ফুলশয্যায় বিষকাঁটা

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৭, ১২:৫৩ পূর্বাহ্ণ

ইরানী বিশ্বাস


গুলশানের এই রাস্তাটা বেশ নিরিবিলি। হয়তো শুক্রবার বলেই এমনটি হতে পারে। কয়েকটি রিক্সা শাঁ করে চলে গেল শিলার পাশ দিয়ে। আনমনা শিলা অনিচ্ছায় ঘাড় ফিরিয়ে তাকায় সেদিকে। আবার সমানের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে। রিক্সার টুংটাং শব্দে মাঝে মাঝে খেই হারিয়ে ফেলে শিলা। সামনের দিক থেকে একরাশ জৈষ্ঠ্যের দমকা বাতাস এসে মুখে লাগে। মাথার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালের ওপর খেলা করে। বাম হাতের তর্জনী দিয়ে চুলগুলো একপাশে সরিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। অবাধ্যের মতো আবার এসে হুল্লোড় করে। রবিন ঠিক এ রকমই। কি নাছোড়বান্দা ছেলে, ভাবতেই নিজের মনে হেসে ওঠে শিলা। অন্য কোন ছেলে হলে নিশ্চয়ই প্রতিশোধ নেয়ার কথা ভাবতো। কিন্তু রবিন তা করল না। কেন করলো না, বার বার এ প্রশ্নটাই শিলাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে বেশ কয়েকদিন ধরে। এখনো রিক্সায় যেতে যেতে এই কথাটাই ভাবছে।
ছোটবেলা থেকে ডানপিটে স্বভাবের। এজন্য কি কম কষ্ট পোহাতে হয়েছে শিলার মায়ের! আত্মীয় থেকে পাড়া প্রতিবেশি আড়ে-চাড়ে কতো কথা শুনিয়েছে শিলার মাকে। তারা শুনিয়ে শুনিয়ে শিলার মায়ের সামনে অন্য মেয়েদের গুনের কথা বলতো। গ্রামের মানুষদের এই এক স্বভাব। মেয়ে হলে তাকে বাধ্যতামূলক রান্না জানতে হবে, সেলাই জানতে হবে। মানুষ দেখে চোখ নিচু করে কথা বলতে হবে। কিন্তু শিলা সেখানে অন্যরকম। ওড়না গলায় না পেচিয়ে, কোমরে পেঁচিয়ে ঘুরে বেড়াতো। পুতুল খেলা রেখে ছেলেদের সাথে মাঠে গিয়ে দাঁড়িয়াবান্দা খেলতো। এ এক অন্যরকম মেয়ে। শিলার মা মেয়ের জন্য চোখের জল ফেলেনি এমন দিন খুব কমই ছিল। পাড়া-প্রতিবেশি থেকে ঘরের মানুষের কথা, কোনটাই কম যায় না। আর পড়ালেখাতের ছিল ডাব্বা। ক্লাশ নাইনে পরীক্ষার আগে পর্যন্ত কখনোই দশের মধ্যে রোল নম্বর থাকতো না। তাই পরীক্ষার পর যত না শিলা টেনশন করতো, তারচেয়ে বেশি করতো ওর মা। কারণ প্রত্যেকবার রেজাল্ট বের হলেই শিলার বাবার রক্তচক্ষু দেখতে হতো।
– তোমার ওমন ধেংড়ি মেয়েকে আর পড়াতে পারবো না, এই বলে দিলাম। এভাবেই কথা শোনাতো শিলার বাবা। কিন্তু সবার এমন রক্তচক্ষুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শিলা দশম শ্রেণিতে উঠেছিল ৫ রোল নিয়ে।
সেবার স্কুলের অংক টিচার নিখিল বাবু ছুটে এসেছিলেন শিলাদের বাড়িতে। শিলার মা নিখিল বাবুকে দেখে আঁৎকে উঠেছিলেন। না জানি কোন দুঃসংবাদ দিতে এসেছেন। আর নিখিল বাবুও কম যায় না। তেমনি মুখ গোমড়া করে কাঠের চেয়ারে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। শিলার মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
– আপনার মেয়ে কি করেছে জানেন?
শিলার মা মনে মনে কয়েকবার সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করে নিলেন। তারপর পাংশুর মুখে টিচারের দিকে তাকিয়ে বললেন,
– কি করেছে মাস্টার মশাই?
মুখখানার কোন বদল না করে মোটা সুরে বললেন,
– আগে ডাকেন তাকে, তারপর বলব।
ততক্ষণে শিলা এসে হাজির। ডিসেম্বর মাস তবুও সারা মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। না, এ ঘাম ভয়ে নয়। বিকালের পড়ন্ত রোদে মাঠে গোল্লার ছুট খেলছিল। নিখিল বাবু এসেছেন শুনে, ছুটে এসেছেন। মেয়ে যতই ডানপিটে হোক, গুরুজনদের শ্রদ্ধা করতে একটুও ভুল করে না। নিখিল বাবুর পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করতেই, হেসে উঠলেন তিনি। বললেন, মাকে আগে প্রনাম করো। আপনার মেয়ে এবার সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে রেজাল্ট করে। কথাগুলো বলার সময় নিখিল বাবুর চোখে মুখে অদ্ভুত এক আনন্দের বন্যা বইছিল। শিলার মা তখনো কিছু বুঝে উঠতে পারে নি। আর পারবেই বা কি করে! সারা বছর জুড়ে তো মেয়ের নামে নালিশ ছাড়া প্রশংসা শোনে নি।
একটি প্রাইভেট কার হর্ণ বাজিয়ে চলে গেল পাশ দিয়ে। কোন কারন ছাড়াই শিলা সেদিকে তাকায়। বেশ হ্যান্ডসাম একটি ছেলে গাড়ি ড্রাইভ করছে। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে এ রকম অনেক ছেলেরা আসে গাড়ি ড্রাইভ করে। কিন্তু ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে, দেখাই যায় না। গ্রাম থেকে প্রথম ঢাকা আসে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষা দেবার সময়। এখানে আসলে সব মফস্বল শহরের ছেলেরা ভর্তি হয়। আর শহরের ছেলে-মেয়েরা প্রাইভেট ইউনির্ভাসিটিতে ভর্তি হয়। তবে ইউনিভার্সিটির প্রথম দিকে না বুঝলেও সে এখন বুঝতে পারে। রাজনীতি ছাড়া ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে পরীক্ষা দেয়া বা পাশ করা যায় না। ইস, সেই দিনগুলির কথা মনে হতেই গা কেমন রি-রি করে ওঠে। ছাত্র রাজনীতি যে এতটা জঘন্য তা সে আগে বুঝতো না।
গাড়িটি চলে গেল সাঁ করে। চোখ সেদিকেই রয়েছে শিলার। একটি মেয়ে বেশ অভিমান করেছে। ছেলেটি তাকে জাপটে ধরে মান ভাঙাচ্ছে। শিলার রিক্সার পাশ দিয়ে অন্য একটি রিক্সা চলে যাচ্ছে। যাবার সময় শিলার দিকে তাকিয়ে বলছে, বেশ্যারা তবু রাতের অন্ধকারে আকাম করে। আর ভদ্রলোকের মাইয়া গুলান সবার সামনে আকাম করে। কথা শেষ হতে না হতেই রিক্সাটা শিলার রিক্সাকে দুরত্ব বাড়িয়ে চলে গেল। ঘটনাটি শিলাও দেখেছে। তবে তেমন করে ভাবার সময় হয় নি।
সেই সকাল থেকে বুকের মধ্যে যেন ঢেকিতে ধান ভানছে। এত শক্ত মনের মেয়েটার একি হাল হলো? শিলা মাঝে মাঝে নিজেও ভাবছে, এর আগে কখনোওতো এমন নার্ভাস লাগেনি? তাহলে, এমন লাগছে কেন? তবে কি প্রেমে পড়লে সকলেরই এমন হয়!
ইউনিভার্সিটির প্রথম দিন থেকেই রবিন শিলাকে খুব পছন্দ করতো। কিন্তু শিলা! কোন দিকে তাকানোর যেন ফুরসৎ নেই। হয় পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত, নাহয় পার্টির কাজে ব্যাস্ত। ফার্স্ট ইয়ারে পরীক্ষার পর অনেকেই শিলার শত্রু হয়ে গেল। এমন কি মিলি পর্যন্ত! যে মিলি, একদিন শিলাকে এত উপকার করেছিল। এমন কি শিলা তখন হলে সিট পায় নি। নিজের সিটে মিলি শিলাকে শেয়ার করছে। গরমে কষ্ট হয়েছে। তবু মনে কোন কষ্ট ছিল না। সেই মিলি কিনা কথা বন্ধ করে দিল! শুধু মিলির ধারনা নয়, অনেকেরই ধারনা, মিলি পার্টি করে বলে, স্যার ওকে বেশি নম্বর দিয়েছে।
নিন্দুকের নিন্দার ঝড়ে বাতাস দিলেও শিলার মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া ছিল না। সে নিজের মনে পড়ালেখা করেছে সব সময়। এবছর তার ফাইনাল ইয়ার। পড়ালেখায় যতটা মন দেয়া উচিত তা কি শিলা দিতে পারছে? পারে নি। কারন, শিলার সেই ডানপিটে মনের এক কোনে নরম তুলতুলে সাদা মেঘের দানা বেঁধেছে। যেকোন সময় বৃষ্টি হতে পারে।
রবিন সব সময় শিলার এন্টিপার্টি করে। তবে দেখতে বেশ হ্যান্ডসাম। হলে কি হবে? কথায় আছে, পার্টির সুবিধের জন্য নাকি ভাই ভাইকে খুন করে। আর এতো হলো ক্লাশমেট। অনেকে বলেছে, রবিন যত কিছুই করুক না কেন, শিলার মন গলাতে পারবে না। শিলা তেমন মেয়েই না। তাছাড়া রবিনকে তো মিলি ভালবাসতো। রাত জেগে কতো গল্প শুনেছে শিলা। অনেক দিন শিলা কথা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তো। তবু মনের আনন্দে মিলি কথাগুলো বলেই যেতো।
রিক্সায় টুংটুং শব্দ করে রাস্তার এক পাশে রেখে নেমে পড়ে রিক্সাওয়ালা। শিলা কি যেন ভাবছে। তাই বুঝতে পারেনি, ও গুলশান ছাড়িয়ে বনানী এসে পৌঁছেছে। শিলার অন্যমনস্ক দেখে রিক্সাওয়ালা বলে,
– আফা, বনানী আইয়া পড়ছি তো।
শিলার হুশ ফেরে। কোন দিকে যাবে, বুঝতে পারছে না। এখানেই তো আসার কথা ছিল রবিনের। এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে মনে পড়লো, একটা ফোন করলেইতো ঝামেলা মিটে যায়। ব্যাগ থেকে মোবাইলটা বের করতেই দেখে, সুইচ অফ হয়ে আছে। মনে মনে ভাবলো, হয়তো চাপ লেগে অফ হয়ে গেছে। মোবাইলের বাটন চেপে ওপেন করার চেষ্টা করে। কিন্তু মোবাইল ওপেন হওয়ার পর কল করতে গেলেই অফ হয়ে যাচ্ছে। মনে পড়লো, মোবাইলে তো চার্জ দিতেই ভুলে গেছে।
রবিরের সেই মিষ্টি চাহনি যেন আজও মন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি শিলা। কি নিস্পাপ দৃষ্টি। যে কারোরই মন কাঁড়তে পারে। ইউনিভার্সিটিতে ছাত্রদের দুই গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়েছিল মাস ছয়েক আগে। সবচেয়ে বেশি মার খেয়েছিল রবিন। অনেকেই মনে করেছিল রবিন বুঝি বাঁচবে না। তবে মাত্র ১৫ দিনের মধ্যেই দিব্যি হাটাচলা করতে লাগলো। রাজনীতি করা ছেলে মেয়েদের যখম হওয়া আর না হওয়া বোঝা যায় না। যখন নিজের দল হেরে যাচ্ছে, তখন অসুস্থ না হয়েও অসুস্থতার ভান করে থাকতে হয়। এ জন্য শিলা প্রথম দেখেই বুঝেছিল রবিনের তেমন কিছু হয় নি।
ছাত্র সংঘর্ষের দুইদিন পর ক্লাশে অনেকেই বলাবলি করছিল, রবিন খুব বেশি যখম হয়েছে। হয়তো বাঁচবে না। এটা শুনেতো মিলি নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল। অবশ্য মিলির সঙ্গে এতদিনে সম্পর্কটা ফাঁকা হয়ে গেছে। প্রয়োজন ছাড়া কেউ কারো সাথে কথা বলে না।
শিলা যতই নেত্রী হোক, মানুষ তো? তাই রবিনের কথা শুনে ওর খুব খারাপ লেগেছিল। রাজনীতির বাইরে দাঁড়ালে, প্রত্যেকেই মানুষ। তাহলে কিসের জন্য এত হানাহানি, এত সংঘর্ষ। অনেক ভাবতে ভাবতে শিলার মধ্যে অন্য এক শিলার জন্ম হলো। সিদ্ধান্ত নিলো, রবিন কে তার দেখতে যাওয়া উচিত। অনেক ভেবে শিলা সকলের চোখ এড়িয়ে হাসপাতালে ছুটে যায়। পাছে পার্টির লোক কৈফিয়ৎ চাইতে পারে। তাতে কি? মানুষের যদি মানবতাই না থাকলো, তবে পার্টি দিয়ে কি হবে? ভাবতে ভাবতে, রিক্সা থেকে নামে শিলা। হাতে কতোগুলো ফল নিয়ে এগিয়ে যায় হাসপাতালের গেট ধরে। হাতে-কপালে ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় অঘোরে ঘুমাচ্ছে রবিন। নিঃশব্দে কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই রবিনের ঘুম ভেঙ্গে গেল। অবাক হয়ে তাকায় শিলা। যেন রবিন তারই অপেক্ষা করছিল। মনে মনে ভয়ও ছিল তার। কারণ রবিন হয়তো মনে করবে, জুতো মেরে গরু দান করতে এসেছে সে। কিন্তু না, রবিন চোখ মেলে শিলাকে ওভাবে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটুও অবাক হয় নি। বরং ঠোট নেড়ে বলেছিল, তুমি! ভয়ে ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল শিলার সারা শরীর। উত্তর দেবে কি দেবে না, সে ভেবে পাচ্ছে না। ঠিক এ মুহুর্তে তার ভয় ভেঙে দিতে রবিন কথা বলে উঠল। শিলা যেন অনেকটা স্বস্তি পেল। তারপর অনেক কথা। সবচেয়ে মজার বিষয় ছিল, দুজনে কিন্তু একবারও রাজনীতি বা নিজের নিজের দলের কথা বলে নি। শুধুই জীবনের কথা বলেছে। শিলা মনে মনে ভেবেছিল, এই তো আমরা মানুষ। তবে কেন মিথ্যে হিংসা। কেন হাঙ্গামা। এই যে আমরা দুমেরুর দুজনে এতক্ষন পাশাপাশি থেকে কাছাকাছি বসে আছি। কই একবারওতো মতবিরোধ হয়নি। কথা কাটাকাটি হয় নি।
বনানীর এ রাস্তাটা সত্যি ভিআইপি। সব যেন বড়লোকের ছেলেমেয়েদের আড্ডার স্থান। রাস্তার দুজাশে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি। ক্লাশ শেষ করে, অনেকেই রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে গল্প করে। এই সময়টা অবশ্য ক্লাশ ছুটির সময়। অনেকেই গাড়ি হাকিয়ে চলে যাচ্ছে। অনেকের সঙ্গে রয়েছে গার্লফ্রেন্ড। শিলার এভাবে দাঁড়িয়ে থাকাটা মোটেই ভাল লাগছে না। সে লক্ষ্য করছে অনেকগুলো চোখ যেন তার দিকে তীর ছুঁড়ছে। আলাদা আলাদা মানুষ, তাদের ধারনাও আলাদা। কে কি ভাবছে, তা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই শিলার। তার চোখ বার বার পড়ছে হাত ঘড়ির দিকে। নির্ধারিত সময়ের চেয়ে প্রায় ৩০ মিনিট বেশি হয়ে গেছে।
এর আগে অবশ্য দুবার শিলা এরকম অপেক্ষা করছে রবিনের জন্য। প্রত্যেকবারই যেন আলাদা রকম অনুভূতি ছিল। অপেক্ষারও একটা সুখ আছে। কথায় বলে, যদি অপেক্ষাই না থাকলো, তবে প্রেমের কি অর্থ হলো। কথাটা একেবারেই যেন পূর্ণতা পেয়েছিল শিলার ক্ষেত্রে। সেই প্রথমবার, তার অপেক্ষার প্রহর যেন আর কাটে না। তরপর একসময় সেই অপেক্ষার দরজায় খিল এটে ঢুকে পড়লো রবিন। ভাবতে ভাবতে শিলার বুক থেকে কিছু দমকা বাতাস বেরিয়ে আসে। নিজের অস্তি¡ত্ব জানান দিতে একটু নড়ে দাঁড়ায় শিলা। এভাবে কেটে গেল আরো প্রায় ২০ মিনিট।
বাম কানের পাশ থেকে ফিস ফিস শব্দে ভেসে আসছে। প্রথমে সেগুলি আমলে নেয় নি শিলা। কিন্তু এ শব্দগুলি যেন তার খুব পরিচিত। পাশ ফিরে তাকাতেই চমকে ওঠে। কখন যেন চুপি চুপি রবিন এসে তার পাশে দাঁড়িয়ে ডাকছে। শিলা যেন কিছুই শুনতে পায় নি। নিমিষেই শিলার মুখের আনন্দটা চারদিকের বাতাসে মিলিয়ে গেল। একটি গোমড়া মুখো মেয়ের মতো দাঁড়িয়ে রইল রবিনের দিকে মুখ করে। বুঝতে বাকি নেই রবিনের। এটা শিলার রাগ নয়, অভিমান। এ অভিমান নতুন নয়। রবিন সেই প্রথম থেকেই দেখে এসেছে। শিলা বড্ড অভিমানী মেয়ে। কথায় কথায় ছোট বাচ্চা মেয়ের মতো গাল ফুলিয়ে বসে থাকে। মাঝে মাঝে রবিন মুখ ফসকে বলেই ফেলে,
– তোমার পার্টির লোক যদি দেখতো তোমার এই গোমড়া মুখ। তবে তারা কিছুতেই তোমাকে এই বিরাট দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্তে বসে থাকতো না। বড্ড ছেলেমানুষি তোমার।
শিলার মান ভাঙাতে সিদ্ধহস্ত রবিন। বুঝতে পারলো এমন জনস্রোতে কিছুতেই মান ভাঙানোর চেষ্টা করা যাবে না। তার চেয়ে বরং নিরাপদ জায়গায় যাওয়া উচিত। গাড়িটা বেশ দূরে পার্ক করা আছে। ঢাকা শহরের সব জায়গা গাড়ি পার্ক করার মতো অবস্থা নেই। তাই বাধ্য হয়ে একটু দূরে গাড়ি রেখে হেঁটে এসেছে রবিন। শিলাকে ইঙ্গিত দিয়ে বুঝালো সামনের দিকে হাটতে হবে। শিলা কোন বাধা দিলো না, ওবিডিয়েন্ট স্টুডেন্টের মতো রবিনের দেখানো পথে হাঁটতে শুরু করে।
অনেক্ষন ধরে গাড়িটা ছুটে চলেছে সামনের দিকে। রাস্তার যেন কোন শেষ নেই। ঢাকা শহরের এই কোলাহল ছেড়ে ওরা এগিয়ে যাচ্ছে গাজীপুরের দিকে। দুপাশে সারি সারি শালগাছ। একে বেঁকে কখন যেন গাড়ি এসে থেমেছে একটি রিসোর্টের সামনে। এখানে বেশ কিছু রিসোর্ট হয়েছে। অবসর যাপনের জন্য বেশ ভালো। এখানে স্যুটিং স্পটও আছে। সাধারনত এ রিসোর্ট গুলি স্যুটিং ইউনিটদের জন্য করা হয়েছে। সব সময় তো আর স্যুটিং থাকে না। তাই আলাদা ভাড়াও দেয়া হয়।
পুরো রিসোর্টে ওরা মাত্র দুজন। নিচে খাবার ব্যাবস্থা আছে। অর্ডার করলে সব পাওয়া যায়। তবে দামটা একটু বেশি। পরদিন কি কি খাবে তার লিস্ট আগের দিন রাতে বলে রাখতে হয়, এই যা। যারা এখানে আসে, তারা আগে থেকে বুকিং দিয়ে আসে। এমন কি খাবারের অর্ডার দিয়ে তবেই আসে। ঢাকা থেকে গাজীপুর আসতে আসতে শিলার মন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এখন তাকে দেখলে বোঝাই যায় না, সে গোমড়ামুখ করে ছিল। বেশ হৈচৈ করে জানালার পর্দা সরিয়ে দেখছে। কি অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্য! দূরে একটি অচেনা পাখি উড়ে যাচ্ছে। চিৎকার দিয়ে শিলা ডাকছে রবিনকে,
– এই দেখ দেখ কি সুন্দর ওই পাখিটা।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। অনেক পাখিরা ঘরে ফিরছে। চারপাশ থেকে তাদের বিচিত্র রকম শব্দ ভেসে আসছে। শিলা সত্যি অভিভূত। তার মনে কোন ক্ষোভ নেই। বরং মনে মনে রবিনকে থ্যাংকস দিচ্ছে।
সদ্য ভেজা চুল বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি পড়ছে। রবিনের চোখের দৃষ্টি ঘুরে বেড়াচ্ছে শিলার সমস্ত শরীরে। একটু আগে যে শরীরটা ছিল উদম। এখন সেখানে দৃষ্টির পর্দা পড়েছে। তবুও কল্পনায় এই আবরণ ঠেলে সব যেন দেখতে পাচ্ছে রবিন। নিজের ভেতর কে যেন বার বার ধাক্কা দিচ্ছে। রবিন শুয়ে থাকতে পারছে না।
শিলা ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে প্রসাধন মাখছে। আয়নার ভেতর শিলার সব সৌন্দর্য দেখতে পাচ্ছে রবিন। পায়ে পায়ে এগিয়ে যায়। পেছন থেকে জাপটে ধরে শিলাকে। প্রশস্ত দুটি হাতের তালূতে বন্দি করে শিলার মুখ। তারপর ধীরে ধীরে ওপরে তুলতেই দৃষ্টি পড়ে। শিলা অবাক হয়ে রবিনের চোখে চোখ রাখে। অস্পষ্ট সুরে রবিন বলতে থাকে,
– তুমি এত সুন্দর! আজ যেন প্রথম দেখলাম। শিলা আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।
হাতে রাখা চিরুনি রেখে উঠে দাড়ায়। হঠাৎ ঘুরে দাড়িয়ে শিলা বলতে থাকে.
– তুমি সত্যি বলছো! কিন্তু এটা যে আমার মনের কথা। তুমি জানলে কি করে?
ঈষৎ হাসি ঠোটে ঝুলিয়ে রবিন বলে ওঠে,
– তুমি জানো না? আমি এখন তোমার চোখের তারায় সব দেখতে পাই। তোমার অব্যক্ত মনের কথাগুলি আপনা ফুটে ওঠে তোমার মুখের আভায়্। তোমার মনের কথা পড়তে আমার কোন কষ্ট হয় না। এ ভাষা যে আমি রপ্ত করেছি বহু আগেই। তাইতো তোমাকে আমার করে পেয়েছি। তুমি যদি চাও কালই আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।
– কালই! শিলার চোখে মুখে এক অন্য রকম আনন্দের বিদ্যুৎ চমকায়। ভেতরে ভেতরে যেন খুশির বন্য্রা বয়ে যায়। শিলা ভুলে গেছে পার্টির কথা। ভুলে গেছে পার্টির আদর্শের কথা। শুধু নিজের সুখ পেতে সে যেন মরিয়া।
কাছেই গাজীপুর কাজী অফিস। ওদের কলমা পড়া শেষ। ধর্মীয় মতে ওরা এখন দুজন স্বামী-স্ত্রী। বাঙালি স্বামী হিসাবে রবিন তার সবটুকু কর্তৃত্ব ফলাতে পারে শিলার ওপর। সারা বেলা ঘুরে ফিরে রুমে ফিরে আসে দুজন। বিয়ের প্রথম রাতে স্বামীর কাছ থেকে সকল নারী কিছু উপহার আশা করে। রবিন তাই শিলাকে রুমে রেখে নেমে যায় নীচে। ফিরে আসে একগুচ্ছ গোলাপ হাতে।
মানুষ আসলে সব পরিস্থিতির জন্য সব সময় প্রস্তুত থাকে না। কোন কোন মুহুর্ত অবাঞ্ছিত ভাবে অনেক সুখ এনে দেয়। তেমন মুহুর্তের মুখোমুখি এখন ওরা দুজন। শিলা বেশ খুশি। দুজনের কেউই এই মুহুর্তটার জন্য প্রস্তুত ছিল না। সময় গড়িয়ে এখন প্রায় মধ্যরাতের কাছাকাছি। শিলাকে এক গুচ্ছ গোলাপ দিয়ে বরণ করে বিবাহিত জীবনের প্রথম প্রহরে। গত রাত ছিল কুমারী শয্যা। আজ তাদের ফুলশয্যা। পাশাপাশি দুটি রাতের দ’ুরকম অনুভূতি। এমন সৌভাগ্য বোধ করি কম মানুষের ভাগ্যে জোটে। রবিনের দুটি ঠোট ক্রমশ স্পর্শ করে চলেছে শিলার সমস্ত শরীর। শিলা এখন অন্য জগতের বাসিন্দা। যেখানে নেই কোন দুঃখ, নেই অভিমান। আছে শুধুই ভালবাসা। হঠাৎ রবিন শিলার দিকে ঝুকে স্থির তাকিয়ে থাকে। শিলা চোখের ইসারায় জিজ্ঞেস করে,
– কি দেখছো অমন করে?
রবিন যেন স্বাভাবিক। তার মধ্যে রোমান্টিকতার চিহ্ন মাত্র নেই। খুব স্বাভাবিক গলায় রবিন বলতে থাকে,
– আচ্ছা আজ থেকে আমরা স্বামী-স্ত্রী। তাই না?
– কেন তোমার কি কোন সন্দেহ আছে? মিষ্টি হেসে উত্তর দেয় শিলা। রবিন আবারও বলতে থাকে,
– তাহলে আজ আমি একটা কথা তোমাকে বলবো। স্বামী হিসাবে এটা আমার অধিকার। বল তুমি রাখবে?
দুষ্টামীর ছলে রবিনের নাক ধরে টান দিয়ে শিলা বলে ওঠে,
– নিজের বউকেই তো বলবে। তবে এত ভনিতা কেন? বলে ফেললেই তো হয়। আমি জানি, বাসর ঘরে সব স্বামীরাই বায়না করে। এটা শুধু তুমি না। স্বামীদের স্বভাব।
রবিন মুখে আরো গম্ভীরতা এনে বলে,
– তুমি এর পর থেকে আর কোন দিন পার্টি করবে না। স্বামী হিসাবে, এটা আমার অনুরোধ নয়, আদেশ।
মুহুর্তে শিলার মুখে কালো মেঘের ছায়া পড়ে গেল। চোখের দৃষ্টি রবিনের দিক থেকে রুমের ছাদে গিয়ে আটকে গেছে। যেখানে একটি তিন ব্লেডওয়ালা ফ্যান ঝুলে আছে। সুইচ দিলে ফ্যান ঘুরবে বনবন করে। এখন সুইচ দেয়া নেই। এসি চলছে। তবু ১৫ মিনিটের ব্যবধানে শিলার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। নিজেকে বড্ড বেশি একা লাগছে শিলার।