ফ্রুট ব্যাগের প্রয়োজন ও ব্যবসা

আপডেট: জুলাই ২০, ২০২২, ১২:৩৭ পূর্বাহ্ণ

সামসুল ইসলাম টুকু:


বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্ষতিকারক পোকার আক্রমণ থেকে ফল রক্ষার জন্য ফ্রুট ব্যাগের ব্যবহার হয়ে আসছে প্রায় দুদশক ধরে। আমাদের দেশের ফল গবেষক, বিজ্ঞানী ও কৃষিবিদরা বিশেষত যারা অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য প্রশিক্ষণের জন্য বা পিএইচডি করার জন্য বিদেশে ভ্রমণ করেছেন তাদের কাছে ফ্রুট ব্যাগের ব্যবহার অজানা ছিল এমনটা বলা যাবেনা। কিন্তু এই প্রযুক্তিটি দেশে ব্যবহার করা যেতে পারে এমন চেষ্টা করে দেখেননি বা কৃষকদের উৎসাহিত করেন নি। বিশেষজনরা যথযসময়ে যথাযোগ্য প্রযুক্তি সম্পর্কে অবহিত না করার ফলে ক্ষতি যা হবার হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, এমন অনেক কৃষিযন্ত্র বিদেশ থেকে আনা হয়েছে যা অদ্যবধি ব্যবহার হয়নি। যেগুলো খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে মরিচা ধরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সমগ্র দেশে প্রচুর পেয়ারা বাগান আছে এবং যথেষ্ট মূল্য আছে। কিন্তু পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য আধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগাতে পারেন নি বিশেষজ্ঞরা। পেয়ারা চাষীরা আজও সেই নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন প্যাকেট ব্যবহার করে পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা করে তাদের উৎপাদিত পেয়ারা। সেক্ষেত্রে পরিপূর্ণ সফলতা পাচ্ছে না। অনেক পেয়ারা নষ্ট হচ্ছে, পেয়ারা দাগমুক্ত করা যাচ্ছে না। অথচ বিদেশে আপেল, মাল্টা, কমলাসহ বিভিন্ন ফল পোকার হাত থেকে রক্ষা করে দাগমুক্ত ফল রপ্তানি করে। আমরা যা রুচি করে খাই। কিন্তু আমরা পেয়ারা রপ্তানি করতে পারিনা পেয়ারা চাষীরা আজও সেই প্রযুক্তি পায়নি।
আমি যে ফ্রুট ব্যাগের কথা বলে লেখা শুরু করেছি তা হলো আমের জন্য ব্যবহৃত। ২০১৮ সালে সেই ব্যাগ ব্যাবহার শুরু হয়েছে। পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য তা বেশ কাজে আসছে। প্রথমে এ ব্যাগটি জনৈক ফল গবেষকের হাত ধরেই চীন থেকে আমদানি করা হয়। এর সুফল পাওয়ায় চাহিদাও বাড়তে থাকে এবং ২০২১ সালে ফ্রুট ব্যাগের সর্বোচ্চ ব্যবহার হয়েছে প্রায় ৮ কোটি। এটা অবশ্য ব্যাগ ব্যবসায়ীদের কথা। কিন্তু আমচাষীরা বলেন, ওই বছরে কমপক্ষে ১২ কোটি ব্যাগ ব্যবহার হয়েছে। ফল বিশেষজ্ঞরাও এমনটাই মনে করেন। একজন দক্ষ আমচাষী বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে বছরে প্রায় ৪ লাখ মে.টন আম উৎপাদিত হয়। যার অর্ধেকই ফজলি ও আশ্বিনা আম। এ দুটি জাতের আমের ত্বক নরম সংবেদনশীল ও নাবী জাতের এবং পোকার আক্রমণ এদুটি আমেই বেশি হয়। এছাড়া ল্যাংড়া,আম্রপালি ও বারি-৪ জাতের আমেও পোকার আক্রমণ হয় তবে আগাম জাতের আম বলে কম হয়। এসব আমেও ব্যাগ ব্যবহার হয়। যদি ফজলি ও আশ্বিনা আমের পরিমাণ ২ লাখ মে.টন বা ২০ কোটি কেজি হয় তবে হিসাব অনুযায়ী ১ কেজি=দেড়টি আম। অর্থাৎ আমের সংখ্যা হবে ১৩ কোটির বেশি। আর সে অনুযায়ী ১২ কোটি ব্যাগ ব্যবহারের বিষয়টি যুক্তিযুক্ত। ওই কৃষক তার দাবির প্রেক্ষিতে বলেন, যদি ৮ কোটি ব্যাগ সরকারকে ভ্যাট ট্যাক্স দিয়ে উৎপাদিত হয় তবে বাকি ৪ কোটি অবৈধভাবে উৎপাদিত হয়েছে। সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে।
ঈূর্বেই বলেছি এই ফ্রুট ব্যাগ প্রথমে চীন থেকে আমদানি করা হয়। কিন্তু এখন এই ব্যাগ দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। এমনকি চাঁপাইনবাবগঞ্জেও ব্যাগের ফ্যাক্টরি বসেছে। বিশেষজনদের কথা অনুযায়ী মজবুত ক্র্যাফট পেপারের উপর এক ধরনের গ্লু বা আঠার প্রলেপ দেওয়া হয়। ফলে বৃষ্টি হলেও ওই আঠার কারণে দ্রুত পানি সরে যায়, আমকে পোকার হাত থেকে রক্ষা করে। ভাল মানের ব্যাগ হলে পরবর্তী বছরেও ব্যবহার করা যায়। চলতি বছরে ৪ কোটি ব্যাগ বিক্রি হবে বলে জানিয়েছে ব্যাগ ব্যবসায়ীরা। কিন্তু কৃষকরা বলছেন, এবছর আমের উৎপাদন কম হলেও ৮ কোটি ব্যাগ বিক্রি হবে। কারন আমচাষীদের আম রক্ষা করা জরুরি। ফ্রুট ব্যাগ ব্যবহারের ফলে যেমন আম পোকার হাত থেকে বাঁচছে তেমনি ঘন সবুজ আমের রঙ হয় আকর্ষনীয় হলুদ রঙের। তবে মিষ্টতা কিছুটা কমে যায়। যা বিদেশিদের জন্য যেমন আকর্ষণীয় তেমনি তা হয় নিরাপদ বিষমুক্ত আম। কারণ আমে ব্যাগ পরানোর পরে কোনো স্প্রে বা কীটনাশক প্রয়োগ করা যায়না। মুক্ত রোদে, বাতাসে, বৃষ্টিতে আমের যে স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও স্বাদ সৃষ্টি হয় তা ফ্রুট ব্যাগ ব্যবহারে না হয়াটাই স্বাভাবিক। সে ক্ষেত্রে আমের গুনাগুন কতটা নষ্ট হয় সেটা ফল গবেষণাবিদরা আজও পরিক্ষা করে দেখেন নি। তবে জানা যায়, পোকার আক্রমণে পূর্বে প্রায় একচতুর্থাংশ আম নষ্ট হয়ে যেতো তা থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে অন্ততপক্ষে।
এবার দেখা যাক ব্যাগের ব্যাবসা কেমন হচ্ছে। বর্তমানে প্রতিটি ব্যাগ ৩.২৫ টাকা থেকে ৪.০০ টাকা মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে প্রতিটি আমে ব্যাগ পরানো সহ আরও ১ টাকা খরচ হয়। ফলে প্রতিটি আমের অতিরিক্ত মূল্য দাঁড়ায় ৫ টাকা বা কেজি প্রতি প্রায় ৮ টাকা। প্রতিটি ব্যাগের মূল্য যদি ৪ টাকা হয় তবে ১২ কোটি ব্যাগের মূল্য হয় ৪৮ কোটি টাকা শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জেই। তাহলে সারা দেশে কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকার ব্যাগের ব্যবসা হয়।এই বিদেশি প্রযুক্তিটি দেশের মানুষ আয়ত্ত করেছে এবং দেশেই উৎপাদন করছে, দেশে কিছু ব্যাগ ফ্যাক্টরি হয়েছে, কিছু মানুষ কাজ পেয়েছে। আমাদেও দেশে উৎপাদিত পেয়ারা, লিচু, আমড়া, বরই, আনারসসহ অন্যান্য ফলের জন্য আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যাগ উৎপাদনের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাগ ব্যবহারের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে, তবে ব্যাগের মান নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এটা এখনও ১নং পর্যায়ে উন্নীত হতে পারেনি। এছাড়া আরও কম মূল্যে ব্যাগ তৈরি করা যেতে পারে বলে অনেকে মতামত প্রকাশ করেছেন। প্রতিটি আমের গায়ে ব্যাগ পরানোর জন্য দিতে হয় ৫০ পয়সা। ব্যাগ পরানো নিঃসন্দেহে একটি কঠিন কাজ। আমগাছের ডগায় ডগায় মগডালে বড় মানুষের পৌছানো সম্ভব নয়। এজন্য ১২/১৫ বছরের হালকা শিশুদের ব্যবহার করা হয়। যদিও তাদের জন্য মই এবং লম্বা কানাযুক্ত বাঁশ ব্যবহার করা হয়- গাছের ডগায় পৌছানোর জন্য। তারপরেও সেটা ঝুঁকিমুক্ত নয়। আমে ব্যাগ পরিয়ে এসব শিশুরা ২০০/২৫০ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারে প্রতিদিন। যদিও এটা শিশু শ্রম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু এর বিকল্প আপাতত দেখা যাচ্ছে না।
লেখক : সাংবাদিক