বক্ষব্যাধি হাসপাতালই ‘ক্ষয়রোগে’ ক্ষয়িষ্ণু

আপডেট: নভেম্বর ১৪, ২০১৬, ১২:০১ পূর্বাহ্ণ

বুলবুল হাবিব



রাজশাহীর বক্ষব্যাধি হাসপাতাল যক্ষারোগ নিরাময় করে কিন্তু হাসপাতালও ‘ক্ষয়রোগে’ আক্রান্ত। প্রতিষ্ঠার ১৮ বছর পরও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয় নি এই হাসপাতালে। চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় প্রতিদিন শয্যা সংখ্যার অর্ধেক রোগিও ভর্তি হচ্ছে না হাসপাতালে। ফলে নষ্ট হচ্ছে হাসপাতালের রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতি। অব্যবহৃত থাকার ফলে দিন দিন জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে হাসপাতালের ভবন, ক্যাম্পাসও ঝোপ-জঙ্গলে আকীর্ণ।
পর্যাপ্ত বাজেট না থাকায় সংস্কারের অভাবে বাথরুম হয়ে পড়েছে ব্যবহার অনুপযোগী। পানির সংযোগ লাইনও নষ্ট হয়ে গেছে। একমাত্র জেনারেটর তা-ও দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে। হাসপাতালে নেই কোনো পরিবহন সুব্যবস্থা। নেই কোনো অ্যাম্বুলেন্স। পর্যাপ্ত কাজ না থাকায় জনবলেরও সুষ্ঠু ব্যবহার হচ্ছে না।
গতকাল রোববার সকালে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতাল ভবনের বিভিন্ন জায়গা থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা। অনেক সময় ভবনের ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে রোগির ওপর। দরজা-জানালাও সংস্কারের অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। বাথরুমগুলো হয়ে পড়েছে ব্যবহার অনুপযোগী। রোগির অভাবে অধিকাংশ শয্যাই রয়েছে ফাঁকা পড়ে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৮ সালে রাজশাহী যক্ষ্মা হাসপাতালকে বক্ষব্যাধি হাসপাতালে রূপান্তর করা হয়। এটি একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল। অথচ প্রতিষ্ঠার ১৮ বছর পরও হাসপাতালে যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসা ছাড়া ফুসফুসের অন্যান্য রোগের চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করার প্রশাসনিক অনুমতি পাই নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের বহির্বিভাগে ফুসফুসসহ বক্ষব্যাধির অন্যান্য রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু হলেও আন্তঃবিভাগে রোগি ভর্তির প্রশাসনিক অনুমতি পাওয়া যায় নি। শুধুমাত্র যক্ষ্মা রোগিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এজন্য শয্যা সংখ্যার তুলনায় অর্ধেক রোগিও ভর্তি থাকে না হাসপাতালে।
এছাড়া যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারিভাবে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ডট্স কর্নারের মাধ্যমে যক্ষ্মা রোগিদের চিকিৎসা প্রদান করায় হাসপাতালে সাধারণ যক্ষ্মা রোগির সংখ্যাও কমে গেছে। বর্তমানে বক্ষব্যাধি হাসপাতালে শুধু জটিল যক্ষ্মা রোগি এবং এমডিআর রোগিরাই চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালে ১৫০ শয্যা থাকা সত্ত্বেও প্রতিদিন গড়ে ৬০ জনের বেশি রোগি ভর্তি থাকে না।
অথচ হাসপাতালে যক্ষ্মা ছাড়াও অন্যান্য রোগ নির্ণয়ের জন্য রয়েছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন, এমডিআর রোগিদের চিকিৎসার জন্য রয়েছে জিন এক্সপার্ট মেশিন। যদিও এক্স-রে মেশিনটি নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে। বাজেটের অভাবে মেরামত করা যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বক্ষব্যাধি হাসপাতাল হিসেবে যক্ষ্মা ছাড়াও ফুসফুসের অন্যান্য রোগ যেমন অ্যাজমা, ব্রঙ্কাইটিস, ব্রঙ্কিকেটেসিস, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ ও ইন্টারস্টিয়াল লাং ডিজিসের চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হওয়া উচিত। কিন্তু প্রশাসনিক অনুমতি না পাওয়ায় তা শুরু করা যাচ্ছে না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রশাসনিক অনুমিত পেলেই বর্তমানের জনবল ও অবকাঠামো দিয়েই কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীর লক্ষ্মীপুর এলাকায় ২৫ একর জায়গায় ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রাজশাহী যক্ষ্মা হাসপাতাল। তখন এর শয্যা সংখ্যা ছিল ১০০। পরবর্তীতে রোগি বৃদ্ধির কারণে উন্নত চিকিৎসা প্রদানের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে শয্যা সংখ্যা ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১৫০ শয্যা করা হয়। সেই সময় বৃহত্তর রাজশাহী বিভাগের ১৬টি জেলা থেকে রোগি এসে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করত। এছাড়া খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া ও মেহেরপুর জেলার প্রত্যন্ত এলাকা থেকেও যক্ষ্মা আক্রান্ত রোগিরা এসে হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা সেবা নিত। এরপর আরো বড় পরিসরে চিকিৎসাসেবা প্রদানের লক্ষ্যে ১৯৯৮ সালে যক্ষ্মা হাসপাতালকে বক্ষব্যাধি হাসপাতালে রূপান্তর করা হয়। বর্তমানে এই হাসপাতালে রয়েছে তিনটি ইউনিটের ছয়টি ওয়ার্ড। অথচ পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় রোগি কমে প্রতিদিন গড়ে ৬০ জন করে ভর্তি থাকে।
হাসপাতালে গিয়ে কথা হয় ৬ নম্বর ওয়ার্ডের রোগি হালিমার সঙ্গে। তিনি সিরাজগঞ্জের বেলকুচি থেকে এসেছেন চিকিৎসা নিতে। তিনি ১৫ দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। হালিমা জানান, এই হাসপাতালের ডাক্তার-নার্স থেকে শুরু করে সবাই খুব আন্তরিক। অনেক জটিল রোগ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলাম। এখন মোটামুটি সুস্থের দিকে। ডাক্তাররা বলছেন, আর কিছুদিন পর ছেড়ে দিবেন।
চিকিৎসা নিচ্ছেন নওগাঁর বদলগাছী এলাকার মেহেরুন নাহার। তিনি দীর্ঘ ৩ মাস ধরে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনিও এখন সুস্থ। সামনের ১৭ তারিখে আর একটি পরীক্ষা করে তাকে ছুটি দেয়া হবে। মেহেরুন জানান, এই হাসপাতালে ভর্তির আগে তিনি বদলগাছী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছিলেন। কিন্তু অবস্থার অবনতি হলে এখানে ভর্তি হন। তারপর দীর্ঘ চিকিৎসার পর এখন সুস্থ।
হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা জানান, হাসপাতালের অবকাঠামো মেরামত করে বিদ্যমান জনবল দিয়েই যক্ষ্মা রোগি ছাড়াও ফুসফুসের অন্যান্য রোগে আক্রান্ত রোগিকে আন্তঃবিভাগে ভর্তিপূর্বক চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব। তারা জানান, এইজন্য প্রাথমিকভাবে একটি ওয়ার্ড শুধুমাত্র বক্ষব্যাধি রোগির জন্য নির্দিষ্ট করতে হবে। এছাড়া বহির্বিভাগ সার্ভিসের সঙ্গে জরুরি বিভাগের কার্যক্রম চালু করতে হবে। পূর্ণাঙ্গ প্যাথলজি সেবা চালু করা, এমডিআর রোগির জন্য পৃথক নতুন ভবন নির্মাণ, আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও ইসিজি মেশিন সরবরাহের ব্যবস্থা করা গেলে এই হাসপাতালে ফুসফুসের অন্যান্য রোগেরও চিকিৎসা করা সম্ভব।
হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট ডা. আমীর হোসেন জানান, বক্ষব্যাধি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্যই ছিল যক্ষ্মাসহ ফুসফুসের অন্যান্য রোগের চিকিৎসা করা। কিন্তু প্রশাসনিক অনুমতি না পাওয়ায় তা শুরু করা যাচ্ছে না। এইজন্য হাসপাতালে রোগি ভর্তি কম হয়। ইতোমধ্যে অনুমতি চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরকে চিঠি লেখা হয়েছে। অনুমতি পেলে বিদ্যমান জনবল দিয়েই পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব।
ভবন জরাজীর্ণ হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতাল সংস্কার করা হয় নি। সংস্কার না করায় দিন দিন হাসপাতালের অবকাঠামো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালের নিজস্ব কোনো তহবিল নেই। তাৎক্ষণিকভাবে কোনো কিছু মেরামত করা সম্ভব হয় না। মেরামতের জন্য গণপূর্ত ও স্বাস্থ্য প্রকৌশলকে দায়িত্ব দেয়া হলেও কাজ করাতে দীর্ঘসূত্রিতা কাজ করে। ইদানিং তাদেরকেও বরাদ্দ দেয়া হয় না।