প্রাথমিকের গণ্ডি না পেরানো জিয়াউল পড়াশোনা করিয়েছেন ১০ হাজার শিক্ষার্থীকে

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৪, ১২:০৫ পূর্বাহ্ণ


মাহী ইলাহি:এবারে সমাজসেবায় অবদান রাখার জন্য একুশে পদক পেয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ভোলাহাট উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের জিয়াউল হক। শৈশবে পেরুতে পারেননি প্রাথমিকের গণ্ডি। কিন্তু পড়াশোনা করিয়েছেন প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থীকে। যার লাইব্রেরিজুড়ে আছে শুধু অ্যাকাডেমিক বই। আছে ধর্মীয় গ্রন্থ। নিজে না খেয়েও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন। করেছেন স্কুল-মাদ্রাসা, মসজিদ। নিজ থেকে দেন অনুদানও। দই বিক্রির লভ্যাংশ থেকে তিনি এসব করেছেন।

প্রাথমিকের বৃহস্পতিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে উপজেলার মুশরিভুজা গ্রামে তার বাসায় গিয়ে পাওয়া গেল তাকে। একুশে পদক পাওয়ার পর তার বাড়িতে সাধারণ মানুষের আনাগোনা বেড়েছে। সবাই যাচ্ছে মূলত তার সাথে ছবি তোলার জন্য। রাখছেন আবদারও। তবে পাঞ্জাবিতে বেশ অস্বস্তিবোধ করছিলেন দেখেই বোঝা যাচ্ছিল।

তার বাড়িতে ঢুকতেই হাতের বামে একটি রুম নিয়ে লাইব্রেরি। আছে বড় আকারের পড়ার টেবিল। দুটি আলমারি ও পাঁচটি শোকেসে সাজানো আছে বই। এছাড়াও তাকে রাখা আছে অনেক বই। জিয়াউল হকের বাড়ির মধ্যে ঢুকতেই এগিয়ে আসেন তিনি। হাত বাড়িয়ে দেন হ্যান্ডশেক করার জন্য। জানতে চাইলেন কোথা থেকে আসা হয়েছেÑ রাজশাহী থেকে- হাসলেন এক গাল। বললেন, রাজশাহী শহরেও ফেরি করে দই বিক্রি করেছি। তা এত দূর থেকে কী মনে করে- প্রশ্ন করলেন তিনি। তার সাক্ষাৎ নেওয়ার জন্য যাওয়াতে খুশি হয়েছেন আরও। নিয়ে গেলেন লাইব্রেরির মধ্যে।

নিজে থেকে বলতে লাগলেন কথা। বললেন, ‘একুশে পদক পাবো তা স্বপ্নেও ভাবিনি। আমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। আমি যে মানুষকে সহযোগিতা করতাম তার সবচেয়ে বড় পুরষ্কার পেয়েছি। আমার আর কিছু প্রয়োজন নেই। প্রধানমন্ত্রী আমাকে নিজ হাতে গলায় মেডেল পরিয়ে দিয়েছেন। তিনি যে আমাকে সম্মানিত করেছেন এরচেয়ে আর বেশি কিছু আশা করা যায় না।’

জিয়াউল হকের জন্ম ১৯৩৪ সালের ৬ জুন। ৯০ ছুঁই ছুঁই করছে তার বয়স। এখনও বিক্রি করেন দই। তৈয়ব আলী ও মা শারিকুন নেছার প্রথম সন্তান তিনি। বাবা ছিলেন গোয়ালা। বাবা বিক্রি করতেন দুধসহ বিভিন্ন মিষ্টি। ছোট থেকেই করতেন বাবাকে সহায়তা। ১১ বছরে তাঁর শিক্ষাজীবনে ইতি টানতে হয়েছে। এরপর তিনিও গোয়ালা হয়ে উঠেন। বিভিন্ন বাড়িতে দুধ দিয়ে বেড়াতেন। হাটে বিক্রি করতেন দইসহ মিষ্টান্ন খাবার।

জিয়াউল হক বলেন, ‘দুই আনার জন্য আমার আব্বা আমাকে প্রাথমিকের পড়াশোনা করাননি। তখনকার শিক্ষাব্যবস্থা এত সহজ ছিল না। ১৯৫৫ সালে এক টাকায় পাঁচ কেজি চাল মিলত। আব্বা ছয়জনের সংসার চালাতেন। সে সময় আমাদের ছয়জনের সংসার চালাতে আব্বাকে হিমশিম খেতে হতো। তাই তিনি আমাকে তার সাথে কাজে নিলেন। তিনি আমাকে দুধ দিতেন, আমি দই বানিয়ে হাটে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতাম।’

কিন্তু প্রাথমিকের পড়াশোনা না করানোর জেদ থেকে গিয়েছিল জিয়াউল হকের মাথায়। মনের মধ্যে ছিল প্রাথমিকের গণ্ডি স্কুলে যাওয়ার আকুতি। এই আকুলতা থেকেই যারা তার মতো স্কুল থেকে ঝরেপড়া তাদের বাঁচাতে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তিনি। নিজের দই বিক্রি করা টাকায় সঞ্চয় না করে তিনি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। ১৯৬২ সাল থেকে শুরু করেন তিনি মানুষকে সহযোগিতা করা।

দই বিক্রি করতে গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে বেড়ানো জিয়াউল হক সঞ্চয় করা শুরু করেন। পাঁচ বছর পর হাতে কিছু টাকা এলে সিদ্ধান্ত নেন প্রাথমিকের স্কুলের ঝরেপড়া শিশুদের জন্য কিছু করবেন। তিনি বলেন, ‘আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে জমিজমা কিনব না, বিলাসিতায় গা ভাসাব না। স্কুলের শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া থেকে রক্ষায় কাজ করব। জমানো টাকা দিয়ে পাঠ্যবই কিনে মুশরিভুজা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করি।’

প্রথমে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য এবং পরে হাইস্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য দই বিক্রি করে বই কিনতে শুরু করেন তিনি। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার সরকার যখন স্কুলের বই বিনামূল্যে দেওয়া শুরু করল, তখন আমি কলেজ থেকে ঝরে পড়াদের মধ্যে প্রাথমিকের পাঠ্যপুস্তক দিতে উদ্যোগ নিই। পাঠ্যপুস্তক সমাজ গঠনে যথেষ্ট নয়। গ্রামের মানুষদের আরও শিক্ষিত করে তুলতে হবে। সমাজ বিকশিত করতে গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নন-ফিকশন ও ধর্মের বই কেনা শুরু করলাম।’

জিয়াউল হক বলেন, ‘শুরুর দিকে এই এলাকায় অল্প কয়েকজন দই বিক্রি করতেন। আমার বিক্রি ছিল বেশি। দূরদুরান্তে এমনকি আশেপাশের জেলা ঘুরে দই বিক্রি করতাম। এ কারণে আমি টাকা জমাতে পারতাম। যারা আমার সাথে দই বিক্রি করতেন তাদের জমি-জায়গা, বাড়ি-গাড়ি সব করেছে। আমি শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করে গেছি।’

তার দই বিক্রি থেকে বছরে ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা জমাতেন তিনি। সামাজিক কাজে এই টাকা খরচ করতেন। তার সামাজিক কাজ সমমনা ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোকে অনুপ্রাণিত করে। অনেকে তাকে অনুদান দিতে এগিয়ে আসেন। তিনি বলেন, ‘যেসব অনুদান পেয়েছি তার সবটুকু দিয়ে আমি আমার কার্যক্রম বাড়িয়েছি। প্রায় ১৭ দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের জন্য টিনের বাড়ি কিনেছি। ২০টির মতো নলকূপ স্থাপন করেছি। দরিদ্র ব্যক্তির কন্যাদের বিয়েতে সহযোগিতাও করা হয়।

জিয়াউল হক মুশরিভুজা স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সাতটি মাদ্রাসা ও তিনটি এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেছেন। এসব প্রতিষ্ঠানে তিনি বছরে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা
অনুদান দেন। চক্ষু শিবির করে প্রায় ৭২ জনকে বিনামূল্যে ছানি অপারেশন করিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘বই পড়ে প্রায় ৪৫০ শিক্ষার্থী এখন দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকরি করছে। তারা নিয়মিত আমার খোঁজ-খবর রাখে। টাকা দিয়ে সহায়তাও করে।’

জিয়াউল হকের সংগ্রহে আছে ১৪ হাজার বই। এর নাম দেন ‘জিয়াউল হক সাধারণ পাঠাগার’। ১৯৬২ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তার সব খরচের হিসাব সংরক্ষণ করা আছে বলে জানান তিনি। বলেন, ‘এখন পর্যন্ত প্রায় তিন কোটি ৭৫ লাখ টাকার বই কিনেছি।’

তিনি বলেন, ‘একুশে পদকসহ চার লাখ টাকা পেয়েছি। এর মধ্যে এক লাখ টাকা স্কুলে ও আরও এক লাখ টাকা দেব মাদ্রাসায়। এক লাখ টাকা আমার লাইব্রেরির জন্য রেখেছি। বাকিটা এতিম শিশুদের জন্য দেব।’

জিয়াউল হক বলেন, ‘একুশে পদক পাওয়ার পর থেকে খুব আনন্দ হচ্ছে। এত আনন্দ আমি ধরে রাখার জায়গা খুঁজে পাচ্ছি না। আমি প্রধানমন্ত্রীর সাথে অনেকক্ষণ কথা বলেছি। অন্যরা কেউ সেভাবে বলতে পারেনি। তিনি আমাকে আমার প্রতিষ্ঠা করা মুশরিভুজা স্কুল অ্যান্ড কলেজ সরকারিকরণ করবেন। এছাড়া আমার লাইব্রেরির জন্য তিনি জায়গা দেবেন বলে আশ^স্ত করেছেন।’

তবে তাঁর আক্ষেপ ও ক্ষোভও আছে। একুশে পদকের নাম ঘোষণা থেকে এখন পর্যন্ত স্থানীয় সংসদ তাকে একবারও কল করেননি। সহযোগিতা করেননি কোনো রাজনৈতিক দলের নেতারা। তিনি বলেন, ‘আমার এলাকার কিছু বাসিন্দা আমার ওপর ক্ষুব্ধ। তাদের আশঙ্কা, আমি যদি ছেলে- মেয়েদের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে থাকি তাহলে তারা তাদের বাড়িতে কাজ করার জন্য গৃহকর্মী পাবে না বা ফসলের মাঠের শ্রমিক সংকট দেখা দেবে। তারা আমার বাড়ি ও লাইব্রেরি জ্বালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে বেশ কয়েকবার। স্থানীয়দের চাপের কারণে চামা মুশরিভুজা থেকে বর্তমান মুশরিভুজা বটতলা এলাকায় নিজের বাড়ি ও গ্রন্থাগার স্থানান্তর করতে হয়েছে।’

১৯৫৮ সালে জিয়াউল হক তার চাচাতো বোন সারাবান তহুরাকে বিয়ে করেন। তাদের দুই মেয়ে। একজনের বয়স ৬০ বছর ও আরেকজনের ৫৮ বছর। ২০০৩ সালে অসুস্থ হয়ে মারা যান সারাবান তহুরা। এরপর ২০০৪ সালে বিয়ে করেন ফরিদা হককে। তাদেও ঘরে এক পূত্র সন্তান আছে। এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী সে। তার নাম মহব্বত হক বাঁধন। জিয়াউল হক বলেন, ‘সামাজিক কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য পরিবার ছোট রেখেছি। সমাজসেবার দীর্ঘ পথচলায় অনেক স্মৃতি।’
২০০৬ সালে পেয়েছেন ইউনিলিভার বাংলাদেশ ‘সাদা মনের মানুষ’ উপাধী। এ পর্যন্ত তাঁর ঝুলিতে আছে প্রায় ৪০টি পদক। যা সাজানো তার তার হাতে প্রতিষ্ঠা করা লাইব্রেরিতে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটা হারিয়েও ফেলেছেন।

ভোলাহাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাশেদুল ইসলাম বলেন, জিয়াউল হক পাঠাগার একটি স্থায়ী রূপ পাবে। আমরা বেশ কয়েকটি জায়গা দেখে রেখেছি। পাঠাগারটি বিশাল করতে চায়। জেলা প্রশাসক মহোদয় যা বলবেন তাই করা হবে। কিন্তু আমরা আদেশ পাইনি। আর স্কুলটির বিষয় দেখবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এগুলো খুব দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Exit mobile version