‘ফিল্মের ক্রাইসিস কিন্তু সারা পৃথিবীতেই হচ্ছে’

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৭, ১:০৮ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


নির্মাতা সামিয়া জামান দীর্ঘদিন ধরে দেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। দেশে ও দেশের বাইরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যমে সাংবাদিকতা, উপস্থাপনা ও অনুষ্ঠান প্রযোজনা করছেন কয়েক দশক। বর্তমানে তিনি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল একাত্তর টেলিভিশনের সম্পাদক। সম্প্রতি তিনি শবনম ফেরদৌসী পরিচালিত সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত ‘আজব সুন্দর’-চলচ্চিত্রের প্রযোজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রশ্ন : ছোটপর্দায় অনুষ্ঠান প্রযোজনা করেছেন দীর্ঘদিন। বড়পর্দায় নির্মাতা পরিচয়ের বাইরে এবার প্রযোজক পরিচয়ে এলেন। কেন আগ্রহী হলেন?
সামিয়া জামান: প্রথমত, আমার দুটো ছবি শেষ হয়ে যাওয়ার পর আমি কিছুটা ঠাট্টা করেই বলতাম, পরিচালনার কাজটা হয়তো ঠিকমতো করতেই পারলাম না নানা সমস্যার কারণে খানিকটা, বাকিটা আমার অক্ষমতা, ব্যর্থতা বলবো না, হয়তো পরিচালনার মুন্সিয়ানা বলতে যা বোঝায় সেটা প্র্যাকটিস করতে পারি নি।
তবে, ছবি করার আশা এখনও ছাড়িনি, আমার সেই ভালো ছবি আমি করতে চাই। কিন্তু আমি হাসতে হাসতেই বলতাম যে, প্রযোজনার কাজটা হয়তো আমি শিখেছি। সেটা টেলিভিশনে, রেডিওতে এতবছরের অভিজ্ঞতা যে, অনুষ্ঠান প্রডিউস করা, একটা পুরো চ্যানেলের দায়িত্বে কাজ করা, তারপরে আলাদা করে সিনেমার দায়িত্বে কাজ করা তার ফলে যে আমার অভিজ্ঞতার ঝুলি পুরেই গেছে সেটা আমি কিছুটা ঠাট্টা করেই বলতাম।
আরেকটা ব্যাপার হলো- সরকারি অনুদান। অন্যান্য যেখানে যেখানে আমাদের ছবির ফান্ডিং পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে দেশে এবং বিদেশে। আমি কিন্তু খুব উচ্চকণ্ঠ এ ব্যাপারে। সবাইকে বলি, স্ক্রিপ্ট রেডি করো, তোমার পুরো অ্যপ্লিকেশন প্যাকেজ রেডি রাখো। যেখানে যা ডেটলাইন হবে অ্যাপ্লাই করো।
আমরা কোনো খেলায় অংশই নেইনা। আমি আইডিয়া নিয়ে বসে আছি, আমার কাছে তো যেচে ফান্ডিংটা আসবে না। যেহেতু সিনেমা বানানোটা খুব ব্যয়বহুল একটা ব্যাপার। আমি নিজেও কিন্তু অনুদানে সেভাবেই অ্যাপ্লাই করেছি-একটা ছবি করেছি। যখন সেই সুযোগটা এসেছে সেটা তো নিতে হবে।
‘আজব সুন্দর’ ছবিটি স্পেসিফিকেলি এসে গেলো, কারণ ছবির কাহিনিটা আমার খুব ভালো লাগলো, একজন নির্মাতা হিসেবে শবনম ফেরদৌসী যখন একাত্তর টিভিতে কাজ করছে তখনই সে প্রতিষ্ঠিত নির্মাতা, বিশেষ করে প্রামান্যচিত্র ‘জন্মসাথী’টা করার সময়; এটা একাত্তরের একটা বিশেষ প্রজেক্ট, শবনমেরও তাই। এটার সময়ই বোধহয় আমাদের কথাবার্তা, দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আরও কী কী করতে হবে… সবমিলে এটা করার সময়ই কথাগুলো এসেছে।
তারপর যখন অনুদানের জন্য কাগজপত্র তৈরি হলো; রুরাল ফোক নিয়ে একাত্তরেরও কিছু কাজ ছিলো, শবনমেরও কিছু কাজ ছিলো, সবকিছু একজায়গায় মিলে গেলো ‘আজব সুন্দর’-এ এসে। বিষয়ের দিক থেকে, অনুদানের জন্য বলার দিক থেকে, প্রযোজক হিসেবে চলচ্চিত্র প্রযোজনার বিষয়টিতে এখন আমি নিজেকে তৈরি মনে করছি-এ সবগুলো জিনিস মিলে এ প্রজেক্টটাতে যুক্ত হওয়া।
প্রশ্ন : প্রযোজক হিসেবে অনুদানের অর্থকেই কি যথেষ্ট মনে করছেন ?
সামিয়া জামান: অনুদানে আমাদের যে নীতিটা, আমাদের তো আসলে চিত্রনাট্য দেখে অনুদান দেওয়া হয় না। এখন কিছুটা, দু’তিন রকমের টাকা দেওয়া হয়, কিন্তু আপনি একটা চিত্রনাট্য দিলেন, বাজেট বিবেচনা করে অনুদান খানিকটা হচ্ছে এখন, বিশ-ত্রিশ-পঞ্চাশ এসব করে, কিন্তু ব্যাসিক ব্যাপারটা হলো, অনুদানের জন্য একটা অর্থ থাকে, আপনার ছবি যদি অনুদানের জন্য বিবেচিত হয়, সেটা আপনি পেয়ে গেলেন-সেটা ছবির বাজেটের সঙ্গে মিলুক আর না মিলুক।
টেকনিক্যাল যে খরচগুলো সেগুলো কিন্তু প্রতিদিনই বাড়ছে। জীবনযাত্রার খরচের সাথে সেটাও বেড়ে যাচ্ছে। ছ’মাস আগের বাজেটই এখন তা থাকছে না। আমার মনে হয় না যে, এই পঞ্চাশলাখ টাকায় ছবি পুরোপুরি হবে, ইনক্লুডিং মার্কেটিং প্ল্যান ইত্যাদি করা সম্ভব হবে না।
তবে, সরকার যেহেতু এলাউ করেন সহপ্রযোজনায়,এছাড়া মিউজিক রাইটস সহ অন্যান্যভাবে টাকা রেইজ করা যায়। আমরাও সেটা চেষ্টা করছি। আমরা এমন কোনো অসম্ভব বাজেটে ছবি করতে চাই না যেটা এ মার্কেট থেকে তোলা সম্ভব হবে না।
প্রশ্ন : অনুদানের টাকা দফায় দফায় দেওয়া হয়, এতে পুরো নির্মাণই প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি পড়ছে বলে অভিযোগ নির্মাতাদের। কী বলবেন এ বিষয়ে?
সামিয়া জামান: সেটাতো একটা সমস্যা, একবারে দিয়ে দিলে খুব সুবিধা হতো, এবং যে নিয়মে দেয়া হয় – আপনি একটু শুটিং করলেন, আপনি দেখাবেন রাশ। আসলে ছবির কাজ কিন্তু এভাবে হয় না। বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন, শুটিং টা হলো ছবি।
এই যে আমরা কথা বলছি, আমাদের ছবির কাজ কিন্তু শুরু হয়ে গেছে। যেদিন থেকে ছবির চিত্রনাট্য নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে, সেদিন থেকেই কিন্তু ‘আজব সুন্দর’ নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। অনুদান পাওয়ার পর এটা পাকা হয়েছে। আমরা প্রি প্রোডাকশানে চলে গেছি।
শুটিং তো হবে ম্যাক্সিমাম পঁচিশ দিন ত্রিশ দিন, একমাসের বেশিতো আর না। তাহলে তো বাজেট বেড়ে যাবে। তো ওই কুড়ি পঁচিশ দিনের অংশটা হলো একটা পার্টিকুলার অংশ। মূলকাজটা তার আগেই হবে।
কোনো দেশেই ছবি এভাবে করতে পারে না, যে আপনি টাকাটা ব্যাংকে রেখে দিলেন। তারপর একটু একটু করে খরচ করলেন। সেভাবে তো হয় না।
যে শর্ত দিয়ে এ টাকাটা ছাড়া হয় সেটা ঠিক বাস্তবসম্মত নয়। আরেকটু বেশি যদি দেওয়া হতো, ধরুন পুরো পঞ্চাশ না হোক, থার্টি ফর্টি পার্সেন্ট যদি দেয়া হতো, তাহলে আপনি পুরোপুরি শুটিং শেষ করে, পোস্ট প্রোডাকশানের প্যাকেজ ট্যাকেজ শেষ করে তারপর যাওয়া যেতো।
এখন অনুদান নিয়েও তো আমাদের নানা অভিজ্ঞতা আছে সরকারের। সবগুলো অভিজ্ঞতা সুখকর নয়-অনুদান পাওয়ার পর ছবি শেষ হয়নি, অনুদান পাওয়ার পর ছবি শুরুই হয়নি সুতরাং তাদের দিক থেকেও নিশ্চয়ই অনেক যুক্তি আছে।
প্রশ্ন : যৌথপ্রযোজনা এবং চলচ্চিত্র পরিবেশনায় একটি প্রতিষ্ঠানের একাধিপত্য নিয়ে চলচ্চিত্র অঙ্গন বেশ উত্তাল বেশকিছুদিন ধরে। এ নিয়ে আপনার মন্তব্য কি?
সামিয়া জামান: এ বিষয়ে তো সরকার একটা কমিটি করে দিয়েছে। দেখা যাক কমিটি কি করে। আরেকটু বিস্তারিত যদি বলতে হয়, তাহলে বলি, যৌথপ্রযোজনা বলতে আমরা আসলে ব্যাপারটাকে অনেকটাই সংক্ষিপ্ত করে নিয়েছি। যার ফলে আমাদের মনে হয়, এটা হয়তো শুধু ভারতের সঙ্গেই ছবি করা, সেটার ভাগ বটোয়ারাটা কেমন হলো, শিল্পী নির্বাচনেই হোক, অর্থ লগ্নীতেই হোক, আমরা আমাদের আলোচনাটাকে খানিকটা সীমাবদ্ধ করে নিয়েছি। কিন্তু যেটা দেখছি, সমস্ত পৃথিবীতেই এটা একটা ট্রেন্ড, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ মিলে একসঙ্গে ছবি বানাচ্ছে। এবং তার একটার সঙ্গে আরেকটার কোনো যোগাযোগই নেই। যেমন জার্মানির টাকায় ছবি হচ্ছে কোনো একটা সেন্ট্রাল ইওরোপিয়ান কান্ট্রিতে। সেগুলো কিন্তু বিশেষ কোনো ছবির ফান্ড না। সত্যিকারের বাণিজ্যিক কো প্রোডাকশনই কিন্ত হচ্ছে। এমনও দেখেছি, ভারতীয় প্রযোজক ছবি বানাচ্ছেন আয়ারল্যান্ডে। সেখানে বানাচ্ছেন কেন? কেননা ইংল্যান্ড বা ইওরোপের অন্য জায়গার চেয়ে সেখানে ছবি বানানোর কস্ট কম। সরকার চল্লিশ পার্সেন্ট ক্যাশ বেট দেয়। সেই বানানো ছবি নিয়ে সমস্ত ইউরোপে ব্যবসা করা যায়। ছবিগুলো সেদেশের টেলিভিশনে বিক্রি করা যায়। এখন আমি বলবো, সরকার কমিটি করেছেন, সেই কমিটি কি ভাবেন সেটা আমরা দেখবো।
কিন্তু বাংলাদেশ একটা মধ্যম আয়ের দেশ । পঞ্চাশ দশকের পর থেকে সম্ভবত আমরা আমাদের সিনেমায় সবচেয়ে বড় একটা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। ডিস্ট্রিবিউশনের ক্ষেত্রে যেটা বলা যায়, ছবি দেখানোর জায়গাই উধাও হয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়টিকেতো আমরা সামনে আনছিই না যে, সিনেমা শুধু সিনেমা হলেই দেখাতে হবে।
আমাদের টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রিও কিন্তু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি অবস্থান করছে। যেমন এখন ওয়েব সিরিজ হচ্ছে। কয়দিন পর ফোর জি এসে যাবে দেশে। কন্টেন্ট দেখবে লোকে টেলিফোনে। একদম অল্প বয়স্ক যারা, তাদের কাছে আমরা কীভাবে পৌঁছাবো? তারা যেভাবে দেখছে, আমরা বাংলাদেশে কি তাদের জন্য কন্টেন্ট বানাচ্ছি? সেটা কিন্তু বড় একটা ব্যাপার। সুতরাং যৌথপ্রযোজনার নীতিমালা প্রণয়ণের সময় সেটা যাতে সময়োপযোগী, যুগোপোযোগী এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নির্মাতাদের নানা সুযোগ সুবিধার কথা আমরা ভাবছি কিনা? এবং যখন আমরা কো প্রোডাকশানের কথা বলছি, তখন আমরা শ্রীলঙ্কার সাথে বাংলাদেশের কিংবা নেপালের সঙ্গে কো প্রোডাকশান হলে কি হবে তা ভাবছি কিনা? ভারতেরও কিন্তু বিভিন্ন প্রদেশে, বিভিন্ন রাজ্যে ছবি হয়, ভারত বলতেই আমরা বলিউড ভাবি কিনা। আর আমাদের পাশের রাজ্য আসাম, উড়িষ্যায় যে অ্যাওয়ার্ড উইনিং প্রেস্টিজিয়াস সব কাজ হচ্ছে সেসব খবর আমরা রাখছি কিনা?
আমরা থাইল্যান্ডে চিকিৎসা করতে যাচ্ছি। থাইল্যান্ডের এত বড় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কোনো সুবিধা আমরা নিচ্ছি কিনা? ওখানে আমরা পোস্ট প্রোডাকশান করছি, কিন্তু ওখানে কোনো টাকা আছে কিনা আমাদের এখানে ইনভেস্ট করার। এবং আমরা বাংলাদেশে ছবির শ্যুট করে ওই দেশে প্রদর্শন.. মানে এতরকম ডাইমেনশন আছে আমি মনে করি ।
এই পুরো বিষয়গুলোকে, আলোচনার মধ্যে না আনা হয়, তাহলে হয়তো আমরা খুব সীমিতভাবে, খুব তাৎক্ষণিকভাবে সমস্যাটাকে দেখে, সেখানে আমরা যদি নিজেদেরকে সীমাবদ্ধ রাখি তাহলে কিন্তু আগামী পাঁচ, দশ, পনেরো বছরে যেটা হতে যাচ্ছে এই ভবিষ্যত নিয়ে আমরা ভাবছি কি?
আশা করছি, যারা বিষয়গুলো বিবেচনা করছেন সরকারের পক্ষ থেকে তারা বিষয়গুলো মাথায় রাখবেন। আমারও আগামী পনেরো বছর নিয়ে পরিকল্পনা আছে। যদি প্রযোজনাটা অব্যাহত রাখতে পারি, আশাতো আছে আরও দশ পনেরো বছর কাজ করার। তাৎক্ষনিক সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান আমাদেরকে সামনে এগিয়ে নিতে পারবে না।
প্রশ্ন : আপনি ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ইনিশিয়েটিভ অব বাংলাদেশ নিয়ে কাজ করছেন। বাংলাদেশের ফিল্মকে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়ার একটা প্রচেষ্টা। এর মধ্যে ‘ঢাকা টু কান’ নামে একটা প্রজেক্ট চলছে। আপনাকে এ কাজে সহযোগিতা করছে ইওরোপের সংগঠন আইএফটা। এটার অগ্রগতি সম্পর্কে যদি একটু বলেন..
সামিয়া জামান: নিশ্চয়ই। আসলে, ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ইনিশিয়েটিভ অব বাংলাদেশ আমার জন্য একদম নতুন একটা প্রচেষ্ট। আসলে কাজটা আগে হয়েছে, ফর্মুলটা পরে হয়েছে। অভিজ্ঞতা থেকেই এটা হয়েছে। আমি আমার ছবি নিয়েই, যদিও ওটা তেমন ফেস্টিভালে যাওয়ার মতো ছবি না, কিছু কিছু দেশেতো যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। গত কয়েক বছরে আমার মনে হয়েছে যে আমরা যথেষ্ট পরিমানে বাইরের ফিল্ম কম্যুনিটিগুলোর সাথে যুক্ত হচ্ছি না। যোগাযোগ করছি না।
একটা ফেস্টিভালে হয়তো একটা ছবি ভালো করলো, কিন্তু কোনো ধারবাহিকতা আমরা তৈরি করতে পারছি না। পরের বছরও যে আমরা নিশ্চিত করবো আমাদের আরেকটা ছবি সেখানে জমা পড়ুক সে চেষ্টা করছি না। খুব বেশি ছবিও হয়তো তৈরি হচ্ছিলো না। কিন্তু গত কয়েকবছর ধরে নিশ্চয়ই আপনিও হয়তো খেয়াল করেছেন, ফরমাল ইনফরমাল সেক্টর মিলিয়ে ছবি হচ্ছে। তো ওই ছবিগুলো একেকটা ফেস্টিভালকে টার্গেট করে ধারাবাহিকভাবে যাতে আমাদের ছবিগুলো সেখানে জমা পড়ে এটা হতে পারে।
তার বাইরেও এটা বেশ কয়েকবছর ধরেই ট্রেন্ড চলছে একটু বড় ফেস্টিভালগুলোতে, ছোটগুলোতেও হচ্ছে, ফিল্মের একটা মার্কেট তৈরি করা। ফিল্মের ক্রাইসিসটা কিন্তু সারা পৃথিবীতেই হচ্ছে। ফান্ডিং পাচ্ছে না, দর্শক কমে যাচ্ছে, সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এটা আমার দেশের একমাত্র সমস্যা না। এখানে, একজন আছেন পরিচালক, আর সরকারি-বেসরকারি ফান্ড। তাদের যোগাযোগের জায়গাটা কোথায় হবে? সেই জায়গাটাই কিন্তু ফিল্ম ফেস্টিভাল। সেখানে একেকটা জায়গায় আমার গিয়ে মনে হয়েছে আমার কোনো উপস্থিতি নেই বাংলাদেশ হিসেবে। এত এত লোকের সঙ্গে আমার কথা চালাতে হয়েছে যে, ও তোমরা বাংলাদেশ। তোমরা কি ছবি বানাও? আমরা যেসব ছবি বানাচ্ছি কমার্শিয়াল সেক্টরে, ইন্ডিপেন্ডেন্ট সেক্টরে কিংবা শর্টফিল্মগুলোও। এদের সঙ্গে ফান্ডের যোগাযোগটা হবে কি করে? তো, এই দুয়েকটা জায়গায় যেতে যেতে, আমার ‘ঢাকা টু কান’ প্রজেক্ট। আইএফটার সাথে আমার পরিচয়টা হলো কানেই। ওনারা ‘ঢাকা টু কান’ নামে এই প্রজেক্টটাকে সাপোর্ট দিচ্ছেন। এ বছর দু’জনকে নিয়ে গেলাম। যদি ফিল্ম ক্যারিয়ারের শুরুতে যদি এই এক্সপোজারগুলো হয়, তাহলে সুবিধা হয়। কেননা যারা মিড ক্যরিয়ারে গিয়ে সাকসেস হন, সেটার ফল ভোগ করা তার পক্ষে কিংবা পরের প্রজন্মের পক্ষে কিছুটা কষ্টসাধ্য হয়। নতুনদের মধ্যে যাদের মধ্যে পোটেনিশিয়ালিটি আছে ইন্টারন্যাশনাল স্টান্ডার্ডের ফিল্ম বানানোর তাদের এসব ফেস্টিভালে নেয়ার লক্ষ্যেই এই প্রজেক্টটা করা। এ বছরও আমরা একজনকে নিয়ে যাবো। আইএফআইবির এটা হলো একটা প্রজেক্ট-এখানে হয়তো ফুললি স্পন্সর করে আমরা একজন দু’জনকে নিতে পারবো, কিন্তু তার পাশাপাশি আমি যেটা করতে চাচ্ছি সেটা হলো আরও আরও অনেক লোককে ব্যাসিকেলি উৎসাহিত করা।
প্রশ্ন : ‘ঢাকা টু কান’ ছাড়া আইএফআইবির অন্যান্য কার্যক্রম কি থাকছে?
সামিয়া জামান: আইএফআইবির পক্ষ থেকে আমরা আরও কিছু ফেস্টিভালের সাথে যোগাযোগ করছি । আশা করছি আমরা সেসব জায়গাতেও নতুনদের নিতে পারবো। আমরা চেষ্টা করছি আরও কিছু প্রতিষ্ঠান, ফিল্ম মেকার ভিন্ন ভিন্ন ফেস্টিভালের সাথে সম্পর্ক তৈরি করা। একই ধরণের প্রোগ্রাম আমরা অন্যান্য জায়গাতেও করতে পারি। আমাদের ইয়াং ফিল্ম মেকারদের জন্য।
আমার টার্গেট গ্রুপ হলো, যাদের ফিল্ম ক্যারিয়ার নতুন, বিশেষ করে বাইরের এক্সপোজারটা যেটা, বিশেষ করে চিন্তার আদান প্রদানের যে কানেকশানগুলো তৈরি হয়, একেবারে সশরীরে সেখানে হাজির না হলে আসলে সেটা হয় না। সেটার জন্য আমার সেই ছবিটা হবে, তারপর সেটা ফেস্টিভালে যাবে, তারপর সেটা পুরস্কার পাবে -অতদূর পর্যন্ত অপেক্ষা করার কারণ আমি আসলে দেখি না। আমি যখন একটা ফেস্টিভালে যাই, আমি দেখি যে যারা ফিল্ম স্টুডেন্ট তারা সবাই দলবেঁধে চলে এসেছে। সামহাউ আমরা এখানে কালচারটা তৈরি করতে পারছি না।
আমাদের ইয়াং ছেলেপুলে যারা তাদের ইনকামও বেড়েছে, তারা বেড়াতেও যাচ্ছে এতকিছু করছে, ফেস্টিভালেই বা কেন যাবে না? পৃথিবীতে কি কাজ হচ্ছে, আমার পাশের দেশে কি কাজ হচ্ছে সেটা না জানলে কিন্তু এগুনো যাবে না। তো সেইখানে যদি আইএফআইবি একটা ভূমিকা পালন করতে পারে। ফেস্টিভাল কিন্তু শুধু একটা কাজ তার পাশাপাশি ওয়ার্কশপ ট্রেইনিং নানাকিছু আছে।
প্রশ্ন : শুধু ফিল্মমেকারদের মিথস্ক্রিয়ার কথাই বললেন, যদি জানতে চাই, ফিল্মমেকারদের সঙ্গে কেন কবিদের আড্ডা হবে না, মিউজিশিয়ান বা পেইন্টিংস বা অন্যান্য আর্টওয়ার্কের লোকেদের সঙ্গে কেন ওঠাবসা হবে না? আপনার কি মনে হয়না আমাদের এখানে সেটারও খুব বিচ্ছিন্নতা চলছে?
সামিয়া জামান: ইউ আর সো রাইট। এই ট্রাফিক ট্রাফিক করে এটা আসলে একটা অজুহাত। আমি আসলে এটা এখন খুব মনে করতে শুরু করেছি, বাংলাদেশে এখনতো খুব প্রতিযোগিতার সময় চলছে। ওপরে ওঠার প্রতিযোগিতা। দেশ হিসেবে উঠছি, মানুষ হিসেবে ওঠাবার…। আমরা আসলেই খুব বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি। সেই বিচ্ছিন্নতার কারণে যেটা হচ্ছে যে- আড্ডাটা কিন্তু আমাদের একটা জাতীয় সম্পদ। এটা পৃথিবীর আরও অন্যান্য দেশে আছে। তারমধ্যে আমি তুলনীয় বলতে পারি ফ্রান্স।
মানে অকারণে বসে বসে কথা বলা এবং শুধু কথাই বলা, এটা থেকে যে আনন্দ, এটা কিন্তু সবভাবে আমাদের কালচারের অংশ। বাড়ির মধ্যেও আমরা এটা করি, কাজের মধ্যেও করি। এবং আপনি দেখবেন যে আমাদের যে বড়বড় লেখক, সাহিত্য আন্দোলন হয়েছে, অভিনয়-থিয়েটার যা হয়েছে, সিনেমাও এই আড্ডা থেকেই কিন্তু হয়েছে।
প্রশ্ন : আড্ডার স্থানগুলোও কিন্তু হারিয়ে যাচ্ছে..
সামিয়া জামান: আগে যারা আর্ট কালচারে থাকতো সবাই ছিলো স্ট্রাগলিং আর্টিস্ট। এখনতো সবাই চাকরি-বাকরি করে। সব শেষে করে একটা টাইমে বসে শুধু কথা বলা, আইডিয়া শেয়ারিং করা এসব আমার কাছে মনে হয় একদমই কমে গেছে। খুব অল্প বয়স যাদের তাদের মধ্যে হয়তো আছে। অ্যাটলিস্ট আমরা যাদের চোখের সামনে দেখছি, যারা আর্ট-কালচার করছে সবার মুখেই কিন্তু কথাটা শুনছি।
তাতে কি হচ্ছে, আমি একজন ফিল্ম মেকার হিসেবে যদি না জানি, পেইন্টিংয়ে আমার দেশে এবং বিদেশে কি হচ্ছে, আমার একটা ভালো-পরিষ্কার ধারণাতো থাকার কথা। এবং এই কারণেই কিন্তু আমরা শিক্ষিত না। আমরা কিন্তু শিক্ষিত না এখন। এই মুহূর্তে যারা কবিতা লিখছেন চট করে তাদের কবিতার পাঁচটা লাইন বলে দেওয়া, গল্পগুলো নিয়ে আলোচনা করা, আমরা করছি না যথেষ্ট পরিমান। অনেকেই নিশ্চয়ই করছেন। আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, মনে হচ্ছে কিছুর একটা কমতি আছে। সেইখানে আইএফআইবি একটা ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রশ্ন : ময়মনসিংহ গীতিকা অবলম্বনে সৈয়দ শামসুল হকের চিত্রনাট্যে আপনার পরবর্তী চলচ্চিত্র নির্মাণের কথা ছিলো। সেটার অগ্রগতি জানতে চাই..
সামিয়া জামান: ওইটা একটা রেডি স্ক্রিপ্ট। অনেক বছর আগে করা। খুব ভালো স্ক্রিপ্ট। সৈয়দ শামসুল হক কিন্তু আমাদের দেশের অন্যতম সফল চিত্রনাট্যলেখক। ইনফ্যাক্ট আপনি বলছিলেন না, সাহিত্য সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ, আমাদের ষাটের দশক-সত্তর দশকে এত ভালো কাজ হয়েছে কারণ অনেক বিখ্যাত লেখক কিন্তু চিত্রনাট্য লিখেছেন। আমরা জানিওনা হয়তো অনেকের নাম। আজকের সিনেমার যে গেলো গেলো ভাব তখন কিন্তু ওরকম ছিলো না। এটা একটা অসাধারণ একটা চিত্রনাট্য। এটা আমারই দুর্বলতা যে আমি এখনও ছবিটি শুরু করতে পারিনি। কিন্তু আরও একটা কারণ হলো যে, একটা প্রোপার বাজেটে ঠিক সেটাপে করতে না পারলে এটা আসলে করাটা উচিত হবে না।
প্রশ্ন : নির্মাতা হিসেবে তাহলে আবার আপনাকে আমরা কবে ফিরে পাচ্ছি?
সামিয়া জামান: দেখা যাক, প্রযোজক হিসবে এ ছবিটা আগে শেষ করি। হয়তো আগামী বছর..

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ