প্রয়োজন কার, শ্রমের না শ্রমিকের

আপডেট: জুলাই ১২, ২০১৭, ১:২৩ পূর্বাহ্ণ

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন


গত ৩ জুলাই গাজীপুরের কাশিমপুরস্থ মাল্টিফ্যাবস গার্মেন্টসে ভয়াবহ বয়লার বিস্ফোরণ ঘটে। এই বয়লার বিস্ফোরণে ১৩ জন শ্রমিক নিহত হন। এই বয়লার বিস্ফোরণ সম্পর্কিত গণমাধ্যমে প্রকাশিত ৪ জুলাইয়ের  সংবাদগুলোতেও জানা যায়, তখন পর্যন্ত বেশ কয়েক জন শ্রমিক নিখোঁজ ছিল। মাল্টিফ্যাবস গার্মেন্টস কারখানায় যে বয়লারটা ব্যাবহার করা হয়েছে তা ছিল মেয়াদ উর্ত্তীণ। আর এই কারণেই বয়লার বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে জানিয়েছেন এতদসম্পর্কিত ঘটিত তদন্ত কমিটি।  শিল্প কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণ প্রতিনিয়ত ঘটে যাচ্ছে। বয়লার বিস্ফোরণে প্রাণ হারাচ্ছে নিরীহ শ্রমিক। এর কোনো প্রতিকার নেই। মেয়াদ উত্তীর্ণ বয়লার ব্যবহার করে শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটানোটা শ্রমজীবী মানুষ হত্যার সমতুল্য। এ ধরনের ত্রুটিযুক্ত বয়লার বা মেশিনারিজ ব্যাবহার করে যারা মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয় তাদের কেন বিচার হয় না? দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি দেশের শ্রমজীবীরা। তাদেরকে অনিরাপদ স্থানে কাজ করতে দিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে- তাই এই মৃত্যুর দায় রাষ্ট্রের উপরই বর্তায়।  ২০১৭ সালের ১৯ এপ্রিল দিনাজপুরের যমুনা অটো রাইস মিলের বয়লার বিস্ফোরণে নিহত হয় ১৮ হন শ্রমিক। ২০১৬ সালে  ১০ সেপ্টেম্বর টঙ্গির ট্যাম্পকো নামে সিগারেটের ফয়েল তৈরির কারখানায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে ৫০ জন শ্রমিক নিহত হন। ওই দিন বয়লার বিস্ফোরণে শ্রমিকদের সাথে কারখানার পাশ দিয়ে চলার রাস্তার পথচারীও নিহত হন। অগ্নিকা-ের কারণ ছিল কারখানাটির বয়লার বিস্ফোরণ। ওই সময় বয়লার বিস্ফোরণে আহত হয়েছিল প্রায় শতাধিক শ্রমিক। আহতদের মধ্য থেকেও পরে বেশ কয়েকজন মারা যান। ট্যাম্পকো কারখানাটির আগুন প্রায় কয়েক ঘণ্টা চেষ্টার পর নিয়ন্ত্রণে এনেছিল দমকলের কর্মীরা। বয়লার বিস্ফোরণের ফলে কারখানা ভবনটিও ধসে পড়েছিল। ৯-১০-২০১৩ তারিখে গাজীপুরের শ্রীপুরে পলমল শিল্প গ্রুপের তৈরি পোশাক কারখানা আসওয়াদ কম্পোজিটে ভয়াবহ অগ্নিকা- ঘটে আর এই অগ্নিকা-ে আবার জীবন্ত দগ্ধ হয় গার্মেন্ট শ্রমিকেরা। এই দুর্ঘঘটনার কারণও বয়লার বিস্ফোরণ। বাংলাদেশে শ্রমিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কর্মস্থলে কাজ করে যাচ্ছে। শিল্প-কারখানাগুলি কেন নিরাপদ হচ্ছে না শ্রমিকদের জন্য? গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিগত দিনের কিছু দুর্ঘঘটনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়,  ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের বাসস্ট্যান্ডের পাশে রানাপ্লাজা ধসে প্রাণ হারায় ১১২৯ জন, আহত হয় ২৫০০ বেশি আর নিখোঁজ ছিল ৯৯৬ জন। এরা সবাই পোশাক শিল্পের শ্রমিক। সাভারের আশুলিয়ায় ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর তাজরীন ফ্যাশান নামে এক পোশাক কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকা- সংগঠিত হয়। এই অগ্নিকা-ে ১২৪ জন পোশাক শিল্প শ্রমিক অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান। জীবনের তরে পঙ্গুত্ব বরণ করেন অর্ধ শতাধিক আর আহত হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন প্রায় ২০০ এর মতো। ১৯৯০ সালের ১৭ ডিসেম্বর ঢাকার মিরপুরে সারাকা গার্মেন্টেসে আগুনে পুড়ে মারা যান ৩০ জন শ্রমিক। ১৯৯০ সালের আগস্টে গ্লোব নিটিং এ আগুনে পড়ে মারা যায় ১২জন শ্রমিক। ২০০০ সালের নভেম্বর মাসে ২৫ নভেম্বর নরসিংদির চৌধুরী নিট ওয়্যারে আগুন লেগে মারা যান ৫০ জন শ্রমিক। ২০০১ সালে ৮ আগস্ট মিকো স্যুয়েটারে আগুন লাগার পর পদদলিত হয়ে মারা যান ২৪ জন শ্রমিক। ওই বছরের এই ঘটনার এক সপ্তাহের মধ্যে কাফরুলে অগ্নিকা-ে মারা যান ২৫ জন শ্রমিক। ২০০৪ সালের ৩ মে মিসকো সুপার মার্কেটে আগুন লেগে মারা যান ৯ জন শ্রমিক। ২০০০ সালের নরসিংদির শিবপুরে এক গামেন্টেসে আগুন লাগার পর  মারা যান ৪৮ জন শ্রমিক। ২০০৫ সালে নারায়ণগঞ্জের এক পোশাক তৈরি কারাখানা আগুন লেগে মারা যান ২২ জন শ্রমিক। ২০০৬ সালে ২৩ ফেব্রুয়ারি কেটিএস কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলে জীবন্ত দগ্ধ হয়ে না ফেরার দেশে চলে যান ৯১ জন শ্রমিক। ২০০৬ সালে গাজীপুরের যমুনা স্পিনিং মিলে আগুন লাগায় মারা যান ৬ জন শ্রমিক। ২০০৬ সালের মার্চ মাসে সায়েম  ফ্যাশনে আগুন লেগে মারা যান ৩ জন শ্রমিক। ২০১০ সালে গাজীপুরের গরীব এন্ড গরীব স্যুয়েটার ফ্যাক্টরিতে আগুন লেগে মারা যান ২১ জন শ্রমিক। ২০০৬ সালে ১৪ ডিসেম্বর আশুলিয়ায় হামিম গ্রুপের অগ্নিকা-ে মারা যান ৩০ জন শ্রমিক। আগুনে পুরে আর ভবন ধসে গত দুই দশকে প্রায় দুই হাজার শ্রমিকের মৃত্যু হয়। আহত হয়েছেন হাজার হাজার আর জীবনের তরে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে প্রায় হাজার খানেক কর্মজীবী মানুষকে। গাজীপুরে এক বছরে বয়লার বিস্ফোরণে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় একশ জন শ্রমিক। সারা দেশে তা হয়ে যাবে প্রায় দুই শতাধিকের কাছাকাছি। প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া বয়লার বিস্ফোরণ দেখার কি কেউ নেই? সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের যারা দায়িত্বে আছেন বয়লার পরিদর্শনের তারা কীভাবে এই দায় এড়িয়ে যাচ্ছেন? বয়লার বিস্ফারণের পর সরকারে বয়লার পরিদর্শন সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তা কিন্তু গণমাধ্যমে আসে না। সরকারের বয়লার পরিদর্শন সংশ্লিষ্ট কর্মীদের আইনের আওতায় আনা উচিত। দেশে শ্রমজীবী মানুষদের নিয়ে কথা বলার লোক নেই, যারা আছেন তারা শ্রমজীবীদের নিয়ে রাজনীতি করছেন। রাজনীতিকরা নিজেদের কায়েমি স্বর্থে শ্রমিকদের ব্যবহার করছেন। ঈদের দুই দিন আগে রংপুর মহাসড়কে সিমেন্ট বোঝাই ট্রাক উল্টে মারা যান ১৭ জন পোশাক শিল্প শ্রমিক। নিহত শ্রমিকরা গাজীপুর থেকে ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছিল। হতভাগ্য নিহত শ্রমিকের প্রায় সবার বাড়িই লালমনিরহাটে। দুর্ঘটনার পর অনেকেই এর দায় শ্রমিকদের উপর চাপিয়েছেন। কারণ, হিসেবে বলা হয়েছে কেন তারা সিমেন্টের বোঝাই ট্রাকে উঠল। মাল ভর্তি ট্রাকে ভ্রমণ করা অবশ্যই অপরাধ। তবে প্রশ্ন জাগে, সরকার ঈদের তিন দিন আগে মহাসড়কে মালামাল পরিবহণ করা যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করেছেনÑ তারপর কী করে ঈদের দুইদিন আগে গাজীপুর থেকে সিমেন্ট ভর্তি ট্রাক যাত্রী পরিবহণ করলো। এই বিষয়টি দেখার কেউ ছিল না।
একজন পোশাক শিল্প শ্রমিককের বেতন ৫৩০০ টাকা। ঈদ উপলক্ষে ঢাকা রংপুরের বাসভাড়া ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০০০ টাকা করা হয়। তাই একজন পোশাক শ্রমিক স্বল্প ভাড়ার পরিবহণ ওঠাটাই স্বাভাবিক। সরকারসহ সংশ্লিষ্টরা সবাই জানে পোশাক শ্রমিকদের আর্থিক অবস্থা। দেশের অধিকাংশ পোশাক শিল্প শ্রমিক উত্তরবঙ্গের। সরকার এবং পোশাক শিল্প মালিকরা এদের বাড়ি পাঠানো  বিশেষ ব্যবস্থা নিতে পারেন। শিল্প এলকায় যে সকল স্থানে শ্রমিকরা থাকেন তাদেরকে কর্মস্থলে আসা যাওয়ার জন্য বিশেষ বাস রয়েছে। ঈদের ছুটির সময় এই বাসগুলি শ্রমিকদের গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষ  বরাদ্দ দিতে পারেন। বিভিন্ন ঘটনায়  শ্রমিক মৃত্যুর কারণ উদঘাটিত হয় না। প্রতিটি ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়, প্রকৃত দোষী কে  তা রহস্যাবৃত থাকে। মেয়াদ উত্তীর্ণ বয়লার কেন মালিক ব্যবহার করলো- আর সরকারের যে বিভাগটি এই বিষয়টি দেখাশুনা করেন কেন তাদের নজরে পড়ল না বয়লারটি মেয়াদ শেষ। তাই এই মৃত্যুর জন্য এই দুপক্ষকে দায়ী করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া উচিত। ভবিষ্যতে এ ধরনের মৃত্যুর হাত থেকে শ্রমিকদের বাঁচাতে হলে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।  বয়লার বিস্ফোরণ বা শিল্পে আগুন লাগার নিহত শ্রমিকদের যে ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করা হয় তা নিয়েও চলে নানা কারসাজি। একজন মানুষের মৃত্যুর পর তার পরিবারকে কিছু টাকা দিলেই কি সব মিটে যায়? কিছু সরকারি কর্মীর দায়িত্ব অবহেলা আর মুনাফাখোর মালিকের লোভের রোষানলে পড়ে দেশের শ্রম সম্পদের অকাল মৃত্যু হচ্ছে।  উল্লিখিত ঘটনাগুলি পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে, শ্রমিকের জানের নিরাপত্তার প্রয়োজন নাই, প্রয়োজন আছে তার শ্রমের, শ্রম নেয়ার পর তাকে নিয়ে মালিক বা সরকার কেউ ভাবে না। তাছাড়া শ্রমিকের কর্মস্থল কতটা শ্রমবান্ধব সেই বিষয়টিও দেখার কেউ নেই।  কারণ দেশের শিল্প কারখানাগুলোতে শ্রমিক পেতে অসুবিধা হয় না।
কৃষি খাতে বাংলাদেশের শতকরা ৬০ ভাগ মানুষের জীবন জীবিকা কোনো না কোনো ভাবে নির্ভরশীল। দেশের মোট কর্মক্ষম জনসম্পদের ৪৭.৫ শতাংশ শ্রমশক্তি সরাসরি কৃষির সাথে জড়িত। দেশের কৃষির মালিকানা চলে যাচ্ছে  বড়  বড় পুঁজিপতিদের হাতে। বাংলাদেশের গ্রামগুলিতে পুঁজি বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা গড়ে তুলছে কৃষি খামার। এই টাকাওয়ালারা প্রান্তিক চাষিদের জমি মোট টাকা দিয়ে কিনে নেয় বা বাৎসরিক  ভাড়া হিসাবে খামারভুক্ত করে। আর এই কারণে প্রান্তিক চাষিরা হয়ে যাচ্ছে বেকার। এই গড়ে ওঠা কৃষি খামারগুলিতে আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে মাছসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদন করা হয়। ফলে শ্রমিকের প্রয়োজন হয় অনেক কম। আধুনিক প্রযুক্তি এবং কৃষি কাজে যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে প্রতি বছরই কৃষিখাত থেকে শ্রমসম্পদ উদ্বৃত্ত হচ্ছে। কৃষি খাতের উদ্বৃত্ত শ্রম শিল্প অভিমুখি হয়ে যায় কাজের আশায়। এই জন্য দেখা যায়, বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে  হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন ঢাকা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহের ভালুকার দিকে ছুটছে। আর এই কারণে দেশের শিল্প কারখানা মালিকেরা সহজেই শ্রমিক পেয়ে যান। তাই দেখা যায়, মালিকের কাছে শ্রমিকের শ্রমের গুরুত্বই বেশি ব্যক্তি শ্রমিকের নয়। কারণ একজন শ্রমিক কোনো কারণে মারা গেলে তাতে শিল্প কারখানায় শ্রমিক শুন্যতা সৃষ্টি হয় না। মালিকরা জানেন, অগণিত শ্রমিক কাজের আশায় তাদের শিল্প-কারখানায় আশে পাশে ঘুরছে। দেশের বিরাট জনগোষ্ঠির বেকারত্বের সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছে দেশের শিল্প মালিকেরা। তাই শ্রমিকদের জানের নিরাপত্তাটা তাদের কাছে মুখ্য না মুখ্য হলো মুনাফা। সারা দেশে শ্রমিক মৃত্যুর চিত্রটা দেখলে মনে হয় শিল্প মালিকেরা অন্যান্য কাচা পণ্যের মতো শ্রমসম্পদকে ব্যবহার করে। তাই শ্রমিকদের মৃত্যুরোধ করার জন্য তাদের কোনো ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নেই। দেশে নব্বই দশকের পর থেকে বেসরকারিভাবে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠতে শুরু করে। আর সেই সময় থেকেই ঘটতে থাকে দুর্ঘটনা।সেই হিসাবে আজকের দিনে প্রায় তিনদশক পার হলো। তারপর শ্রমিক শ্রমিক মৃত্যুর রোধ করতে কো নো দৃশ্যমান উদ্যোগ নাই। ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, প্রতিবছরই শিল্প কারখানায় দুর্ঘটনা শ্রমিক মৃত্যুর হার বেড়েই চলেছে। দেশে শ্রমসম্পদের কল্যাণে আজ বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশের দিকে এগুচ্ছে। তাই যাদের শ্রমের বিনিময়ে দেশের এই প্রাপ্তি তাদের নিরাপত্তা বিধান করা সরকারের দায়িত্ব। দেশের সাধারণ মানুষ আর একটি শ্রমিকের মৃত্যুও দেখতে চায় না। আর যেন একটি শ্রমিকের কারখানা দুর্ঘটনায় মৃত্যু না হয় সরকার ও সংশ্লিষ্টরা সেই ব্যবস্থা নিবেন, এটাই প্রত্যাশা। লেখক:- কলামিস্ট