ফিরে দেখা : এই দিনে বঙ্গবন্ধু

আপডেট: March 26, 2020, 12:23 am

২৬ মার্চ


১৯৬৬- তে সফলভাবে সমাপ্ত আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনের পর বঙ্গবন্ধু সারা দেশ চষে বেড়ান। ২৬ মার্চ সন্দ্বীপ এবং ২৭ মার্চ সাতকানিয়ার বিশাল জনসভায় ছয় দফা ব্যাখ্যা করে বক্তৃতা করেন। উত্তরাঞ্চল সফরে যান ৭ এপ্রিল। ওই দিন পাবনা ও নগরবাড়ীর জনসমাবেশে বক্তৃতা করেন। ৮ তারিখ বগুড়া, ৯ তারিখ রংপুর, ১০ তারিখ দিনাজপুর, ১১ তারিখ রাজশাহী, ১৪ তারিখ ফরিদপুর, ১৫ তারিখ কুষ্টিয়া, ১৬ তারিখ যশোর এবং ১৭ তারিখ খুলনায় বিশাল সব জনসভায় ছয় দফার বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন।
এভাবে সারা দেশে ৩৫ দিনে মোট ৩২টি জনসভায় বক্তৃতা করেন তিনি। বিপুলসংখ্যাক মানুষের অংশগ্রহণে লাগাতার জনসভায় প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতায় ছয় দফার স্বপক্ষে জনমত প্রবল হয়ে ওঠে। ফলে বঙ্গবন্ধুসহ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের ওপর নেমে আসে স্বৈরশাসক আইয়ুবের নির্মম গ্রেপ্তার-নির্যাতন। প্রতিটি জেলায় অনুষ্ঠিত সভায় প্রদত্ত বক্তৃতার প্রতিপাদ্য বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে বঙ্গবন্ধুকে প্রতিটি জেলা থেকে জারি করা ওয়ারেন্ট বলে লাগাতার গ্রেপ্তার-প্রক্রিয়া চলতে থাকে। ১৭ এপ্রিল খুলনায় এক জনসভা শেষে ঢাকা ফেরার পথে রাত ৪ টায় রমনা থানার ওয়ারেন্টে পাকিস্তান দেশরক্ষা আইনের ৪৭ (৫) ধারা বলে পুলিশ বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে। যশোর মহকুমা হাকিমের এজলাস থেকে তিনি জামিন পান। সেদিনই রাত ৯ টায় সিলেটে গ্রেপ্তার, পুনরায় জামিনের আবেদন এবং ২৩ তারিখে জামিন লাভ। ২৪ এপ্রিল ময়মনসিংহে গ্রেপ্তার, ২৫ এপ্রিল জামিন। ছয় দফা প্রচারকালে তিন মাসে আটবার গ্রেপ্তার হন বঙ্গবন্ধু। এভাবেই আইয়ুবের দমননীতি চলতে থাকে। ৮ মে নারায়ণগঞ্জের চাষাড়ায় মে দিবস স্মরণে শ্রমিক জনতার এক সমাবেশে বঙ্গবন্ধুকে বিপুল সংবর্ধনা এবং পাটের মালায় ভূষিত করে শ্রমিকরা। ভাষণ শেষে রাত ১ টায় বাসায় ফেরার পথে পাকিস্তান দেশরক্ষা আইনের ৩২ (১) ‘ক’ ধারায় ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহকর্মীসহ বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয়। ছয় দফা দেওয়াকে অপরাধ গণ্য করে বঙ্গবন্ধুকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ অভিহিত করে স্বৈরশাসক আইয়ুব আওয়ামী লীগের ওপর অব্যাহত গ্রেপ্তার-নির্যাতন চালাতে থাকে। সামরিক সরকারের এই সব কার্যকলাপের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের আহ্বানে ১৩ মে সমগ্র প্রদেশে ‘প্রতিবাদ দিবস’ পালিত হয়। প্রতিবাদ দিবসের জনসভায় ছয় দফার প্রতি গণমানুষের বিপুল সমর্থন প্রকাশ পায়। হাজার হাজার শ্রমিক এই দিন স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল করে। পল্টনের জনসভায় উপস্থিত হয়ে সরকারের দমননীতির প্রতিবাদ করে। দলের নব নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদকে গ্রেপ্তার করা হলে সাংগঠনিক সম্পাদক মিজান চৌধুরী অস্থায়ী সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নেতৃবৃন্দের গ্রেপ্তার-নির্যাতনের বিরুদ্ধে ২০ মে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটি ৭ জুন সর্বব্যাপী হরতাল আহ্বান করে।
গণমানুষ স্বাধিকার, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ সব রাজবন্দির মুক্তির দাবিতে ৭ জুন দেশব্যাপী হরতাল পালন করে। অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে সমগ্র পূর্ব বাংলা। বিক্ষুব্ধ মানুষের ওপর পুলিশ গুলি চালালে মনু মিয়া, মুজিবুল্লাহসহ অনেক শহীদের রক্তে লাল হয়ে ওঠে ছয় দফা। এ সম্পর্কে কোনো রকম প্রতিবেদন মুদ্রণ ও প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ১২-৩০ মিনিট অর্থাৎ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার হবার আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাবার্তা ওয়্যারলেস (ইপিআরদের ওয়্যারলেস) যোগে চট্টগ্রামের জহুরুল আহমেদ চৌধুরীকে প্রেরণ করেন। চট্টগ্রাম বেতার থেকে আওয়ামী লীগ নেতা হান্নান বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার বাণী স্বকন্ঠে প্রচার করেন। ২৬ মার্চ দুপুরের আগেই, হ্যান্ডবিল আকারে তা চট্টগ্রাম শহরে বিলি করা হয়। হ্যান্ডবিলটি ছিল ইংরেজিতে, যার বাংলা অনুবাদ নিম্নরূপ:
‘বাংলাদেশের জনগণ ও বিশ্বের জনগণের প্রতি: ২৬.৩.১৯৭১ তারিখে জিরো আওয়ারে পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী অকস্মাৎ পিলখানায় ইপিআর দপ্তর ও রাজারবাগে পুলিশ লাইন আক্রমণ করেছে। ইপিআর ও পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে এখনো যুদ্ধ চলছে ঢাকার রাস্তায় রাস্তায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য জনগণ বীরত্বের সঙ্গে শত্রুসেনার বিরুদ্ধে লড়ে চলেছে। বাংলাদেশের প্রতি সেক্টরকে প্রতিরোধ করার নির্দেশ দেয়া হলো। আল্লাহর করুণা আপনাদের উপর বর্ষিত হোক। তিনি যেন স্বাধীনতা সংগ্রামে আপনাদের সাহায্য করেন।’
জয় বাংলা।
স্বাক্ষর শেখ মুজিবুর রহমান।’
পরে ২৭ মার্চ চট্টগ্রামে অবস্থিত অষ্টম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর জিয়াউর রহমান ওই ঘোষণা পুনর্পাঠ করেন।
১৯৭১ সালেব ২৬ মার্চ রাতেই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে প্রথমে ঢাকা সেনানিবাসে, পরে করাচিতে নিয়ে যাওয়া হয়। এটিসি অফিসার স্কোয়াড্রন লিডার খাজা, সিনিয়র অপারেশন অফিসার উইং কমান্ডার খাদেমূল বাশার এবং বিমানবন্দরের পরিচালক ও ফ্লাইট সিকিউরিটি স্কোয়াড্রন লিডার এমআর নাককে দিয়ে শেখ মুজিবকে মধ্যরাতের পরে তেজগাঁও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। জরুরি অবস্থার কারণে সকলেই সেই রাতে ডিউটিতে ছিলেন। মুজিবকে পশ্চিম পাকিস্তানে স্থানান্তরিত করা হয় এবং ফয়সালাবাদের (তৎকালীন লায়লপুর) কাছে একটি কারাগারে ভারি পাহারায় রাখা হয়। অন্যান্য অনেক রাজনীতিবিদ ভারত এবং অন্যান্য দেশে পালিয়ে গ্রেপ্তার এড়িয়ে গেছেন। পাকিস্তানি জেনারেল রহিমুদ্দিন খানকে ফয়সালাবাদে মুজিবের সামরিক আদালতের মামলার সভাপতিত্ব করার জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, যার কার্যক্রম কখনও প্রকাশ্য হয়নি। এই দফায় বঙ্গবন্ধু ২৮৮ দিন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ছিলেন।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া এক ভাসণে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধুকে ‘দেশদ্রোহী’ বলে আখ্যায়িত করে।
১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ শোষণহীন সমাজ গঠনের অঙ্গীকারের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হয়। অনুষ্ঠান উপলক্ষে আজিমপুর বালিকা বিদ্যালয় মাঠে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের নিয়ে আয়োজিত ‘ক্রীড়া ও বিচিত্রা অনুষ্ঠানে’ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। আজিমপুর বালিকা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পৌঁছার পরপরই ছাত্রী ও দর্শকরা আনন্দে ফেটে পড়ে এবং ‘জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘জয় বাংলা’ প্রভৃতি ধ্বনি দিতে থাকে। প্রধানমন্ত্রীকে স্কুল ছাত্রীরা গার্ড অব অনার প্রদান করে।
মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার সাথে সাথে শেখ মুজিবুর রহমান সদ্য স্বাধীন জাতির শান্তি ও সুরক্ষা বজায় রাখতে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র জমা দেওয়ার আহ্বান জানান। জবাবে ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র হস্তান্তর করতে ঢাকা স্টেডিয়ামে এসেছিলেন। অনুষ্ঠানে গর্বিত ও সমান সংবেদনশীল শেখ মুজিবুর রহমান আগত মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে ভাষণে বলেন, ‘‘আমি ত্যাগ করতে পারি এবং সবকিছু উপেক্ষা করতে পারি তবে আপনাদের ভালবাসা এমন একটি জিনিস যা আমি কখনই উপেক্ষা করতে পারি না।’’
বাকশাল গঠনের প্রাক্কালে সংসদে বঙ্গবন্ধু বলেন, “আমাদের দ্বিতীয় বিপ্লব – বাকশাল নিয়ে শুধু সংসদে ব্যাখ্যা করলেই তো হবে না, জনগণকেও বোঝাতে হবে।”
১৯৭৫ সালের ২৬ শে মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সেই কাজটাই করলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর এই ‘দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচী’ বাস্তবায়নের জন্য জনগণকে কী করতে হবে, তার নির্দেশনাও দিলেন।
ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, “আমার ভাই ও বোনেরা, আমরা কেন সিস্টেম পরিবর্তন করলাম? সিস্টেম পরিবর্তন করেছি দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য। সিস্টেম পরিবর্তন করেছি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবার জন্য। এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে যে অফিসে যেয়ে টাকা নিয়ে যায়, সাইন করিয়ে নেয়, ফ্রি স্টাইল। ফ্যাক্টরিতে যেয়ে কাজ না করে টাকা দাবি করে। সাইন করিয়ে নেয়। যেন দেশে সরকার নাই। অনেকেই স্লোগান দিয়ে বলছে, বঙ্গবন্ধু কঠোর হও। বঙ্গবন্ধু কঠোর হবে। কঠোর ছিল, কঠোর আছে। কিন্তু দেখলাম, চেষ্টা করলাম। দেখি পারি কি না। আবদার করলাম, আবেদন করলাম, অনুরোধ করলাম, কথা শুনে না। চোরা নাহি শুনে ধর্মের কাহিনি।
ভাইয়েরা, বোনেরা আমার, আজকে যে সিস্টেম করেছি তার আগেও ক্ষমতা বঙ্গবন্ধুর কম ছিল না। আমি বিশ্বাস করি না ক্ষমতা বন্দুকের নলে। আমি বিশ্বাস করি ক্ষমতা বাংলার জনগণের কাছে। দুঃখের বিষয়, তারা রাতের অন্ধকালে পাঁচজন পার্লামেন্টের সদস্যকে হত্যা করেছে, তিন-চার হাজারের মতো কর্মীকে হত্যা করেছে। আরেক দল দুর্নীতিবাজ টাকা টাকা, পয়সা পয়সা করে পাগল হয়ে গেছে। আজ কে দুর্নীতিবাজ? যে ফাঁকি দেয় সে দুর্নীতিবাজ। যে ঘুষ খায় সে দুর্নীতিবাজ। যে স্মাগলিং করে সে দুর্নীতিবাজ। যে ব্ল্যাক মার্কেটিং করে সে দুর্নীতিবাজ। যারা হোর্ড করে তারা দুর্নীতিবাজ। যারা কর্তব্য পালন করে না, তারা দুর্নীতিবাজ। যারা বিবেকের বিরুদ্ধে কাজ করে তারাও দুর্নীতিবাজ। যারা বিদেশের কাছে দেশকে বিক্রি করে তারাও দুর্নীতিবাজ। এই দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম শুরু করতে হবে। আমি কেন ডাক দিয়েছি? এই ঘুণে ধরা ইংরেজ আমলের, পাকিস্তানি আমলের যে শাসনব্যবস্থা তা চলতে পারে না। একে নতুন করে ঢেলে সেজে গড়তে হবে। তাহলে দেশের মঙ্গল আসতে পারে, না হলে আসতে পারে না। আমি তিন বছর দেখেছি। দেখে শুনে আমি স্থির বিশ্বাসে পৌছেছি। এবং তাই জনগণকে পৌঁছিয়ে দিতে হবে শাসনতন্ত্রের মর্মকথা। সরকারি আইন করে কোনো দিন দুর্নীতিবাজদের দমন করা সম্ভব নয় জনগণের সমর্থন ছাড়া। আজকে আমার একমাত্র অনুরোধ আপনাদের কাছে সেটা হলো এই আমি বলেছিলাম, প্রত্যেক ঘরে ঘরে জেহাদ করতে হবে, যুদ্ধ করতে হবে শত্রুর বিরুদ্ধে। আজকে আমি বলব বাংলার জনগণের এক নম্বর কাজ হবে দুর্নীতিবাজদের বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করা। আমি আপনাদের সাহায্য চাই। কেমন করে করতে হবে? আইন চালাব। ক্ষমা করব না। যাকে পাব ছাড়ব না। একটা কাজ আপনাদের করতে হবে। গণ-আন্দোলন করতে হবে। এমন আন্দোলন করতে হবে, যে ঘুষখোর, যে দুর্নীতিবাজ, যে মুনাফাখোর, যে আমার জিনিস বিদেশে চোরাচালান দেয় তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। গ্রামে গ্রামে মিটিং করে দেখতে হবে, কোথায় ওই চোর, ওই ব্ল্যাক মার্কেটিয়ার, ওই ঘুষখোর। ভয় নাই, কোনো ভয় নাই, আমি আছি। ইনশাআল্লাহ আপনাদের ওপর অত্যাচার করতে দেব না। কিন্তু আপনাদের গ্রামে গ্রামে আন্দোলন করতে হবে। আপনারা সংঘবদ্ধ হন। ঘরে ঘরে আপনাদের দুর্গ গড়তে হবে। সে দুর্গ গড়তে হবে দুর্নীতিবাজদের খতম করার জন্য। এই দুর্নীতিবাজদের যদি খতম করতে পারেন তাহলে বাংলাদেশের মানুষের শতকরা ২৫ থেকে ৩০ ভাগ দুঃখ চলে যাবে। এত চোরের চোর, এই চোর যে কোথা থেকে পয়দা হয়েছে জানি না। পাকিস্তান সব নিয়ে গিয়েছে কিন্তু এই চোর তারা নিয়ে গেলে বাঁচতাম। এই চোর রেখে গিয়েছে। কিন্তু দালাল গিয়েছে, চোর গেলে বেঁচে যেতাম।
দ্বিতীয় কথা, আপনারা জানেন, আমার দেশের এক একর জমিতে যে ফসল হয় জাপানে তার তিন গুণ বেশি ফসল হয়। কিন্তু আমার জমি দুনিয়ার সেরা জমি। আমি কেন সেই জমিতে ডবল ফসল করতে পারব না। আমি চাই বাংলাদেশের প্রত্যেক কৃষক ভাইয়ের কাছে যারা সত্যিকার কাজ করে, যারা প্যান্ট পরা, কাপড় পরা ভদ্রলোক তাদের কাছেও চাই-জমিতে যেতে হবে, ডবল ফসল করুন। যদি ডবল ফসল করতে পারি, আমাদের অভাব ইনশাআল্লাহ হবে না। ভিক্ষুকের মতো হাত পাততে হবে না। এ বৎসর আমাকে ছয় কোটি মণ খাবার আনতে হবে। কী করে মানুষকে বাঁচাব? কী করে অন্যান্য জিনিস কিনব? অন্যান্য বন্ধুরাষ্ট্রে সাহায্য দিচ্ছে বলে বেঁচে যাচ্ছি। কিন্তু এভাবে চলতে পারে না। আমাদের স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে পায়ের ওপর দাঁড়াতে হবে জাতি হিসেবে। ভাইয়েরা আমার, আমাদের প্রত্যেক বছর ৩০ লক্ষ লোক বাড়ে। আমার জায়গা হলো ৫৫ হাজার বর্গমাইল। যদি আমাদের প্রত্যেক বছর ৩০ লক্ষ লোক বাড়ে, তাহলে ২৫-৩০ বছরে বাংলায় কোনো জমি থাকবে না চাষ করার জন্য। বাংলার মানুষ বাংলার মানুষের মাংস খাবে। এই জন্য আজকে আমাদের পপুলেশন কন্ট্রোল, ফ্যামিলি প্ল্যানিং করতে হবে। এটা হলো তিন নম্বর কাজ। চার নম্বর হলো জাতীয় ঐক্য। জাতীয় ঐক্য গড়ার জন্য একদল করা হয়েছে। যারা বাংলাকে ভালোবাসে, এর আদর্শে বিশ্বাস করে, চারটি রাষ্ট্রীয় আদর্শ মানে, সৎপথে চলে, তারা সকলেই এই দলের সদস্য হতে পারবে। যারা বিদেশি এজেন্ট, যারা বহিঃশত্রুর কাছে থেকে পয়সা নেয়, এতে তাদের স্থান নাই। সরকারি কর্মচারীরাও এই দলের সদস্য হতে পারবে। কারণ তারাও এই জাতির একটা অংশ। তাদেরও অধিকার থাকবে এই দলের সদস্য হওয়ার। এই জন্য সকলে যে যেখানে আছি একতাবদ্ধ হয়ে দেশের কাজে লাগতে হবে।
ভাইয়েরা, বোনেরা আমার, এই জাতীয় দলের আপাতত পাঁচটা ব্রাঞ্চ হবে। একটা শ্রমিক ভাইদের অঙ্গদল, কৃষক ভাইদের একটা, যুবক ভাইদের একটা, ছাত্রদের একটা এবং মহিলাদের একটা। এই পাঁচটা অঙ্গদল মিলে কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ। আমাকে অনেকে বলে, কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ হলো, আমাদের কী হবে? আমি বলি, আওয়ামী মানে তো জনগণ। ছাত্র, যুবক, শিক্ষিত সমাজ, সরকারি কর্মচারী সকলে মিলে কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ।
শিক্ষিত সমাজকে আমি অনুরোধ করব, আমাদের চরিত্রের সংশোধন করতে হবে, আত্মশুদ্ধি করতে হবে। আপনি চাকরি করেন, আপনার মাইনা দেয় ওই গরিব কৃষক। আপনার মাইনা দেয় ওই গরিব শ্রমিক। আপনার সংসার চলে ওই টাকায়। আমরা গাড়ি চড়ি ওই টাকায়। ওদের সম্মান করে কথা বলুন, ইজ্জত করে কথা বলুন। ওরাই মালিক, ওদের দ্বারাই আপনার সংসার চলে। সরকারি কর্মচারীদের বলি, মনে রেখো এটা স্বাধীন দেশ। এটা ব্রিটিশের কলোনি নয়। পাকিস্তানের কলোনি নয়। যে লোককে দেখবে তার চেহারাটা তোমার বাবার মতো, তোমার ভাইয়ের মতো, ওরই পরিশ্রমের পয়সা, ওরাই সম্মান বেশি পাবে। কারণ ওরা নিজে কামাই করে খায়। আমাদের লেখাপড়া শিখিয়েছে কে? আমরা বলি বাপ-মা। লেখাপড়া শিখিয়েছে কে? ডাক্তারি পাস করায় কে? ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করায় কে? সায়েন্স পাস করায় কে? বৈজ্ঞানিক করে কে? অফিসার করে, কার টাকায়? বাংলার দুখী জনগণের টাকায়। শিক্ষিত ভাইয়েরা যে আপনার লেখাপড়ার খরচ দিয়েছে তা শুধু আপনার সংসার দেখার জন্য নয়। আপনার ছেলে-মেয়েদের দেখার জন্য নয়। দিয়েছে, তাদের জন্য আপনি কাজ করবেন, তাদের সেবা করবেন বলে। তাদের আপনি কী দিয়েছেন? কী ফেরত দিয়েছেন, কতটুকু, দিচ্ছেন? আত্মসমালোচনা করেন, বক্তৃতা করে লাভ নাই।
সমাজব্যবস্থায় যেন ঘুন ধরে গেছে। এই ঘুনে ধরা সমাজের প্রতি চরম আঘাত করতে চাই। যে আঘাত করেছিলাম পাকিস্তানিদের, সে আঘাত করতে চাই এই ঘুণে ধরা সমাজ ব্যবস্থাকে। আমি আপনাদের সমর্থন চাই। আমি জানি, আপনাদের সমর্থন আছে। কিন্তু একটা কথা, এই যে নতুন সিস্টেমে যেতে চাচ্ছি আমি, গ্রামে গ্রামে বহুমুখী কো-অপারেটিভ করা হবে। ভুল করবেন না। আমি আপনাদের জমি নেব না। পাঁচ বছরের প্ল্যানে বাংলাদেশের ৬৫ হাজার গ্রামে একটি কো-অপারেটিভ হবে। প্রত্যেকটি গ্রামে গ্রামে কো-অপারেটিভে জমির মালিকের জমি থাকবে। যে বেকার, যে মানুষ কাজ করতে পারে, তাকে এই কো-অপারেটিভের সদস্য হতে হবে। এগুলি বহুমুখী কো-অপারেটিভ হবে। পয়সা যাবে তাদের কাছে, ফার্টিলাইজার যাবে তাদের কাছে, টেস্ট রিলিফ যাবে তাদের কাছে। ওর্য়াকস প্রগ্রাম যাবে তাদের কাছে। আস্তে আস্তে ইউনিয়ন টাউটদেরকে বিদায় দেওয়া হবে, তা না হলে দেশকে বাঁচানো যাবে না। এই জন্যই ভিলেজ কো-অপারেটিভ হবে। আমি ঘোষণা করছি আজকে যে পাঁচ বছরের প্ল্যানে প্রত্যেকটি গ্রামে ৫০০ থেকে হাজার ফ্যামিলি পর্যন্ত নিয়ে কম্পালসারি কো-অপারেটিভ হবে। আপনার জমির ফসল আপনি নেবেন, অংশ যাবে কো-অপারেটিভের হাতে, অংশ যাবে গর্ভনমেন্টের হাতে।
দ্বিতীয়, থানায় থানায় একটি করে কাউন্সিল হবে। এই কাউন্সিলে রাজনৈতিক কর্মী, সরকারি কর্মচারী যেই হয়- একজন তার চেয়ারম্যান হবেন। এই থানা কাউন্সিলে থাকবে বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের সরকারি কর্মচারী। তার মধ্যে আমাদের কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি থাকবে, যুবক প্রতিনিধি থাকবে, কৃষক প্রতিনিধি থাকবে, তারাই থানাকে চালাবে। আর জেলা থাকবে না, সমস্ত মহকুমা জেলা হয়ে যাবে। সেই মহকুমায় একটি করে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাউন্সিল হবে। তার চেয়ারম্যান থাকবে। সব কর্মচারী একসঙ্গে তার মধ্যে থাকবে। এর মধ্যে পিপলস রিপ্রেজেনটেশন থাকবে। পার্টি রিপ্রেজেনটেশন থাকবে। সেখানে তারা সরকার চালাবেন-এইভাবে আমি একটা সিস্টেম চিন্তা করেছি। এবং করব বলে ইনশাআল্লাহ আমি ঠিক করেছি। আমি আপনাদের সাহায্য ও সহানভূতি চাই।
শ্রমিক ভাইয়েরা, আমি শ্রমিক প্রতিষ্ঠান করেছি। আপনাদের প্রতিনিধি ইন্ডাস্ট্রি ডির্পাটমেন্ট, লেবার ডির্পাটমেন্টের শ্রমিক প্রতিনিধি বসে একটা প্ল্যান করতে হবে। সেই প্ল্যান অনুযায়ী কী করে আমরা বাঁচতে পারি তার বন্দোবস্ত করতে হবে। ছাত্র ভাইয়েরা, লেখাপড়ার কাজ শেখেন। শিক্ষক সম্প্রদায়ের কাছে আমার আকুল আবেদন, খালি ফেল করিয়ে বাহাদুরি নিবেন – তা হয় না। তাদের মানুষ করুন শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনুন, রাজনীতি একটু কম করুন। আমি স্ট্রিক্ট চাই, নকল করতে দিবেন না।
আর একটি কথা বলতে চাই। বিচার। বাংলাদেশের বিচার ইংরেজ আমলের বিচার। আল্লার মর্জি যদি সিভিল কোর্টে কেস পড়ে, সেই মামলা শেষ হতে লাগে ২০ বছর। আমি যদি উকিল হই আমার জামাইকে উকিল বানিয়ে কেস দিয়ে যাই। ওই মামলার ফয়সালা হয় না। আর যদি ক্রিমিনাল কেস হয়, চার বছর তিন বছরের আগে শেষ হয় না। এই বিচার বিভাগকে নতুন করে এমন করতে হবে যে থানায় ট্রাইব্যুনাল করার চেষ্টা করছি এবং সেখানে সব ফয়সালা হবে। ভাইয়েরা, আবার দেখা হবে, কী বলেন? ইনশাআল্লাহ আবার দেখা হবে।” ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ, স্বাধীনতা দিবসে দেয়া এই ভাষণই জনগণের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুর জীবনের শেষ ভাষণ।