প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষকদের বেতন বাড়ছে

আপডেট: September 23, 2020, 12:10 am

মো. ওসমান গণি:


বিশ্বের অনেক দেশেই প্রথম মর্যাদাবান পেশা হচ্ছে শিক্ষকতা। আর্থিকভাবেও শিক্ষকেরা বেশি বেতন পান। ফলে তরুণ মেধাবীদের প্রথম পছন্দের চাকরি শিক্ষকতা। যেমন: ফিনল্যান্ডের উচ্চ শিক্ষা শেষ করা সবচেয়ে মেধাবীরা আসেন প্রাথমিক শিক্ষকতায়।
ব্রিটিশ ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক এবং সোসাল রিসার্চের গত বছরের এক গবেষণায় দেখা যায়, চিনের একাশি শতাংশ শিক্ষার্থী বিশ্বাস করে শিক্ষকদের সম্মান করতে হবে। বিশেষ করে ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, চিন, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও মালয়েশিয়ার শিক্ষকদের আর্থ-সামাজিক মর্যাদা অনেক উপরে। গবেষণায় দেখা যায়, আন্তর্জাতিকভাবে যে সব প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা হয় সেখানে এসব দেশের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে ভালো করেছে। তার প্রধান কারণ, মর্যাদা আছে বলেই ভালো শিক্ষক পাওয়া যায় এবং ধরে রাখাও সহজ হয় এসব দেশে। ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব টিচার্সের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা যায় যুক্তরাজ্যে বেশি কাজ ও কম বেতনের কারণে যাঁদের বয়স পঁয়ত্রিশ বছরের কম, তাঁদের প্রায় অর্ধেক সংখ্যক শিক্ষক আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দিতে পারে।
বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা মর্যাদার দিক দিয়ে অনেক পিছিয়ে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশাকে আকর্ষণীয় করার জন্য শিক্ষকদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। মানসম্মত শিক্ষার জন্য শিক্ষকের বিষয় জ্ঞানই যথেষ্ট নয়, পেশাগত প্রবণতা, পেশার প্রতি অঙ্গীকার ও নৈতিক মূল্যবোধ অত্যাবশ্যক। মানসম্মত শিক্ষার জন্য চাই যোগ্য শিক্ষক। শিক্ষার গুণগতমান বহুবিধ প্রভাবকের উপর নির্ভরশীল। যেমন: শিক্ষা অর্জনে সহায়তাকারী হিসেবে শিক্ষক, শিক্ষাক্রম, পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষার উপকরণ, আসবাবপত্র, বিদ্যালয়ের পরিবেশ, প্রতিষ্ঠান প্রধানের সুদক্ষ নেতৃত্ব ইত্যাদি। এসবের মধ্যে সবচেয়ে সর্বোৎকৃষ্ট হলো শিক্ষক। শিক্ষা ব্যবস্থাকে সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য শিক্ষা বাজেটও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক। আপাত দৃষ্টিতে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে বাজেট যথাযথ মনে হলেও শিক্ষার সাথে অন্য খাত যুক্ত করে বাজেট দেওয়ার ফলে শিক্ষা খাতে বাজেট প্রকৃতপক্ষে প্রতি বছর কমতির দিকে।
ইউনেসকো (টঘঊঝঈঙ) এডুকেশন ফ্রেমওয়ার্কে একটি দেশের জিডিপি’র ৪-৬ শতাংশ ও মোট বাজেটের ১৫-২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান ছাড়া অন্য সব দেশ শিক্ষা খাতে জিডিপি’র ৩.৮, ৩.৭ ও ৩.৬ শতাংশ ব্যয় করে। ভুটানের শিক্ষা খাতে ব্যয় জিডিপি’র ৬ শতাংশ। ভারতের শিক্ষা ব্যয় বাড়ানোর গুরুত্ব তুলে ধরে আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয় মন্তব্য করে ‘বাহান্ন বৎসর আগে কোঠারি কমিশনের সুপারিশে বলা হয়েছিল সরকারি শিক্ষা ব্যয় জাতীয় আয়ের অন্তত ৬ শতাংশ হওয়া আবশ্যক।’’(সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ০৭ আগস্ট ২০২০ খ্রি:) আমাদের দেশেও জাতীয় আয়ের ৬ শতাংশ ব্যয় করতে হবে। তবে কবে জাতীয় আয়ের ৬ শতাংশ ব্যয় শুরু হবে তা দূর অন্ত।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা ৯ মার্চ ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা ঘোষণা করেন। প্রধান শিক্ষকদের জাতীয় বেতন স্কেলের ১০ম গ্রেডে বেতন-ভাতা প্রদানে আশ্বস্ত করেন। এরপর থেকে সহকারী শিক্ষকেরা জাতীয় বেতন স্কেলের ১১তম গ্রেডে বেতন-ভাতা প্রদানের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচী পালন শুরু করেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দীর্ঘ দিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের ১০ম গ্রেডে এবং সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেডে বেতনের একটি প্রস্তাবনা অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। পরবর্তীতে অর্থ মন্ত্রণালয় সেই প্রস্তাবনাটি আবার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠায়। এরপর থেকে শিক্ষকদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকেরা ২৫ ডিসেম্বর ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে জাতীয় বেতন স্কেলের ১১তম গ্রেডের দাবিতে অনশন শুরু করে। তখন সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জনাব মোস্তাফিজুর রহমান সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেডের দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাস প্রদান করেন। সাবেক মাননীয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের আশ্বাসের ফলে সহকারী শিক্ষকেরা অনশন স্থগিত করেন। দুই বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও যখন ১১তম গ্রেডের দাবি বাস্তবায়ন হয়নি, তখন সহকারী শিক্ষকেরা আবারও কর্মসূচী ঘোষণা করেন।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকেরা টানা চারদিন কর্ম বিরতির পর ২৩ অক্টোবর ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে আবারও মহাসমাবেশের ডাক দেন। সহকারী শিক্ষকেরা মহাসমাবেশ সফল করার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে একত্রিত হয়। কিন্তু পুলিশের বাঁধায় সহকারী শিক্ষকেরা মহাসমাবেশ সফল করতে পারেনি। পুলিশ সহকারী শিক্ষকদের লাঠিচার্জ করে শান্তিপূর্ণ মহাসমাবেশ ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
উল্লেখ্য, ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য নিরসনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়া দেশের প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মোবাইল ফোনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা ভয়েস ম্যাসেজ এর মাধ্যমে শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য নিরসনের বিষয়ে আশ্বস্ত করেছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেড পরিবর্তন করেন। সহকারী শিক্ষকদের তীব্র আন্দোলনের ফলে ২০২০ খ্রিস্টাব্দে ফেব্রুয়ারি মাসে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১৩ তম গ্রেডের উচ্চ ধাপে উন্নীত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু সহকারী শিক্ষকদের দীর্ঘ দিনের দাবি ছিল ১১ তম গ্রেডে উন্নীতকরণ। সে দাবি সহকারী শিক্ষকদের পূরণ হয়নি। এছাড়া সহকারী শিক্ষকেরা দাবি করে আসছে ১৩ তম গ্রেডে বেতন দিলে তাঁদের বেতন কমে যাবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সহকারী শিক্ষকদের ১৩ তম গ্রেডের উচ্চ স্কেলে বেতন নির্ধারণে ১২ আগস্ট ২০২০ খ্রিস্টাব্দে অর্থ মন্ত্রণালয় পাঁচটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষে বলা হয় ১৩ তম গ্রেডের উচ্চ ধাপে বেতন দিলে সহকারী শিক্ষকদের বেতন কমবে না বরং বাড়বে। সরকার খুব শিগগিরই প্রজ্ঞাপন জারী করে সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১৩ তম গ্রেডের উচ্চ ধাপে বাস্তবায়ন করবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার ভয়েচ ম্যাসেজ এবং ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারের বাস্তবায়ন প্রতিফলিত হবে।
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা পুরোটা জাতীয়করণ হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে শুরু এবং ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরী জ্যেষ্ঠ কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার আমলে সমাপ্তি হয়। মুজিববর্ষে আমরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা বেতন বৈষম্য দূর করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করি। আরও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করি মাননীয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী, মহাপরিচালক, সচিব ও সকল কর্মকর্তাদের। আর মাত্র কয়েক মাস পরে ২০২১ খ্রিস্টাব্দে সমগ্র জাতি স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করবে। মুজিববর্ষে এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের পূর্বে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সকল প্রকার বৈষম্য দূর হোক, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে এই কামনা করি।
লেখক, সহকারী শিক্ষক, মচমইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাগমারা, রাজশাহী।