ফড়িং-ভাষার গল্প

আপডেট: আগস্ট ১৯, ২০২২, ১২:৪৪ পূর্বাহ্ণ

আরিফুল হাসান:


কতিপয় ফড়িং ভাষার গল্প শেষে আমাদের গল্পগুলো শূন্য বালুতটে হোঁচট খায়। গল্পগুলো খেই হারিয়ে
আহাুজারি শুরু করে। তখন আকাশ দেখে কান্না, মেঘলা ময়ূর দেখে বৃষ্টি আর বসন্তে শুরু হয় পাতা ঝরা। তখন ঋতু বৈচিত্র উধাওয়ের মাঝে হঠাৎ বেয়াদবির মতো দবির খাঁ আমাদের সামনে সআসে। আমরা হাতের সিগারেট মাটিতে গুঁজে সালাম দিয়ে উঠে দাঁড়াই। দবির খাঁ আমাদের সামনে দাঁড়ায় কিঞ্চিত, তারপর আবার চলতে শুরু করে। কিছু দূর চলার পরে আবার ফিরে আসে এবং সোজা আমার কাঁধে হাত রেখে ঝাকুনি দেয়। আমি দবির খাঁর চোখের দিকে চেয়ে আবার চোখ নামিয়ে ফেলি। মেঘের মতো সাদা দুটি চোখের ছোট্ট মণিতে কোনো ভাষা খুঁজে পাইনা। মাটির দিকে চোখ করে দাঁড়িয়ে আছি। দবির খাঁ এবার হা হা করে হেসে উঠে। কিরে মাইজন, ভয় পাইছস? না, ভয় আমি পাইনি। তবে বিরক্ত হচ্ছি। কিন্তু দেখানোর উপায় নেই।

নিপাট অভিনয়ে আমরা সবাই পটু হয়ে গেছি। এখন দবির খাঁকে দেখলে দাঁড়াই, সালাম দেই, তার অদৃশ্য হয়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করি। তারপর কষে একটা গাল দেই। শালা চোরের বাচ্চা চোর, তারে দেখে দাড়াইতে হইবো! হুঁ, ছুডামু! দবির খাঁর ইউনিয়ন আর আমার ইউনিয়ন একই। মহব্বতপুর এক গ্রাম একটি ইউনিয়ন, বড় গ্রাম। না, আমি নির্বাচনে দাঁড়াইনি। তবে, আমাদের একজন প্রতিনিধি ছিলো। বলা চলে,

জনগণের প্রতিনিধি ছিলো। কিন্তু দবির খাঁ করলো কি! ছি ছি লজ্জা, এই বুড়া বয়সেও এসব করতে সাহস পায়! আমাদের গা কাটা দিয়ে উঠে। আমরা ঘাসের বুকে থুথু ফেলে আবারও সিগারেট জ্বালাই। শফিক একটা কথা বলতে চায়, সে হাত তুলে। বলেÑ মাইজন, আমার কাছে কিন্তু ব্যপারটা ভালো লাগলো না। হ্যাঁ, ভালো আমারও লাগেনি। দবির খাঁর এই ফিরে আসা, কাঁধ ধরে ঝাকানি, শেষ পর্যন্ত বলাÑ ভয় পাসনে, আমি তো তোদের ভাই-ই লাগি। এই এইটা একটা থ্রেট। আমরা বুঝি। নির্বাচনে জয় লাভের পর এটি তার প্রথম থ্র্রেট। গত প্রিয়ডে চেয়ারম্যান আছিলো। এইবারও হইলো। হইলো না, আসলে বিসর্জন দিলো। যেই কাম করছে, তাতে কইরা লোকে আর তাকে চেয়ারম্যান হিসেবে মাইনা নিবো না। হ্যাঁ, সবাই তাকে সামনাসামনি শ্রদ্ধা করবে ঠিকই। কিন্তু ভেতর থেকে, মন থেকে তাকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে

মেনে নেবে না। এমনিতেও এ এলাকার লোকজন প্রথম বার থেকেই তাকে মেনে নিতে পারেনি। লোকে জানে, দবির খাঁর বাপ একাত্তরে কতো ঘর পোড়াইছে। লোকে এও জানে, দবির খাঁ একবার হলুদ, একবার নীল দলে আসা যাওয়া করে। তবু মানুষ ভোট দিয়েছে। ভাবছে, ঘর যখন ভাঙলো তখন ঘর তোলার টাকা যে দিয়েছে তাকে অন্তত কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ভোটখানা দেই। কিন্তু ভোটে জিতার পর দবির খাঁর চেহারা পাল্টে যেতে থাকে। শুধু ঘর ভাঙাই নয়, ঘরের খাপরোয়া পর্যন্ত খুলে নিতে থাকে। তখন জনগণ তাদের ভিন্ন প্রতিনিধি দাঁড় করায়। একটু একটু করে গড়ে তোলে গ্রামের সবচেয়ে সহজ সুন্দর ছেলেটিকে। কিন্তু দবির খাঁ তা হতে দেবে কেন। সে একটি ফাঁদ পাতে। গ্রামের সবচে সহজ সুন্দর ছেলেটি পুরাতন একটি প্রেমের কথা ভুলে না। তার প্রেম ছিলো দবির খাঁর মেয়ের সাথে। এই অসম প্রেম অনেকে মেনে নেয়নি কিন্তুু নতুন প্রতিনিধি এই ব্যাপারে কথা শুনতে নারাজ। তার সবকিছু ঠিক আছে, শুধু এই রক্তচোষা চেয়ারম্যানের মেয়েকে ত্যাগ করতে হবে। কিন্তু সে ত্যাগ করে না। চেয়ারম্যানও উপায়ন্তর না পেয়ে মেয়েকে অন্যত্র বিয়ে দিয়ে দেয়। আবার দেড় বছরের মধ্যেই মেয়ের সংসার ভেঙে মেয়েকে গ্রামে নিয়ে আসে। এখন আর যোগাযোগ করে না আমাদের নতুন প্রতিনিধি। তিনি নির্বাচন নিয়ে ব্যাস্ত। এমনই এক রাতে চেয়ারম্যান নিজেই এগিয়ে দেয় মেয়েকে তরুণ প্রতিদ্বন্দ্বির ঘরে। মেয়ে তার ধরে কাঁদে।

চেয়ারম্যান আড়াল থেকে নিজের ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলে। অন্তরঙ্গ মুহুর্তের ছবি রাতের অন্ধকারে ছেপে দেয়ালে দেয়ালে সেঁটে দেয়। তাই বলে নিজের মেয়ের বেইজ্জত করে নির্বাচনে জয় লাভ? থুঃ আমাদের মুখের থুথুরও অযোগ্য হয়ে উঠে চেয়ারম্যান। শুনেছি মেয়েকে আমেরিকায় পাঠিয়ে দেবে এবার। এখন সে ঢাকায় আছে কোনো এক আত্মীয়ের বাসায়। আমাদের নতুন প্রতিনিধি সেই রাতের পর থেকেই যে গা-ঢাকা দিয়েছে। কোথায় আছে জানে না কেউ। তবে অনেকে সন্দেহ করে, চেয়ারম্যানের লোকজন তাকে খুন করে লাশটা গায়েব করে দিয়েছে। করতেই পারে, দবির খার রক্তের মধ্যে খুন আছে। তার বাবা একাত্তরে তো মানুষ মারছে মারছেই। একাত্তরের পরে আবার যখন সে পুনর্বাসিত হয় তখন এলাকার সাতজন মুক্তিযোদ্ধাকে মেরেছে ভয়ানক শাস্তি দিয়ে। একজনকে খুন করেছে সবার সামনে, দিনে দুপুরে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তার পোষা কুকুরেরা। একদিন, বিচারের আসনে বসে দবির খার বাবা রায় দেয়, এই লোক ধর্মের শত্রু। তাকে পুড়িয়ে মারা হোক। হৈ হৈ করে তার লোকেরা গাছে বাঁধা মুক্তিযোদ্ধা শফিউরের দেহে কেরোসিন ঢালে। জনতা তাজ্জব হয়ে চেয়ে থাকে। তাদের ভাষা উবে যেতে থাকে। কিন্তুু মুক্তিযোদ্ধা শফিউর তার মাথা উন্নত রাখে। গায়ে আগুন দেবার পর সে বজ্রকণ্ঠে বলে উঠে, জয় বাংলা।

আমরা ঘাসের মাঠ থেকে উঠতে উঠতে রাত বেড়ে মধ্যরাত। আমাদের ভেতর থেকে শফিক আবারও গলা
চড়ায়,-এই চেয়ারম্যানের একটা হ্যাস্তন্যাস্ত করতেই হইবো। অন্যরাও গলা চড়ায়। হ্যাঁ হ্যাঁ, এইটার একটা বিহিত চাই-ই চাই। এমনে ভীতুর মতো পড়ে থাকলে চেয়ারম্যান শুধু আমাদেরকে দুর্বলই ভাববে। আজকেই এর একটা সমাধান চাই। আমাদের পাঁচজনের মাথা থেকে পাঁচ রকমের বুদ্ধি বেরোতে থাকে। দ্রুতই আমরা একটি প্লান করে ফেলি। আমাদের প্লান মাফিক আমরা রাত আরও বাড়ার জন্য অপেক্ষা করি। তারপর নিশি গভীর হলে আমরা বাজারে গিয়ে সিদ্দিকের তেলের দোকানের তালা ভাঙি। পেট্রোলের কয়েকটা বোতল কাঁধে করে নিয়ে বের হই। বাজারের প্রহরী জয়নুলও আমাদের সাথে আসে। আমরা ছয়জন অন্ধকারে লুকিয়ে মহিলা মেম্বারের বাড়ির দিকে যাই। জানি, আজকাল চেয়ারম্যান ওখানেই রাত কাটায়। পেয়েও যাই তাকে। লীলা শেষে দুজনেই নিদ্রিত। আমরা পেট্রোল ঢেলে আগুন জ্বালাই। ধরা পরে জয়নুল। রাতের অন্ধকারে গনপিটুনিতে মারা যায় সফিক। আমাদেরকে ধরা হয় দুদিন পর। আদালতের জিজ্ঞাসার মুখে আমরা স্বীকার করি, হ্যাঁ, আমরা একটা রক্তচোষা হায়েনাকে মেরেছি আর দ্বিতীয় খুনটা অনাকাঙ্খিত। আমাদেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুর দন্ডাদেশ দেয়া হয়। পাঁচটি পাশাপাশি মঞ্চে আমাদেরকে একই সময় ঝুলানো হবে। ফাঁসিকাষ্ঠে দাঁড়িয়ে আমাদের মনে পড়ে যায় বাপ-দাদাদের মুখে শোনা মুক্তিযোদ্ধা শফিউরের কাহিনী। আমাদের মনে হয়, আমরাও সদ্য একটা মুক্তিযুদ্ধ করে এসেছি। আমরা সিনা টান টান করে দাঁড়াই। কালো কাপড়ে মুখ ঢেকে ফেলার পর আমরা পাঁচজন একসাথে সমস্বরে বলে উঠি, -জয় বাংলা।