত এই পানাম সিটিতে যে সব হর্মরাজি, বাসভবন, নাচঘর, মঠ, টাকশাল, পুকুরঘাট, গোসলখানা, দরবার হল, ব্রিজ, নীহারিকা, রেস্ট হাউজ কালোত্তীর্ণ হয়ে প্রকৃতি- পরিবেশের সঙ্গে সংগ্রাম করে টিকে আছে সেগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা এ প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য।
এসএম তাইফুরের মতে,  ‘ঞৎধপবং ড়ভ ড়ষফ ভড়ৎঃরভরপধঃরড়হ ধহফ সড়ধঃং পড়ঁষফ ংঃরষষ নব ভড়ঁহফ ঃযবৎব. ওঃ রং ঢ়ৎবংঁসবফ ঃযধঃ ধঃ ড়হব ঞরসব ঃযরং ঢ়ষধপব পড়হঃধরহবফ ঃযব ধপঃঁধষ ংবধঃ ড়ভ ঃযব ৎঁষবৎং ড়ভ ঝড়হধৎমধড়হ.’ অর্থাৎ, ‘প্রাচীন দূর্গ ও পরিখার নিদর্শন এখনো সেখানে খুঁজে পাওয়া যায়। এ থেকে ধারণা করা হয় যে, এ এলাকাটিই এক সময়ে সোনারগাঁয়ের শাসকদের মূল রাজধানী ছিল।’ তাছাড়া এখানে এক সময়ে ছিল ট্রেজারার হাউস, অস্ত্রাগার, নীহারিকা, রেস্ট হাউসসহ স্মৃতি বিজড়িত অনেক ইমারত। এই ইমারতকুলো রাস্তার দু’পাশে সারিবদ্ধভাবে নির্মিত এবং দেশের শহর এলকার বাড়ির অনুরূপ বৈশিষ্ট্যের সবগুলো ইমারতের সম্মুখভাগ রাস্তার দিকে অবলোকন করা যায়। চুন-সুরকির গাঁথুনি দিয়ে এই ইমারতগুলো নিপুনভাবে নির্মাণ করা হয়।
এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ‘ঝড়হধৎমধড়হ চধহধস’ গ্রন্থটি এসব ইমারতের সময়কাল উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে, ‘ ঞযব ঢ়ৎবংবহঃ নঁরষফরহম ড়ভ চধহধস ঘধমধৎ পধহ ধঃ নবংঃ নব ফধঃবফ  নধপশ ঃড় ঃযব ষধঃব ১৮ঃয ড়ৎ বধৎষু ১৯ঃয পবহঃঁৎু. ঝড় রঃ রং াবৎু ষরশব ঃযধঃ ঃযব পড়ষড়হরধষ ঢ়বৎরড়ফ ংঃৎঁপঃঁৎবং মৎবি ঁঢ় ড়হ ঃযব ংরঃব ধহ বধৎষরবৎ ড়পপঁঢ়ধঃরড়হ ড়ভ ঃযব গঁংষরস ঢ়বৎরড়ফ. ঙহষু ধৎপযধবড়ষড়মরপধষ বীপধাধঃরড়হং রহ ঃযব ধৎবধ পধহ বরঃযবৎ ঢ়ৎড়াব ড়ভ ফরংঢ়ৎড়াব ঃযরং যুঢ়ড়ঃযবংরং’ অতীত ঐতিহ্য সংবলিত এ সিটির গৌরবময় দিনের নিদর্শন না থাকলেও ভগ্নপ্রায় ইমারতগুলো যে কোনো ঐতিহ্যপ্রেমী মানুষের কাছেই মূল্যবান। এই পানাম সিটির একটি সরকারি রিকুউজিশনকৃত পুরোনা রেস্ট হাউস সংস্কার করে ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ অস্থায়ীভাবে লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরের কাজ শুরু করা হয়। পানাম সিটি যার সাথে জড়িয়ে আছে সোনালি অতীতের স্মৃতি। পরিখা পরিবেষ্টিত ঘুমন্তপ্রায় এ শহর জমিদার, ব্যবসায়ী, পর্যটকদের পদভারে মুখরিত থাকতো। অনিন্দ্যসুন্দর এসব অট্টালিকা যে কোনো ঐতিহ্যপ্রেমী ও সংস্কৃতিমনা মানুষের কাছেই মূল্যবান।
শেষ কথা
অনিন্দ সুন্দর ও মাধুর্যম-িত এই ঐতিহ্যবাহী সোনারগাঁ শুধু অতীতের স্মৃতি বহন করাবার জন্য নয়, যদি মনের মাধুরী মিশিয়ে আমরা স্বচক্ষে দেখার সুযোগটাকে কাজে লাগাই তবে সেটির আরও বাস্তব তথ্য সম্পর্কে আমরা অবগত হব। এই বাংলার আনাচে-কানাচে এত কিছু দেখার আছে, জানার আছে যা দৃষ্টিগোচর হয়নি। কেন আমরা সাত সমুদ্র, তেপান্তর পাড়ি দিয়ে বিদেশ যাব? অনেক কিছু এখানো অদেখা রয়ে গেছে- তাই সেই ভাষ্যটি আজ বার বার মনে হচ্ছে – ‘দেখা হয় নাই চুক্ষ মেলিয়া ঘর হইতে শুধু দু’পা ফেলিয়া, একটি ধানের শীষের উপর একটি শিশির বিন্দু।’ গাজী মাজহারুল আনোয়ারের ভাষায়- “একবার যেতে দেনা আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়। যেথায় কোকিল ডাকে কুহু কুহু, দোয়েল ডাকে মুহু মুহু, নদী যেথায় ছুটে চলে আপন ঠিকানায়।”
লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইতিহাস বিভাগ, বঙ্গবন্ধু ডিগ্রি কলেজ, রাজশাহী এবং  সভাপতি, বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনী, রাজশাহী।