ফেরদৌসির বিচার চান দগ্ধ রেখা || মামলা দায়ের, জবানবন্দি রেকর্ড

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৯, ২০১৭, ১২:৪০ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


রামেক হাসপাতালে বার্ণ ইউনিটে চিকিৎসাধীন দগ্ধ রেখা- সোনার দেশ

বান্ধবীর দেয়া আগুনে ঝলসানো রেখা বেগমের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক। তিনি বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন আছেন। আগুনে শরীর ঝলসে যাওয়ার পর থেকে দু’চোখের পাতা এক হয়নি তার। পিঠের অংশ টুকুও পুড়ে যাওয়ায় ঠিকমতো শুতেও পারছেন না তিনি। এ ঘটনায় রেখা বেগমের ভাই নওশাদ আলী দুইজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। রেখা বেগমের জবানবন্দি রেকর্ড করেছে পুলিশ।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে বার্ন ইউনিটের ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেল, ‘ও আল্লাহ’, ‘ও মা’ বলে পোড়া যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন রেখা বেগম। আবার মাঝে মাঝেই চুপ হয়ে যাচ্ছেন। কিছুক্ষণের নিরবতা ভেঙে আবারও কাঁপুনি দিয়ে উঠছেন। একবার বললেন ‘ফেরদৌসির বিচার চাই’।
রেখা বেগমের পোড়া শরীর ব্যান্ডেজ দিয়ে মুড়ে ফেলা হয়েছে। ওষুধও দেয়া হয়েছে। তারপরেও তার যন্ত্রণা কমেনি। মুখ আর বুক ছাড়া শরীরের প্রায় সব অংশ পুড়ে গেছে তার। পিঠের অংশটুকুও বাঁচেনি। তাই শুয়েও শান্তি পাচ্ছেন না। এ জন্য মাঝে মাঝে তাকে তুলে বসানো হচ্ছে। ২৬ নম্বর বেডে শুয়ে-বসে কাতরাচ্ছেন মৃত্যু যন্ত্রণায়।
বার্ন ইউনিটের চিকিৎসক আফরোজা নাজনিন জানান, রেখার শরীরের ৮০ ভাগ দগ্ধ হয়েছে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। যন্ত্রণায় সারা রাত জেগেই কাটিয়েছেন তিনি। গতকাল সকাল থেকেও তার দুই চোখের পাতা এক হয়নি। পোড়া যন্ত্রণায় সারাক্ষণ কাতরাচ্ছেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুতই তাকে ঢাকায় পাঠানো প্রয়োজন।
রেখা বেগমের ভাগ্নে রঞ্জু হোসেন জানান, তার খালুর পরকীয়া সম্পর্কের কারণে এক মাস থেকে তার খালা কলাবাগানে বাবার বাড়িতে থাকতে শুরু করেন। তার মেয়ে লাবণ্য অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। ছেলে রাবিব ইসলাম এসএসসি পরীাক্ষার্থী। ছেলে-মেয়ে দুজনই মায়ের সঙ্গে নানার বাড়িতেই থাকেন। বাবার সঙ্গে যোগাযোগ নেই।
রঞ্জু বলেন, ঈদের দিন থেকে এই ঘটনার সূত্রপাত। তার খালু কামরুল হুদা ওই দিন নগরীর দরগাপাড়া এলাকায় তার প্রেমিকা ফেরদৌসির বাড়িতে যান। কিন্তু এলাকার যুবকরা বিষয়টি বুঝতে পেরে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়। পরে পাড়ার বড় ভাইদের ডেকে ওই দুজনকে পেটান। কিন্তু ফেরদৌসি মনে করেন- রেখা বেগমই লোক ভাড়া করে এই ঘটনা ঘটান।
স্বামীর সঙ্গে অশান্তির জন্য বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রেখা হজরত শাহমখদুম (র.) এর মাজারে দোয়া করতে যান। আর ওই এলাকাতেই ফেরদৌসি খাতুনের বাড়ি। সেখানে দরগা থেকে ফেরার পথে একা পেয়ে রেখার শরীরে পেট্রোল ছুঁড়ে আগুন দেন ফেরদৌসি। পরে তিনি পালিয়ে যান। এরপর শরীরের আগুন নিয়ে রেখা নদীতে ঝাঁপ দেন। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
রেখার বড় ভাই নওশাদ আলী জানান, কামরুল হুদা ঠিকাদারি ব্যবসা করেন। পদ্মা নদীর তীরে থাকা বিজিবি পরিচালিত ‘সীমান্ত অবকাশের’ একটি রেঁস্তোরায় তার শেয়ার আছে। গত সাত বছর থেকে ফেরদৌসির সঙ্গে কামরুলের পরকীয়া সম্পর্ক। এ জন্য ফেরদৌসি বিয়েও করেননি। ফেরদৌসি তার বোন রেখার বাল্যকালের বান্ধবী। তাই এতদিন বিষয়টি কেউ টেরও পাননি।
নওশাদ জানান, এক বছর আগে রেখা তার স্বামীর পরকীয়া প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি জানতে পেরে এতে বাধা হয়ে দাঁড়ান। এ কারণে তাদের দাম্পত্য কলহ শুরু হয়। পরে দুই সন্তানকে নিয়ে রেখা বাবার বাড়ি চলে আসেন। আর কামরুল নগরীর তেরখাদিয়া এলাকার একটি বাড়িতে একাই থাকতেন। ঘটনার পর থেকে তিনি পলাতক।
এ ব্যাপারে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বোয়ালিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি. তদন্ত) সেলিম বাদশা বলেন, ফেরদৌসিকে তার নিজ বাড়ি দরগাপাড়ার কসাইপাড়া থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে ৫ দিনের রিমান্ডের আবেদনসহ গ্রেফতারকৃতকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তবে গতকাল শুনানি না হওয়ায় বিজ্ঞ আদালত আসামীকে জেল হাজতে প্রেরণ করেছেন।
একটি সূত্র জানায়, ফেরদৌসি একটি এনজিওতে চাকরি করতেন। পরকীয়ার কারণেই ওই এনজিও কর্তৃপক্ষ ফেরদৌসিকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে।
এদিকে বৃহস্পতিবার রাতেই হাসপাতালে রেখার সঙ্গে কথা বলে পুলিশ। তখন রেখা পুলিশকে জানান, ফেরদৌসি তার শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়েছে। তার এ কথার ভিত্তিতে রাতেই অভিযান চালিয়ে ফেরদৌসিকে আটক করে পুলিশ। পরে গতকাল সকালে হাসপাতালে ফের রেখার জবানবন্দি নেয় পুলিশ। এরপর দুপুরে ফেরদৌসি ও কামরুল হুদাকে আসামি করে থানায় একটি মামলা করেন রেখার ভাই নওশাদ আলী।
নগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আমান উল্লাহ বলেন, নওশাদ আলীর দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে দুপুরে ফেরদৌসিকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এর আগে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ফেরদৌসি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে তার পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে।
ওসি জানান, রিমান্ড আবেদনের শুনানি এখনও হয়নি। আদালতে রিমান্ড মঞ্জুর হলে তাকে থানায় এনে ফের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এদিকে পলাতক কামরুল হুদাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।