ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি: আম চাষিদের জন্য আশীর্বাদ

আপডেট: মে ২৫, ২০২৪, ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ

মাহাবুল ইসলাম:


বর্তমানে বালাইনাশকের ব্যবহার উদ্রেকজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্প্রে করার প্রকৃত কারণ ও পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান না থাকার কারণে ফলচাষিরা এক মৌসুমে ফল বাগানে প্রয়োজনের চেয়ে বহুবার স্প্রে করে থাকেন। যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য উভয়ের জন্যই মারাত্মক ক্ষতিকর। এমন অবস্থার উত্তরণে ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তির নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমচাষিরা আম সংগ্রহ করার পর থেকে পরের মৌসুমে আম সংগ্রহ করা পর্যন্ত ১৫-৬২ বার বালাইনাশকের ব্যবহার করে থাকেন। অথচ গবেষণায় দেখা গেছে, ২-৫ বার ক্ষেত্র বিশেষে -প্রে করলেই ভালো আম সংগ্রহ করা সম্ভব। মাত্রাতিরিক্ত স্প্রে যেমন জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তেমনি আমের উৎপাদনকেও ব্যয়বহুল করে তোলে। অতিরিক্ত স্প্রে করার ফলে উপকারী ও বন্ধু পোকার সংখ্যাও দিন দিন কমে যাচ্ছে। বালাইনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারের পরিবেশবান্ধব সমাধানের অন্যতম উপায় এই ব্যাগিং প্রযুক্তি।

ফ্রুট ব্যাগিং বলতে ফল গাছে থাকা অবস্থায় বিশেষ ধরনের ব্যাগ দ্বারা ফলকে আবৃত করাকে বুঝায় এবং এর পর থেকে ফল সংগ্রহ করা পর্যন্ত গাছেই লাগানো থাকে ব্যাগটি। এই ব্যাগ বিভিন্ন ফলের জন্য বিভিন্ন রঙ এবং আকারের হয়ে থাকে। তবে আমের জন্য দুই ধরনের ব্যাগ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। রঙিন আমের জন্য সাদা রঙের এবং সবুজ আমের জন্য দুই আস্তরের বাদামি ব্যাগ। এ পদ্ধতিতে আমের পাশাপাশি পেয়ারা ও ডালিমেও ব্যাপক সফলতা এসেছে। কলা ও কাঁঠাল অন্যান্য ফলেও এ প্রযুক্তি সুফল আনছে। এতে বরেন্দ্রের ফল বাগানগুলোতে দিনকে দিন জনপ্রিয় হচ্ছে এ প্রযুক্তি বলে জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলী গ্রামের কৃষক আবুল হোসেন বলেন, ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতি ফলকে তাজা ও দাগমুক্ত রাখে। তিনি এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভালো সুফল পেয়েছেন। তিনি ৩২ হাজার আমের ব্যাগিং করেছেন। যেখানে তার খরচ হয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৮০০ টাকা।

এ প্রযুক্তিটি ব্যয়বহুল হওয়ায় ব্যক্তি পর্যায়ে এখনো তেমন জনপ্রিয়তা পায় নি। তবে যারা রপ্তানির জন্য আম উৎপাদন করছেন, তারা প্রয়োজনের তাগিদেই এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন।
এ প্রযুক্তি চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁয় বাণিজ্যিক বাগানগুলোতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের (আরএইচআরসি) বিজ্ঞানীরা কৃষি গবেষণার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জনের পর প্রায় সাত থেকে আট বছর আগে চাষীদের মধ্যে প্রযুক্তিটি প্রকাশ করেন। এরই মধ্যে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রতি ব্যাগ ৩ থেকে ৪ টাকায় কৃষকদের সরবরাহের জন্য বিদেশ থেকে বিশেষায়িত ব্যাগ সংগ্রহ করছে।

আরএইচআরসি এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুখলেসুর রহমান তার গবেষণার ফলাফলের উল্লেখ করে বলেন, ব্যাগযুক্ত ফলগুলি নন-ব্যাগযুক্ত ফলগুলির তুলনায় অনেক ভালো। এ প্রযুক্তি পোকামাকড় এবং রোগের ক্ষতি কমাতে এবং আমের ফলের গুণ-মান ত্রুটিগুলি হ্রাস করতে সহায়তা করে। ফল ব্যাগিং পদ্ধতি ফল ও গাছের সুরক্ষার জন্য একটি কার্যকর পদ্ধতি।

রাজশাহীর ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, আম এই অঞ্চলের বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ফল ফসলের মধ্যে একটি। তবে গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসলটি বিকাশের সব পর্যায়ে কীটপতঙ্গ এবং রোগের আক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রযুক্তিটি আতঙ্ক দূর করার জন্য চাষি এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটি উচ্চ আশা তৈরি করেছে।

রাজশাহী আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. মোতালেব হোসেন বলেন, বাণিজ্যিক বাগানগুলোতে এ পদ্ধতিতে জনপ্রিয়তা বেশি পেয়েছে। আর যে কোনো ভালো প্রযুক্তির সম্প্রসারণে কৃষি বিভাগ আন্তরিক। তবে সব চাষীই যে এ প্রযুক্তি বাধ্যতামূলকভাবে ব্যবহার করবে এমনটা না। তবে সময়ে সঙ্গে প্রয়োজনের তাগিদেই এ পদ্ধতি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ