ফিরে দেখা

আপডেট: মার্চ ২২, ২০২০, ১২:৩৮ পূর্বাহ্ণ

২২ মার্চ


১৯৭৫ সালের ২২ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশে ‘ইসলামি ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ হল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান যেটি ইসলামের আদর্শ ও মূল্যবোধ প্রচার করে এবং সে সম্পর্কিত কার্যক্রম পরিচালনা করে। ফাউন্ডেশনটির প্রধান কার্যালয় ঢাকায় অবস্থিত, যেটি ৭টি বিভাগীয় কার্যালয়, ৬৪টি জেলা কার্যালয়, ৭টি ইমাম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং ২৯টি ইসলামিক প্রচারণা কেন্দ্রের মাধ্যমে কার্যক্রমসমূহ বাস্তবায়ন করে। ফাউন্ডেশনটির মহাপরিচালক হলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী।
১৯৫৯ সালে বাংলাদেশের ঢাকায় ইসলামের শিক্ষার প্রচার ও প্রসারে দুটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা হয়। বায়তুল মোকাররম সোসাইটি নির্মাণ করে ‘বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ’। ওলামাগণ, ইসলামী দর্শন, সংস্কৃতি ও জীবন ব্যবস্থাকে মানুষের কাছে সহজে পৌছে দেয়ার জন্য এবং তা নিয়ে গবেষণার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেন ‘দারুল উলুম’। ১৯৬০ সালে দারুল উলুমকে ‘ইসলামিক একাডেমী’ নামে নামকরণ করা হয় এবং করাচিভিত্তিক সেন্ট্রাল ইন্সটিটিউট অব ইসলামিক রিসার্চ এর একটি শাখা হিসেবে রূপান্তর করা হয়। ১৯৭২ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে স্বঘোষিত সমর্থন ও সহায়তার জন্য নিষিদ্ধ করা হয় ইসলামিক একাডেমীকে। একাডেমীটিকে সে সময় রাজনীতিকে ইসলামীকরণের জন্য দোষারোপ করা হয়েছিল।
১৯৭১ সালের ২২ মার্চ রাতে একটি সিদ্ধান্তের সঙ্কটে পড়তে হয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে। সেবারও তাঁকে উদ্ধার করেছিলেন তাঁর প্রিয় স্ত্রী ফজিলাতুন্নেসা রেণু। এবারের সংকট ২৩ মার্চ স্বাধীন বাংলার পতাকা ওড়ানো হবে কি না। ২৩ মার্চ ভোরে পাকিস্তানি পতাকার বদলে নতুন পতাকা দেখলেই মানুষ বুঝতে পারবে, নেতা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ নিয়ে বিতর্ক চলল মাঝরাত পর্যন্ত। দুই পক্ষের বক্তব্যই শুনছেন বঙ্গবন্ধু, সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। সভা মূলতবি রেখে গেলেন বাড়ির ভেতর। নেতা ও কর্মীদের খাবার দেয়া হলো। ৩২ নম্বরের গেটের বাইরে তখনো হাজার হাজার মানুষ। মুখে স্লোগান ‘আপসের মুখে লাথি মারো, স্বাধীনতা ঘোষণা করো।’ স্বামীকে চিন্তাক্লিষ্ট দেশে ফজিলাতুন্নেছা জিজ্ঞেস করলেন, ‘পতাকা ওড়ানোর ব্যাপারে আপনি কি কোনো সিদ্ধান্ত নিলেন?’ খেতে খেতে মুজিব বললেন, ‘আমি পতাকা ওড়াতে চাই। একটাই ভয়, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এখনো ঢাকায়। পাকিস্তানিরা বলবে, আলোচনা চলা অবস্থায় শেখ মুজিব নতুন পতাকা উড়িয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে। এই অজুহাতে তারা নিরস্ত্র বাঙালির ওপর সামরিক হামলা চালাবে।’ ফজিলাতুন্নেছা বললেন, ‘স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে বিপদ। আবার না দিলেও চলে না। ৭ মার্চ ঘোষণায় স্বাধীনতার কথা আপনাকে বলতেই হয়েছিল। এখনো সে রকম একটা কিছু করুন। যাতে সাপও মরে, লাঠিও না ভাঙে।’ বঙ্গবন্ধু স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘রেণু, তুমিই বলো কী করব? ৭ মার্চ তো তুমিই পরামর্শ দিয়েছিলে?’ ফজিলাতুন্নেছা বললেন, ‘আপনি ছাত্র নেতাদের বলুন আপনার হাতে পতাকা তুলে দিতে। আপনি সেই পতাকা ৩২ নম্বরে ওড়ান। কথা উঠলে বলতে পারবেন, আপনি ছাত্র-জনতার দাবির প্রতি সম্মান দেখিয়েছেন।’ বঙ্গবন্ধু খাওয়া ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। আর একটি কথাও বললেন না। নেতাকর্মীদের জানালেন, তিনি আগামীকাল ৩২ নম্বরে স্বাধীন বাংলার পতাকা ওড়াবেন। মাঝ রাতে জয় বাংলা স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠল ৩২ নম্বর।
১৯৭১ সালের ২২ মার্চ বঙ্গবন্ধুর সাথে দীর্ঘ আলোচনার পর ইয়াহিয়া খান ২৩ মার্চ আহুত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। দেশের জনগণ ইয়াহিয়ার এই ধরনের স্থগিতাদেশ এর বিরোধিতা করে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন।
১. ১৯৭৫ সালের ২২ মার্চ এক অধ্যাদেশবলে ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন, ২. বাংলাদেশ সিরাত মজলিশ প্রতিষ্ঠা, ৩. বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড পুনর্গঠন (পূর্বে স্বায়ত্তশাসিত মাদ্রাসা বোর্ড ছিল না), ৪. বিশ্ব ইজতেমার জন্য টঙ্গীতে সরকারি জায়গা বরাদ্দ, ৫. কাকরাইলের মারকাজ মসজিদ সম্প্রসারণের জন্য জমি বরাদ্দ, ৬. হজ পালনের জন্য সরকারি অনুদানের ব্যবস্থা, ৭. ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.), শবেকদর, শবেবরাত উপলক্ষে ছুটি ঘোষণা এবং উল্লিখিত দিনগুলোতে সিনেমা হলে সিনেমা প্রদর্শন বন্ধ রাখার নির্দেশ প্রদান, ৮. মদ, জুয়া, হাউজি ও অসামাজিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধকরণ এবং শাস্তির বিধান, ৯. রেসকোর্স ময়দানের ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা বন্ধকরণ, ১০. রাশিয়ায় প্রথম তাবলিগ জামাত প্রেরণের ব্যবস্থা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। রাশিয়ায় কমিউনিস্ট মতাদর্শের কারণে সেখানে বিদেশ থেকে ইসলাম প্রচারের জন্য কেউ অনুমতি পেত না। বঙ্গবন্ধুই প্রথম তাবলিগ জামাত প্রবেশের অনুমতির ব্যবস্থা করেছিলেন। ১১. আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে আরব বিশ্বের পক্ষে সমর্থন ও সাহায্য প্রেরণ, ১২. ওআইসি সম্মেলনে যোগদান ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন ইত্যাদি। তা ছাড়া পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্রদের বিনা মূল্যে বই বিতরণ, যার ধারাবাহিকতায় বর্তমানে এইচএসসি পর্যন্ত বিনামূল্যে বই বিতরণ করার ব্যবস্থা করছেন বর্তমান সরকার। বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে সংযোজিত হলো ১, ১১, ৬০০ বর্গকিলোমিটার যা ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধুর শাসনামল থেকেই প্রক্রিয়াধীন ছিল, যেটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলেই ১৪ মার্চ ২০১২ সালে বাস্তবায়িত হলো। বাঙালি জাতি পেল বিশাল সমুদ্র জলসীমা। এটি আমাদের জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম উৎস। [সূত্র: ডা. মো. ফজলুল হক, সাবেক ডিন ও রেজিস্ট্রার, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর, ২০ আগস্ট, ২০১৯, দৈনিক কালের কণ্ঠ]