ফেরার মনুষ্যত্ব ফিরে আসুক

আপডেট: অক্টোবর ১২, ২০২১, ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ

আব্দুল মজিদ:


পৃথিবী নামক গ্রহ থেকে কত কিছুই না হারিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। নবী সোলায়মান বাদশাহর আংটি, মুঘলদের তখত তাউস, ময়ুর সিংহাসন, কোহিনূর, হীরা জহরত, আলাদীনের চেরাগ, রাজা বাদশাহর শান শওকত, সিন্দাবাদের সিন্দুক, পৃথিবীতে দোর্দ- প্রতাপে চলাচলকারী অতিকায় প্রাণী ডাইনোসোর, মোহেঞ্জাদারো হরপ্পার সভ্যতাসহ নানা কিছু কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে বা যাচ্ছে নীতি নৈতিকতা, সহনশীলতা,পরিমিতিবোধ, সভ্যতা ভব্যতা ও মূল্যবোধ আরও কত কী! কিছু কিছু বিষয় হারিয়েছে সময়ের বিবর্তনে কিছু রাজনৈতিক ইতিহাসের চলমান চাকার ঘর্ষণে। কিছু আন্দোলন সংগ্রামে আর কিছু নিজেদের লোভ লালসার যূপকাষ্ঠে এবং নানা রকমের অপকর্মের কারণে। সবকিছুকে ছাপিয়ে অদ্ভুত ঘটনা আত্মসাতের ধারাতেও বহু কিছু হারাচ্ছে, যেমন বাংলাদেশের হারিয়েছে নদী নালা জলাশয়, খাল বিল, পাহাড় টিলা, বন বাদার আরও নানা কিছু। হরিলুটের স্রোতে হারিয়েছে অঢেল জাতীয় ও ব্যক্তিগত সম্পদ। অনলাইন-ডিজিটাল কারসাজিতে হারিয়েছে জনসাধারণের কোটি কোটি টাকা। আর অতি সম্প্রতি হারিয়েছে সম্মানের প্রতীক শিক্ষার্থীদের মাথার চুল এবং সর্বশেষ প্রধান শিক্ষকের মুখের দাঁত। ঘটনার বিবরণে পত্রিকান্তরে প্রকাশ বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার এক স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির ঘুষিতে প্রধান শিক্ষকের তিনটি দাঁত পড়ে গেছে। সেদিন ছিল শুক্রবার (৮ অক্টোবর ২০২১) তথা
পবিত্র দিন। অথচ ওইদিনই ঘটলো এক মর্মন্তুদ অপবিত্র ও নির্মম ঘটনাটি।
নাম সাজ্জাদুল ইসলাম দুদু। তাঁকে জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নন্দীগ্রাম উপজেলার প-িতপুকুর বাজারে তাঁর মুখে সজোরে ঘুষি দিলে তিনটি দাঁত পড়ে যায়। তিনি একই উপজেলার ভরতেঁতুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। আর তাঁর দাঁত হরণকারী স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি। খুব সহজেই অনুমান করা যায় স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির সাথে সংশ্লিষ্ট প্রধান শিক্ষকের কোনো না কোনো বিষয়ে মতান্তর ছিল এটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। একসাথে কোনো কাজ করতে গেলে এমন হতেই পারে। সবাই সব বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করবেন এমনটি নাও হতে পারে। কিন্তু সম্পর্ক ভালো না হলে বা মতপার্থক্য থাকলে ভদ্রতা, সভ্যতা, সৌজন্যবোধ হারাতে হবে বা দাঁত উৎপাটন করতে হবে এমন আত্মঘাতি সংস্কৃতি কোথা থেকে এলো এটাই বড় প্রশ্ন!
একইভাবে শিক্ষার্থীরা কোনো অন্যায়, অবিচার বা ভুল করতেই পারে। সেজন্য বিচারের ও শাসনের নামে বিধিবদ্ধ পদ্ধতি রয়েছে। কিন্তু বিচারের বা শাসনের বা সংশোধনের নামে তুঘলকি কায়দায় তাদের চুল কর্তন বা মাথা মু-ন করে দেয়ার আদৌ কোনো হেতু থাকতে পারে কি? এহেন আচরণ বা পদক্ষেপ কি সমর্থনযোগ্য? বরং বলা যায় এরূপ কর্মকা- আপত্তিকর এবং হিংস্রতা ও মানসিক বিকৃতির পরিচায়ক। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতেই পারে এমন চরম আক্রমণাত্মক ও নিন্দনীয় পদক্ষেপের নজির চারদিকে বাড়ছে কেন? সমাজ কাঠামোয়, রাজনৈতিক ব্যবস্থায়, সাংস্কৃতিক বিন্যাসে এ ধরনের উগ্র ও অসৌজন্যমূলক আচরণের পেছনের অন্তর্নিহিত কারণগুলোর মূল শেকড় কোথায় লুক্কায়িত রয়েছে তা বোধ করি খুঁজে বের করার সময় এসে গেছে। কেন নীতি, নৈতিকতা, আইনানুগ পন্থা ইত্যাদি বারবার বিপর্যস্ত হচ্ছে? দখল, দাপট, হামলা, আঘাত, প্রত্যাঘাত, দম্ভ, সহিংসতা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে? কেন আশরাফুল মাখলুকাত মানুষ ও মনুষ্য সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে নৈতিক মূল্যবোধ?
শিক্ষর্থীর চুল ও প্রধান শিক্ষকের দাঁত বিষয়ক অপকর্ম ঘটেছে শিক্ষায়তনে। কিন্তু শিক্ষাঙ্গন তো কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। পুরো সমাজেরই অপরিহার্য অঙ্গ। সুতরাং সমস্যার কারণ বা বীজ খুঁজতে হবে বৃহত্তর পরিসরে। এমন হিংসাশ্রয়ী ও কঠোর সমাজের কিছু বৈশিষ্ট্য সামাজিক গবেষণায় ধরা পড়েছে। যেমন আমেরিকার মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে মনস্তত্ত্বের অধ্যাপক মিশেল গেলফান্ড নানা দেশের সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সমীক্ষা চালিয়ে ‘টাইট'(আঁটোসাঁটো) এবং ‘লুজ'(ঢিলেঢালা)- এ বিভক্ত করেছেন দেশগুলোকে। গেলফান্ড ও তাঁর সতীর্থরা বিশ্বাস করেন কোনো দেশের সমাজ কত আঁটোসাঁটো বা ঢিলেঢালা,তা অনেক কিছুর উপর প্রভাব ফেলে। দেশের মানুষ কতটা সৃষ্টিশীল, দেশে স্বামী স্ত্রীর বিবাহ বিচ্ছেদের হার কী রকম, মত প্রকাশের ও ব্যক্তি স্বাধীনতা কতটুকু এসব বিষয়ের হ্রাস বৃদ্ধিও ঘটে দেশের চরিত্রের ভিত্তিতে, যার প্রভাব সমাজ ও মানুষের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়।
বাংলাদেশের সামাজিক পরিবেশ পরিস্থিতি কেমন এবং কেন তা ক্রমাবনতিশীল সেটা খতিয়ে দেখা অতীব জরুরি। উপর মহল থেকে নীচ পর্যন্ত বলা যায় সর্বস্তরে হুংকার, দম্ভ, ক্ষমতা প্রদর্শন, ত্রাসের বীভৎসতা এখানে লুকানো কোনো বিষয় নয়। চোখ মুখ খুলে চারদিকে তাকালে সেই অস্বাস্থ্যকর অগ্রহণযোগ্য, অসহনীয় পরিবেশ পরিস্থিতি হর হামেশাই দেখা যায় যা কেবলমাত্র শিক্ষর্থীদের চুল ও প্রধান শিক্ষকের দাঁতেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রধান শিক্ষকের উৎপাটিত দাঁত একটি প্রতীক ও সামান্য দৃষ্টান্ত মাত্র। বাস্তবে আরও কত কী উৎপাটিত হচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে তার হিসেব মেলানো কঠিন। তবে সে হিসাব যদি না নেয়া হয় বা না নেয়া যায় তাহলে পরিস্থিতি কেবল নাজুক ও অসহনীয়ই হবে না, বরং দাঁতহীন হাসি মানুষ ও সমাজের প্রতি বিদ্রূপ করতেই থাকবে যা দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণকর নয়।
লেখক : প্রাক্তন ছাত্র ও শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ।