ফেক নিউজের শিকার ছিলেন অ্যান্টনি, ক্লিওপেট্রা

আপডেট: জুলাই ১৭, ২০১৭, ১২:৫৮ পূর্বাহ্ণ

গৌতম চক্রবর্তী


রোমের সেনেটে সে দিন মার্ক অ্যান্টনির গোপন উইলটি পড়ে শুনিয়ে দিলেন অক্টাভিয়াস। সেনেট মানে, আমাদের এখনকার সংসদের মতো। প্রায় ৯০০ জন বিশিষ্ট নাগরিক সেখানে সম্রাটকে নানাবিধ বিষয়ে পরামর্শ দেন। সেনেটে সে দিন ভিড়। প্রায় সকলেই জানে, সেনানায়ক মার্ক অ্যান্টনি রোমের পূর্ব দিকের রাজ্যগুলি দেখেন, এখন মিশরের রানি ক্লিওপেট্রার সঙ্গে থাকেন। মিশরের রানিটি এক যৌনপুত্তলিকা বিশেষ, ভাইকে বিয়ে করেছিলেন। পরে জুলিয়াস সিজারকেও বশে এনেছিলেন। এখন মার্ক অ্যান্টনির ঔরসে যমজ পুত্রকন্যার জন্মও দিয়েছেন।
এই রোম জানে, মার্ক অ্যান্টনি বীর। কিন্তু অক্টাভিয়াস বীর এবং তুখড় বাগ্মী। সেনেটে ঢোকার আগে সেনেটরদের একটি লাল চাদর বা ‘টোগা’ গায়ে দিতে হয়। ওটিই তাঁদের আভিজাত্যের চিহ্ন। কিশোর বয়সে অক্টাভিয়াস এক দিন সেনেটে ঢুকছেন, টোগা হঠাৎ ছিঁড়ে পায়ের কাছে খসে পড়ল। এটি অমঙ্গলের চিহ্ন। কিন্তু অক্টাভিয়াস বিন্দুমাত্র থতমত না খেয়ে বললেন, ‘‘স্বর্গের অধীশ্বর জুপিটারকে প্রণাম। তিনি দেখিয়ে দিলেন, এই টোগা আজীবন পায়ের নীচে আমাকে ভর দিয়ে মাথা উঁচু করে রাখতে সাহায্য করবে।’’ যা ছিল অমঙ্গলের চিহ্ন, তাকে ঘুরিয়ে প্রায় মঙ্গলের প্রতীক করে দিলেন অক্টাভিয়াস। জুলিয়াস সিজার চমৎকৃত, এই ছেলেই হতে পারে তাঁর রোম সাম্রাজ্যের প্রকৃত উত্তরাধিকারী।
তার পর অনেক জল বয়ে গিয়েছে, সিজার খুন হয়েছেন। অক্টাভিয়াস আর মার্ক অ্যান্টনিরাই এখন সাম্রাজ্য চালান।
অক্টাভিয়াস সেনেটকে সে দিন জানালেন, রোমের রক্ষাকর্ত্রী, চুল্লির দেবী ‘ভেস্টা’র মন্দিরের গোপন ভল্ট থেকে তিনি মার্ক অ্যান্টনির উইল নিয়ে এসেছেন। ভেস্টার মন্দিরে মেয়েরা পুরোহিত হতেন, অক্টাভিয়াস অনেক ব্যাপারেই তাঁদের ধর্মীয় পরামর্শ নিতেন।
অক্টাভিয়াস জানালেন, গোপন উইলে মার্ক অ্যান্টনি লিখেছেন, তাঁর মৃত্যুর পর ভূমধ্যসাগরের তীরে তাঁর জয়-করা রাজ্যগুলির অধীশ্বর হবেন তাঁর ও ক্লিওপেট্রার ছেলেমেয়েরা। এবং সেখানেই শেষ নয়। রোমান সেনানায়কের অনুরোধ, রোমে কোনও কারণে তাঁর মৃত্যু হলে মরদেহ যেন মিশরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানেই তিনি চিরতরে শুয়ে থাকবেন।
মার্ক অ্যান্টনি সত্যিই এই রকম ইচ্ছাপত্র লিখেছিলেন কি না, লিখলেও সেটিকে রোমে রেখে যাবেন কোন দুঃখে, এটা আজও লাখ টাকার প্রশ্ন। কিন্তু সেনেটের প্রতিটি সদস্যই সে দিন রেগে টং। খবরের কাগজ তখনও ভবিষ্যতের গর্ভে। সেনেট নির্দেশ দিল, উইলের কপি যেন রোমের বাজার, গুরুত্বপূর্ণ প্রাসাদের দেওয়াল বা ফোরামে টাঙিয়ে দেওয়া হয়। বার্তাবহরা এই উইলের বার্তা ঘুরে ঘুরে পুরো রোম সাম্রাজ্যকে জানাক। রোমান সেনাবাহিনীকে পরিচালনার রাজকীয় অধিকার বা ‘ইম্পেরিয়াম’ সে দিনই কেড়ে নেওয়া হল মার্ক অ্যান্টনির থেকে।
এখানেই সভ্যতার সংঘর্ষ। ক্লিওপেট্রা গ্রিক টলেমি বংশের, সেটা রোমান জনতা ভেবে দেখেনি। তাদের কাছে, শুধু রোমকরাই সভ্য। বাকি দুনিয়া অসভ্য। মিশরে ভাই-বোনের বিয়ে হত, দু’জনেই সিংহাসনে বসত। মেয়েদের অধিকার ছিল। অন্য দিকে রোমে মেয়েদের ঘরবাড়ি, বিষয়সম্পত্তিÍ সবই তাঁদের অভিভাবক পিতা বা স্বামীর অধীনে। রোম সভ্যতা ভীষণ ভাবে পুরুষতান্ত্রিক।
সেই পুরুষতন্ত্র জানে, মার্ক অ্যান্টনি মিশরে গিয়ে প্রায় বখে গিয়েছেন। তিনি শাসন ভুলে সারা ক্ষণ ক্লিওপেট্রার সঙ্গে মদে আর প্রমোদে ডুবে থাকেন। এক দিন রাজসভায় ক্লিওপেট্রাকে দেখে উন্মাদের মতো দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন, আর এক দিন তাঁর পায়ে সুগন্ধি তেল মাখিয়ে দিচ্ছিলেন। ক্লিওপেট্রা সুশাসক ছিলেন, খাল কেটে মিশরে জলসেচের বন্দোবস্ত করেছিলেন, এগুলি রোম জানত না। জানলেও বিশেষ পাত্তা দেয়নি। রোমান জনতা সে দিন মিশরের এক জাদুকরী যৌনপুত্তলিকা, মার্ক অ্যান্টনির রোমান চরিত্র ছেড়ে মিশরীয় ভেড়ুয়া বনে যাওয়া ইত্যাদি যা কিছু শুনতে চাইছিল, অক্টাভিয়াস তাতেই সুকৌশলে ইন্ধন দিয়েছিলেন। ফেক নিউজ এ ভাবেই তৈরি করতে হয়।
ফেক নিউজ? সারা রোমান সাম্রাজ্য জানে, মার্ক অ্যান্টনি রাহুগ্রস্ত প্রাচ্যের প্রতীক। অ্যান্টনির সেনাদলেও যে অনেক রোমক সৈন্য, সেটি চেপে গেলেন অক্টাভিয়াস। তাঁর যা চাওয়ার, সেটি পাওয়া হয়ে গিয়েছে। অ্যান্টনি বনাম ব্রুটাস ইত্যাদি ক্ষমতার খেলা দেখতে দেখতে রোম ক্লান্ত। কিন্তু এ বার তো আর অক্টাভিয়াস বনাম মার্ক অ্যান্টনি লড়াই নয়। রোমান সভ্যতা বনাম মিশরের অসভ্যদের লড়াই!
পরের ঘটনা সকলের জানা। মার্ক অ্যান্টনির পরাজয় ও আত্মহত্যা। বুকে বিষাক্ত সাপের দংশন নিয়ে ক্লিওপেট্রার মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া। ভবিষ্যতে এই অক্টাভিয়াসের বয়ানেই শেক্সপিয়র থেকে লিজ টেলরের সিনেমা, সবাই ক্লিওপেট্রাকে যৌনতাতাড়িত এক নারী হিসাবেই দেখাবে। আর অক্টাভিয়াস ইতিহাসে বেঁচে থাকবেন সম্রাট অগাস্টাস সিজার হিসাবে। সিংহাসনে বসে তাঁর প্রথম কাজই হবে, সেনেটের সদস্যসংখ্যা ৯০০ থেকে কমিয়ে আনা। ফেক নিউজ ও রোমান সাম্রাজ্য ওতপ্রোত জড়িয়ে।
তাই ফেক নিউজকে যাঁরা শুধু সংবাদের নামে গুজব, সোশ্যাল মিডিয়ার ‘আধুনিক বিপদ’ ইত্যাদি ভাববেন, ভুল করবেন। ফেক নিউজ আসলে জটিল এক গোলকধাঁধা, সভ্যতার কোনও পর্বেই তাকে পুরোপুরি ‘গুড বাই’ জানিয়ে সত্যের আলোয় আনা যায় না।
জোসেফ পুলিৎজার, উইলিয়াম র‌্যান্ডলফ্ হার্স্টদের গল্পটা যেমন। রোম সভ্যতার মতো দূরের নয়, উনিশ শতকের আমেরিকা। পুলিৎজারের নামে আজও বিশ্বখ্যাত একটি পুরস্কার আছে। মিডিয়া মুঘল র‌্যান্ডলফ্ হার্স্ট-এর আদলেই অরসন ওয়েল্স তৈরি করেছিলেন ‘সিটিজেন কেন’।
হার্স্ট এবং পুলিৎজারের কাগজ তখন পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু ১৮৯৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তাঁরা একই দিকে। হাভানা বন্দরে নোঙর করা মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস মেইন’ বিস্ফোরণে উড়ে গিয়েছে, ২৬৬ নৌসেনা হত।
প্রতিদ্বন্দ্বী দুই সংবাদপত্রই তখন বিস্ফোরণের জন্য তড়িঘড়ি স্পেনকে দায়ী করে দিল, জাহাজে করে দ্রুত কিউবায় রিপোর্টার ও ছবি-আঁকিয়েদের পাঠিয়ে দেওয়া হল। কিউবা তখন স্পেনের অধীনে, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্টও স্পেনকে দায়ী করেননি। কিন্তু ওই যে ‘ট্রায়াল বাই মিডিয়া’! পুলিৎজার এবং হার্স্টের কাগজ তখন কিউবা থেকে রোজ স্পেনবিরোধী রোমাঞ্চকর সব ফেক নিউজ ছাপে। ‘‘সাংবাদিকতার ইতিহাসে এর চেয়ে ঘৃণ্য জালিয়াতি আর হয়নি,’’ লিখেছিল নিউইয়র্ক ইভনিং পোস্ট।
একটা গল্প এখানে অসঙ্গত নয়।  হার্স্ট-এর কাগজ থেকে যে সাংবাদিক কিউবায় গিয়েছিলেন, তিনি জানালেন, যুদ্ধ হবে না। তাঁর প্রতি র‌্যান্ডলফ্ হার্স্টের জবাব আজও বিখ্যাত, ‘‘ণড়ঁ ভঁৎহরংয ঢ়রপঃঁৎবং, ও ংযধষষ ভঁৎহরংয ঃযব ধিৎ’’। ‘‘তুমি ঠিকঠাক ছবি দাও, আমি যুদ্ধটা বাধিয়ে দেব।’’ বেচারি সাংবাদিক কী আর করেন! পরের সংখ্যায় ছাপা হল বেশ কিছু জাল ছবি। কিউবার অফিসাররা মার্কিন নারীদের প্রায় নগ্ন করে তল্লাশি চালাচ্ছে।
তার পরই যুদ্ধ। স্পেনের পরাজয়, পুয়ের্তোরিকো এবং ফিলিপিন্সের কিছু দ্বীপ চলে এল আমেরিকার অধিকারে। হার্স্ট ও পুলিৎজারেরা শুধু ফেক নিউজ ছাপেননি, দুনিয়ার ইতিহাসে প্রথম মিডিয়া-স্পনসর্ড যুদ্ধের জনকও তাঁরাই।
গণতন্ত্রের পীঠস্থানে অবশ্য এ সব হয়েই থাকে। শত্রুর বিরুদ্ধে ফেক নিউজ ছাপো এবং যুদ্ধ ঘোষণা করো এটা আমেরিকায় বহু আগে থেকেই চলছে। আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন নিজে দিনের পর দিন তাঁর কাগজে একটি ফেক নিউজ লিখে গিয়েছেন: ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় জর্জের সহযোগী হয়েছে মাথা-কামানো রক্তপিপাসু রেড ইন্ডিয়ান গোষ্ঠী।
শুধু যুদ্ধ নয়, ধর্মীয় গোলযোগেও যুগ যুগ ধরে উস্কানি দিয়েছে ফেক নিউজ। ১৪৩৯ সালে গুটেনবার্গের ছাপাখানা আবিষ্কার। তার পর চার দশক কাটতে না কাটতে ১৪৭৫ সালে ইতালির ট্রেন্ট শহরে শোনা গেল, আড়াই বছরের একটি শিশু হারিয়ে গিয়েছে। এক ধর্মযাজক বললেন, ইহুদিরা শিশুটিকে খুন করে তার রক্ত খেয়েছে। ১৫ জন ইহুদিকে প্রমাণ ছাড়া আগুনে পুড়িয়ে মারা হল। পোপ চতুর্থ সিক্সটাস গোলমাল থামানোর চেষ্টা করেও সফল হলেন না। তাঁর পর্যবেক্ষণ, এই সব ফেক নিউজ কাগজে নয়, লোকের আজন্মলালিত সংস্কারে থাকে। বাড়াবাড়ি হলে শাসনকর্তাদেরও মুশকিল হয়।
ছাপাখানার সেই আদিযুগে খবরের কাগজ নেই। সপ্তদশ শতকের প্যারিসে বিক্রি হয় ছাপা ব্রডশিট বা ‘কানার্ড’। সেখানে উদ্ভট অনেক ছোট ছোট খবর থাকে, সঙ্গে এনগ্রেভিং করা ছবি। ১৭৮০ সালে একটি কানার্ড এনগ্রেভিং দিয়ে জানাল, চিলিতে গভীর সমুদ্রে এক ডাকিনী ধরা পড়েছে। মুখটা মানুষের মতো, সঙ্গে বাদুড়ের মতো দুটো ছোট ডানা আর সারা গায়ে আঁশ। দশ বছরের মধ্যে এই ফেক নিউজটা ফের অন্য ভাবে কানার্ডে এল। এনগ্রেভিং-এ এই বার ডাকিনীর মুখ রানি মেরি আঁতোয়ানেতের মতো। যার ওপর রাগ, তাকে তখনই ডাইনি বানিয়ে দাও সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার পাশাপাশি এটাও ফরাসি বিপ্লবের উত্তরাধিকার! গোলকধাঁধায় আলোকপ্রাপ্তি আর ফেক নিউজ একত্র থাকে।
উত্তরাধিকার কি আর একটা? ১৭৬১ সালে ফ্রান্সের তুলা শহরে মার্ক আঁতোয়ান কালাস নামে ২২ বছরের একটি ছেলের মৃতদেহ পাওয়া যায়। পরিবারটি প্রোটেস্টান্ট। খবর জানায়, কালাস ফের ক্যাথলিক হতে চেয়েছিল। ফলে তার বাবা তাকে রাগের চোটে খুন করেছেন। স্থানীয় বিচারকেরা সাক্ষী ডাকলেন। সকলে এক কথা বলল। বাবাই খুনি। কালাসের বাবাকে অপরাধী সাব্যস্ত করে জেলে পাঠানো হল। প্রবল অত্যাচারের শেষে তাঁকে দেওয়া হল মৃত্যুদ-। যা ছিল গুজব, মাত্র কয়েক দিনে হয়ে গেল সত্যিকার জলজ্যান্ত খবর।
কিন্তু গল্পের তখনও বাকি ছিল। ভলতেয়ার নিজে এ বার গোটা ঘটনাটার ব্যবচ্ছেদ করে নিবন্ধ লিখলেন। ২২ বছরের কালাস সত্যিই কি প্রোটেস্টান্ট থেকে ফের ক্যাথলিক, এই ধর্মান্তরের মানে বুঝত? এক জন শান্তিপ্রিয় নাগরিক ধর্মের নামে নিজের ছেলেকে আত্মহত্যায় উদ্বুদ্ধ করবেন কেন? পর্তুগালে কয়েক বছর আগে ভূমিকম্প হয়েছিল, সেই কথাও টানলেন ভলতেয়ার। ফ্রান্স আর পর্তুগালে বেশির ভাগ কাগজ তখন লিখেছিল, পাপীদের শাস্তি দিলেন ঈশ্বর। ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক ঘটনায় ঈশ্বর কেন আসবেন? আত্মহত্যার কি অন্য কারণ থাকে না? শুধুই ক্যাথলিক-প্রোটেস্টান্ট দ্বন্দ্ব?
জনমত ফের অন্য দিকে ঘুরে গেল। ফ্রান্স দাবি তুলল, আদালত নিয়ে ফেক নিউজ বন্ধ করতে হবে। প্রতিটি জায়গা খুঁটিয়ে দেখতে হবে, সাততাড়াতাড়ি মৃত্যুদ-ের সাজা দেওয়া যাবে না।
জনমতে মিশে থাকা ফেক নিউজকে বধ করার তাই একটাই রাস্তা। ভলতেয়ারের যুক্তিবাদী মন (আনন্দবাজার পত্রিকার সৌজন্যে)