বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন পালন কবে থেকে শুরু হয়েছে?

আপডেট: মার্চ ১৭, ২০২১, ১২:১৮ পূর্বাহ্ণ

‘‘১৯৫৫ সালে আমরা ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বন্দি ছিলাম এক মাস। ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২১ মার্চ। ১৭ মার্চ তারিখটি আমার মনে ছিল। সহবন্দি ছাত্রদের পরামর্শটা দিলাম। মুজিব ভাইকে এই তারিখে একটা সারপ্রাইজ দেব। পরবর্তী জীবনে বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক, তখন আমার সহপাঠী জহির রায়হান আমাকে উৎসাহের সঙ্গে সমর্থন জানালেন। এক ৭০ বছরের বৃদ্ধ কয়েদি (খুনের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদ-ে দ-িত) আমাদের ফাইফরমাস খাটত। এদের জেলে বলা হয় ফালতু। এই ফালতু পাউরুটি আর দুধ-চিনি মিশিয়ে মিষ্টি কেক তৈরি করল। আমরা ব্যাপারটা কাউকে জানতে দিলাম না।
সেদিন ছিল ১৭ মার্চ ১৯৫৫। বিকালে এক ঘন্টার জন্য সেলের তালা খুলে আমাদের মাঠে নামানো হলো। কিছুক্ষণ পর মুজিব ভাইও এলেন। আমরা চার-পাঁচ জন তাকে জেলের বাগানের ফুল এবং ফালতুর বানানো কেক দিয়ে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালাম। মুজিব ভাই প্রথমে একটু বিস্মিত হলেন। তারপর বললেন, তোরা পাগল। আমরা কি জন্মদিন পালন করি? আমাদের বড়ো বড়ো নেতা হক সাহেব, সোহরাওয়ার্দী সাহেব ও মওলানা ভাসানীরই জন্মদিন পালিত হয় না? আমার আবার কীসের জন্মদিন?
আমরা ছিলাম নাছোড়বান্দা। আমাদের মধ্যে গাইবান্ধার নজরুল ইসলামের (ডা. মনিরুজ্জামানের ছোটো ভাই) গলা ছিল মোটামুটি সুরেলা, সে রবীন্দ্রনাথের ‘লহো অভিনন্দন’ গানটি একটু পালটে গাইল, এভাবে মুজিব ভাইকে নিয়ে জেলে বসে পালন করছি মুজিব ভাইয়ের ৩৫তম জন্মদিবস, অবশ্যই ঘরোয়াভাবে। সেদিন কি জানতাম, মুজিব ভাই একদিন হবেন বঙ্গবন্ধু, জাতির পিতা, রাষ্ট্রের স্থপতি? দেশ জুড়ে তার জন্মশতবর্ষ পালনে উৎসবের বন্যা বইবে? আমরা হব শুধু দর্শক? আজ দুঃখ হয় মুজিব ভাই বেঁচে থাকতে কেন তাকে জিজ্ঞাসা করিনি, তাদের পরিবারে জন্মদিন পালনের রেওয়াজ আছে কি না। পারিবারিকভাবে বাসায় কেক কেটে পরিবার-পরিজন বছর বছর তার জন্মদিন পালন করে কি না?
যতদূর মনে হয়, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বেরিয়ে এসে মুজিব ভাই জাতীয় নেতা এবং বঙ্গবন্ধু হওয়ার পর তার জন্মদিন দলীয়ভাবে উদযাপন শুরু হয়। তবে তাতে গানবাজনা, আলোকসজ্জা নয়, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও বাঙালিদের অধিকার নিয়ে আলোচনা বৈঠক হতো। বঙ্গবন্ধুকে শুভেচ্ছা জানানো হতো।
১৯৭২ সালে ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন দলীয় ও সরকারিভাবে পালিত হয়। সারা ঢাকা শহর ভেঙে পড়েছিল তাকে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য। ফুলে ফুলে তার শরীর ঢেকে গিয়েছিল। মিষ্টি বিতরণ হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু তাতে খুশি হয়েছিলেন কি? জানি না। তবে গণভবনের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, আপনারা আমাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানান, আমার আপত্তি নেই। কিন্তু এই আতিশয্য ভালো নয়। একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজে আমরা যখন ব্যস্ত, তখন কোনো কারণেই উৎসবের আতিশয্য ও অর্থের অপব্যয় ভালো নয়। এই জন্মদিনের উৎসবের অর্থ আমার গরিব-দুঃখী ভাইদের মুখে হাসি ফোটানোর কাজে লাগানো হলে ভালো হতো। আমার জন্মদিন পালন সার্থক হতো।’ (সূত্র: আবদুল গাফফার চৌধুরী, দৈনিক বাংলা, ১৮ মার্চ, ১৯৭২ ও লন্ডন: ২৯ ফেব্রুয়ারি, শনিবার ২০২০]
১৯৪৮ সালের ১৭ মার্চ তারিখে পুলিশি কার্যক্রমের প্রতিবাদে শেখ মুজিব অবিলম্বে সারা দেশব্যাপি ছাত্র ধর্মঘটের ঘোষণা দেন।
১৯৬৭ সালের ১৭ই মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারের রোজনামচায় লিখেছিলেন, ‘আজ আমার ৪৭তম জন্মবার্ষিকী। এই দিনে ১৯২০ সালে পূর্ব বাংলার এক ছোট্ট পল্লীতে জন্মগ্রহণ করি। আমার জন্মবার্ষিকী আমি কোনোদিন নিজে পালন করি নাই- বেশি হলে আমার স্ত্রী এই দিনটাতে আমাকে ছোট্ট একটা উপহার দিয়ে থাকত। এই দিনটিতে আমি চেষ্টা করতাম বাড়িতে থাকতে। খবরের কাগজে দেখলাম ঢাকা সিটিতে আওয়ামী লীগ আমার জন্মবার্ষিকী পালন করছে। বোধ হয়, আমি জেলে বন্দি আছি বলেই। আমি একজন মানুষ, আর আমার আবার জন্মদিবস। দেখে হাসলাম।’
১৯৭১ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫১তম জন্মদিন। এই দিন ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা আলোচনা থেকে ফিরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেন, “এদেশে জন্ম দিনই বা কি আর মৃত্যু দিনই বা কি আমার জনগণই আমার জীবন।” ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরুঙ্কুশ আসনে বিজয় পাওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর না করে একের পর এক আলোচনার বাহানা করতে থাকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। দ্বিতীয় দফার আলোচনা শুরু হয় ১৭ মার্চ তারিখে। কিন্তু আলোচনা কোনো ফলপ্রসূ অগ্রগতি পাওয়া যাচ্ছিলো না। ১৭ই মার্চের আলোচনার পরেই সাংবাদিকদের কাছে বঙ্গবন্ধুর দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন আলোচনা ফলপ্রসূ হচ্ছে না।
১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশে ৩ দিনের দ্বিপক্ষীয় সফরে আসেন।
শিশু দিবস
১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর জন্মদিনটিকে বাংলাদেশে জাতীয় শিশু দিবস হিসাবে পালন করা হয়। ১৯৯৬ সাল থেকে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনকেই বাংলাদেশের শিশু দিবস হিসাবে েেঘাষণা করা হয়েছে।
আজ থেকে ‘মুজিববর্ষ’কে ‘সেবাবর্ষ’ হিসাবে গণ্য করবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। এর পাশাপাশি প্রতি কার্য দিবসে অফিস সময়ের পর এক ঘণ্টা করে অতিরিক্ত কাজ করবে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি) এর সকল কর্মচারী। ২০২০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন (বিআরইবি) বোর্ড সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে ১৭ মার্চ ২০২০ প্রথমবারের মতো ২০০ টাকা মূল্যমানের ব্যাংক নোট ছাড়ে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০০ টাকার ব্যাংক নোট ছাড়াও ১৮ মার্চ থেকে স্বর্ণ ও রৌপ্য স্মারক মুদ্রা এবং ১০০ ও ২০০ টাকার মূল্যমানের স্মারক নোট বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিসসহ অন্যান্য শাখা থেকে ছাড়া হয়।