বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস : কিছু কথা

আপডেট: জানুয়ারি ১৯, ২০২২, ১২:৪৮ পূর্বাহ্ণ

ড. সাইফুদ্দীন চৌধুরী


বিদেশি আক্রমণকারী, বণিক, পর্যটক ও ধর্মপ্রচারকগণ এদেশে এসেছেন নানা আকর্ষণে। এদেশের হাতিরদাঁত ও বস্ত্রশিল্পের তো খ্যাতি ছিল বিশ্বজুড়ে। এখানকার অধিবাসীরা স্বাধীনচেতা হলেও পরাধীনতার নিগড় কখনও ছিন্ন করতে পারেনিÑ শাসিত ও শোষিত হয়েছে বিদেশি শাসকদের দ্বারা। সুযোগ হয়নি এই জনগোষ্ঠীর চিত্ত উন্নয়ন ও আত্মবিকাশের। অথচ এদের ছিল হৃদয়-ঐশ্বর্যের সঙ্গে স্বতন্ত্র জীবনাচরণ, সমাজব্যবস্থা, উৎসব-অনুষ্ঠান, অর্থনৈতিক পরিকাঠামো ও শিল্প-সংষ্কৃতি। ইতিহাসেই এসব কথা লিপিবদ্ধ রয়েছে। তবে, একথাও সত্য যে, ওই জনগোষ্ঠী নিজেদের বিদেশিদের নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে শতাব্দীর পর শতাব্দী লড়াই- সংগ্রাম করেছে। কিস্তু সফলকাম হতে পারেনি।
যেটা সম্ভব হলো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে সশস্ত্র একটি মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে। দক্ষিণ এশিয়ার গাঙ্গেয় বদ্বীপাঞ্চলে যে নতুন ভূ-খ- বিশ্ব মানচিত্রে স্থান করে নিয়েছে নানা কৌণিকেই তা গৌরবের আর অহঙ্কারের উজ্জ্বল প্রতীকÑ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ যার পরিচয়।
বাংলাদেশ আর বাঙালি জাতির মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আটচল্লিশ বছর আগে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ তারিখে স্বদেশের মাটিতে ফিরে এসেছিলেন। দেশের ইতিহাসে তাঁর এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন একাত্তরের স্বাধীনতা লাভের বিজয়ের মতো যেন আরেক বিজয় হিসেবে গৃহীত হয়েছে দেশবাসীর কাছে।
আকস্মিকভাবে বঙ্গবন্ধু বিজয় দুটি এনে দেননি, বলতে কী? দিতে পারেন নি। এজন্য একেবারে কৈশোর থেকে নিজেকে তৈরি করতে হয়েছিলো তাঁকে। অসীম সাহসিকতা, মানবসেবা আর ন্যায়পরায়ণতার আদর্শ তখন থেকেই যেন নেতৃত্বের বীজ রোপন করে দিয়েছিল।
নেতৃত্ব লাভের পর তিনি পাকিস্তানি শাসকদের সকল প্রকার শোষণ, দলন ও নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেনÑ এদেশের মানুষের মুক্তির সনদ হিসেবে প্রণয়ন করেন ছ’দফা দাবি। পাকিস্তানি শাসকরা তাঁর বিরুদ্ধে যতই মিথ্যা ষড়যন্ত্র করেছে, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে; অপরদিকে ততটাই দেশের মানুষের কাছে তাঁর জনসমর্থন বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৭০ সালে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে বিজয় অর্জন করেও সরকারের সর্বোচ্চ পদ তিনি পাননি। পাকিস্তানি শাসকদল তাঁকে ওই পদে অভিষিক্ত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
বাধ্য হয়ে একাত্তরের ১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ অসহযোগ ডাক দেন বঙ্গবন্ধু। দেশের আপামর জনগোষ্ঠীর ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় সুদৃঢ় নেতৃত্ব। সমগ্র পূর্বপাকিস্তান পরিচালিত হয় তাঁরই নির্দেশে। একেবারে মুখ থুবড়ে পড়ে পাকিস্তানিদের অপশাসন। এমাসের ৭ তারিখে বঙ্গবন্ধু প্রদান করেন তাঁর ঐতিহাসিক ও বিশ্বনন্দিত ভাষণ। সে এক বিস্ময়কর ভাষণÑ যার ভাষা ছিল সাবলীল, তীক্ষ্ম ও বাহুল্যবর্জিত। সমগ্র দেশবাসীর অন্তর ছুঁয়ে গিয়েছিল সেই ভাষণ। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ উদাত্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করে তিনি স্বাধীনতার ডাক দেন। এরপরই আসে ২৫ মার্চের কাল রাত। পরেরদিন প্রথম প্রহরে তাঁকে পাকিস্তানি বাহিনী গ্রেফতার করে নিয়ে যায়।
পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১০ জানুয়ারি’ ৭২ এ স্বদেশের মাটিতে ফিরে আসেন বঙ্গবন্ধু। বিমান থেকে অবতরণের পর জাতীয় নেতৃবৃন্দ তাকে পুষ্পমাল্যে শোভিত করেন। খোলা ট্রাকে চড়ে তিনি বিমানবন্দর থেকে রওয়ানা হন রমনা রেসকোর্স ময়দানের উদ্দেশ্যে। ট্রাক ধীরগতিতে এগিয়ে চলে। রাস্তার দুই ধারে লাখো জনতার উল্লাস। মুহূর্মুহু করতালির মাধ্যমে জনতা স্বদেশের মাটিতে ফিরে আসার জন্য বঙ্গবন্ধুকে অভিনন্দন জানায়।
সভা মঞ্চে পৌঁছে বঙ্গবন্ধু বারবার রুমাল দিয়ে চোখ মুছে সংক্ষিপ্ত অথচ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণ দেন। তিনি বলেন, ‘আজ আমার জীবন সাধনা পূর্ণাঙ্গতা পেয়েছে, আজ আমার দেশ স্বাধীন।’ ওই দিনের পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক সংবাদ নিবন্ধ থেকে জানা যয়Ñ এক সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেছিলেন, তিনি জাতিকে আজ কী বাণী শোনাবেন? সাংবাদিকের কথার জবাবে বঙ্গবন্ধু হেসে উঠে উদাত্ত কণ্ঠে তাঁর প্রিয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা উচ্চারণ করে বলেছিলেনÑ
‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী,
ভয় নাই ওরে ভয় নাই।
নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।’
বস্তুত অর্থেই বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নানা মাত্রায় বাংলাদেশের মানুষের জীবনের অত্যন্ত গুরুত্ববহ ও তাৎপর্যম-িত একটি দিন। এদিন বাঙালিদের বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সিঁড়ি তৈরি করে দিয়েছে। বড় ত্যাগ ছাড়া যে কোনো বড় অর্জন সম্ভব নয়, সেই বার্তাই বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস বহন করে।
লেখক: প্রাক্তন অধ্যাপক, ফোকলোর বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়