ফিরে দেখা

আপডেট: মার্চ ২১, ২০২০, ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ

২১ মার্চ


১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রমনা রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) একটি জনসভায় ঘোষণা করেছিলেন যে, ‘‘উর্দু এবং কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা। অন্য কোনও ভাষা নয়, কেবল উর্দুই মুসলিম জাতির চেতনাকে মূর্ত করে তোলে, তাই উর্দুই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে থাকবে।”
জিন্নাহ্র এই উক্তির সাথে সাথেই জনতার মধ্যে থেকে প্রতিবাদ উঠেছিল। অনেকের মতে সেদিনকার তরুণ নেতা শেখ মুজিব সকলের আগে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করে বলেছিলেন, ‘‘না, বাংলাকেই রাষ্ট্রভাষা করতে হবে।’’
সেদিনই সন্ধ্যাবেলা কার্জন হলে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে এই উক্তির প্রতিবাদ হয়েছিল।
১৯৭১ সালের ২১ মার্চ একটি লিখিত বাণীতে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘‘ লক্ষ্য অর্জনের জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে হবে প্রতিরোধের দুর্গ। আমাদের দাবি ন্যায়সঙ্গত। তাই সাফল্য আমাদের সুনিশ্চিত। একটি ঐক্যবদ্ধ জাতিকে বেয়নেট ও বুলেট দিয়ে দাবিয়ে রাখা যাবে না। জয়বাংলা।’’
১৯৭১ সালের ২১ মার্চ কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে (সামরিক বাহিনী বেষ্টিত) পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভূট্টো ঢাকায় আসেন বঙ্গবন্ধুর সাথে আরেক দফা আলোচনা করতে। আলোচনা শুরুও হয়। কিন্তু ফলপ্রসূ কোনো অগ্রগতি তাতেও পাওয়া যায়নি।
১৯৭১ সালের ২১ মার্চ এক সভায় মাওলানা ভাসানী ২০ মার্চ দেয়া সংবাদ সম্মেলনের দাবি পুনরায় তুলে ধরেন।
১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বাংলাদেশে ফেরার দুই মাস ১১ দিনের মাথায়, আজকের তারিখে লোসানো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।
১৯৭৪ সালের ২১ মার্চ বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বাংলাদেশে ফেরার তৃতীয় বছরে কঙ্গো প্রজাতন্ত্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।
ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বেও বঙ্গবন্ধু, তথ্য পাকিস্তানি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে
বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রধান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৮ থেকে ৫২ সাল পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনেও নেতৃত্ব দিয়েছেন। ইতিহাসবিদ এমনকি ভাষা আন্দোলনকারীরাও অজানা কারণে বিষয়টি এতদিন তুলে আনেন নি। কিন্তু সে সময় পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার যে প্রতিবেদন নিয়ে বই প্রকাশ হয়েছে, সেখানে ঠিকই সেগুলো স্থান পেয়েছে।
১৯৪৭ সালে বৃটিশ রাজ্যের অবসানের পর পাকিস্তান সৃষ্টির এক বছরের মধ্যেই আন্দোলনে নামতে হয় বাঙালিদের। এই বাংলার মানুষের আন্দোলনেই যে দেশ প্রতিষ্ঠা হয়েছে, সেখানে বাঙালিরাই যে ঠকে গেছে তা প্রকাশ পায় ১৯৪৮ সালেই। যখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসে বলেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই অনুষ্ঠানেই প্রতিবাদ উঠেছিল এবং সেই প্রতিবাদে ছিলেন সে সময়ের ছাত্রনেতা তরুণ শেখ মুজিব। আর আন্দোলনের এক পর্যায়ে তিনি গ্রেপ্তারও হন। আর ৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনের যখন চূড়ান্ত রূপ, সেদিন তিনি কারাগারেই।
সে সময় পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন নিয়ে প্রকাশিত হওয়া বই ‘সিক্রেট ডকুমেন্ট অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ এ কিন্তু তরুণ শেখ মুজিবের ভাষা আন্দোলনের ভূমিকা ঠিকই উঠে এসেছে।
বইয়ে সংযুক্ত গোয়েন্দা নথিতে বলা হয়েছে, শেখ মুজিবুর রহমান নামটি পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের নজরে আসে ১৯৪৮ সালের প্রথম দিকেই। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ যার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বঙ্গবন্ধু।
৩ এপ্রিল গোয়েন্দাদের দেয়া এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৫ মার্চ গোপালগঞ্জে প্রায় ৪০০ ছাত্র বিক্ষোভ করে। তারা শেখ মুজিবুরের মুক্তির দাবিতে এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে স্লোগান দেয়।
প্রশ্ন উঠেছে ভাষা আন্দোলনে জাতির জনকের সক্রিয় অংশগ্রহণ, অসামান্য অবদান এত বছর কেন প্রকাশিত হয়নি। ভাষা আন্দোলনকারীদের অনেকেই বঙ্গবন্ধুর এই অবদানের কথা স্বীকার করেন নি।
এই আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা কেবল গোপন করা হয়নি, রীতিমতো অস্বীকার করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কেন সেই প্রশ্নের জবাব মেলেনি কখনও।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘১৯৪৮ এবং ৪৯ সালের ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন। সেই সময়ে যারা ভাষা আন্দোলনকে নানাভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি তাদের অন্যতম।’
‘ভাষা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকাকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কেউ যদি এমনটা মনে করে তা হবে ইতিহাস বিকৃতি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক গোবিন্দ চক্রবর্তী ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমরা শেখ মুজিবুর রহমানকে আওয়ামী লীগ এবং ১৯৭১ এর মধ্যেই রাখতে চাই। কিন্তু আমরা ৭১ এ কীভাবে পৌঁছালাম? ভাষা আন্দোলনের দুটি সময়কাল ছিল। ১৯৫২ থেকে আমরা ভাষা পাই। কিন্তু এটা শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালে। এটা নিয়ে আগেও কথা হয়েছে। তথ্যগুলো উঠে এসেছে। কিন্তু ওইভাবে উঠে আসেনি। ১৯৭১ এর মত ১৯৪৮ সাল থেকে তার যে অবদান এটা তুলে ধরতে হবে। ভাষা আন্দোলনের পটভূমিটা ১৯৪৮ সাল থেকেই।’
এই অধ্যাপক আরও বলেন, ‘তিনি তো একদিনে বঙ্গবন্ধু হননি। তার এই বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠাটা ১৯৪৮ সাল থেকেই।’ [সূত্র: কাজী রফিকুল ইসলাম, ঢাকা টাইমস্ টুয়েন্টিফোর.কম, ২২ আগস্ট, ২০১৯]